হাতে সময় বেশি থাকলে কেন বাড়তি কেনাকাটা করি আমরা

দিনশেষে প্রশ্নটা আর শুধু এই নয় যে, মানুষ কী কিনছে? প্রশ্নটা হলো, মানুষ কোথায় গিয়ে সময় কাটাতে চাইছে? কারণ রিটেইলাররা জানে, ক্রেতার সময় দখল করতে পারলেই তার পকেটেও পৌঁছানো যাবে।

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ২০: ২৬
হাতে সময় বেশি থাকলে কেন বাড়তি কেনাকাটা করি আমরা। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকায় ছুটির দিনে দুপুরের পর পরিবার নিয়ে বের হওয়া এখন খুব পরিচিত দৃশ্য। কোথাও একটু খাওয়া, সন্তানদের কেনাকাটা, নিজের জন্য পোশাক বা বাসার টুকিটাকি জিনিস কেনার মতো অনেক কিছুই থাকে এই পরিকল্পনায়। আগে এসবের জন্য আলাদা আলাদা জায়গায় যেতে হতো, কিন্তু এখন সব পাওয়া যায় এক ছাদের নিচে।

আড়ং, ইউনিমার্ট বা ইনফিনিটি মেগামলের মতো বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন একেকটি ‘ডেস্টিনেশন’ বা ঘোরার জায়গা হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, দোকান আর শুধু দোকান থাকছে না। সেটা হয়ে উঠছে ঘোরার, সময় কাটানোর, খাওয়ার জায়গা কিংবা ছবি তোলার জায়গা। এটাই এখন বাংলাদেশের নতুন রিটেইল ব্যবসার ধরন।

একসময় মানুষ দোকানে যেত প্রয়োজন মেটাতে। জামা দরকার, জুতা দরকার, গিফট দরকার? সোজা দোকানে গিয়ে কিনে বেরিয়ে আসত। এখন ব্র্যান্ডগুলো বুঝতে পেরেছে, শুধু পণ্য দিয়ে ক্রেতাকে ধরে রাখা যাবে না। ক্রেতাকে দিতে হবে নতুন অভিজ্ঞতা (এক্সপেরিয়েন্স)। এটিই আজকের রিটেইল সিস্টেমের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

রিটেইল ব্যবসার ভাষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যাকে বলা হয় ‘ডুয়েল টাইম’। সংগৃহীত ছবি
রিটেইল ব্যবসার ভাষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যাকে বলা হয় ‘ডুয়েল টাইম’। সংগৃহীত ছবি

বিশাল আউটলেট, প্রশস্ত ফ্লোর, সুন্দর লাইটিং, সাজানো ডিসপ্লে, আরামদায়ক ট্রায়াল রুম, বাচ্চাদের জন্য খেলার জায়গা আর ক্যাফে—সব মিলিয়ে শপিং এখন আর এক ঘণ্টার কাজ নয়। ধানমন্ডি, গুলশান বা বসুন্ধরার মতো এলাকায় রিটেইল শপগুলো এখন দুই-তিন ঘণ্টার পারিবারিক সময় কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছে। আর এই বাড়তি সময়টাই আসল ব্যবসা। কাস্টমারদের পার্চেজ বিহ্যাভিয়রেও আসছে পরিবর্তন। মানুষ যখন বেশি সময় কাটায়, তখন তাদের কেনাকাটার পরিমাণও বেড়ে যায়।

রিটেইল ব্যবসার ভাষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যাকে বলা হয় ‘ডুয়েল টাইম’। একজন ক্রেতা দোকানের ভেতরে কতক্ষণ থাকছেন তা এখানে বিবেচ্য। ক্রেতা যত বেশি সময় থাকেন, তাঁর কেনাকাটার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। কারণ, মানুষ যখন শুধু দরকারি জিনিস কিনতে যায়, তখন সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন সে সময় কাটাতে যায়, তখন তার চোখে অনেক কিছু পড়ে।

হয়তো একটা শাড়ি কিনতে গিয়ে সে কানের দুলও কিনে ফেলল, কিংবা বাচ্চার জামা কিনতে গিয়ে খেলনা কিনে ফেলল। এভাবেই প্রয়োজনের তালিকায় ঢুকে পড়ে শখের বা ইচ্ছের জিনিস।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের শপিং করার ধরনও বদলে যাচ্ছে। ঢাকার মতো শহরে পার্ক বা খোলা জায়গার অভাব থাকায় শপিংমলগুলোই এখন নতুন সামাজিক মিলনায়তন হয়ে উঠেছে। আড়ং অনেক আগেই দেশি নকশা আর উৎসবের আবহ দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। আবার ইউনিমার্ট বা ইনফিনিটির মতো মেগামলগুলো বিশাল জায়গা আর হরেক রকম পণ্য দিয়ে ক্রেতাকে ‘বাল্ক শপিং’ বা একবারে অনেক কিছু কেনায় অভ্যস্ত করে তুলছে।

আগে মানুষ আলাদা দোকান থেকে আলাদা জিনিস কিনত। এখন সে চায়, এক জায়গায় ঢুকে জামা, জুতা, ব্যাগ, কসমেটিকস, বাচ্চার পোশাক, ঘরের জিনিস, সব দেখে ফেলতে। এই সবকিছু একসঙ্গে পাওয়ার সুবিধাই ‘মেগামল’ কালচারকে জনপ্রিয় করছে।

রিটেইল শপগুলো এখন দুই-তিন ঘণ্টার পারিবারিক সময় কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছে। সংগৃহীত ছবি
রিটেইল শপগুলো এখন দুই-তিন ঘণ্টার পারিবারিক সময় কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছে। সংগৃহীত ছবি

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও কাজ করে। বড় স্পেস মানুষকে বেশি কেনাকাটার জন্য প্রস্তুত করে। ট্রলি, বড় ডিসপ্লে, বোগো অফার, বড় সাইনবোর্ড, সবকিছু ক্রেতাকে বোঝায়, ‘আরও দেখুন, আরও নিন, আরও সময় থাকুন’। এটাকে সরাসরি অ্যাভারেজ অর্ডার ভ্যালু বাড়ানোর কৌশলও বলা যেতে পারে।

মেগামলগুলোর ফ্লোর প্ল্যান বা নকশাও খুব পরিকল্পিত হয়। সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রাখা হয় দোকানের একদম ভেতরের দিকে। ফলে সেই জিনিসটি নিতে গিয়ে ক্রেতাকে পুরো দোকান ঘুরে যেতে হয়। এই পথে তার চোখে পড়ে নতুন কালেকশন বা আকর্ষণীয় সব অফার। এই পরিকল্পিত হাঁটাটাই তাকে আরও কেনাকাটায় আগ্রহী করে।

পাশাপাশি এখন ‘ডেটা’ বা তথ্যের ব্যবহারও বেড়েছে। লয়্যালটি কার্ড বা পেমেন্ট হিস্ট্রি দিয়ে ব্র্যান্ডগুলো বুঝতে পারে কোন ক্রেতা কী পছন্দ করেন বা কখন বেশি কেনেন। সেই অনুযায়ী তারা পরবর্তী পরিকল্পনা সাজায়। আধুনিক রিটেইলাররা এখন শুধু পণ্য নিয়ে নয়, ক্রেতার আচরণ নিয়েও গবেষণা করে।

ই-কমার্স যতই বাড়ুক, বাংলাদেশের ক্রেতার একটা বড় অংশ এখনও পণ্য হাতে ছুঁয়ে দেখতে চায়। কাপড়ের রং, কাপড়ের টেক্সচার, জুতার ফিটিং, গিফটের মান, এসব অনলাইনে পুরোপুরি বোঝা যায় না। তার ওপর পরিবার নিয়ে বাইরে যাওয়ার কালচার বাংলাদেশের শহুরে জীবনে বহুকালের।

দিনশেষে প্রশ্নটা আর শুধু এই নয় যে, মানুষ কী কিনছে? প্রশ্নটা হলো, মানুষ কোথায় গিয়ে সময় কাটাতে চাইছে? কারণ রিটেইলাররা জানে, ক্রেতার সময় দখল করতে পারলেই তার পকেটেও পৌঁছানো যাবে।

সম্পর্কিত