leadT1ad

‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ প্রকল্পের নামে প্রায় ৯০৩ কোটি টাকার লুটপাট

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রকল্পের পেছনের প্রকৃত চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক

ব্যর্থতা বা সফলতা কোনো ব্যাপারই না। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের কারো নাম যুক্ত করতে পারলেই কোটি কোটি টাকার সরকারি বাজেট পাওয়া যেত। প্রায় ৯০৩ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব (এসআরডিএল)’ ও ‘স্কুল অব ফিউচার (এসওএফ)’-এর নামে। ২০১৫ থেকে ২০১৯-এ প্রকল্পে বাজেট ছিল ২৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং ২০১৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এর বাজেট ধার্য করা হয়েছিল ৬০৫ কোটি টাকা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে এই প্রকল্পের পেছনের প্রকৃত চিত্র। গত দেড় দশকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কার্যক্রমে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে ‘হোয়াইট পেপার অন ডিজিটাল বাংলাদেশ: মডার্নানাইজেশন, মিমিক্রি অ্যান্ড দ্যা মিথ অব ডিজিটাল-ইরা ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করেছে সরকার। আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটেই গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এই শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করা হয়।

শ্বেতপত্রে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবকে (এসআরডিএল) ‘শিক্ষা ছাড়া ল্যাব বা ল্যাব উইদাউট লার্নিং’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আর ২০০৯-২০২৪ শাসনকালের আইসিটি প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটিকেই সবচেয়ে বেশি রাজনীতিকরণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। যা মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে দলীয় ও রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়েই বেশি মনোযোগী ছিল।

সরকারি নথি (ডিপিপি, আইএমইডি ও আইআইএফসি মূল্যায়ন), মাঠ জরিপ এবং সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই শ্বেতপত্রে পুরো প্রকল্পচক্র জুড়ে পদ্ধতিগত শাসন এবং বাস্তবায়নের ভয়াবহ ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং

২০২১ সালে শেখ হাসিনা সরকার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব (এসআরডিএল) প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে ‘স্কুল অব ফিউচার’ নামে একটি উপ-প্রোগ্রাম চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে একটি করে স্কুলে ভবিষ্যৎ-মুখী এডটেক অবকাঠামো বা লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) চালু করা। শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের নামে এই প্রকল্পের নামকরণ করা হয়। যা ছিল মূলত শেখ পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্য প্রচারের একটি কৌশল। এর অংশ হিসেবে শেখ রাসেল দিবস পালন, শেখ রাসেল পদক প্রদান এবং শেখ রাসেল অ্যানিমেশন ল্যাবের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নির্বাচনী আসন অনুযায়ী এসআরডিএল প্রোগ্রামের বিতরণের চিত্র
নির্বাচনী আসন অনুযায়ী এসআরডিএল প্রোগ্রামের বিতরণের চিত্র

তৎকালীন সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই উদ্যোগটি ছিল একটি বিস্ময়কর সাফল্য। ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরকারি পোর্টালে দাবি করা হয় যে, সারা দেশে ১৩ হাজারের বেশি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ২৭ হাজার ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ল্যাবে ১৭টি কোর আই-৩ ল্যাপটপ, স্মার্ট টিভি, প্রিন্টার, রাউটার এবং আরামদায়ক আসবাবপত্রসহ ২৩টি অত্যাধুনিক আইসিটি সরঞ্জাম দেওয়ার কথা বলা হয়।

তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, ল্যাবগুলোর অধিকাংশই জরাজীর্ণ, তালাবদ্ধ এবং অব্যবহৃত। অনেক ক্ষেত্রে ল্যাবের মূল সরঞ্জামগুলোই নিখোঁজ। প্রধান শিক্ষকদের মতে, প্রশিক্ষিত অপারেটর ও তদারকির অভাবে সেখানে কোনো ক্লাস হয় না। এমনকি ল্যাপটপ চুরির ঘটনাও নিয়মিত সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের ব্যর্থতা

এসআরডিএল প্রকল্পের প্রথম পর্যায় (২০১৫-২০১৯) শেষ হওয়ার আগেই এর ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। পরিকল্পনা বিভাগের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত মধ্যবর্তী প্রভাব মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রকল্পটির কাঠামোগত ত্রুটি ছিল প্রকট।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাব পরিচালনার মৌলিক প্রস্তুতিই ছিল না। জরিপকৃত ৫২ শতাংশ স্কুলে কোনো ল্যান সংযোগ ছিল না এবং বাকি অর্ধেক স্কুল কোনো অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ছাড়াই চলছিল। অর্ধেকের বেশি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও তা শিক্ষার্থীদের শেখানোর পরিবর্তে স্কুলের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতো।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ল্যাবগুলো সপ্তাহে চার ঘণ্টারও কম সময় ব্যবহৃত হতো এবং দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীও মৌলিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পায়নি। আইসিটি ক্লাবগুলো ছিল নিষ্ক্রিয় এবং ৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উপজেলা আইসিটি অফিসাররা কখনো পরিদর্শনই করেননি। শিক্ষকেরা অন্যান্য দায়িত্বে ভারাক্রান্ত থাকায় এবং কোনো বাড়তি প্রণোদনা না থাকায় ল্যাব পরিচালনায় আগ্রহ দেখাননি। ফলে কম্পিউটার ও প্রজেক্টরগুলো নষ্ট হওয়ার ভয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো।

নষ্ট স্মার্টবোর্ড
নষ্ট স্মার্টবোর্ড

আইআইএফসি-এর সমাপ্তিকালীন মূল্যায়নেও একই চিত্র উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, গড়ে প্রতিটি কম্পিউটার ল্যাবে দিনে কার্যকর ব্যবহার ছিল মাত্র ৩ ঘণ্টা এবং শিক্ষার্থীরা গড়ে মাত্র ২৩ মিনিট কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পেত। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়, এসআরডিএল প্রকল্পটি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনে সফল হলেও আইসিটি-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে।

এতসব নেতিবাচক প্রতিবেদন ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও নীতিপ্রণেতারা প্রকল্পটি সংস্কার না করে বরং একটি নতুন রাজনৈতিক মোড়কে দ্বিতীয় পর্যায় চালু করেন, যেখানে বাজেট এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা—উভয়ই বাড়ানো হয়।

স্থান নির্বাচনে রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ

দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প দলিলে (ডিপিপি) ল্যাব স্থাপনের জন্য স্কুল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যেসব স্কুলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং বিজ্ঞান ও গণিতে ভালো ফলাফল রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে ৩০০টি সংসদীয় আসনে সংসদ সদস্যরা (এমপি) তাদের পছন্দমতো স্কুল নির্বাচন করেছেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় ল্যাব বরাদ্দের পরিমাণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। নাটোর-৩ (সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক), নেত্রকোনা-৪, রংপুর-৬ (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা), ঢাকা-১ এবং গোপালগঞ্জ-৩— এই পাঁচটি ভিআইপি নির্বাচনী এলাকায় মোট ৩২৭টি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই রাজনৈতিক পক্ষপাতের নিদর্শন। জনস্বার্থ বা প্রয়োজনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবই এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

এছাড়া ল্যাবগুলোর মনিটরিং কমিটিতে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) এবং ইয়ুথ বাংলার মতো দলীয় সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চিঠিপত্রে দেখা যায়, সিআরআই-ইয়ুথ বাংলাকে ল্যাব রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আইসিটি বিভাগের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের প্রমাণ বলছে, এই দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োগে মনিটরিংয়ের কোনো উন্নতি হয়নি, বরং এটি দলীয় কর্মীদের পুনর্বাসনের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।

স্কুল অব ফিউচার

এসআরডিএল-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অংশ ছিল ‘স্কুল অব ফিউচার’ (এসওএফ)। এখানে রোবোটিক্স, থ্রিডি প্রিন্টিং, আইওটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয় শেখানোর কথা ছিল। কিন্তু এই স্কুলগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বেসলাইন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, নির্বাচিত স্কুলগুলো ওই এলাকার সেরা এবং আইসিটি অবকাঠামোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু সংগৃহীত ডেটা বলছে, নির্বাচিত তিন-চতুর্থাংশ স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগই ছিল না। ৮০ শতাংশ স্কুলে ডিজিটাল বোর্ড বা ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট ছিল না এবং প্রায় অর্ধেক স্কুলে কোনো কম্পিউটার ল্যাবই ছিল না। অর্থাৎ, ‘উপযুক্তভাবে সজ্জিত স্কুল’ নির্বাচনের যে দাবি ডিপিপিতে করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।

দুপাশে দুটি ভাঙা অ্যাটেনডেন্স ইউনিট, মাঝে একটি সক্রিয় অ্যাটেনডেন্স ইউনিট
দুপাশে দুটি ভাঙা অ্যাটেনডেন্স ইউনিট, মাঝে একটি সক্রিয় অ্যাটেনডেন্স ইউনিট

এখানে একটি গুরুতর ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) লক্ষ্য করা গেছে। প্রকল্পের মাঠ মনিটরিং এবং প্রভাব মূল্যায়নের দায়িত্ব একই ভেন্ডরকে দেওয়া হয়েছিল, যা সরকারি ক্রয় নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যে ভেন্ডর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও মনিটর করছে, তাকেই আবার সেই প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ভেন্ডর নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ভুয়া ডেটা বা মনগড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে জোরালো সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নে এই জরিপকে ‘প্রযুক্তিগতভাবে অসাড়’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এমনকি ভেন্ডর মূল ডেটাসেট হস্তান্তর করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

কাগজবিহীন স্কুলের নামে ‘ভৌতিক’ তথ্য

স্কুল অব ফিউচারের জন্য তৈরি ‘স্কুল অব ফিউচার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এসএফএমএস) বা লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নিয়ে ভেন্ডর দাবি করেছিল যে, ৩০০টি স্কুলই এখন ‘সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং কাগজবিহীন’। তাদের দাবি ছিল, সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল এবং ফি কালেকশন সব কিছুই ডিজিটালি হচ্ছে।

কিন্তু আইসিটি বিভাগের অ্যাডমিন পোর্টালে সংরক্ষিত ডেটা এবং মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ৩০০টি স্কুলের মধ্যে কোনোটিতেই ২০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়নি। সিলেট, মানিকগঞ্জ এবং মাদারিপুরে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, স্কুল খোলা থাকলেও এলএমএস মডিউলে কোনো উপস্থিতির তথ্য নেই। এমনকি সাপোর্ট অফিসারদের উপস্থিতির রেকর্ডও ছিল শূন্য।

টিম ক্রিয়েটিভের লিংকড ইন প্রোফাইল
টিম ক্রিয়েটিভের লিংকড ইন প্রোফাইল

ভেন্ডর ‘টিম ক্রিয়েটিভ’ সর্বাধিক ব্যবহৃত মডিউল হিসেবে ‘হোম ওয়ার্ক’ এবং ‘ক্লাসওয়ার্ক’-এর কথা উল্লেখ করলেও, তাদের দাবির সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য আর্কাইভ ডেটা দিতে পারেনি। মূলত, কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা এই সফটওয়্যারটি বাস্তবে অব্যবহৃতই রয়ে গেছে।

লুটপাট ও অপচয়ের মহোৎসব

প্রকল্পের ব্যয়ের খাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার মানের চেয়ে দৃশ্যমান ব্যয়ের দিকেই ঝোঁক ছিল বেশি। মার্বেল পাথরের ফলক, ব্র্যান্ডযুক্ত সাইনবোর্ড এবং জাকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। অথচ আইসিটি শিক্ষকদের জন্য কোনো স্থায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়নি, তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি এবং ল্যাব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বাজেট রাখা হয়নি।

প্রথম পর্যায়ে একটি ল্যাব স্থাপনের খরচ যেখানে বেশি ধরা হয়েছিল, দ্বিতীয় পর্যায়ে তা কমিয়ে আনা হয়, যা মানের সঙ্গে আপস করার ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ওয়ারেন্টি থাকা সত্ত্বেও নষ্ট কম্পিউটার মেরামত বা প্রতিস্থাপনে ভেন্ডরদের অনীহা এবং জবাবদিহির অভাব পুরো প্রকল্পকে অকার্যকর করে তুলেছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিয়মিত ল্যাপটপ চুরি, বাক্সে বন্দি রোবোটিক্স কিট এবং নষ্ট স্মার্ট বোর্ডের খবর এলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। বরং এক অনুষ্ঠানে ৫ হাজার ল্যাব এবং ৩০০ স্মার্ট স্কুল একসাথে উদ্বোধন করে চমক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে, যা ছিল বাস্তবায়নের প্রস্তুতির চেয়ে লোকদেখানো প্রচারণার অংশ।

শিখনবিহীন স্কুলিং

শ্বেতপত্র প্রণয়নকারী টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এসআরডিএল এবং স্কুল অব ফিউচার প্রকল্পের সামগ্রিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, এটি ছিল ‘উন্নয়নবিহীন ডিজিটালাইজেশন’-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ২ লাখ পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে করা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ল্যাব সুবিধা থাকা এবং না থাকা স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ, হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অর্জনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাংলাদেশের ডিজিটাল শিক্ষা সংস্কারের একটি দূরদর্শী উদ্যোগ হতে পারত। কিন্তু দলীয় নিয়ন্ত্রণ, আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, এবং জবাবদিহিতার অভাবে এটি একটি ‘রাজনৈতিকভাবে ব্র্যান্ডকৃত ব্যয়ের মহড়ায়’ পরিণত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকীকরণ ছাড়া শুধু প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কেনাকাটা করলে তা ‘শিখনবিহীন স্কুলিং’ তৈরি করে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে টাস্কফোর্স। অন্যথায়, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর মতো স্লোগানগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রচারণাই হয়ে থাকবে, যা জাতির জন্য কোনো প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এসআরডিএল প্রকল্প একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে যে, অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত