দায়ী করা হচ্ছে তেলের প্যানিক বায়িংকে, সংকটের নেপথ্যে ডিপোগুলোর রেশনিং নীতি

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ২০: ১৩
জ্বালানি সংকটে রাজধানীর পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে গ্রাহকের লম্বা সারি। স্ট্রিম ছবি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে মাসজুড়ে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে। রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুললেও সরকারের দাবি— মজুত ও সরবরাহে ঘাটতি নেই। ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটাকে এই সংকটের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ডিপোগুলো থেকে রেশনিং বা নির্দিষ্ট বরাদ্দের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ। পাম্পগুলো চাহিদাপত্র দিলেও মূলত ২০২৫ সালের মার্চের উত্তোলনের হিসাব ধরেই এবার তেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে বর্তমান উচ্চ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের এই চিত্র পাওয়া যায় রাজধানীর একটি ফিলিং স্টেশনের নথিতে। ২০২৫ সালের মার্চে তারা ৩ লাখ ১ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল ও ২২ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন কিনেছিল। অথচ ২০২৬ সালের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত তারা ডিজেল পেয়েছে মাত্র ২ লাখ ৭ হাজার লিটার এবং অকটেন পেয়েছে ১৮ হাজার লিটার। আরও ৪ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন পাওয়ার আশা করছে পাম্প কর্তৃপক্ষ, যা পেলে তাদের মোট প্রাপ্তি গত বছরের সমান হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে উচ্চ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গত বছরের নির্ধারিত কোটার বেশি জ্বালানি মিলছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একটি পাম্পের কর্মকর্তা জানান, গোদনাইলে অগ্রিম ক্রয়াদেশ দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ডিপো থেকে সাফ জানানো হয়েছে, গত বছরের মার্চ মাসের বরাদ্দ অনুযায়ীই এবার সরবরাহ করা হবে।

সারা দেশে জোনভিত্তিক তেল সরবরাহ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি, মেঘনা ও পদ্মা পেট্রোলিয়ামের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন কোনো চাহিদাপত্র নেওয়া হচ্ছে না। গত বছরের উত্তোলনের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান বরাদ্দ নির্ধারিত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে বরাদ্দ ১০ শতাংশ বাড়ানো হলেও যারা অতীতে অবৈধ উৎস থেকে তেল নিয়েছে, তাদের বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

পদ্মা ও মেঘনার গোদনাইল ডিপোর ২৪ থেকে ২৮ মার্চের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা জোনের অধিকাংশ পাম্পেই পেট্রোল নেই। ২৮ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৫৮টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ৪১ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ পাম্প। এদিন মুন্সীগঞ্জ ও শেরপুরের কোনো পাম্পেই অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহ করা হয়নি। একই চিত্র মেঘনা ডিপোতেও; যেখানে ৩১টি ডিলারের মধ্যে মাত্র দুটি পাম্প পেট্রোল পেয়েছে। সিংহভাগ বরাদ্দই গেছে রাজধানীর বড় পাম্পগুলোতে।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির এজিএম হারিস আহমেদ সরকার দাবি করেন, তেলের কোনো সংকট নেই, বরং প্যানিক বায়িং পরিস্থিতি জটিল করেছে। তিনি স্বীকার করেন, গত বছরের মার্চের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান সরবরাহ নির্ধারিত হচ্ছে। তবে পাম্প মালিকদের দাবি, প্যানিক বায়িং নয়, বরং সরবরাহ কমে যাওয়াই সংকটের মূল কারণ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, সারা দিনে যা বিক্রি হতো তা এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) জানান, প্রতিদিন ১২ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা থাকলেও ঈদের আগে ২৪-২৫ হাজার টন সরবরাহ করতে হয়েছে। সংকট সামাল দিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। অবৈধ মজুত ঠেকাতে প্রতিটি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া পাম্পগুলো তদারকিতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ এবং বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সম্পর্কিত