শ্রীমঙ্গলে একমাসে ৯ অজগর উদ্ধার, আবাসসংকট নিয়ে প্রশ্ন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

উদ্ধার করা অজগর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অবমুক্ত করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
উদ্ধার করা অজগর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অবমুক্ত করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একমাসে ২০ বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে ৯টি অজগর। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত বানরও পাওয়া গেছে লোকালয়ে। এভাবে একের পর এক বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা এখন শ্রীমঙ্গলের নিয়মিত দৃশ্য। লোকালয়ে চলে আসার পেছনে আবাসস্থল ও খাদ্যসংকটের কথা বলছেন বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের চারপাশে বন, চা-বাগান, টিলা ও জলাভূমি। এসব প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাস করে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। কিন্তু সেই প্রাণীরাই যখন বারবার মানুষের বসতবাড়ি, কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকায় চলে আসছে।

শুধু আগস্ট মাসের হিসাবে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বাকি তিনটির মধ্যে রয়েছে একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর। উদ্ধার হওয়া সাপের মধ্যে অজগরই সবচেয়ে বেশি—৯টি। এর একটি ছিল মৃত।

আগস্টের শুরুতে হাইল হাওরের ধানখেত থেকে অজগর উদ্ধারের মধ্য দিয়ে এই ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর, ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে পাওয়া যায় একটি মৃত অজগর।

১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। ১৩ আগস্ট ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে উদ্ধার করা অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ ফুট এবং ওজন প্রায় ১৬ কেজি। পরদিন হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার হয়।

১৫ আগস্ট এক দিনেই চারটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। নোয়াগাঁও থেকে দাঁড়াশ, উত্তর ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি থেকে লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে শঙ্খিনী, ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি উল্টোলেজি বানর এবং ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরেকটি শঙ্খিনী উদ্ধার করা হয়।

২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার হয়। ২৮, ২৯ ও ৩০ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, সাতগাঁও-খিলগাঁও ও ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে চলে আসার পেছনে আবাসস্থল ও খাদ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বনের ভেতরে খাবারের সংকট এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

বন উজাড়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বন উজাড় হচ্ছে। খাবার না থাকলে প্রাণী কীভাবে থাকবে? এ বিষয়ে বন বিভাগের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

তবে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে আসাকে শুধু খাদ্যসংকট বা আবাসস্থল সংকট হিসেবে দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘এখন গরম ও বর্ষার সময়। তাই হয়তো প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। তাছাড়া খাবার কিংবা অন্য কোনো সংকট নেই।’

তবে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এতে কোনো কোনো প্রাণী মারা যাচ্ছে বা আহত হচ্ছে বলেও জানান। তাঁর মতে, সড়কপথের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা গেলে প্রাণীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব।

রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দিন দিন বনে প্রাণী বাড়ছে, কমছে না। আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণী দেখা যাচ্ছে।’

পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বাড়ি বা লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত