বাংলাদেশের ক্রিকেট আবারও প্রমাণ করল—এটি শুধু খেলা নয়, এটি ক্ষমতার লড়াইয়ের এক মঞ্চ। সরকার বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না। রাজনীতির দুষ্টচক্রে আটকে থাকা ক্রিকেট যেন আর মুক্তির পথই খুঁজে পায় না।
বিএনপি সরকারের মেয়াদ দুই মাসও হয়নি। এরই মধ্যে একের পর এক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ—সবখানে দলীয়করণ। সেই একই ধারা এসে ঠেকেছে ক্রিকেট বোর্ডে। বিসিবি এখন আর ক্রিকেট বোর্ড নয়—কারও কারও ভাষায়, এটি হয়ে উঠেছে ‘বাপের ক্রিকেট বোর্ড’, ‘বাচ্চাদের ক্রিকেট বোর্ড’ কিংবা ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’। এই ভাষা কটু। তবে বাস্তব আরও কটু।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) হঠাৎ করেই নির্বাচিত বিসিবি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিল। কারণ হিসেবে দেখানো হলো ‘অনিয়ম’। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিলো। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হলো। প্রশ্ন হচ্ছে, তদন্ত হঠাৎ এত জরুরি হয়ে উঠল কেন? আরও বড় প্রশ্ন, যে এনএসসি নিজেই নির্বাচন পরিচালনা করেছিল, সেটি কয়েক মাসের মাথায় কীভাবে সেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে? এটা কি অনিয়মের বিচার, নাকি ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া?
নতুন ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে আছেন মন্ত্রীর ছেলে, মন্ত্রীর স্ত্রী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। এদের অনেকেরই ক্রীড়ার সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। মূল প্রশ্নটি খুব সহজ: ক্রিকেট বোর্ড কি এখন রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার? যেখানে মাঠের পারফরম্যান্স, প্রশাসনিক দক্ষতা, ক্রিকেট জ্ঞান– সবকিছু গৌণ; সেখানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কার ছেলে’, ‘কার স্ত্রী’?
তামিম ইকবাল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ‘অনিয়মের’ অভিযোগ তুলে। এর পরই অ্যাডহক কমিটির প্রধান। এটা কি কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পিত পথ চলা? নির্বাচনে অংশ না নিয়েও বোর্ডের শীর্ষ পদে বসা—এটি কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া? নাকি শর্টকাট?
বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী? খেলা নয়। খেলোয়াড় নয়। প্রশিক্ষণ নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চেয়ার। কে বসবে? কতদিন বসবে? কীভাবে বসবে? একই দিনে দুজন সভাপতি। কয়েক মাসে চারজন সভাপতি। এটি কি স্বাভাবিক ক্রীড়া প্রশাসনের চিত্র? না। এটি ক্ষমতার সার্কাস।
ক্রিকেটের বৈশ্বিক সংস্থা সরকারি হস্তক্ষেপ অনুমোদন করে না। তবু এখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ হয়েছে। এর পরও কেন কোনো শাস্তির আশঙ্কা নেই? কারণ লবিং। এখানেই আসে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। আইসিসির নেতৃত্বে প্রভাবশালী শক্তি। এমন অনেক কথা বাজারে এসেছে, যা অনেকে ভাবতেই পারেনি। তামিম ভারত থেকে ফেরার পরই দায়িত্ব পান। এর মানে, সব কিছু পরিকল্পিত। আমিনুল ইসলাম বুলবুল প্রতিবাদ করেছিলেন। তখনই অনেকে বলেছেন, তার প্রতিবাদে কাজ হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নেতৃত্বে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজেপি নেতা অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ।
ভারত বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডকেও নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছে। সরকারেরও সায় ছিল। আমরা দেখলাম, ভারতের ক্রিকেট বোর্ড তামিমের অ্যাডহক কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলতে না যাওয়ায় প্রতিশোধ নিলো ভারত।
শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডকেও নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছে। সরকারেরও সায় ছিল। আমরা দেখলাম, ভারতের ক্রিকেট বোর্ড তামিমের অ্যাডহক কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলতে না যাওয়ায় প্রতিশোধ নিলো ভারত। এর মানে এখানেও ভারতের প্রভাব। আর সরকারের সমর্থন। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ। ফলাফল—বাংলাদেশের ক্রিকেট নিজ সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছে না।
বিদায়ী সভাপতি আমিনুল ইসলাম নিজেকে বৈধ দাবি করছিলেন। তার ভাষায়, এটি ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’। তদন্তকে তিনি বলেছেন এখতিয়ারবিহীন। বিষয়টি আদালতে যেতে পারে বলে অনেকে বলেছিলেন। সেটি হয়নি। হবেও না। ইতোমধ্যে বুলবুল নিজেই তা টের পেয়েছেন। আদালতে গেলে কী হয়, তা বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবেই জানে। প্রশ্ন হলো, এটাই কি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ? রাজনীতি ক্রিকেটকেও খেয়ে ফেলবে?
এই ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০০১ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তখন ফুটবল ফেডারেশন ভেঙে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এসেছিল। এবার ক্রিকেটে একই পথ। পার্থক্য একটাই—এবার আরও সূক্ষ্ম, আরও পরিকল্পিত। আমরা জানি, বাংলাদেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নির্বাচন বহুদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। ভোটের আগেই ফলাফল জানা থাকে। সমঝোতা হয়। পদ ভাগাভাগি হয়। এই বাস্তবতায় নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা। গণতন্ত্র নয়; নিয়ন্ত্রণই লক্ষ্য।
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ঘটনাটি আরও গভীর সংকট তুলে ধরে। একজন আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তারপরও এসিসিতে (এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল) পদ পাননি। কারণ, দুটি প্রভাবশালী দেশের ভেটো। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া কূটনীতির দুর্বলতা। বুলবুল প্রতিহিংসার শিকার হলেন।
বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেনি। কারণ, নিরাপত্তা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে? বোর্ড? সরকার? নাকি চাপ? বোর্ড বলেছে সরকার। সরকার বলেছে পরিস্থিতি। দায় কেউ নিচ্ছে না। বলি হলেন বুলবুল।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক—সাংবাদিকদের ভূমিকা। ক্রিকেট বোর্ড ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদে যখন কিছু বিক্ষোভ হচ্ছিল, তখন কিছু সাংবাদিক বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়েছেন। এটি শুধু পেশাগত ব্যর্থতা নয়। এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক। সাংবাদিকদের কাজ হলো ক্ষমতাধরদের প্রশ্ন করা। কিন্তু আমরা দেখছি, ক্ষমতাধরদের তোষামোদের মাধ্যমে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন অনেকের জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন—পেশাটিকে কত নিচে নামানো যায়। যেখানে প্রতিবাদ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দেখা গেছে পক্ষ নেওয়া।
ক্রিকেট এখন ঢাকাকেন্দ্রিক এবং উন্নয়ন কাগজে। ২৫ বছর ধরে টেস্ট মর্যাদা। তবু জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো নেই; আঞ্চলিক উন্নয়ন নেই। প্রতিভা বিকাশ সীমিত। সব পরিকল্পনা কাগজে। বাস্তবে কিছুই নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শত্রু কে? খারাপ ব্যাটিং? দুর্বল বোলিং? না। সবচেয়ে বড় শত্রু রাজনীতি। যেখানে খেলোয়াড় রাজনীতিতে জড়ান, রাজনীতিক খেলায় ঢুকে পড়েন, প্রশাসন দলীয় হয়, সেখানে খেলা টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের ক্রিকেট এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই, এটি কি কখনো রাজনীতির বাইরে যেতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে এই সার্কাস চলবে। চেয়ার বদলাবে, মানুষ বদলাবে, কিন্তু অবস্থা বদলাবে না। ক্রিকেট হারাবে তার আত্মা।
শেষ কথা খুব স্পষ্ট—মাঠের খেলাকে বাঁচাতে হলে বোর্ডকে রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে। না হলে বিসিবি থাকবে; ক্রিকেট থাকবে না।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
(মতামত লেখকের নিজস্ব)