পেপাল আসছে, কিন্তু কেন এত সংশয়

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ২৩: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশে পেপালের আগমনের গল্পটা একটু অদ্ভুত। প্রায় এক দশক ধরে একই কথা বলা হচ্ছে—পেপাল আসছে। প্রতিটি সরকারই এই ঘোষণা দিয়েছে, আবার নীরবে সরেও গেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পেপাল চালুর জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ঘোষণার পর সারা দেশের ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তবে উৎসাহের চেয়ে সংশয়টাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

পেপাল কী, সেটা এখন আর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে এই ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার আছে। ফ্রিল্যান্সার থেকে শুরু করে ছোট উদ্যোক্তা, সবাই পেপালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন করেন অনায়াসে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা এখনো পেওনিয়ার বা ওয়্যার ট্রান্সফারের মতো জটিল, ব্যয়বহুল পথে পেমেন্ট আনতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ বিশ্বের অন্য প্রান্তের ক্লায়েন্টরা প্রথমেই পেপাল চান। এই একটা বাধার কারণে অনেক বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার কাজ পাওয়ার আগেই হারিয়ে বসেন।

তাহলে এত বছর পেপাল আসেনি কেন? এর উত্তর একটাই, নিয়ন্ত্রক জটিলতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পেপালের আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি নেই, কোনো প্রস্তাবনাও আসেনি সরাসরি। গত ডিসেম্বরে পেপালের দক্ষিণ এশিয়ার একটি সিনিয়র টিম প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও আইসিটি বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে বৈঠক করলেই কারবার শুরু হয় না, এটা ব্যাংকিং পেশার মানুষ হিসেবে আমি ভালো জানি। পেপালের মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন বাজারে আসতে হলে রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। প্রতিশ্রুতির ফেনা তুলে বাস্তবে পৌঁছানো তাই সহজ নয়।

এখন সরকার বলছে, পেপাল চালুর জন্য কমিটি হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে, ইতিমধ্যে সাড়ে সাত হাজার জন পেয়েছেন। এটা ভালো উদ্যোগ, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কমিটি গঠন মানেই সমাধান নয়। কমিটি কাজ করবে, সুপারিশ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মাঝখানে কতটা সময় যাবে, কেউ বলছেন না। ২০১৭ সালেও একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়েছিল, পরে সেটি চুপচাপ বাতিল হয়। সেই স্মৃতি ফ্রিল্যান্সারদের মনে এখনও টাটকা।

পেপালের পাশাপাশি দেশীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। মোবাইল ব্যাংকিং এগিয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো অপ্রতুল। পেপাল এলেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি টাকা আনা যাবে না, থার্ড পার্টির মাধ্যস্থতা লাগবে। এই ব্যবধানটা পূরণ করার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

তবু এবারের পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন মনে হচ্ছে। পেপাল নিজেরা এসে আলোচনা করেছে, এটা আগে হয়নি। ব্যাংকিং খাতে কিছুটা সংস্কারও এসেছে, যেটা পেপালের প্রতিনিধি দল নিজেরাই আস্থার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। আইটি খাতে তরুণদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে, হাই-টেক পার্কের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং বিষয়ে দুই হাজারের বেশি তরুণ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এই পরিবেশ পেপালের জন্য অনুকূল। কিন্তু অনুকূল পরিবেশ থাকলেই বিদেশি কোম্পানি আসে না, চাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও দ্রুত পদক্ষেপ।

পেপাল চালু হলে কী পরিবর্তন আসতে পারে? শুধু ফ্রিল্যান্সার নয়, ছোট রপ্তানিকারকরাও সরাসরি বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে পেমেন্ট পাবেন। এলসি খোলার ঝামেলা ছাড়াই ইউরোপ বা আমেরিকায় ছোট চালানে পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সহজ হলে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আনার প্রবণতাও কিছুটা কমবে। নগদ লেনদেনের বিকল্প ডিজিটাল মাধ্যম শক্তিশালী হলে কর ফাঁকির সুযোগও কমে আসে। সব মিলিয়ে সুবিধার তালিকাটা ছোট নয়।

কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। পেপাল আসলে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? না, বরং কিছু নতুন ঝুঁকিও সামনে আসবে, যেগুলো এখনই ভেবে রাখা দরকার। সবচেয়ে বেশি যে আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটা হলো মূলধান বহির্গমন বা ক্যাপিটাল ফ্লাইটের ঝুঁকি। পেপাল শুধু টাকা আনার মাধ্যম নয়, টাকা পাঠানোরও মাধ্যম। কেউ চাইলে দেশ থেকে পেপালের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারবেন। তখন কার টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেটা নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে। পেপাল টু পেপাল লেনদেন সরকারের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়, এটা সত্যিকারের উদ্বেগ। এর পাশাপাশি ফিশিং স্ক্যামসহ সাইবার জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়বে। ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা দেশে এখনো যথেষ্ট নয়, ফলে অনেক ব্যবহারকারী প্রতারণার শিকার হতে পারেন।

এই সমস্যাগুলো অবশ্য নতুন নয়, অন্য দেশও এগুলো মোকাবিলা করেছে। সমাধান আছে, তবে সেটার জন্য দরকার স্মার্ট নীতিকাঠামো। প্রথমত, পেপালের মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ বহির্গমনের ওপর স্পষ্ট সীমা বেঁধে দিতে হবে, যাতে শুধু ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণ পাঠানো যায়। দ্বিতীয়ত, পেপালের লেনদেন ডেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে নিয়মিত ভাগ করার বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল আর্থিক সচেতনতার কার্যক্রম বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা স্ক্যাম চিনতে পারেন। এই তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ব্যক্তিগত লেনদেনে পেপাল চার্জ নেয় না, কিন্তু ব্যবসায়িক লেনদেনে ফি প্রযোজ্য। ইনস্ট্যান্ট ট্রান্সফারে এক শতাংশ পর্যন্ত চার্জ কাটে। মুদ্রা রূপান্তরে আরও কিছু খরচ আছে। ছোট ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এই ফি মাঝেমধ্যে চাপের কারণ হতে পারে। তাই পেপালকে শুধু আনলেই হবে না, এর ব্যবহারকারীদের জন্য অনুকূল শর্তে চুক্তি করাটাও সরকারের কাজ।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। পেপালের পাশাপাশি দেশীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। মোবাইল ব্যাংকিং এগিয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো অপ্রতুল। পেপাল এলেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি টাকা আনা যাবে না, থার্ড পার্টির মাধ্যস্থতা লাগবে। এই ব্যবধানটা পূরণ করার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং খাত দ্রুত বাড়ছে। তরুণরা কাজ পাচ্ছেন, আয় করছেন। কিন্তু পেমেন্ট আনার জটিলতায় অনেকেই মাঝপথে থমকে যান। সেই জায়গায় পেপাল একটা বড় সমাধান হতে পারে, যদি সত্যিই আসে। সরকারের উচিত কমিটির সুপারিশের অপেক্ষায় না থেকে সমান্তরালভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পেপালের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা। বিনিয়োগ বোর্ডের পথে দ্রুত প্রস্তাব চাওয়া। সময়সীমা নির্ধারণ করে কাজ করা। আর সুযোগটা আনার পাশাপাশি ঝুঁকিগুলো ঠেকানোর প্রস্তুতিটাও সমানভাবে নেওয়া।

প্রতিশ্রুতির বয়স যখন এক দশক ছুঁই ছুঁই, তখন শুধু আশার কথা বললে মানুষ আর বিশ্বাস করেন না। পেপাল চালু হোক, এটা সবাই চান। কিন্তু চাওয়াটা এবার কর্মে রূপ নিক, এবং নিক সতর্কতার সঙ্গে, সেটাই প্রত্যাশা।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ,ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত