‘ওরা সব নিউজ দেখে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ছে’
রাজপথে আন্দোলন থেকে শুরু করে বিমান বিধ্বস্তের মতো ঘটনায় ক্রমাগত আমাদের শিশু-কিশোরেরা ট্রমায় আক্রান্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে তারাই হবে এ দেশের মূল নাগরিক অংশ। ব্যক্তিক ও জাতীয় প্রয়োজনেই এই শিশু-কিশোরদের ট্রমামুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিভাবক ও মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখাটি লিখেছেন দেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
শাহ্নাজ মুন্নী

পাশের বাসার অল্পবয়সী মেয়েটা প্রতিদিন সকাল বেলা ছোট্ট দুটো ফুটফুটে হাসিখুশি শিশুর হাত ধরে ওদের স্কুলে দিয়ে আসতে যায়। লিফটে প্রায় প্রতিদিনই তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একজন ক্লাস টু, আরেকজন কেজি। দুজনই চটপটে, স্মার্ট। কালকে দেখি লিফটের গোড়ায় মা একা। পিচ্চিগুলো সঙ্গে নেই।
‘কী ব্যাপার? বাচ্চারা কই? আজকে স্কুলে যাবে না?’
‘আপা কী বলব, উত্তরায় স্কুলের ঘটনা শুনে ওরা তো স্কুলেই যেতে চাচ্ছে না। বলে যে আমাদের স্কুলে যদি বিমান ভেঙে পড়ে! তখন কী হবে! আমরা তো মরে যাব! পুড়ে যাব! এমন ভয় পাইছে আপা! ওর দাদা তো সারা দিন নিউজ দেখেন, দাদার সঙ্গে ওরাও সব নিউজ দেখছে! এখন এমন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ছে!’
বিষণ্ণ গলায় জানালেন মা। ভাবলাম, এমন মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা বড়রাই তো শোকে স্তব্ধ, দুঃখে রুদ্ধবাক ও হতভম্ভ হয়ে গেছি। আর ওরা তো নেহায়েৎ কোমল মনের শিশু! ওদের ওপর কী ভয়ানক মানসিক চাপ পড়েছে, তা সহজেই অনুমানযোগ্য।
‘চাপাচাপি কইরেন না। কয়েকদিন বরং স্কুলটা বাদ দেন। আস্তে আস্তে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
একজন বিমর্ষ মাকে সান্ত্বনা দিলাম এই কথা বলে।
এই শিশুরা তবু দূরের স্কুলের। আমি ভাবছিলাম মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কথা। যে স্কুলে তাদের দিনের অনেকটা সময় কেটেছে, সেই স্কুলই এখন তাদের কাছে বিভীষিকা হয়ে উঠেছে। যে সহপাঠীদের সঙ্গে একদিন আগেও পাশাপাশি বেঞ্চিতে বসে খুনসুটি করেছে, আজ তাদের কয়েকজন আর পৃথিবীতেই নেই। অথবা থাকলেও হাসপাতালের বিছানায় পোড়া দেহ নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। যারা ওই দিন ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে ফিরেছে, তারা কি কখনো ভুলতে পারবে সেই কান ফাটানো শব্দ, সেই আগুনের মৃত্যুঘাতী শিখা, আহতদের আর্তনাদ! যে আতংকের বীজ, যে অসহায়ত্বের বোধ তাদের মনের গভীরে ঢুকে গেল, তার প্রভাব ওদের পরবর্তী জীবনে যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এই যে ট্রমা বা মানসিক আঘাত শিশু-কিশোরদের স্মৃতিতে, তা দীর্ঘদিন ক্ষতের মতো রয়ে যেতে পারে। এই দুঃসহ স্মৃতি এমনকি কারও কারও ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলতে পারে। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি তো বরাবরই উপেক্ষিত। শিশু-কিশোরদের মনের অসুখ নিয়েও রয়েছে সচেতনতার অভাব। ফলে তাদের ট্রমার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
কোথায় যেন শুনলাম, স্কুলের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের কাউন্সেলিং করানো হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সেটা যেনতেন কিছু যেন না হয়। এক্ষেত্রে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া গেলে ভালো হবে। কারও কারও দরকার হতে পারে মনের নিবিড় পরিচর্যা।
শিশু-কিশোরদের সংবেদনশীল নরম মনকে সুরক্ষা দিতে বাবা-মা, শিক্ষকসহ বড়দের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। সঠিকভাবে মনের যত্ন নিতে হবে। শিশু যেন পরিবারের ভেতর বা স্কুলে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একজন মা হিসেবে বলতে পারি, আমরা অনেক সময় বুঝে বা না বুঝে সন্তানদের সঙ্গে এমন সব আচরণ করে ফেলি যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। যেমন, তুলনা করে বলি, ‘অমুক তো কত শান্ত আছে, তুমি এমন করছ কেন?’, ‘তোমার তো কিছু হয়নি, তুমি পড়তে বসো’, ‘এত ঢং করো না, এক্ষুণি ঘুমাও’ ইত্যাদি।
এ রকম ঘটনায় সব শিশুর প্রতিক্রিয়া একরকম হবে না, সেটাই স্বাভাবিক। শিশুদের মনের ওপর জোরাজুরি করা একদম ঠিক নয়। বরং ধৈর্য ধরে সময় দিয়ে, সঙ্গে থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহযোগিতা করা খুব জরুরি।
এখন জুলাই-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি চলছে। এক বছর আগে এই রক্তাক্ত জুলাইয়ে আমাদের সন্তানেরা তাদের প্রিয় বন্ধু-সহপাঠীদের হারিয়েছে। চোখের সামনে দেখেছে ভয়ংকর পুলিশি তাণ্ডব। সেই ট্রমাও এখনো অনেকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
জুলাই-অভ্যুত্থানে রাজপথে থাকা আমার বান্ধবীর কিশোর পুত্র এখনো ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। এখনো পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে সে পারছে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে এখন তার চিকিৎসা চলছে। এমনই আরও কত শিশু-কিশোর গভীর ট্রমার সঙ্গে মোকাবিলা করতে গিয়ে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্বেগ, ভয় ও হতাশায় ভুগে স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ছে। তাদের সহায়তার জন্য আমরা কি সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নিয়েছি?
লেখক: সাংবাদিক; কথাসাহিত্যিক

পাশের বাসার অল্পবয়সী মেয়েটা প্রতিদিন সকাল বেলা ছোট্ট দুটো ফুটফুটে হাসিখুশি শিশুর হাত ধরে ওদের স্কুলে দিয়ে আসতে যায়। লিফটে প্রায় প্রতিদিনই তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একজন ক্লাস টু, আরেকজন কেজি। দুজনই চটপটে, স্মার্ট। কালকে দেখি লিফটের গোড়ায় মা একা। পিচ্চিগুলো সঙ্গে নেই।
‘কী ব্যাপার? বাচ্চারা কই? আজকে স্কুলে যাবে না?’
‘আপা কী বলব, উত্তরায় স্কুলের ঘটনা শুনে ওরা তো স্কুলেই যেতে চাচ্ছে না। বলে যে আমাদের স্কুলে যদি বিমান ভেঙে পড়ে! তখন কী হবে! আমরা তো মরে যাব! পুড়ে যাব! এমন ভয় পাইছে আপা! ওর দাদা তো সারা দিন নিউজ দেখেন, দাদার সঙ্গে ওরাও সব নিউজ দেখছে! এখন এমন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ছে!’
বিষণ্ণ গলায় জানালেন মা। ভাবলাম, এমন মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা বড়রাই তো শোকে স্তব্ধ, দুঃখে রুদ্ধবাক ও হতভম্ভ হয়ে গেছি। আর ওরা তো নেহায়েৎ কোমল মনের শিশু! ওদের ওপর কী ভয়ানক মানসিক চাপ পড়েছে, তা সহজেই অনুমানযোগ্য।
‘চাপাচাপি কইরেন না। কয়েকদিন বরং স্কুলটা বাদ দেন। আস্তে আস্তে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
একজন বিমর্ষ মাকে সান্ত্বনা দিলাম এই কথা বলে।
এই শিশুরা তবু দূরের স্কুলের। আমি ভাবছিলাম মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কথা। যে স্কুলে তাদের দিনের অনেকটা সময় কেটেছে, সেই স্কুলই এখন তাদের কাছে বিভীষিকা হয়ে উঠেছে। যে সহপাঠীদের সঙ্গে একদিন আগেও পাশাপাশি বেঞ্চিতে বসে খুনসুটি করেছে, আজ তাদের কয়েকজন আর পৃথিবীতেই নেই। অথবা থাকলেও হাসপাতালের বিছানায় পোড়া দেহ নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। যারা ওই দিন ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে ফিরেছে, তারা কি কখনো ভুলতে পারবে সেই কান ফাটানো শব্দ, সেই আগুনের মৃত্যুঘাতী শিখা, আহতদের আর্তনাদ! যে আতংকের বীজ, যে অসহায়ত্বের বোধ তাদের মনের গভীরে ঢুকে গেল, তার প্রভাব ওদের পরবর্তী জীবনে যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এই যে ট্রমা বা মানসিক আঘাত শিশু-কিশোরদের স্মৃতিতে, তা দীর্ঘদিন ক্ষতের মতো রয়ে যেতে পারে। এই দুঃসহ স্মৃতি এমনকি কারও কারও ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলতে পারে। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি তো বরাবরই উপেক্ষিত। শিশু-কিশোরদের মনের অসুখ নিয়েও রয়েছে সচেতনতার অভাব। ফলে তাদের ট্রমার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
কোথায় যেন শুনলাম, স্কুলের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের কাউন্সেলিং করানো হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সেটা যেনতেন কিছু যেন না হয়। এক্ষেত্রে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া গেলে ভালো হবে। কারও কারও দরকার হতে পারে মনের নিবিড় পরিচর্যা।
শিশু-কিশোরদের সংবেদনশীল নরম মনকে সুরক্ষা দিতে বাবা-মা, শিক্ষকসহ বড়দের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। সঠিকভাবে মনের যত্ন নিতে হবে। শিশু যেন পরিবারের ভেতর বা স্কুলে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একজন মা হিসেবে বলতে পারি, আমরা অনেক সময় বুঝে বা না বুঝে সন্তানদের সঙ্গে এমন সব আচরণ করে ফেলি যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। যেমন, তুলনা করে বলি, ‘অমুক তো কত শান্ত আছে, তুমি এমন করছ কেন?’, ‘তোমার তো কিছু হয়নি, তুমি পড়তে বসো’, ‘এত ঢং করো না, এক্ষুণি ঘুমাও’ ইত্যাদি।
এ রকম ঘটনায় সব শিশুর প্রতিক্রিয়া একরকম হবে না, সেটাই স্বাভাবিক। শিশুদের মনের ওপর জোরাজুরি করা একদম ঠিক নয়। বরং ধৈর্য ধরে সময় দিয়ে, সঙ্গে থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহযোগিতা করা খুব জরুরি।
এখন জুলাই-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি চলছে। এক বছর আগে এই রক্তাক্ত জুলাইয়ে আমাদের সন্তানেরা তাদের প্রিয় বন্ধু-সহপাঠীদের হারিয়েছে। চোখের সামনে দেখেছে ভয়ংকর পুলিশি তাণ্ডব। সেই ট্রমাও এখনো অনেকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
জুলাই-অভ্যুত্থানে রাজপথে থাকা আমার বান্ধবীর কিশোর পুত্র এখনো ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। এখনো পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে সে পারছে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে এখন তার চিকিৎসা চলছে। এমনই আরও কত শিশু-কিশোর গভীর ট্রমার সঙ্গে মোকাবিলা করতে গিয়ে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্বেগ, ভয় ও হতাশায় ভুগে স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ছে। তাদের সহায়তার জন্য আমরা কি সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নিয়েছি?
লেখক: সাংবাদিক; কথাসাহিত্যিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন সাতজন। তাঁরা মূলত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এককভাবে প্রার্থী হওয়ার কারণে তাদেরকে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলা হয়। যদিও সংবিধান বা নির্বাচনি আইনে ‘বিদ্রোহী প্রার
১৭ ঘণ্টা আগে
প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জীবন ও সম্পদের প্রাণহানিও ব্যাপক। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানের সামনে এখন ‘বিচক্ষণ কূটনীতি’ এবং একমুখী আমেরিকা-নির্ভরতা কাটিয়ে চীন-রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন এবং নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
২ দিন আগে
বোরো মৌসুম মানে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই একটি মৌসুম থেকে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষকের পুরো জীবন আবর্তিত হয় এই ফসলকে ঘিরে। হাল চাষ থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের শরীরে ঘাম, চোখে স্বপ্ন। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের গায়ে
২ দিন আগে