মতামত
সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যক্তি নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই ধরনেরই একজন নেতা। তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল এক অর্থে অস্বাভাবিক। তাঁর মৃত্যু মর্মান্তিক। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে– কীভাবে একজন সেনা কর্মকর্তা দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইতিহাসও সামনে চলে আসে।
১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভক্ত। প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল। জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
প্রথম দিকে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি নিজেকে সৈনিক বলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে, রাজনৈতিক ভিত্তি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন এগোতে পারে না। এ কারণেই তিনি কেবল ক্ষমতা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসম্পৃক্ততার পথ খুঁজেছেন।
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বক্তব্যে উন্নয়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এত সুস্পষ্টভাবে সামনে আনা হয়নি।
জিয়া বুঝেছিলেন, জনগণ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান চায় না। তারা চায় কাজ। চায় উন্নয়ন। চায় জীবনের মানোন্নয়ন। এমন উপলব্ধি থেকেই তিনি উন্নয়নকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি অনেকাংশে এ সময়েই তৈরি হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর কার্যত একদলীয় কাঠামোর দিকে দেশ এগিয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্র হত্যা সম্পন্ন করেন।
জিয়া সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেন। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পরিবেশও তৈরি করেন।
বিশ্ব ইতিহাসে সামরিক শাসকের উদাহরণ অনেক আছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনো সামরিক নেতা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বহুদলীয় ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই দিক থেকে জিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন। প্রথমে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু জাগদল প্রত্যাশিত সাড়া জাগাতে পারেনি। এরপর আরও বৃহত্তর পরিসরে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের কাজ শুরু হয়।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
দলটির বিশেষত্ব ছিল এর বহুমাত্রিক চরিত্র। এখানে সাবেক আমলা ছিলেন। শিক্ষক ছিলেন। পেশাজীবী ছিলেন। কৃষক প্রতিনিধি ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা থেকে আসা নেতারা ছিলেন। এই বৈচিত্র্য বিএনপিকে দ্রুত জাতীয় পরিসরে বিস্তার লাভে সাহায্য করে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ ছিল তাঁর জনসংযোগ। তিনি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতি করেননি। গ্রামে গেছেন। হেঁটে হেঁটে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের ঘরে গেছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন।
গ্রামীণ সমাজে এর প্রভাব ছিল গভীর। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, গণসংযোগই তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ মানুষ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজেদের কাছে দেখতে পেয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে কেবল ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রের ভৌগোলিক বাস্তবতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস ও জনগণের অভিন্ন স্বার্থকে ভিত্তি করে একটি জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সেই রাজনৈতিক ধারণারই প্রতিফলন। এই ধারণা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জিয়াউর রহমানের সময় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষককে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফল দ্রুত পাওয়া যায়। খাদ্য উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় হতে থাকে। বাংলাদেশের পরবর্তী কৃষি সাফল্যের পেছনে এই সময়ের নীতিগত ভিত্তির গুরুত্ব অর্থনীতিবিদদের অনেকেই স্বীকার করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ওপর জোর ছিল। জিয়াউর রহমান সেই অকার্যকর কাঠামোয় পরিবর্তন আনেন। তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসে। দেশে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান শুরু হয়। আজকের বাংলাদেশের শক্তিশালী বেসরকারি অর্থনীতির শেকড় অনেকাংশে সেই সময়ের নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় উৎসও এটি। এই শিল্পের বিকাশে সরকারি নীতিগত সহায়তা, বেসরকারি উদ্যোগের উৎসাহ ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমানের সময়েই এই রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক চিন্তার ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।
জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। প্রবাসী আয় ধীরে ধীরে জাতীয় অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়।
আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। এই বাস্তবতার সূচনাপর্বেও জিয়ার নীতিগত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামভিত্তিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। এই চিন্তা থেকেই বিভিন্ন স্থানীয় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পরে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের যে মডেল আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে, তার পেছনেও এই চিন্তার প্রভাব রয়েছে।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়েই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে দলটি জনগণের ভোটে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালেও নির্বাচনে জয়ী হয়।
শুধু সরকার গঠন নয়, বিরোধী দল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯৬ সালের সংসদে বিএনপি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিরোধী দল ছিল। ২০২৬-এ বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে।
গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী দল। বিএনপি সেই ভূমিকাও পালন করেছে।
ইতিহাসে কোনো নেতাই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। এ অবস্থায় একজন নেতার মূল্যায়ন করতে হয় তাঁর সামগ্রিক অবদান দিয়ে। জিয়াউর রহমান মাত্র কয়েক বছরের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। সেই অল্প সময়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেন।
অর্থনীতিতে উৎপাদন ও উদ্যোক্তাবান্ধব চিন্তা সামনে আনেন। কৃষিতে অগ্রাধিকার দেন। গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেন। একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক অনিবার্য নাম। তিনি শুধু সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না। শুধু একজন রাষ্ট্রপতিও ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাষ্ট্র গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি।
জাগদল থেকে বিএনপির যাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্মের ইতিহাস নয়। এটি নতুন রাজনৈতিক ধারার উত্থানের ইতিহাস। আজও বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর উন্নয়ন নিয়ে যে বিতর্ক ও আলোচনা হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো না কোনোভাবে জিয়াউর রহমান থাকেন। এটাই প্রমাণ করে, ইতিহাসে তাঁর অবস্থান এখনো জীবন্ত। তাঁর উত্তরাধিকার এখনো প্রাসঙ্গিক। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে তাঁর নাম নিঃসন্দেহে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যক্তি নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই ধরনেরই একজন নেতা। তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল এক অর্থে অস্বাভাবিক। তাঁর মৃত্যু মর্মান্তিক। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে– কীভাবে একজন সেনা কর্মকর্তা দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইতিহাসও সামনে চলে আসে।
১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভক্ত। প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল। জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
প্রথম দিকে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি নিজেকে সৈনিক বলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে, রাজনৈতিক ভিত্তি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন এগোতে পারে না। এ কারণেই তিনি কেবল ক্ষমতা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসম্পৃক্ততার পথ খুঁজেছেন।
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বক্তব্যে উন্নয়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এত সুস্পষ্টভাবে সামনে আনা হয়নি।
জিয়া বুঝেছিলেন, জনগণ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান চায় না। তারা চায় কাজ। চায় উন্নয়ন। চায় জীবনের মানোন্নয়ন। এমন উপলব্ধি থেকেই তিনি উন্নয়নকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি অনেকাংশে এ সময়েই তৈরি হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর কার্যত একদলীয় কাঠামোর দিকে দেশ এগিয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্র হত্যা সম্পন্ন করেন।
জিয়া সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেন। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পরিবেশও তৈরি করেন।
বিশ্ব ইতিহাসে সামরিক শাসকের উদাহরণ অনেক আছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনো সামরিক নেতা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বহুদলীয় ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই দিক থেকে জিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন। প্রথমে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু জাগদল প্রত্যাশিত সাড়া জাগাতে পারেনি। এরপর আরও বৃহত্তর পরিসরে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের কাজ শুরু হয়।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
দলটির বিশেষত্ব ছিল এর বহুমাত্রিক চরিত্র। এখানে সাবেক আমলা ছিলেন। শিক্ষক ছিলেন। পেশাজীবী ছিলেন। কৃষক প্রতিনিধি ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা থেকে আসা নেতারা ছিলেন। এই বৈচিত্র্য বিএনপিকে দ্রুত জাতীয় পরিসরে বিস্তার লাভে সাহায্য করে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ ছিল তাঁর জনসংযোগ। তিনি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতি করেননি। গ্রামে গেছেন। হেঁটে হেঁটে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের ঘরে গেছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন।
গ্রামীণ সমাজে এর প্রভাব ছিল গভীর। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, গণসংযোগই তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ মানুষ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজেদের কাছে দেখতে পেয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে কেবল ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
রাষ্ট্রের ভৌগোলিক বাস্তবতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস ও জনগণের অভিন্ন স্বার্থকে ভিত্তি করে একটি জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সেই রাজনৈতিক ধারণারই প্রতিফলন। এই ধারণা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জিয়াউর রহমানের সময় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষককে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফল দ্রুত পাওয়া যায়। খাদ্য উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় হতে থাকে। বাংলাদেশের পরবর্তী কৃষি সাফল্যের পেছনে এই সময়ের নীতিগত ভিত্তির গুরুত্ব অর্থনীতিবিদদের অনেকেই স্বীকার করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ওপর জোর ছিল। জিয়াউর রহমান সেই অকার্যকর কাঠামোয় পরিবর্তন আনেন। তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেন। উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসে। দেশে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান শুরু হয়। আজকের বাংলাদেশের শক্তিশালী বেসরকারি অর্থনীতির শেকড় অনেকাংশে সেই সময়ের নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় উৎসও এটি। এই শিল্পের বিকাশে সরকারি নীতিগত সহায়তা, বেসরকারি উদ্যোগের উৎসাহ ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমানের সময়েই এই রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক চিন্তার ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।
জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। প্রবাসী আয় ধীরে ধীরে জাতীয় অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়।
আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। এই বাস্তবতার সূচনাপর্বেও জিয়ার নীতিগত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামভিত্তিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। এই চিন্তা থেকেই বিভিন্ন স্থানীয় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পরে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের যে মডেল আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে, তার পেছনেও এই চিন্তার প্রভাব রয়েছে।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়েই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে দলটি জনগণের ভোটে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালেও নির্বাচনে জয়ী হয়।
শুধু সরকার গঠন নয়, বিরোধী দল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯৬ সালের সংসদে বিএনপি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিরোধী দল ছিল। ২০২৬-এ বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে।
গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী দল। বিএনপি সেই ভূমিকাও পালন করেছে।
ইতিহাসে কোনো নেতাই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। এ অবস্থায় একজন নেতার মূল্যায়ন করতে হয় তাঁর সামগ্রিক অবদান দিয়ে। জিয়াউর রহমান মাত্র কয়েক বছরের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। সেই অল্প সময়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেন।
অর্থনীতিতে উৎপাদন ও উদ্যোক্তাবান্ধব চিন্তা সামনে আনেন। কৃষিতে অগ্রাধিকার দেন। গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেন। একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক অনিবার্য নাম। তিনি শুধু সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না। শুধু একজন রাষ্ট্রপতিও ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাষ্ট্র গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি।
জাগদল থেকে বিএনপির যাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্মের ইতিহাস নয়। এটি নতুন রাজনৈতিক ধারার উত্থানের ইতিহাস। আজও বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর উন্নয়ন নিয়ে যে বিতর্ক ও আলোচনা হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো না কোনোভাবে জিয়াউর রহমান থাকেন। এটাই প্রমাণ করে, ইতিহাসে তাঁর অবস্থান এখনো জীবন্ত। তাঁর উত্তরাধিকার এখনো প্রাসঙ্গিক। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে তাঁর নাম নিঃসন্দেহে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগা প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বিষয়ক বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি দুর্বল হতে পারে—এমন যুক্তি গ্রহণ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমান্ত নদীনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বৈধ অধিকার সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে।
১ মিনিট আগে
মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
৪ ঘণ্টা আগে
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত
৫ ঘণ্টা আগে
একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
৭ ঘণ্টা আগে