ঝড়ে লবণ আবাদ ধ্বংস, চাষির চোখে লোনাজল

  • ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত
  • ১ লাখ টন লবণ উৎপাদন ব্যাহত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ২৩: ৫১
গত দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় অন্তত ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

কালবৈশাখী ঝড় ও টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলে লবণ শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় অন্তত ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ টন লবণের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বলে মাঠ পর্যায়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টির প্রভাবে মাঠের লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি চাষের জন্য করা ‘বেড’ বা ‘কাই’ নষ্ট হয়ে উপকূলজুড়ে লবণ উৎপাদন আপাতত বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত মোট ১২ দিনের বৃষ্টিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩ লাখ টন লবণের উৎপাদন কম হয়েছে। অথচ মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র দাবদাহে দৈনিক উৎপাদন ৩২ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিতে গিয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের চাষি আলমগীর হোসেন জানান, ১২ একর জমিতে তাঁর প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে। একইভাবে চাষি শাহেদ সেলিম ও আহমেদ হোসেন জানিয়েছেন, মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে তাঁদের শত মণ লবণ পানিতে ভেসে গেছে। উৎপাদন থমকে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে লবণের কম দাম চাষিদের লোকসানকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সংকটে উপকূলের হাজার হাজার প্রান্তিক চাষি। ছবি: সংগৃহীত
সংকটে উপকূলের হাজার হাজার প্রান্তিক চাষি। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে প্রায় ৩০০ টাকা উৎপাদন খরচের বিপরীতে প্রতি মণ লবণ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাষি ফরিদ উল্লাহর মতে, প্রতি কেজি লবণে তাঁদের অন্তত ৫ টাকা করে লোকসান দিতে হচ্ছে। নোয়াপাড়ার চাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘চার মাস ধরে লোকসানে লবণ বিক্রি করছি। দাদনের টাকা শোধ তো দূরের কথা, সংসার চালানোই কঠিন।’

টেকনাফের হোয়াইক্যং, সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় লবণের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কাজ শুরু করতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। টেকনাফে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা এখন ঝুঁকির মুখে। টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষি কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহম্মদ অভিযোগ করেন, এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে, যা দেশীয় প্রান্তিক চাষিদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে।

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, বৃষ্টিতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হলেও টানা কয়েক সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত ১৭ লাখ ৫৯ হাজার টন উৎপাদিত হয়েছে এবং আগের মৌসুমের ৪ লাখ টন লবণ মজুত রয়েছে।

লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়ে  চাষের জন্য করা ‘বেড’ বা ‘কাই’। ছবি: সংগৃহীত
লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়ে চাষের জন্য করা ‘বেড’ বা ‘কাই’। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বৈরী আবহাওয়া আরও দুই-তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী ৬ মে থেকে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ১৪ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া সম্ভাব্য তীব্র তাপপ্রবাহ লবণ উৎপাদনের জন্য সহায়ক হবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় হঠাৎ বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই অবকাঠামো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করলে চাষিরা ক্রমেই এই পেশা থেকে সরে যাবেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত