এ আই এম মোস্তফা রেজা নূর

একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। ঢাকায় রাজনৈতিক আলোচনায় বসেছেন শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এই ব্যর্থ আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম প্রধান মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া সাংবিধানিক সংকট সমাধানের শেষ চেষ্টা ছিল এই আলোচনা। কিন্তু দুই প্রধান রাজনৈতিক নেতার মূল অবস্থানগুলো মৌলিকভাবেই অমীমাংসিত থাকায় তা ভেস্তে যায়।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে বিরোধ, ভিন্ন গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে গভীর পারস্পরিক সন্দেহের কারণেই শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। অনেক গবেষকের মতে, আলোচনাটি ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল, যখন সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর) যদি বিদ্রোহ না করত বা বিদ্রোহটি ব্যর্থ হতো, তবে প্রতিরোধের জাতীয়, কৌশলগত এবং সামাজিক ধারাটি আরও অনেক বড় বাধার সম্মুখীন হতো। চট্টগ্রাম—সম্ভবত পূর্ব পাকিস্তানজুড়েই এর সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারত সুদূরপ্রসারী।
চট্টগ্রাম ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের মূল লাইফলাইন। মেজর জিয়া যদি বিদ্রোহ না করতেন কিংবা বিদ্রোহ ব্যর্থ হতো, তবে এই অঞ্চলে তাৎক্ষণিক সামরিক ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যেত:
৮ম ইবিআর বিদ্রোহ না করলে, এমভি সোয়াত জাহাজে থাকা ১০ হাজার টন গোলাবারুদ সফলভাবে খালাস এবং বিতরণ করা সম্ভব হতো। এটি পাকিস্তানি ১৪তম ডিভিশনকে সম্পূর্ণভাবে সশস্ত্র করত, যা তাদের সপ্তাহের পরিবর্তে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বন্দর নগরীটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করত।
চট্টগ্রামের প্রতিরোধ বিলম্বিত বা খণ্ডিত হতে পারতো। কৌশলগতভাবে চট্টগ্রাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি ছিল প্রধান সমুদ্রবন্দর, একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অঞ্চল এবং প্রথম স্থানগুলোর একটি, যেখানে সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার পর মেজর জিয়া যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি অনুগত থাকতেন বা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন অংশকে সংগঠিত করতে সমস্যা হতে পারত। তাছাড়া চট্টগ্রামের বাঙালি সেনারা বিভ্রান্ত বা বিভক্ত হয়ে পড়তে পারত। প্রতিরোধের সমন্বয়ও দুর্বল হতে পারত। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরও দ্রুত বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারত, যা অস্ত্র প্রাপ্তি, যোগাযোগ এবং শুরুর দিকের বিদ্রোহী সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।
বাস্তবে, প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রায় এক সপ্তাহ চট্টগ্রামের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, যা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দেশের অভ্যন্তরে সেনা পাঠানোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বন্দরটি ব্যবহারে বাধা দিয়েছিল। এই বিলম্বটুকু না হলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দ্রুত উত্তর ও পশ্চিমে সেনা মোতায়েন করে স্থানীয় বেসামরিক প্রতিরোধ পকেটগুলো সংগঠিত হওয়ার আগেই গুঁড়িয়ে দিতে পারত।
যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছিল প্রশ্নাতীত, কিন্তু ২৫ মার্চ রাতের বাস্তব পরিস্থিতি ছিল চরম বিশৃঙ্খল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অথবা আত্মগোপনে ছিলেন।
সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও ইউনিফর্ম পরিহিত বাঙালি সৈন্যদের এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ অরক্ষিত এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক বল জোগায়। এটি এমন একটি পরিস্থিতিকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তর করে, অন্যথায় যা কেবল বেসামরিক গণহত্যা বলে মনে হতে পারত।
মেজর জিয়া যদি বিদ্রোহ না করতেন, তবে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণাগুলো কখনোই আসত না। ঢাকা শহরে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ভয়াবহতায় স্তব্ধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠীর কাছে একজন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার মুখে সুপরিকল্পিত প্রতিরোধের এই ঘোষণা ছিল এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্ফুলিঙ্গ। এটিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের ‘মুক্তি বাহিনী’র প্রাথমিক দলে পরিণত করতে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এটি না হলে, এক গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং হতাশা হয়তো পুরো প্রদেশকে পঙ্গু করে রাখত।
এই সম্প্রচারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল; কারণ তা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছিল যে একটি সংগঠিত প্রতিরোধ বিদ্যমান। ইঙ্গিত দিয়েছিল যে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা এই গণঅভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, সেগুলো পাকিস্তানি কমান্ড কাঠামো থেকে বাঙালিদের দলত্যাগকে উৎসাহিত করেছিল।
মেজর জিয়ার অংশগ্রহণ ছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর বিভ্রান্তি হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী হতো। গুজব ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারত। সাময়িকভাবে মানুষের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
সামাজিকভাবে একটি তাৎক্ষণিক সামরিক বিদ্রোহের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষ যেভাবে এই যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াটিকে মৌলিকভাবে বদলে দিত।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা—জিয়া ও ৮ম ইবিআর-এর বিদ্রোহের মাধ্যমে লজিস্টিকাল (যোগাযোগ ও রসদ) লাইন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। দ্রুত যুদ্ধাবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। জনগণের মধ্যে উচ্চ মনোবল ফিরে এসেছে। তাৎক্ষণিক সামরিক বিদ্রোহ না হলে বন্দর সুরক্ষিত থাকত, অস্ত্র খালাস করা হতো, শুরুতেই মারাত্মক স্থবিরতা ভর করত। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অসম (অ্যাসিম্যাট্রিক) সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটতে পারত।
বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের তাৎক্ষণিকভাবে দলবদ্ধ, প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও সৈন্য না থাকলে সীমান্ত ও গ্রামীণ সেক্টরগুলোর প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ত। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী অভিযানের মুখে কোনো সংগঠিত প্রথাগত প্রতিরোধ থাকত না। ফলে শুরুর মাসেই বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়তো আরও কয়েক গুণ বেশি ও বিপর্যয়কর হতে পারত।
যুদ্ধ অবশ্য থেমে থাকত না; সাড়ে সাত কোটি বাঙালির রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তুলেছিল। তবে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মূল অংশটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসে যদি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড়াতে না পারত, তবে এই প্রতিরোধের কোনো প্রথাগত কাঠামো থাকত না। এটি তখন সুসংগঠিত ও প্রথাগত সেক্টরে বিভক্ত কোনো সেনাবাহিনীর মতো না হয়ে, ফরাসি প্রতিরোধ বাহিনী বা ভিয়েত কং-এর মতো একটি অত্যন্ত খণ্ডিত, আন্ডারগ্রাউন্ড এবং দীর্ঘস্থায়ী শহুরে গেরিলা আন্দোলনে পরিণত হতো—যা হয়তো যুদ্ধটিকে নয় মাসের পরিবর্তে বছরের পর বছর টেনে নিয়ে যেত।
বলা যায়, মেজর জিয়ার চট্টগ্রাম বন্দরে না গিয়ে মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটি স্বাধীনতার চেতনা তৈরি করেনি, তবে এটি সেই স্ফুলিঙ্গ যেটি তাৎক্ষণিক সামরিক কাঠামো এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বর্ম জুগিয়েছিল, যা একটি স্তব্ধ জাতিকে প্রথম দিন থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে বিজয়ের আগ পর্যন্ত লড়াই করার স্পৃহা ও শক্তি দিয়েছিল।

একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। ঢাকায় রাজনৈতিক আলোচনায় বসেছেন শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এই ব্যর্থ আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম প্রধান মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৈরি হওয়া সাংবিধানিক সংকট সমাধানের শেষ চেষ্টা ছিল এই আলোচনা। কিন্তু দুই প্রধান রাজনৈতিক নেতার মূল অবস্থানগুলো মৌলিকভাবেই অমীমাংসিত থাকায় তা ভেস্তে যায়।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে বিরোধ, ভিন্ন গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে গভীর পারস্পরিক সন্দেহের কারণেই শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। অনেক গবেষকের মতে, আলোচনাটি ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল, যখন সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর) যদি বিদ্রোহ না করত বা বিদ্রোহটি ব্যর্থ হতো, তবে প্রতিরোধের জাতীয়, কৌশলগত এবং সামাজিক ধারাটি আরও অনেক বড় বাধার সম্মুখীন হতো। চট্টগ্রাম—সম্ভবত পূর্ব পাকিস্তানজুড়েই এর সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারত সুদূরপ্রসারী।
চট্টগ্রাম ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের মূল লাইফলাইন। মেজর জিয়া যদি বিদ্রোহ না করতেন কিংবা বিদ্রোহ ব্যর্থ হতো, তবে এই অঞ্চলে তাৎক্ষণিক সামরিক ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যেত:
৮ম ইবিআর বিদ্রোহ না করলে, এমভি সোয়াত জাহাজে থাকা ১০ হাজার টন গোলাবারুদ সফলভাবে খালাস এবং বিতরণ করা সম্ভব হতো। এটি পাকিস্তানি ১৪তম ডিভিশনকে সম্পূর্ণভাবে সশস্ত্র করত, যা তাদের সপ্তাহের পরিবর্তে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বন্দর নগরীটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করত।
চট্টগ্রামের প্রতিরোধ বিলম্বিত বা খণ্ডিত হতে পারতো। কৌশলগতভাবে চট্টগ্রাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি ছিল প্রধান সমুদ্রবন্দর, একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অঞ্চল এবং প্রথম স্থানগুলোর একটি, যেখানে সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার পর মেজর জিয়া যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি অনুগত থাকতেন বা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন অংশকে সংগঠিত করতে সমস্যা হতে পারত। তাছাড়া চট্টগ্রামের বাঙালি সেনারা বিভ্রান্ত বা বিভক্ত হয়ে পড়তে পারত। প্রতিরোধের সমন্বয়ও দুর্বল হতে পারত। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরও দ্রুত বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারত, যা অস্ত্র প্রাপ্তি, যোগাযোগ এবং শুরুর দিকের বিদ্রোহী সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।
বাস্তবে, প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রায় এক সপ্তাহ চট্টগ্রামের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, যা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দেশের অভ্যন্তরে সেনা পাঠানোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বন্দরটি ব্যবহারে বাধা দিয়েছিল। এই বিলম্বটুকু না হলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দ্রুত উত্তর ও পশ্চিমে সেনা মোতায়েন করে স্থানীয় বেসামরিক প্রতিরোধ পকেটগুলো সংগঠিত হওয়ার আগেই গুঁড়িয়ে দিতে পারত।
যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছিল প্রশ্নাতীত, কিন্তু ২৫ মার্চ রাতের বাস্তব পরিস্থিতি ছিল চরম বিশৃঙ্খল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অথবা আত্মগোপনে ছিলেন।
সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও ইউনিফর্ম পরিহিত বাঙালি সৈন্যদের এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ অরক্ষিত এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক বল জোগায়। এটি এমন একটি পরিস্থিতিকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তর করে, অন্যথায় যা কেবল বেসামরিক গণহত্যা বলে মনে হতে পারত।
মেজর জিয়া যদি বিদ্রোহ না করতেন, তবে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণাগুলো কখনোই আসত না। ঢাকা শহরে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ভয়াবহতায় স্তব্ধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠীর কাছে একজন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার মুখে সুপরিকল্পিত প্রতিরোধের এই ঘোষণা ছিল এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্ফুলিঙ্গ। এটিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের ‘মুক্তি বাহিনী’র প্রাথমিক দলে পরিণত করতে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এটি না হলে, এক গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং হতাশা হয়তো পুরো প্রদেশকে পঙ্গু করে রাখত।
এই সম্প্রচারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল; কারণ তা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছিল যে একটি সংগঠিত প্রতিরোধ বিদ্যমান। ইঙ্গিত দিয়েছিল যে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা এই গণঅভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, সেগুলো পাকিস্তানি কমান্ড কাঠামো থেকে বাঙালিদের দলত্যাগকে উৎসাহিত করেছিল।
মেজর জিয়ার অংশগ্রহণ ছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর বিভ্রান্তি হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী হতো। গুজব ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারত। সাময়িকভাবে মানুষের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
সামাজিকভাবে একটি তাৎক্ষণিক সামরিক বিদ্রোহের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষ যেভাবে এই যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াটিকে মৌলিকভাবে বদলে দিত।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা—জিয়া ও ৮ম ইবিআর-এর বিদ্রোহের মাধ্যমে লজিস্টিকাল (যোগাযোগ ও রসদ) লাইন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। দ্রুত যুদ্ধাবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। জনগণের মধ্যে উচ্চ মনোবল ফিরে এসেছে। তাৎক্ষণিক সামরিক বিদ্রোহ না হলে বন্দর সুরক্ষিত থাকত, অস্ত্র খালাস করা হতো, শুরুতেই মারাত্মক স্থবিরতা ভর করত। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অসম (অ্যাসিম্যাট্রিক) সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটতে পারত।
বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের তাৎক্ষণিকভাবে দলবদ্ধ, প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও সৈন্য না থাকলে সীমান্ত ও গ্রামীণ সেক্টরগুলোর প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ত। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী অভিযানের মুখে কোনো সংগঠিত প্রথাগত প্রতিরোধ থাকত না। ফলে শুরুর মাসেই বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়তো আরও কয়েক গুণ বেশি ও বিপর্যয়কর হতে পারত।
যুদ্ধ অবশ্য থেমে থাকত না; সাড়ে সাত কোটি বাঙালির রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তুলেছিল। তবে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মূল অংশটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসে যদি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড়াতে না পারত, তবে এই প্রতিরোধের কোনো প্রথাগত কাঠামো থাকত না। এটি তখন সুসংগঠিত ও প্রথাগত সেক্টরে বিভক্ত কোনো সেনাবাহিনীর মতো না হয়ে, ফরাসি প্রতিরোধ বাহিনী বা ভিয়েত কং-এর মতো একটি অত্যন্ত খণ্ডিত, আন্ডারগ্রাউন্ড এবং দীর্ঘস্থায়ী শহুরে গেরিলা আন্দোলনে পরিণত হতো—যা হয়তো যুদ্ধটিকে নয় মাসের পরিবর্তে বছরের পর বছর টেনে নিয়ে যেত।
বলা যায়, মেজর জিয়ার চট্টগ্রাম বন্দরে না গিয়ে মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটি স্বাধীনতার চেতনা তৈরি করেনি, তবে এটি সেই স্ফুলিঙ্গ যেটি তাৎক্ষণিক সামরিক কাঠামো এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বর্ম জুগিয়েছিল, যা একটি স্তব্ধ জাতিকে প্রথম দিন থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে বিজয়ের আগ পর্যন্ত লড়াই করার স্পৃহা ও শক্তি দিয়েছিল।
.png)

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল চলছে, বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি। ম্যাচটি যত এগিয়ে এসেছে, আলোচনার কেন্দ্র সরে গেছে ফুটবল থেকে। মেসি, বেলিংহাম, হ্যারি কেইন কিংবা কৌশল নয়; ফিরে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ....
২৫ মিনিট আগে
সাপ সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে প্রতি বছর ১৬ জুলাই 'বিশ্ব সাপ দিবস' পালিত হয়। ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সাপ উদ্ধারে প্রশংসনীয় কাজ করছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই প্রকৃতিতে মানুষ ও সাপের নিরাপদ সহাবস্থান
১ ঘণ্টা আগে
ড. মো. মিজানুর রহমান আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক। তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-এর প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা ওয়াসাতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে।
১ ঘণ্টা আগে
বিপ্লবের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যার আগে এবং পরে দেশকে আর একই রকম দেখা যায় না। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের জন্য তেমনই একটি দিন। সেদিন রংপুরে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তবে প্রকৃত অর্থে সেদিন একজন মানুষের মৃত্যু হয়নি। সেদিন মৃত্যুবরণ করেছিল ভয়।
৬ ঘণ্টা আগে