ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইরান-আমেরিকা সংলাপের টেবিলে যখন গোটা বিশ্ব শান্তির আশা করেছিল, ঠিক তখনই সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে গিয়ে বিশ্বরাজনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কেবল দুটি রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের এক প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে বিশ্ব এক নজিরবিহীন মেরুকরণের সাক্ষী হচ্ছে, যেখানে খোদ পশ্চিমা জোটের ভেতরেই বড় ধরনের ফাটল দৃশ্যমান।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও স্পেনের মতো দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের কঠোর নীতি থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, এমনকি লোহিত সাগরে মার্কিন নেভাল ব্লকেডের মতো সামরিক পদক্ষেপেও সরাসরি অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করছে। ন্যাটোর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা না পাওয়া এবং আমেরিকার একক আধিপত্য মেনে নেওয়ার অনিচ্ছা প্রমাণ করে যে, আটলান্টিক পাড়ের পুরোনো মিত্ররা এখন নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় বেশি আগ্রহী। পশ্চিমা বিশ্বের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিকভাবে একাকী করে দিচ্ছে, যা ইরান ইস্যুতে তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
ইরান-আমেরিকা সংলাপের এই শূন্যতা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং গাজা ও লেবাননের রণক্ষেত্রে এক ভয়াবহ মানবিক ও সামরিক সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। ইরান সমর্থিত জোটের সাথে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মাঝে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলেছে।
এই অস্থিতিশীলতার সুযোগে একদিকে যেমন তুরস্ক সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক হুমকির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান পুনরায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে এক নতুন আঞ্চলিক মুসলিম ব্লকের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমেরিকার এই দোদুল্যমানতার বিপরীতে চীন-রাশিয়া-ইরানকে কেন্দ্র করে এক শক্তিশালী ‘নতুন অক্ষশক্তি’র উত্থান ঘটছে, যা মূলত মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে। ভবিষ্যতের এই কঠিন বাস্তবতায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে কেবল সামরিক পেশিশক্তি নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বকে তাদের মিত্রদের সাথে তৈরি হওয়া ফাটল মেরামত এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। নয়তো সংলাপহীন এই অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের দিকে ধাবিত করতে পারে।
পশ্চিমা জোটে ফাটল: ওয়াশিংটনের একাকিত্ব
ইরান ইস্যুতে আমেরিকার কঠোর অবস্থান এখন আর তার চিরাচরিত মিত্রদের পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে না; বরং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং স্পেনের মতো দেশগুলো ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে নেভাল ব্লকেড বা নৌ-অবরোধ তৈরির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জোটে সরাসরি অংশ নিতে যে অনীহা প্রকাশ করেছে, তা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অনেক মিত্র দেশই মনে করছে, ন্যাটোর সহযোগিতা এখন কেবল মার্কিন স্বার্থরক্ষা ও ইউক্রেন যুদ্ধের মতো নির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যা তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এমনকি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাজ্যের সাথেও কৌশলগত ফাটল দেখা দিচ্ছে, যার অন্যতম উদাহরণ হলো ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ দ্বীপের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক মতভিন্নতা।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার রহস্যজনক ভূমিকা এবং ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ইউরোপীয় দেশগুলোকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের একক ছাতার নিচে থাকা এখন আর আগের মতো নিরাপদ নয়। ইউক্রেন ইস্যুতে আমেরিকার অতি-ব্যস্ততা এবং এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ফলে অনেক দেশই এখন নিজেদের কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য খুঁজছে। এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আস্থার সংকট স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমেরিকার তথাকথিত ‘একক নেতৃত্ব’ বা হেজেমনি এখন আর কেবল বাইরে নয়, বরং খোদ পশ্চিমা বিশ্বের অন্দরমহলেই তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
মধ্যপ্রাচ্যের বহুমুখী সংকট: গাজা, লেবানন ও ইরান
ইরান-আমেরিকা অচলাবস্থা এখন আর কেবল পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গাজা ও লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি এই সংকটকে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেওয়ার উপক্রম করেছে। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইসরায়েলের সংঘাত যখন চরমে, তখন আমেরিকা তার মিত্রদের সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে, যা এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে।
লেবানন ও গাজা ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিচারিতা বিশ্বমঞ্চে তাদের নৈতিক অবস্থানকে চরমভাবে দুর্বল করে দিয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন গভীরভাবে বুঝতে পারছে যে আমেরিকার তথাকথিত নিরাপত্তা বলয় তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আর কার্যকর বা নির্ভরযোগ্য নয়।
বর্তমান বাস্তবতা এটিই যে, একক কোনো শক্তির পক্ষে আর লাঠি ঘুরিয়ে বিশ্ব শাসন করা সম্ভব নয়। গাজা থেকে তেহরান এবং ইউক্রেন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বহুমুখী সংকটের সমাধান যদি অনতিবিলম্বে কূটনৈতিকভাবে না হয়, তবে এই নতুন মেরুকরণ বিশ্বকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।
এই আস্থার সংকটের মুখে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও এখন নিরাপত্তার গ্যারান্টির জন্য কেবল পশ্চিমের ওপর নির্ভর না করে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অস্ত্রের সরবরাহ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের জন্য এই নতুন বিকল্পগুলোর সন্ধান প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কয়েক দশকের একক নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ছে এবং একটি বহুমুখী সামরিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
তুরস্কের হুমকি ও আঞ্চলিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তুরস্ক, যা ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আঙ্কারাকে ওয়াশিংটনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গাজা ও ইরান ইস্যুতে তুরস্ক সরাসরি আমেরিকার অবস্থানের বিরোধিতা করছে এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বিংশ শতাব্দীর স্বৈরশাসক হিটলারের সাথে তুলনা করে কূটনৈতিক যুদ্ধকে চরমে নিয়ে গেছে।
আঙ্কারার পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি এবং লেবাননের পাশে দাঁড়ানোর প্রকাশ্য ঘোষণা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল পাল্টা অভিযোগ তুলছে যে, তারা যখন সন্ত্রাসবাদ দমনে লড়ছে, তখন তুরস্ক ইরানকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে এবং হামাসকে সমর্থন জানিয়ে সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিচ্ছে। তেল আবিব আরও ইঙ্গিত করছে যে, তুরস্ক একদিকে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সোচ্চার হলেও নিজ দেশে কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বাদানুবাদের সমান্তরালে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান পুনরায় সৌদি আরবের পাশে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ও শক্তিশালী মুসলিম ব্লক তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তুরস্কের এই হার্ডলাইন ডিপ্লোম্যাসি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নতুন মেরুকরণ প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় পশ্চিমাদের তৈরি করা পুরোনো ছকগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। আঙ্কারার এই স্বাধীনচেতা অবস্থান কেবল ন্যাটোতেই ফাটল ধরাচ্ছে না, বরং তেহরান থেকে রিয়াদ পর্যন্ত এক নতুন কৌশলগত বলয় তৈরির পথ প্রশস্ত করছে।
আইনি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট
বাইরের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ইসরায়েল ও আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বর্তমানে শান্তি প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা এবং তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিজ দেশে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের ক্রমাগত সমালোচনা ও পদত্যাগের দাবির মুখে রয়েছেন, যিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নীতিকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেছেন; এমনকি তুরস্কের আদালতেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায় তাকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, আসন্ন নির্বাচন এবং জনমতের তীব্র বিভাজন ওয়াশিংটনকে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর দোদুল্যমানতা এবং খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত মিত্রদের মনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে, যার পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে ইরান ও তার মিত্ররা।
ট্রাম্পের অসংলগ্ন পররাষ্ট্রনীতির কারণে এমনকি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অনেকেই, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট নেতা ন্যান্সি পেলোসির মতো ব্যক্তিত্বরা প্রেসিডেন্টের মানসিক স্থিতিশীলতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নেতৃত্বের সংকট ওয়াশিংটনকে বিশ্বমঞ্চে নীতিহীন করে তুলছে, যা প্রকারান্তরে নতুন অক্ষশক্তির উত্থানকেই ত্বরান্বিত করছে।
নতুন অক্ষশক্তির উত্থান: চীন-রাশিয়া-ইরান ত্রিভুজ
আমেরিকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপকে মোকাবিলা করতে ইরান এখন ‘লুক ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত জোট গড়ে তুলেছে। এই উদীয়মান অক্ষশক্তি কেবল ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞাকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে না, বরং কয়েক দশকের পশ্চিমা আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইরান-আমেরিকা অচলাবস্থা এখন আর কেবল পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গাজা ও লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি এই সংকটকে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেওয়ার উপক্রম করেছে।
এই ত্রিভুজ সম্পর্কের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে উত্তর কোরিয়ার রহস্যজনক ও উসকানিমূলক ভূমিকা, যা পিয়ংইয়ংয়ের একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্বকে এক নতুন সামরিক সমীকরণের সংকেত দিচ্ছে।
চীনের অর্থনৈতিক ঢাল
চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও জ্বালানি তেল ক্রয়ের নিশ্চয়তা তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। বেইজিংয়ের এই সমর্থন ইরানকে আমেরিকার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির বিপরীতে এক শক্তিশালী সুরক্ষা কবচ প্রদান করেছে। এর ফলে ইরান কেবল টিকে নেই, বরং চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করেছে।
অন্যদিকে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে চীনের সাথে তাদের গোপন বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই অক্ষশক্তির অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও মজবুত করছে। ডলারের আধিপত্য ভাঙতে এই ব্লকটি এখন নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে, যা পশ্চিমাদের জন্য এক অশনিসংকেত।
রাশিয়ার সামরিক সমীকরণ
ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রোন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—তেহরান ও মস্কোর এই 'গিভ অ্যান্ড টেক' নীতি রণক্ষেত্রের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
এই সামরিক সমীকরণে উত্তর কোরিয়ার সংযুক্তি পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে; কারণ কিম জং উনের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং মস্কোর সাথে সম্ভাব্য প্রযুক্তির বিনিময় এক বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যখন লোহিত সাগর বা ইউক্রেন সামলাতে ব্যস্ত, তখন এই অক্ষশক্তি তাদের সামরিক সামর্থ্য সংহত করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পশ্চিমাদের নাজেহাল করছে।
সংলাপহীন এই বিশ্ব এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো ব্যবস্থার পতন আর নতুন মেরুকরণের পদধ্বনি স্পষ্ট। একদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, নেতৃত্বের সংকট এবং চিরাচরিত মিত্রদের সাথে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের অবসান ঘটাচ্ছে; অন্যদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের মতো শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থান একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতা এটিই যে, একক কোনো শক্তির পক্ষে আর লাঠি ঘুরিয়ে বিশ্ব শাসন করা সম্ভব নয়। গাজা থেকে তেহরান এবং ইউক্রেন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বহুমুখী সংকটের সমাধান যদি অনতিবিলম্বে কূটনৈতিকভাবে না হয়, তবে এই নতুন মেরুকরণ বিশ্বকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।
ভবিষ্যতের এই বিপর্যয় এড়াতে হলে বিশ্বনেতৃত্বকে কেবল সামরিক শক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের পথে হাঁটতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন একটি নতুন বৈশ্বিক চুক্তি, যেখানে সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আলোচনার টেবিলকে যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। অন্যথায় অবিশ্বাসের এই দেয়াল যদি আরও দীর্ঘ হয়, তবে আগামীর ইতিহাস কেবল ধ্বংসস্তূপ আর মানবতার পরাজয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে। একটি শান্তিকামী ও স্থিতিশীল পৃথিবীর স্বার্থে সংঘাত নয়, বরং সংলাপই হোক আগামীর একমাত্র গন্তব্য।