জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা: সংবিধানের লঙ্ঘন বলছে আইনি পর্যালোচনা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১০: ০১
হাইকোর্ট ভবন। ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের প্রবেশে সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাকে দেশের ‘বিদ্যমান আইন, বিচারিক নজির এবং সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের নেতৃত্বাধীন চেম্বার ল’ ল্যাব-এর প্রকাশিত এক আইনি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ‘অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থি’।

গত ৭ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার শুনানির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীরা সাংবাদিকদের প্রবেশপথে আটকে দেন। কারণ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের জানানো হয় যে, আদালতের এজলাসে প্রবেশের অনুমতি নেই এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরে রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হলেও তিনি এর কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেননি এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।

সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের ‘লঙ্ঘন’

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সাংবিধানিকভাবে আদালতের কার্যক্রম জনসমক্ষে হওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন।

এছাড়া সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার ওপর কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা আদালত অবমাননার মতো সুনির্দিষ্ট শর্তে যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ আরোপ করা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর আরোপিত এই শর্তহীন নিষেধাজ্ঞা সংবিধানে উল্লিখিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের আওতায় পড়ে না।

পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে এই বৈষম্যমূলক আচরণ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের সমান সুরক্ষা এবং ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সমতা নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করা হয় পর্যালোচনায়।

প্রকাশ্য বিচার নীতি ও দেশীয় আইন

কমন ল-এর সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টার পূর্ববর্তী সময় থেকেই প্রকাশ্য বিচার নীতি বা ‘প্রিন্সিপাল অব ওপেন জাস্টিস বিচারব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেও মনে করছে চেম্বার ল’ ল্যাব। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, লর্ড হিউয়ার্ট ১৯২৪ সালের বিখ্যাত ‘আরবি সসসেক্স জাস্টিজ‘ মামলায় বলেছিলেন, ন্যায়বিচার কেবল সম্পন্ন হওয়াই যথেষ্ট নয়, তা যে স্পষ্টভাবে ও প্রকাশ্যে সম্পন্ন হচ্ছে তা দৃশ্যমান হওয়াও আবশ্যক। লর্ড অ্যাটকিনের মতে, ন্যায়বিচার কোনো গোপন বা নির্জন বিষয় নয় যা বদ্ধ দরজার পেছনে চর্চা করা হবে।

‘ল ল্যাব’-এর এই পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

পর্যালোচনার আরো বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করলে আদালতের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা কমে যায় এবং বিচারিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয়। সংবাদমাধ্যম আদালতের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছে দেয় এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে জনসচেতনতা তৈরি করে। এই ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস পায়। আইনের শাসন ও বিচারিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের ওপর আরোপিত এই অসাংবিধানিক নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করা আবশ্যক বলে মত দেওয়া হয়েছে পর্যালোচনায়।

ল’ ল্যাব-এর এই আইনি পর্যালোচনার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের একদল আইনজীবী ও গবেষক যুক্ত ছিলেন। চেম্বারটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের নেতৃত্বে এই টিমে সিনিয়র কাউন্সেল হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। এছাড়া কাউন্সেল হিসেবে মোহাম্মাদ মিজানুল হক, মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ ও আবদুল্লাহ সাদিক সহ অনেকেই যুক্ত ছিলেন।

সম্পর্কিত