সংস্কৃতি

স্মার্টফোনের যুগে বদলে যাওয়া কোরবানি ঈদ

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১৬: ৩৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

মাত্রই বিদায় নিয়েছে কোরবানি ঈদ। তবে উৎসবের আমেজ রয়ে গেছে এখনো। ফেসবুকে ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে ঈদকে ঘিরে নানা রঙে-ঢঙে পোস্ট করা ছবি, রিলস, ভিডিও। কেউ কোরবানি দেওয়ার আগে গরুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। কেউ কোরবানি দেওয়ার পরে মাংস কাটাকাটির ভিডিও পোস্ট করেছেন।

স্মার্টফোনের আগে ঈদ

স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার চল শুরুর আগে কোরবানির আনন্দ ছিল পাড়া-মহল্লায়। বড়দের সঙ্গে হাটে যাওয়া, বন্ধুরা মিলে এলাকায় গরু দেখতে বের হওয়া, সবাই মিলে সবার গরুকে খাওয়ানো, সারা রাত জেগে পাহারা দেওয়া—এসবই ছিল ঈদের আনন্দ। এলাকার বয়সীরা বাইরে চেয়ার নিয়ে বসতেন, বাড়ির ছোটদের দিয়ে তাদের জন্য পাঠানো হতো চা-নাস্তা বা খাবার। সেই উপলক্ষে বাসার ভেতরেও ঈদের আগেই ঈদের আমেজ বোঝা যেত।

ঈদের সকালে কসাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কখন কোরবানি হবে এবং কখন মাংস খাওয়া হবে—এইটাই ছিল মূল আগ্রহের জায়গা। পশু কেমন বা কী, তাঁর চেয়ে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য ও সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগিই ছিল মূল লক্ষ্য।

স্মার্টফোনের পরে ঈদ

স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর শুধু ঈদ নয়, সকল উদযাপনের ধরনই বদলে গেছে। আনন্দ উদযাপন করার চেয়ে ‘আনন্দ করছি’—এটা দেখানোই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কার পশু কেমন ও কত দামি এটাই দিনদিন মূখ্য হয়ে উঠছে। ঈদের আগের কয়েকদিনে টাইমলাইন ভরে ওঠে গরুর ভিডিও, ‘মাশাআল্লাহ’ কমেন্ট, দাম আন্দাজের খেলায়। কোরবানির ঈদ যেন আর শুধু হাট বা পশু কেনার ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; এর একটি বড় অংশ এখন বাস করে স্ক্রিনে।

এখন একজনের কোরবানি মুহূর্তেই ‘কনটেন্ট’ হিসেবে শত শত মানুষের দেখার বিষয় হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোরবানিকে শুধু দৃশ্যমান করেনি, তৈরি করেছে নতুন এক সামাজিক ভাষা।

পশু, মর্যাদা ও ডিজিটাল প্রদর্শন

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ বরাবরই সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত ছিল। কে কত বড় গরু কিনল, কার গরুর দাম কত—এসব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া সেই আলাপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যা সীমাবদ্ধ ছিল মহল্লার ভেতর, এখন তা পৌঁছে যাচ্ছে হাজার মানুষের নিউজফিডে। বড় গরু এখন শুধু কোরবানির পশু নয়, অনেক সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শনীর বস্তু।

ধর্মীয় আচার নাকি সামাজিক পারফরমেন্স

এ কারণেই কোরবানির পোস্ট ঘিরে প্রায়ই অস্বস্তির আলোচনাও তৈরি হয়। কেউ মনে করেন, এটি আনন্দ ভাগাভাগি। আবার কেউ মনে করেন, ধর্মীয় আচার ধীরে ধীরে ‘পারফরমেন্সে’ পরিণত হচ্ছে।

এই সমালোচনা শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতে গত বছর ইসলামিক সেন্টার অফ ইন্ডিয়া মুসলমানদের কোরবানির ভিডিও বা রক্তাক্ত দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট না করার আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, কোরবানি একটি পবিত্র ধর্মীয় অনুশীলন, এটি প্রদর্শনের বিষয় হওয়া উচিত নয়।

স্ক্রিনের ভেতর অংশগ্রহণের উৎসব

তবে বিষয়টি একমাত্রিকও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোরবানির উৎসবকে অনেকের কাছে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে। বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও এখন লাইভ ভিডিওতে কোরবানিতে যুক্ত হতে পারেন। অনেক শিশুর কাছে কোরবানির প্রথম স্মৃতিও তৈরি হয় ফোনের ক্যামেরায়।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে কোরবানির অভিজ্ঞতা এখন শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম উৎসবগুলো সামাজিকমাধ্যমে নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতি প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠছে।

কোরবানির ডিজিটাল স্মৃতি ও বদলে যাওয়া সংস্কৃতি

আরেকটি দিক হলো, স্মৃতির রাজনীতি। আগে ঈদের স্মৃতি থাকত পারিবারিক অ্যালবামে; এখন তা থেকে যায় ফেসবুকের মেমোরিতে। কয়েক বছর আগের কোরবানির গরুর ছবি আবার ফিরে আসে টাইমলাইনে। ফলে কোরবানি এখন শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, ডিজিটাল স্মৃতিরও অংশ।

সোশ্যাল মিডিয়া কোরবানির ভাষাও বদলে দিয়েছে। আগে কোরবানির আলোচনা ছিল ধর্মীয় কর্তব্য, মাংস বণ্টন বা আত্মত্যাগের গল্প ঘিরে। এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে কোন ছবিতে গরু ভালো দেখাচ্ছে, কোন ভিডিও বেশি সিনেম্যাটিক, কোন ক্যাপশন বেশি এনগেজিং। এমনকি গরুর নামকরণ, ফটোশুট বা ‘মাশাআল্লাহ কমেন্ট করবেন’ ধরনের পোস্টও এক ধরনের অনলাইন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন এইসব না করলে আর ইদ কিসের!

সম্প্রতি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের একটি সাদা মহিষ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। নারায়ণগঞ্জের সেই মহিষকে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেছিল, ছবি তুলেছিল, ভিডিও বানিয়েছিল। ঘটনাটি দেখায়, কোরবানির পশু এখন কেবল ধর্মীয় প্রতীক নয়, ভাইরাল সংস্কৃতিরও অংশ।

আত্মত্যাগ থেকে অ্যালগরিদম

তবু কোরবানির ভেতরের মূল ধারণা—ত্যাগ, বণ্টন, সহমর্মিতা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সামাজিকমাধ্যম সেই ধারণাগুলোকেও নতুনভাবে তুলে ধরছে। অনেকেই দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণের ছবি দেন, অনলাইনে কোরবানি ক্যাম্পেইন চালান, বা কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে পোস্ট লেখেন। ইন্দোনেশিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বিলিভ’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল ধর্মীয় প্রকাশ অনেক সময় মানুষকে সামাজিক সংহতি ও অংশগ্রহণের নতুন সুযোগও দেয়।

সমস্যা সম্ভবত সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বরং আমরা কীভাবে সেটি ব্যবহার করছি সেখানে। কারণ কোরবানির ঈদ সবসময়ই ছিল সামাজিক উৎসব। আগে সবার সঙ্গে গল্প হতো সামনাসামনি, এখন হয় কমেন্ট সেকশনে। পরিবর্তনটা মূলত মাধ্যমের।

কিন্তু এই পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়—আজকের কোরবানির ঈদে ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা, স্মৃতি ও অ্যালগরিদম—সবকিছুই কি একসঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে?

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত