leadT1ad

পায়রা সমুদ্রবন্দর

জাহাজ কমে বাড়ছে ব্যয়, পলিতে আটকা গেটওয়ের স্বপ্ন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

রাবনাবাদ নদীর নাব্য সংকটে পায়রা সমুদ্রবন্দরে ভিড়তে পারছে না বড় জাহাজ। স্ট্রিম গ্রাফিক

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় দেশের ‘তৃতীয় অর্থনৈতিক গেটওয়ে’ হিসেবে তৈরি পায়রা বন্দরের বিশাল জেটি এখন কার্যত নীরব। রাবনাবাদ নদীর নাব্য সংকটে বন্দরে ভিড়তে পারছে না বড় জাহাজ। মে পর্যন্ত জাহাজ ভিড়েছে মাত্র ৩১টি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত তিন বছর রক্ষণাবেক্ষণ ও ড্রেজিং বন্ধ থাকায় পলি জমে রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা কমে গেছে। এতে বন্দরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পায়রা বন্দর সূত্র জানায়, রাবনাবাদ চ্যানেলে স্বাভাবিকভাবে সাড়ে ৭ মিটার গভীরতায় জাহাজ চলাচল করতে পারে। শুরুতে বন্দরে বড় জাহাজ আনতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা সাড়ে ১০ মিটার করা হয়েছিল। এই ড্রেজিং শেষ হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। এরপর থেকে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং না হওয়ায় নদীতে আবার পলি জমেছে।

পায়রা বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, প্রতি সপ্তাহেই হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ জরিপ করছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ধীরে ধীরে গভীরতা কমছে। মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং না হওয়ায় নাব্য অনেকটাই কমে গেছে বলে জানান তিনি।

জাহাজ কমে বেড়েছে ব্যয়

বন্দর ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, চ্যানেলে পলি জমা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফলে সব সমুদ্রবন্দরেই নিয়মিত ড্রেজিং করা হয়। পায়রা বন্দরে তা না থাকায় বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারছে না।

বন্দরের পরিসংখ্যান বলছেন, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বিদেশি জাহাজ এসেছে ১২৩টি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে ৮৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মে পর্যন্ত এসেছে মাত্র ৩১টি জাহাজ।

জাহাজ কমে যাওয়ায় বন্দরের কার্যক্রমে ধীরগতির সঙ্গে বেড়েছে আমদানি ব্যয়। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে ঢুকতে না পারায় মাঝসমুদ্রে পণ্য খালাস ও ছোট জাহাজে স্থানান্তরের প্রয়োজন হচ্ছে। এতে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ ডলার ব্যয় বাড়ছে।

বন্দর এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবকাঠামো থাকলেও নাব্য সংকটের কারণে বন্দর ব্যবহারকারীদের আগ্রহ কমছে। এক সময় যে বন্দরের দিকে বিদেশি অপারেটর ও শিপিং কোম্পানিগুলো তাকিয়ে ছিল, এখন তারা অপেক্ষায় আছে ড্রেজিং কবে শুরু হবে।

আটকা নতুন প্রকল্প

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবার ড্রেজিং শুরু করতে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে দুটি হপার ড্রেজার কেনা এবং দুই বছরের মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

বন্দর কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পটি একনেকে উঠেছিল। তবে কিছু প্রশ্ন তুলে তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। এখন সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর জামাল চৌধুরী বলেন, ড্রেজিং শুরু করা গেলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই ৭-৮ মিটার ড্রাফট (জাহাজের গভীরতা) পাওয়া সম্ভব হবে। তখন আবার বড় জাহাজ আসতে পারবে।

গত ২২ এপ্রিল সংসদেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, প্রকল্প অনুমোদন পেলে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের এবং ৪৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল সম্ভব হবে।

নতুন পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পায়রা বন্দরের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল নদীর স্বাভাবিক পলিপ্রবাহ। শুরু থেকেই নিয়মিত ড্রেজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় ও বাস্তবতা নিয়ে পর্যাপ্ত সমীক্ষা হয়নি। কারণ, বঙ্গোপসাগরের মোহনা এলাকার নদীগুলোতে পলি জমার হার অত্যন্ত বেশি। এতে একবার ক্যাপিটাল ড্রেজিং করলেই সমাধান হয় না, প্রয়োজন হয় নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক নৌ-প্রকৌশলী বলেন, পায়রার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই বন্দরের জীবনরেখাই হলো ড্রেজিং। সেটা বন্ধ থাকলে পুরো ব্যবস্থাটা ধাক্কা খাবে।’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মো. বদিউজ্জমান বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে বিকল্প সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দক্ষিণাঞ্চলে একটি কার্যকর সমুদ্রবন্দর দেশের জন্য কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পায়রা এখন দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশাল অবকাঠামো, অন্যদিকে নাব্য সংকট। একদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জাহাজশূন্য জেটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানো, জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সমুদ্রবন্দর তৈরির লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা করে পায়রা বন্দর। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলকে শিল্প–বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ছিল উদ্দেশ্য। এ জন্য গত এক দশকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অবকাঠামো।

পায়রা বন্দরে ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি, ৩ দশমিক ২৫ লাখ বর্গমিটারের ব্যাকআপ ইয়ার্ড, ১০ হাজার বর্গমিটারের ওয়্যারহাউজ, ১ক লাখ বর্গমিটারের গুদাম, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন ও আধুনিক কার্গো হ্যান্ডেলিং সিস্টেম। এ ছাড়া আন্ধারমানিক নদীতে ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতু এবং ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার ছয় লেনের সংযোগ সড়কের কাজও শেষ পর্যায়ে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত