leadT1ad

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো ‘নৃশংসতার চূড়ান্ত’, বিচার নিয়ে প্রশ্ন আসামিপক্ষের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

আশুলিয়ায় ভ্যানে লাশের স্তূপের দৃশ্য উঠে এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতিতেও

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সাভারের আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার পর পেট্রোল ঢেলে লাশ পোড়ানোর মামলার রায়ে এই ঘটনাকে ‘নৃশংসতা চূড়ান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। আর একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাস চেম্বারে হাজার হাজার মানুষ হত্যার নৃশংসতার সঙ্গে তুলনা করেছেন প্রসিকিউশন। তবে মামলাটিতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের স্বজনরা বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা ন্যায়বিচার পাননি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আলোচিত মামলাটিতে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রায় দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এতে স্থানীয় এমপিসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড ও সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।

সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন হলেন— আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, এসআই মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।

যাবজ্জীবনের আসামিরা হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস এবং ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন।

এ ছাড়া এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় এসআই শেখ আবজালুল হককে খালাস দেওয়া হয়েছে।

নজিরবিহীন নৃশংসতা: রাষ্ট্রপক্ষ

রায়ের পর প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম। হিটলারের গ্যাস চেম্বারে মানুষ হত্যার পরেই এই ঘটনাকে নৃশংসতম বলা যায়। পরিকল্পিতভাবে ছয়জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।

রায়ের পর্যবেক্ষণ ব্যাখ্যা করে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, আদালত এই ঘটনাকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ব্রুটালিটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একজন জীবিত ব্যক্তিকেও পোড়ানো হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম জনপ্রতিনিধি হয়েও জনগণকে রক্ষা না করে হত্যায় উৎসাহ ও নির্দেশ দিয়েছেন। ডিআইজি, এসপি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের যাবজ্জীবন দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র দায় এবং তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করেছেন।

তথ্য-প্রমাণে ‘অসংগতি’র অভিযোগ আসামিপক্ষের

রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্টির কথা জানালেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তথ্য-প্রমাণে অসংগতির অভিযোগ তুলেছেন। উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এসআই মালেক ও কনস্টেবল মুকুলের আইনজীবী মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ‘প্রসিকিউশন তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২৪ সাক্ষীকে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু কোনো সাক্ষীই সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। আমি আইও-কে (তদন্ত কর্মকর্তা) জিজ্ঞেসা করেছিলাম, ভিডিও বা অডিওতে এসআই আব্দুল মালেককে দেখেছেন বা তার কোনো শব্দ শুনেছেন কিনা। তিনি স্বীকার করেছেন যে দেখেননি।’

কনস্টেবল মুকুলের বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের অসংগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে যে ব্যক্তিকে ভ্যানে লাশ তুলতে দেখা গেছে, তার পরনে ছিল পুলিশের হালকা আকাশী রঙের ভেস্ট এবং পায়ে বুট জুতা। অথচ মুকুল চোকদার তখন টিয়া রঙের টি-শার্ট পরে ছিলেন। এটি একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য (গ্ল্যারিং কন্ট্রাডিকশন)। আমরা আদালতে তা উপস্থাপন করেছি। আশা করেছিলাম খালাস পাব। কিন্তু এই রায়ে আমরা ভীষণভাবে সংক্ষুব্ধ।’

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত শাহিদুল ইসলামের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহাদী হাসান বলেন, শাহিদুলের বিরুদ্ধে ‘কমন রেসপন্সিবিলিটি’র অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কোনো সাক্ষী নিশ্চিতভাবে তার ঘটনাস্থলে থাকার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি।

আব্দুল্লাহিল কাফীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ এনাম বলেন, সাক্ষীদের বক্তব্য ছিল, শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে। কার কাছ থেকে শুনেছেন, সেই নামও তারা বলতে পারেননি। এরপরও যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এস এম মেরাজুল আলম বলেন, ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণের জন্য আমরা কল রেকর্ড (সিডিআর) বা ওয়াকিটকির রেকর্ড চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রসিকিউশন তা দাখিল করতে পারেনি। ভিডিওতে যাকে আগুন দিতে দেখা গেছে, তাকে আসামিই করা হয়নি। অথচ কেবল পরিদর্শক হওয়ার কারণে ডিবির আরাফাত হোসেনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে।’

রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্তদের স্বজনরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত শাহিদুল ইসলামের স্ত্রী কামরুন্নাহার বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার মিসক্যারেজ হওয়ায় আমার স্বামী ঢাকার বাসায় ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। কোনো অডিও বা ওয়্যারলেস রেকর্ড না থাকার পরও তাঁকে কীভাবে নির্দেশদাতা বানানো হলো?’

আর মুকুলের স্ত্রী সুমাইয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থলে শুধু দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমার স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে, তিনি সেখানে কেবল দাঁড়িয়ে ছিলেন।’

মামলার পটভূমি

মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে সাজ্জাদ হোসেন (সজল), আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন। পরে জীবিত একজন ও ছয়জনের লাশ একটি ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২ জুলাই ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২১ আগস্ট বিচার শুরু হয়। গত ২০ জানুয়ারি উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এর আজ রায় ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত