হামের টিকা নিয়ে ইউনিসেফের দাবি সঠিক নয়, ইউনূস সরকারের বিশেষ সহকারী

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

হামের টিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘সায়েন্স’– এর প্রতিবেদনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।

শুক্রবার (১ মে) রাতে ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি এবং পরিবর্তিত পদ্ধতিতে ইপিআইয়ের টিকাও কেনা হয়নি। এ বিষয়ে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়।

ডা. সায়েদুর লিখেছেন, সায়েন্সে আমার বক্তব্য খণ্ডিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও আমি লিখিতভাবে খণ্ডিত অংশ প্রকাশের ফলে অস্পষ্টতার কারণে ভুল বুঝাবুঝির সম্ভাবনার কথা বলেছিলাম।

দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, প্রথমে স্পষ্ট করা দরকার, ইপিআইয়ের নিয়মিত কর্মসূচির হামের টিকা সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, সরকার ইপিআইয়ের চারটি টিকার সম্পূর্ণ অর্থ এবং অন্য টিকাগুলোর ক্ষেত্রে গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) পাশাপাশি আংশিক মূল্য পরিশোধ করে। শুধু নতুন টিকা শুরু এবং ক্যাম্পেইনের টিকার সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে গ্যাভি। অর্থাৎ হামের টিকাসহ চারটি টিকা সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে হয় বিধায় এক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় নিয়মাবলী অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয় ও যৌক্তিক।

সায়েন্স বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউনিসেফ সতর্ক করার পরেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করেছিল। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এটি কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়।

তবে অন্তবর্তী সরকারের সময়ে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন হয়নি দাবি করে ডা. সায়েদুর লিখেছেন, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনার ক্ষেত্রে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬’ অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং সে অনুযায়ী এই ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ‘ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিটিএম)’ অথবা ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)’ অনুসরণ করার নিয়ম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইপিআইয়ের জন্য টিকা কেনার অনুমতি চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এর (৬৮(১) উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন বা জনস্বার্থে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ডিটিএমে টিকা কেনার অনুমোদন দেয়।

তিনি লেখেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া শুরুর আগে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি আগের বছরের অনুমোদনের সময়ের পর্যবেক্ষণ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণের উল্লেখ থাকায় অনুরোধ পাঠানোর আগে যাচাই-বাছাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। যেহেতু ইপিআই একটি নিয়মিত জাতীয় কর্মসূচি। এটি প্রতি বছর জরুরি ধারা ব্যবহার করে চালানো ঠিক নয় বিবেচনায় টিকার আন্তর্জাতিক বাজার অনানুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে রাষ্ট্রীয় অর্থ সংস্থানের প্রাথমিক সম্ভাবনা দেখা যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন চলমান একটি কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা ক্রয়ে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরকারের নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

সাবেক এই বিশেষ সহকারী বলেন, এই অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে টিকা কেনার সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা কেনার নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন প্রয়োজনীয় বলে সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু যেহেতু অন্তবর্তী সরকারের হাতে যথেষ্ট সময় ছিল না, সে কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত সরকারি বরাদ্দের অর্ধেক অর্থাৎ ৪১৯ কোটি টাকা ডিটিএমে কেনার সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির’ কাছে টিকা কেনার চলমান প্রক্রিয়ায় (ডিটিএম) অনুমতির অনুরোধ করলে কমিটি অনুমতি দেয়।

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের ফেসবুক পোস্ট।
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের ফেসবুক পোস্ট।

তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব খাতের বরাদ্দ টাকার বাইরেও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে করোনা টিকার জন্য ঋণের অর্থ পুনরায় ব্যবহারের (Repurpose) অনুমতির মাধ্যমে পাওয়া ৬০৯ কোটি টাকার ক্ষেত্রেও ডিটিএম অনুসরণ করে ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার জন্য ক্রয়কারীকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমতি দেওয়া হয়।

ডা. সায়েদুর বলেন, অতএব অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ক্রয় পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি এবং কোনো পরিবর্তিত পদ্ধতিতে ইপিআইয়ের টিকাও কেনা হয়নি। সরকারের টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন বা বন্ধ করা সম্পর্কে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তবে আমাদের উদ্বেগ ছিল– এই বিশেষ নিয়ম দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বা পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে ইপিআইয়ের টিকা নিয়মিত কেনার জন্য উপযুক্ত, আইনসিদ্ধ ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে করা উচিত।

ফেসবুকে তিনি লেখেন, স্পষ্ট উল্লেখ করতে চাই– ইপিআইয়ের কোনো টিকাই এখন পর্যন্ত উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে কেনা হয়নি। শুধু প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের স্বচ্ছ ও যথাযথ ব্যবহারের ন্যায্য পদ্ধতি হিসেবে এই পদ্ধতি অথবা ‘লং টার্ম অ্যাগ্রিমেন্ট (এলটিএ)’ পদ্ধতি অনুসরণ করাই এ ধরনের নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদী ক্রয়ের জন্য পরে উপযুক্ত হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অভ্যন্তরীণ পরামর্শ আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। দরপত্রের আহ্বান প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়নি।

টিকার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জোরালো অবস্থান তুলে ধরে এই বিশেষ সহকারী লেখেন, শিশুদের টিকা সংগ্রহে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের নিদর্শন হচ্ছে– ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিকা কেনার জন্য আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করেছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, গত বছরের মার্চে স্বাক্ষরিত গ্যাভির সঙ্গে ডিসিশন লেটারের অধীনেই বর্তমানে চলমান হাম ক্যাম্পেইনের টিকা দেশে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দুটি নতুন টিকার ক্যাম্পেইন সফলভাবে হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত