মোহাম্মদ আজমের সাক্ষাৎকার

‘পয়লা বৈশাখ আগের মতো কেন হয় না—এটা নিয়ে হাহাকার করাকে পশ্চাৎপদতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতাই বলব’

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির অন্যতম সর্বজনীন উৎসব। সময়ের পরিক্রমায় এই উৎসবকে ঘিরে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, রাজনীতি এবং নগর-সংস্কৃতির নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকা স্ট্রিম-এর আয়োজনে আরিফ রহমান ও হুমায়ূন শফিকের নেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম

লেখা:
লেখা:
আরিফ রহমান ও হুমায়ূন শফিক

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ২৫
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। স্ট্রিম ছবি

ঢাকা স্ট্রিম: বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখকে প্রায়ই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। নববর্ষের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের এই সম্পর্ককে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোহাম্মদ আজম: বাংলা নববর্ষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে—এটা আসলে একটা খুবই আংশিক ধারণা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তো এটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো ধারণার মধ্যে একটি। সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তার কারণ হলো, এর যে নতুন বিন্যাস হয়েছে, নতুন সমাবেশ হয়েছে, নতুনভাবে এটা শুরু হয়েছে, পুনর্নির্মিত হয়েছে—সেখানে ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী উত্থানের একটা গভীর সম্পৃক্ততা আছে। সেটা ঐতিহাসিক দিক থেকে অস্বীকার করার কোনো কারণও নেই। তার কোনো প্রয়োজনও নেই।

কিন্তু কেউ কেউ পুরো জিনিসটাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিক থেকেই কেবল ব্যাখ্যা করতে চায়। সেই চেষ্টা একটা ‘রিডাকশন’ বা কমিয়ে আনা, একরৈখিক করে তোলার ঘটনা ঘটে। এটা থেকে আমাদের যথাসম্ভব মুক্ত থাকাই উচিত। মানে পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের অনেকগুলো দিক আছে। তার ঐতিহাসিক দিক আছে, ঐতিহ্যগত দিক আছে, জনগোষ্ঠীর নানামাত্রিক সম্পৃক্ততা আছে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণিগত নানাধরনের সম্পৃক্ততা আছে। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী যে সম্পৃক্ততা, সেটা একটা মাত্র।

ঢাকা স্ট্রিম: পয়লা বৈশাখের আয়োজনে, বিশেষ করে ষাটের দশকের রমনার বটমূল বা পরবর্তী সময়ের শোভাযাত্রার শুরুর দিকে—একটি স্পষ্ট প্রতিবাদী চরিত্র ছিল। সেই প্রতিবাদী রূপটি কি এখন আর প্রাসঙ্গিক আছে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ আজম: যেকোনো ধরনের ইভেন্টের কথা বলি না কেন, সেটার প্রতিবাদী চরিত্র একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটের মধ্যে উদ্ভূত হয়। সেটা কখনোই একরূপে কাজ করে না। পয়লা বৈশাখের ক্ষেত্রে, ষাটের দশকের শেষ দিকে ব্যাপারটা একধরনের প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক ও বাংলাদেশ-বিরোধী, পূর্ববঙ্গ-বিরোধী, এই অঞ্চলের জনমানুষ ও বাঙালি জনগোষ্ঠী-বিরোধী যে অবস্থান—সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের অংশ হিসেবেই আসলে নববর্ষ নতুনভাবে উত্থিত হয়েছিল। ফলে তার একটা প্রতিবাদী ভূমিকা ছিল।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা একই ধরনের প্রতিবাদী ভূমিকাটা পাব না। একইসঙ্গে যে শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল, তারও একটা প্রতিবাদী মুহূর্ত ছিল। এবং সেটা তার প্রতিবাদী মুহূর্ত, তাৎপর্য ও অবদান ঠিকভাবেই পালন করেছে। কিন্তু বছরের পর বছর একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেটা পালিত হবে সেটা সম্ভব নয়। সুতরাং, একসময় যেটা প্রতিবাদী মুহূর্তের মধ্যে ছিল, সেটা পরবর্তী সময়ে একই রকমভাবে নেই—এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

ঢাকা স্ট্রিম: নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে ইদানীং এক ধরনের আদর্শিক ও ধর্মীয় বিতর্ক প্রবল হয়ে উঠেছে। কেউ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছাঁচে, আবার কেউ ধর্মের নিরিখে এর বিরোধিতা বা পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। এই সংকটকে কীভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ আজম: এই বিতর্ক বাংলাদেশে প্রবল। শুধু এই বিষয়ে নয়, সংস্কৃতির প্রায় সমস্ত অঙ্গনেই এরকম বিতর্ক আছে। সেটা খুব গভীরভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। একে আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামষ্টিক যে জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রাজনৈতিক জনগণ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া এবং সেখান থেকে রাষ্ট্র পরিগঠন, এটারই একটা বিরোধী অবস্থা হিসেবে দেখি।

বৈশাখের ক্ষেত্রে আমি বলব যে, এতে দুই পক্ষেরই দায় আছে। দায়টা হলো—লোকে সাধারণত ‘আদর্শ’ প্রস্তাব করে। এই আদর্শ প্রস্তাব করাটা একটা বড় ধরনের সমস্যা যে, ‘আমি যা করছি, এটা এভাবে করা হবে এবং এটাই হলো আদর্শ, ফলে অন্যদেরকে এদিকে আসতে হবে।’ আসলে ব্যাপারটা কী? আসলে এটা একটা নববর্ষ। এটা মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা ঐতিহাসিকভাবে নানানভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং চলে আসছে। ফলে এটাকে আমাদের ‘ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিস’ হিসেবে দেখতে হবে।

কিন্তু ওটাকে যদি আমি একটা মতাদর্শিক দিক থেকে দেখতে থাকি, আদর্শ হিসেবে দেখতে থাকি, আরোপণমূলকভাবে চর্চা করতে চাই, তখন আবশ্যিকভাবে দুটো ঘটনা ঘটে। একটা হলো, সে বাস্তব জীবনের তল থেকে ছুটে গিয়ে শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যা বাস্তব জীবনযাপনের সঙ্গে ধীরে ধীরে সম্পর্ক হারায়। আরেকটা হলো, এ ধরনের যেকোনো আদর্শবাদী প্রস্তাব আবশ্যিকভাবে প্রতিপক্ষ তৈরি করে, বিরোধী পক্ষ তৈরি করে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। স্ট্রিম ছবি
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। স্ট্রিম ছবি

আমাদের এখানে বলতে হবে যে, যারা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটা করে, তারাও এই ঘটনা ঘটাচ্ছে। আবার একইসঙ্গে যারা বাঙালিত্বের দিক থেকে ঘটনাটা ঘটায়, তারাও একই ধরনের কাজ করছে। দুই পক্ষই কিন্তু আদর্শ প্রস্তাব করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যাপারই এরকম আদর্শ মেনে এবং মতাদর্শিক ছাঁচের মধ্যে কাজ করে না। যখনই আমরা ওটা করতে চাই, তখনই আসলে এটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফলে আমি বলব যে, এটা আমাদের সমাজের সামগ্রিক গণতান্ত্রিকতার একটা অভাবের ফল। এটা সামষ্টিক সচেতনতার, চৈতন্যের এবং রাজনৈতিকতার একটা গরিবী ভাব। এটা থেকে আমরা যত দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারি, আমরা ব্যাপারটাকে সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক করে তুলতে পারি, ততই খোদ বৈশাখী উৎসব বা বাংলা নববর্ষের উৎসবের জন্য মঙ্গলজনক হবে, বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। একইসঙ্গে আমাদের জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিগঠনের দিক থেকেও এটা খুব অনুকূল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারবে।

ঢাকা স্ট্রিম: অনেকে বলেন নববর্ষ এখন কেবলই শহরের এলিট ও মধ্যবিত্তদের উৎসব, প্রান্তিক মানুষের উৎসব আর নেই। এই সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ আজম: বাংলা নববর্ষের সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার যে সামগ্রিক সম্পর্ক, এটাকে আমার ২০০ বছর আগের বা ১০০ বছর আগের, এমনকি ৫০ বছর আগের নিরিখে দেখলে চলবে না। যখন চৈত্র সংক্রান্তি পালিত হতো, পুরোনো বাংলা নববর্ষে হালখাতা হতো, তখন আমাদের এটা কৃষিভিত্তিক একটা অঞ্চল ছিল। সামগ্রিক যে উৎপাদন, সে উৎপাদনের একটা প্রধান অংশ আসত কৃষি থেকে। ফলে তার সংশ্লিষ্ট যে উৎসব, সেটার একটা কেন্দ্রীয় প্রাধান্য ছিল। এখন তো আসলে কৃষি আছে, প্রকৃতির নির্ভরশীলতা আছে, কিন্তু সামষ্টিক বাংলাদেশের জনসমাজে তার চূড়ান্ত কোনো প্রাধান্য নাই। ফলে এটা পরিবর্তিত হবেই।

এই পরিবর্তন নিয়ে ‘চৈত্র সংক্রান্তি আগের মতো কেন হয় না’, ‘পয়লা বৈশাখ আগের মতো কেন হয় না’—এটা নিয়ে হাহাকার করাকে আমি একটু ঝুঁকি নিয়ে পশ্চাৎপদতা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতাই বলব।

কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখা উচিত দুটো জিনিস। একটা জিনিস হলো, যখনই গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে যুক্ত, অনেক বেশি গরিব মানুষের সঙ্গে যুক্ত এরকম ট্র্যাডিশনাল ব্যাপারগুলোর আরবানাইজেশন ঘটে, তখন এর মধ্যে একটা মেকিত্ব ভর করে। ওই মেকিত্ব ভর করার বিপরীতে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। আর আরেকটা হলো, এটা যেন গরিব-বিরোধী না হয়ে যায়। কারণ মানুষের একটা বিরাট অংশ গরিব। আপনি যখন আরবানাইজেশন করছেন... গ্রামেও কিন্তু আরবানাইজেশন হচ্ছে, নগরায়ন হচ্ছে। ফলে আগের সেই অকৃত্রিম গ্রামীণ পটভূমিতে আপনি এই উৎসব করতে চান—আমি এটাকে কোনো প্রগতিশীল ব্যাপার বলব না।

পয়লা বৈশাখে আপনি মাটির সানকিতে খাবেন, পান্তা ভাত খাবেন, ইলিশ মাছ খাবেন—আমি কোনোটাতেই কোনো সমস্যা দেখি না। একমাত্র সমস্যা তখনই যদি আপনি এটাকে আইডিয়াল বা আদর্শ করে তোলেন! আপনি এটাকে মতাদর্শিক রঙ চড়ালে সেটা সংকট। কিন্তু এর বাইরে প্র্যাকটিস হিসেবে এটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার।

বিশেষ করে ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা বড় তাত্ত্বিকেরা অনবরত এই কথা বলে গেছেন যে, ঐতিহ্য কিন্তু কোনোভাবেই একভাবে থাকে না। ঐতিহ্য পুনর্নির্মিত হয়, নির্মিত হয়, এমনকি একদম নতুন জিনিসও প্রস্তাবিত হয়। ঐতিহ্য সবাই সমর্থন করবে, সেটাও নয়। তালাল আসাদের দুর্দান্ত থিসিস আছে যে—আপনি যেটা অনুসরণ করেন সেটাও ঐতিহ্য, আবার আপনি যেটার বিরোধিতা করার প্রয়োজন বোধ করেন ও বিরোধিতা করেন, সেটাও আপনার ঐতিহ্য।

ফলে ঐতিহ্যের মধ্যে কিন্তু এরকম একটা নমনীয় ব্যাপার আছে। আমরা যখন সেটাকে একটা ছাঁচে ফেলতে চাই, আমরা যখন বলি যে ‘তুই বাঙালি হ’, আমরা যখন বলি যে ‘এটা ইসলাম বিরোধী’, তখন আমরা কিন্তু একটা মতাদর্শিক ছাঁচের মধ্যে এটাকে ফেলছি। ফেলেই এই সর্বনাশটা করছি।

ফলে আমি মনে করি না যে, নববর্ষকে ঘিরে শহুরে যে কালচার তৈরি হচ্ছে, এটা কোনোভাবেই ক্ষতিকর। এটা একদম ক্ষতিকর নয়। এটাই স্বাভাবিক। এর বাইরে মানুষ কীভাবে যোগ দেবে? আমরা তো নাগরিক অস্তিত্ত্ব নিয়েই জীবনযাপন করছি। ফলে ওটা খুবই জরুরি। কিন্তু ওই জিনিসটা খেয়াল রাখতে হবে—একদিকে আদর্শবাদিতা পরিহার করা, অন্যদিকে মেকিত্ব যথাসম্ভব পরিহার করা। আর এটা যেন গরিব-বিরোধী না হয়। এই ব্যাপারগুলোর লক্ষ্য রাখলেই উৎসবে জোর আসবে, সর্বজনীনতা বৃদ্ধি পাবে, গণতান্ত্রিকতা বৃদ্ধি পাবে আর একটা জনগোষ্ঠীর জন্য খুব জরুরি যে বিচিত্র ধরনের মিলনমেলা প্রয়োজন হয়, নববর্ষ আরও ভালভাবে সেই দায়িত্বটা পালন করতে পারবে।

ঢাকা স্ট্রিম: চমৎকার বিশ্লেষণের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আজম: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

সম্পর্কিত