জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জঙ্গল সলিমপুর

গডফাদারদের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীদের অভয়ারণ্য

>>দশকের পর দশক অবৈধ পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এই অপরাধ জগতের মদত জুগিয়েছেন রাজনীতিক প্রভাবশালীরা

>> সাঁড়াশি অভিযানে ১২ সন্দেহভাজন আটক, ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার

>> অভিযানে অংশ নেয় সাড়ে ৩ হাজার সদস্য

>> দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে: বিভাগীয় কমিশনার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

যৌথ বাহিনীর সাড়ে ৩ হাজার সদস্য জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালায়। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘এলাকাটি পুরোপুরি সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সন্ত্রাসী ইয়াসিন এলাকার প্রতিটি সংযোগস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তুলেছে তারা।’, বলছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ।

কেউ সহজে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন না। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক কিংবা দিনমজুরের ছদ্মবেশে থাকা তথ্যদাতারা আগেভাগেই পৌঁছে দিতেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা।

অস্ত্র হাতে সদর্পে টইল দিতে দেখা যেত কিছু ব্যক্তিকে, যারা কোনো সরকারি বাহিনীর সদস্য নয়। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এলাকার সব প্রবেশপথে বসানো হয় বড় বড় লোহার গেট। এমনকি সেখানকার বাসিন্দাদের দেওয়া হয় নিজস্ব পরিচয়পত্র, যেন স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই লোহার গেটগুলো এখনো চোখে পড়ে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরের চিত্র ছিল এমনই। ৩ হাজার ১০০ একরে বিস্তৃত এই এলাকা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার নিষিদ্ধ বা ‘নো-গো জোন’। আগে থেকে ছাড়পত্র ছাড়া সেখানে ঢোকার উপায় ছিল না।

সোমবার (৯ মার্চ) সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান শুরু হয়। দিনভর অভিযানে এখন পর্যন্ত ১২ সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। এ সময় দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স ও দুটি বাইনোকুলার জব্দ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় দুটি স্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে বলে জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো জেলায় প্রায় চার হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সলিমপুরেই দায়িত্বে আছেন তিন হাজারের বেশি।

দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাটি যেন রাষ্ট্র, সরকার বা আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে এক আলাদা জগৎ হিসেবে টিকে ছিল। গত ১৯ জানুয়ারি এখানেই অভিযান চালাতে গিয়ে পিটুনিতে নিহত হন র‍্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব।

যেন এক স্বাধীন রাজ্য

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে খুব কাছেই সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর আক্ষরিক অর্থেই যেন এক ‘স্বায়ত্তশাসিত’ অঞ্চল! দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রভাবশালী পক্ষের নিয়ন্ত্রণে ছিল এটি। খাসজমি দখল, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং পাহাড় কাটার ওপর ভিত্তি করে এখানে গড়ে উঠেছিল হাজারো অবৈধ বসতি। আর এই পুরো কাঠামোর কেন্দ্রে ছিল স্থানীয় গডফাদার, ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। আর তাদের মদদদাতা হলেন রাজনীতিকরা। এক কথায়, এখানকার গডফাদারেরা সব সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে।

তবে আজকের সাঁড়াশি অভিযানের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। পরাধীদের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য পুরোপুরি না হলেও অন্তত ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গ্রেপ্তারদের একাংশ
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গ্রেপ্তারদের একাংশ

ডিআইজি পলাশ বলেন, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এখন পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। আজ সকালে ৩ হাজার ৫৬ পুলিশ সদস্য নিয়ে সেখানে অভিযান শুরু হয়। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ৫০০-এর বেশি সদস্য এবং পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, আনসার, জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।

কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের আগেই ওই এলাকার বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেতরে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. রাসেল বলেন, ‘বিকেল ৩টা পর্যন্ত ১২ জনকে আটক করা হয়েছে এবং বেশ কিছু অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।’

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে দুটি স্থায়ী ক্যাম্প (একটি পুলিশের এবং একটি র‍্যাবের) স্থাপন করা হবে, যাতে সন্ত্রাসীরা আর কখনো এখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।’

জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ মূলত কয়েকটি গ্যাংয়ের হাতে। আলীনগর অংশে ইয়াসিন মিয়ার প্রভাব। অন্যদিকে সলিমপুর অংশে সক্রিয় কাজী মশিউর রহমান, গাজী সাদেক এবং গোলাম গফুরের অনুসারীরা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধও রয়েছে।

যেভাবে শুরু

সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুর ইসলাম জানান, নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামের এক ব্যক্তি প্রথম জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তখন সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর পৌঁছানো সহজ ছিল না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আক্কাস নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরকারি জমি প্লট আকারে বিক্রি করতে থাকেন।

নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আলী আক্কাস একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়েন। এরপর পাহাড় কেটে আরও নতুন নতুন বসতি গড়ে তোলা হয় এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে অবৈধভাবে জমির বেচাকেনা চলতে থাকে। প্লট ক্রেতাদের সংঘবদ্ধ করতে গঠন করা হয় ‘ছিন্নমূল সমবায় সমিতি’। এই সমিতির মাধ্যমেই নিয়মিত চাঁদা তোলা এবং পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হতো।

র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হন। এরপরই জমি দখল ও প্লট বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর সহযোগীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। আলী আক্কাসের একসময়ের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা গ্যাং তৈরি করেন। এই দলগুলো পরে জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

অভিযানে অংশ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাড়ে ৩ হাজার সদস্য
অভিযানে অংশ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাড়ে ৩ হাজার সদস্য

স্থানীয়রা জানান, আলীনগর এলাকায় সবচেয়ে প্রভাব ইয়াসিন মিয়ার। তিনি ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’ নামের একটি সংগঠন চালান। অন্যদিকে, কাজী মশিউর রহমান ও গাজী সাদেকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’। মূলত পাহাড়ে বসবাসকারী প্লট ক্রেতারা এসব সংগঠনের সদস্য।

ওসি মহিনুর জানান, এই দুই সংগঠনের সদস্য মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস।

রাজনৈতিক প্রভাব ও রক্তপাত

সলিমপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাহাড় দখল ও প্লট বাণিজ্যের পেছনে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের সখ্য দেখা গেছে।

ওসি মহিনুর জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইয়াসিন মিয়া স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এর ফলে আলীনগর এলাকায় তাঁর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইয়াসিন নিজের রাজনৈতিক ভোল পাল্টেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দিনের নাম সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজী মশিউর, গাজী সাদেক এবং গোলাম গফুরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রোকন উদ্দিন আলীনগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন।

ইয়াসিন ও রোকন উদ্দিনের মোবাইল নম্বরে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। তবে আগে রোকন উদ্দিন দাবি করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সলিমপুরে কোনো প্লট নেই। রাজনীতি করেন, এজন্য দলীয় কর্মীদের খোঁজখবর রাখতে হয় বলে জানান তিনি।

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান
জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান

এদিকে, জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুর ইসলাম জানান, গত ১৮ মাসে সেখানে অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মূলত পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ও জমি দখলের জেরে এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে ধারণা তাঁর।

সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেদিনের অভিযানে ইয়াসিনের নির্দেশেই ধারালো অস্ত্র নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই হামলায় এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চার র‍্যাব সদস্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা হয়েছিল।

এর আগে গত ২ জানুয়ারি সলিমপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি মীর আরমানকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত বছরের ৪ অক্টোবর আলীনগর এলাকায় জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে খলিলুর রহমান নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হন।

সম্পর্কিত