মতামত
ড. মো. আবু সালেহ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষতকে পাশে সরিয়ে রেখে স্বাধীন ভারতের স্থপতিরা যে আধুনিক সাধারণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তার অন্যতম কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’।
এটি কেবল একটি বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দ বা আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং ভারতের মতো এক অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যময়, বহু-ধর্মীয় এবং বহু-সাংস্কৃতিক সমাজকে একক রাষ্ট্রে সুসংহত রাখার একমাত্র কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক চুক্তি। বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল গুরুত্ব হলো এটি রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠীর আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষা থেকে সংখ্যালঘুদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়।
তবে সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে এই আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় এবং তার ঠিক পরপরই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর যে পরিকল্পিত সহিংসতা, উচ্ছেদ এবং অধিকার হরণের ঘটনা ঘটেছে, তা ভারতের সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভিত্তিমূলেই আঘাত করেছে। বিজয়ী উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির এই আধিপত্যবাদী আচরণ এবং তার বিপরীতে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ নীতিগত সমর্থন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ-রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের দীর্ঘজীবী শক্তির উৎস ছিল এর পরমতসহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদ। প্রাচীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দর্শনে কোনো একক ধর্মীয় আধিপত্যের ধারণা আধুনিক উপনিবেশবাদের মতো চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের দ্বাদশ শিলালিপিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন “অন্যের ধর্মের নিন্দা করার অর্থ হলো নিজের ধর্মেরই ক্ষতি করা”। অশোকের এই ‘ধম্ম’ দর্শন ছিল মূলত বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও নৈতিক সহাবস্থানের এক প্রাচীন রাষ্ট্রীয় ইশতেহার।
মধ্যযুগে এসে এই বহুত্ববাদী ধারাটি আরও সুসংহত রাজনৈতিক রূপ লাভ করে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। আকবর প্রবর্তন করেছিলেন ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সর্বজনীন শান্তি’র এক রাজনৈতিক দর্শন। তার প্রবর্তিত তাত্ত্বিক কাঠামো ‘দীন-ই-ইলাহি’ মূলত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সমন্বয়বাদী কৌশল ছিল। এই দর্শনের মূল কথাই ছিল রাষ্ট্র কোনো একক ধর্মের তোষণ বা নিগ্রহ করবে না, বরং সমস্ত বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে একটি নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে। একই সময়ে উপদ্বীপে সুফি সিলসিলা এবং সনাতন ধর্মের ভক্তি আন্দোলনের যুগপৎ বিকাশ ঘটে। সুফি সাধকদের ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ব) এবং ভক্তি আন্দোলনের সন্তদের প্রেমবাদ জনমানুষের স্তরে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরি করে।
বিশেষ করে বাংলার ক্ষেত্রে এই ‘সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি’ এক অনন্য রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলার মাটি ও মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস হিন্দু-মুসলিম যৌথ জীবনবোধ এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লালন শাহের মরমী গান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুত্ববাদী বিশ্বজনীনতা এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ও সমন্বয়বাদী সাহিত্য এই সংস্কৃতির প্রধান স্তম্ভ। এই ভূখণ্ডে ধর্ম কখনো মানুষের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারেনি। ফলে, ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের এবং বিশেষত বাংলার শক্তি এর কোনো একক ধর্মীয় একাত্মতায় বা সমরূপতায় নিহিত ছিল না; বরং তা নিহিত ছিল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এক সুগভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যের মধ্যে। বর্তমানের উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণ মূলত এই দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঐতিহ্যকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি পাশ্চাত্যের মডেল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে ফরাসি মডেলের ধর্মনিরপেক্ষতা গড়ে উঠেছে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এক কঠোর অনতিক্রম্য প্রাচীর এর ধারণার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে রাষ্ট্র জীবন থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করে। পক্ষান্তরে, ভারতের বহু-ধর্মীয় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি তৈরি করা হয়েছে, তার মূল কথা হলো ‘সর্ব ধর্ম সমভাব’ অর্থাৎ সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের সমান শ্রদ্ধা ও আচরণ।
ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘নীতিগত দূরত্ব’। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাষ্ট্র ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা বিমুখ থাকবে না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক অধিকার এবং সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র প্রতিটি ধর্ম থেকে একটি নির্দিষ্ট ও সমান দূরত্ব বজায় রাখবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করতে সংস্কারমূলক হস্তক্ষেপ করতে পারবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বা অন্য কোনো ধর্মের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।
এই তাত্ত্বিক রূপটি ভারতের সংবিধানে অত্যন্ত সুচারুভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যদিও মূল সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি প্রস্তাবনায় সরাসরি ছিল না, কিন্তু ১৯৭৬ সালের ৪২তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রকে চিরতরে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে এই ধর্মনিরপেক্ষতার আইনি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে: অনুচ্ছেদ ১৪: আইনের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমতা নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ১৫: ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। অনুচ্ছেদ ২৫ থেকে ২৮: ভারতের প্রতিটি নাগরিককে অত্যন্ত জোরালোভাবে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার’ প্রদান করেছে।
বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ২৫(১) অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির বিবেক ও স্বাধীনতাসম্মতভাবে নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, চর্চা ও প্রচার করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। ফলে, সাংবিধানিক উপরি-কাঠামো অনুযায়ী ভারত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ এই আইনি ফ্রেমওয়ার্ক মানতে বাধ্য।
একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল সংবিধানে লিখিত কিছু শব্দমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর সফল কার্যকারিতা নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা এবং নিরপেক্ষতার ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এর ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ তথা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য। একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আদর্শ রূপটি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো দল ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ব্যবহার করলে নির্বাচন কমিশন কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবে।
একইভাবে, যখনই কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে, তখন স্বাধীন বিচার বিভাগ সংবিধানের চূড়ান্ত অভিভাবক হিসেবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক ‘এস. আর. বোমাই বনাম ভারত ইউনিয়ন’ মামলায় অত্যন্ত স্পষ্ট রায় দিয়ে বলেছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ভারতীয় সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কোনো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেও পরিবর্তন বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই আদর্শ রূপ অনুযায়ী, বেসামরিক প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার রঙ না দেখে যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করবে। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইনের শাসন কার্যকর করে, তখনই একটি বহু-ধর্মীয় সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু তত্ত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শের এই সুউচ্চ দেওয়াল ভেঙে পড়ে যখন বাস্তব রাজনীতির ময়দানে উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ জেঁকে বসে। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যে অভাবনীয় ও নজিরবিহীন নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লক্ষ্য করা গেছে, তা ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর এক চরম আঘাত। নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়ের পরপরই রাজ্যের দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় উগ্র গেরুয়া বাহিনীর সমর্থক ও সক্রিয় কর্মীদের দ্বারা সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এক পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত তাণ্ডব শুরু হয়।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সহিংসতার ধরনটি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল স্পষ্টতই এক ধরনের সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিক দমনপীড়ন। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ ও উপ-শহুরে এলাকায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ঘরবাড়ি, অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি যেমন দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে পরিকল্পিত উপায়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বহু এলাকায় অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার উপায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাতের অন্ধকারে উগ্র স্লোগান দিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে তাণ্ডব চালানো এবং নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে এক চরম ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
এই বিজয়ী উন্মাদনা সাধারণ রাজনৈতিক জয়োৎসবের সীমা লঙ্ঘন করে সরাসরি একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘুদের এই বার্তা দেওয়া যে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তির মর্জির ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা কেবল পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক শান্তিকেই বিঘ্নিত করেনি, বরং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত রাজ্য সরকারের নীতি এবং উগ্র ডানপন্থী গেরুয়া বাহিনীর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম প্রধান শর্ত-রাষ্ট্রের ‘নীতিগত দূরত্ব’ মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে, তখন তাকে ‘ইনস্টিটিউশনাল বায়াস’ বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব বলা হয়। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আইনি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের এক ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে, যা সরাসরি সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের শামিল। এই সরকারি হস্তক্ষেপের দুটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দাবি রাখে:
ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবেই পশু কেনাবেচা এবং পরিবহনের একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় চক্র সচল থাকে। তবে বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে উগ্র গেরুয়া বাহিনীর সদস্যরা মহাসড়ক ও স্থানীয় হাটগুলোতে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে কোরবানির গরু কেনাবেচা ও পরিবহনে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করছে। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও মুসলিম খামারি ও ব্যবসায়ীদের মারধর, গবাদি পশু ছিনতাই এবং তাদের ওপর 'গো-তস্কর' বা গরু চোরের তকমা লেপে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন এখানে আইন প্রয়োগ না করে উল্টো উগ্র বাহিনীদের এই বেআইনি তৎপরতাকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে, যা মূলত সংখ্যালঘুদের একটি মৌলিক ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ করার কৌশল।
এর চেয়েও বড় আইনি ধাক্কাটি এসেছে সরকারের সাম্প্রতিক একটি নীতিমালার মাধ্যমে, যেখানে বলা হয়েছে-যেকোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বা কোরবানির জন্য পশু জবাই করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আগাম অনুমোদন নিতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে পশুপাখি কল্যাণ বা পরিবেশ সুরক্ষার মোড়কে পেশ করা হলেও, একাডেমিক দৃষ্টিতে এটি স্পষ্টতই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপ।
এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫-এর ওপর এক ধারালো আঘাত। অনুচ্ছেদ ২৫ নাগরিককে কেবল মনে মনে ধর্ম বিশ্বাস করার অধিকার দেয় না, বরং তার বাহ্যিক আচার ও ধর্মীয় রীতি স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকারও গ্যারান্টি করে। শত শত বছর ধরে চলে আসা একটি ধর্মীয় রীতি পালনের জন্য যখন আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটি আর অক্ষুণ্ন থাকে না। এটি স্পষ্টতই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বারবার বলা হয়েছে যে, কোনো ধর্মীয় রীতির অপরিহার্য অংশ কী হবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার রাষ্ট্রের বা প্রশাসনের নেই। ফলে, শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের এই আইনি মোড়কের নীতি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী এজেন্ডারই এক সুচতুর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।
পশ্চিমবঙ্গের এই বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর এক গভীর কাঠামোগত সংকটকে নির্দেশ করে। যখন কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতাসীন দল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উগ্র এজেন্ডাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে এবং তাকে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় দেয়, তখন তার প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় রাষ্ট্রের ‘আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা’। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধের সময় লক্ষ্য করা গেছে যে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বহু ক্ষেত্রে উগ্র গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডবের সময় পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কিংবা ভুক্তভোগী সংখ্যালঘুদেরই পাল্টা আইনি হয়রানির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় আইনের শাসনকে ধ্বংস করে দেয় এবং সংখ্যালঘুদের মনে রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি এক স্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক এই নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ মদদের ইতিহাস ভারতের রাজনীতিতে নতুন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী নকশার অংশ। ২০০২ সালে গুজরাটে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর যে বর্বরতম তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, যেখানে শত শত মানুষকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় (যেমনঃ গুলবার্গ সোসাইটি হত্যাকাণ্ড বা নরোদা পাটিয়া গণহত্যা), তা ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী উন্মাদনার এক চরমতম ও নৃশংস উদাহরণ। গুজরাটের সেই উদাহরণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের কাছে তার নিরপেক্ষতা বন্ধক রাখে, তখন তা কীভাবে এক বিভীষিকাময় মানবতাবিরোধী অপরাধে রূপ নিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় মুসলমানদের ওপর হামলা এবং প্রশাসনের উদাসীনতা মূলত গুজরাটের সেই পুরোনো আধিপত্যবাদী মডেলেরই এক নতুন আঞ্চলিক সংস্করণ মাত্র।
এই প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত ভারতকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি ভারতকে তার মূল সাংবিধানিক আদর্শ-‘ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী গণতন্ত্র’ -থেকে বিচ্যুত করে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ হলো এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে সংখ্যার জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পছন্দ-অপছন্দকে সমগ্র রাষ্ট্রের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারকে সংকুচিত করা হয়। এই রূপান্তর যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করে, তবে ভারতের মতো একটি বহু-সাংস্কৃতিক দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অস্তিত্বকেই এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নীতি ও হস্তক্ষেপ কেবল একটি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবনতির বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে ভারতের সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর গভীরে বাসা বাঁধা এক তীব্র ক্ষতের অবয়ব। প্রাচীন ভারতের বহুত্ববাদী ইতিহাস, সুফি-ভক্তি আন্দোলনের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি এবং ভারতীয় সংবিধানের সুনির্দিষ্ট আইনি গ্যারান্টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমানের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি ভারতকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট নীতি এবং কোরবানির মতো মৌলিক ধর্মীয় আচারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে আজ এক চূড়ান্ত ও কঠিন কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই অন্ধকার সময় থেকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং বহুত্ববাদী গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে বহুমাত্রিক প্রতিরোধের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও উচ্চতর বিচার বিভাগকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন ঘটলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একই সাথে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ভারতের শক্তি চিরকালই ছিল এর বৈচিত্র্যের মাঝে, কোনো চাপিয়ে দেওয়া সমরূপতায় নয়। সেই আদি ও অকৃত্রিম বহুত্ববাদী সাংবিধানিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমেই কেবল ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোকে এই অভূতপূর্ব হুমকি থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষতকে পাশে সরিয়ে রেখে স্বাধীন ভারতের স্থপতিরা যে আধুনিক সাধারণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তার অন্যতম কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’।
এটি কেবল একটি বিমূর্ত রাজনৈতিক শব্দ বা আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং ভারতের মতো এক অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যময়, বহু-ধর্মীয় এবং বহু-সাংস্কৃতিক সমাজকে একক রাষ্ট্রে সুসংহত রাখার একমাত্র কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক চুক্তি। বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল গুরুত্ব হলো এটি রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় গোষ্ঠীর আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষা থেকে সংখ্যালঘুদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়।
তবে সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে এই আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় এবং তার ঠিক পরপরই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর যে পরিকল্পিত সহিংসতা, উচ্ছেদ এবং অধিকার হরণের ঘটনা ঘটেছে, তা ভারতের সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভিত্তিমূলেই আঘাত করেছে। বিজয়ী উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির এই আধিপত্যবাদী আচরণ এবং তার বিপরীতে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ নীতিগত সমর্থন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ-রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের দীর্ঘজীবী শক্তির উৎস ছিল এর পরমতসহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদ। প্রাচীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দর্শনে কোনো একক ধর্মীয় আধিপত্যের ধারণা আধুনিক উপনিবেশবাদের মতো চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের দ্বাদশ শিলালিপিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন “অন্যের ধর্মের নিন্দা করার অর্থ হলো নিজের ধর্মেরই ক্ষতি করা”। অশোকের এই ‘ধম্ম’ দর্শন ছিল মূলত বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও নৈতিক সহাবস্থানের এক প্রাচীন রাষ্ট্রীয় ইশতেহার।
মধ্যযুগে এসে এই বহুত্ববাদী ধারাটি আরও সুসংহত রাজনৈতিক রূপ লাভ করে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। আকবর প্রবর্তন করেছিলেন ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সর্বজনীন শান্তি’র এক রাজনৈতিক দর্শন। তার প্রবর্তিত তাত্ত্বিক কাঠামো ‘দীন-ই-ইলাহি’ মূলত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সমন্বয়বাদী কৌশল ছিল। এই দর্শনের মূল কথাই ছিল রাষ্ট্র কোনো একক ধর্মের তোষণ বা নিগ্রহ করবে না, বরং সমস্ত বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে একটি নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে। একই সময়ে উপদ্বীপে সুফি সিলসিলা এবং সনাতন ধর্মের ভক্তি আন্দোলনের যুগপৎ বিকাশ ঘটে। সুফি সাধকদের ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ব) এবং ভক্তি আন্দোলনের সন্তদের প্রেমবাদ জনমানুষের স্তরে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তৈরি করে।
বিশেষ করে বাংলার ক্ষেত্রে এই ‘সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি’ এক অনন্য রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলার মাটি ও মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস হিন্দু-মুসলিম যৌথ জীবনবোধ এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লালন শাহের মরমী গান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুত্ববাদী বিশ্বজনীনতা এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ও সমন্বয়বাদী সাহিত্য এই সংস্কৃতির প্রধান স্তম্ভ। এই ভূখণ্ডে ধর্ম কখনো মানুষের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারেনি। ফলে, ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের এবং বিশেষত বাংলার শক্তি এর কোনো একক ধর্মীয় একাত্মতায় বা সমরূপতায় নিহিত ছিল না; বরং তা নিহিত ছিল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এক সুগভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যের মধ্যে। বর্তমানের উগ্র রাজনৈতিক মেরুকরণ মূলত এই দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঐতিহ্যকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি পাশ্চাত্যের মডেল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে ফরাসি মডেলের ধর্মনিরপেক্ষতা গড়ে উঠেছে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এক কঠোর অনতিক্রম্য প্রাচীর এর ধারণার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে রাষ্ট্র জীবন থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করে। পক্ষান্তরে, ভারতের বহু-ধর্মীয় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলটি তৈরি করা হয়েছে, তার মূল কথা হলো ‘সর্ব ধর্ম সমভাব’ অর্থাৎ সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের সমান শ্রদ্ধা ও আচরণ।
ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘নীতিগত দূরত্ব’। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাষ্ট্র ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা বিমুখ থাকবে না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক অধিকার এবং সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র প্রতিটি ধর্ম থেকে একটি নির্দিষ্ট ও সমান দূরত্ব বজায় রাখবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করতে সংস্কারমূলক হস্তক্ষেপ করতে পারবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বা অন্য কোনো ধর্মের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।
এই তাত্ত্বিক রূপটি ভারতের সংবিধানে অত্যন্ত সুচারুভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যদিও মূল সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি প্রস্তাবনায় সরাসরি ছিল না, কিন্তু ১৯৭৬ সালের ৪২তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রকে চিরতরে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে এই ধর্মনিরপেক্ষতার আইনি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে: অনুচ্ছেদ ১৪: আইনের চোখে প্রতিটি নাগরিকের সমতা নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ১৫: ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। অনুচ্ছেদ ২৫ থেকে ২৮: ভারতের প্রতিটি নাগরিককে অত্যন্ত জোরালোভাবে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার’ প্রদান করেছে।
বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ২৫(১) অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির বিবেক ও স্বাধীনতাসম্মতভাবে নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, চর্চা ও প্রচার করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। ফলে, সাংবিধানিক উপরি-কাঠামো অনুযায়ী ভারত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ এই আইনি ফ্রেমওয়ার্ক মানতে বাধ্য।
একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল সংবিধানে লিখিত কিছু শব্দমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর সফল কার্যকারিতা নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা এবং নিরপেক্ষতার ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এর ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ তথা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য। একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আদর্শ রূপটি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো দল ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ব্যবহার করলে নির্বাচন কমিশন কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবে।
একইভাবে, যখনই কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে, তখন স্বাধীন বিচার বিভাগ সংবিধানের চূড়ান্ত অভিভাবক হিসেবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক ‘এস. আর. বোমাই বনাম ভারত ইউনিয়ন’ মামলায় অত্যন্ত স্পষ্ট রায় দিয়ে বলেছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ভারতীয় সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কোনো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেও পরিবর্তন বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই আদর্শ রূপ অনুযায়ী, বেসামরিক প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার রঙ না দেখে যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করবে। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইনের শাসন কার্যকর করে, তখনই একটি বহু-ধর্মীয় সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু তত্ত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শের এই সুউচ্চ দেওয়াল ভেঙে পড়ে যখন বাস্তব রাজনীতির ময়দানে উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ জেঁকে বসে। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যে অভাবনীয় ও নজিরবিহীন নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লক্ষ্য করা গেছে, তা ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর এক চরম আঘাত। নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়ের পরপরই রাজ্যের দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় উগ্র গেরুয়া বাহিনীর সমর্থক ও সক্রিয় কর্মীদের দ্বারা সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এক পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত তাণ্ডব শুরু হয়।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সহিংসতার ধরনটি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল স্পষ্টতই এক ধরনের সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিক দমনপীড়ন। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ ও উপ-শহুরে এলাকায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ঘরবাড়ি, অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি যেমন দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে পরিকল্পিত উপায়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বহু এলাকায় অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার উপায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাতের অন্ধকারে উগ্র স্লোগান দিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে তাণ্ডব চালানো এবং নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে এক চরম ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
এই বিজয়ী উন্মাদনা সাধারণ রাজনৈতিক জয়োৎসবের সীমা লঙ্ঘন করে সরাসরি একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘুদের এই বার্তা দেওয়া যে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তির মর্জির ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা কেবল পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক শান্তিকেই বিঘ্নিত করেনি, বরং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত রাজ্য সরকারের নীতি এবং উগ্র ডানপন্থী গেরুয়া বাহিনীর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম প্রধান শর্ত-রাষ্ট্রের ‘নীতিগত দূরত্ব’ মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে, তখন তাকে ‘ইনস্টিটিউশনাল বায়াস’ বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব বলা হয়। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আইনি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের এক ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে, যা সরাসরি সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের শামিল। এই সরকারি হস্তক্ষেপের দুটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দাবি রাখে:
ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবেই পশু কেনাবেচা এবং পরিবহনের একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় চক্র সচল থাকে। তবে বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে উগ্র গেরুয়া বাহিনীর সদস্যরা মহাসড়ক ও স্থানীয় হাটগুলোতে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে কোরবানির গরু কেনাবেচা ও পরিবহনে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করছে। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও মুসলিম খামারি ও ব্যবসায়ীদের মারধর, গবাদি পশু ছিনতাই এবং তাদের ওপর 'গো-তস্কর' বা গরু চোরের তকমা লেপে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন এখানে আইন প্রয়োগ না করে উল্টো উগ্র বাহিনীদের এই বেআইনি তৎপরতাকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে, যা মূলত সংখ্যালঘুদের একটি মৌলিক ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ করার কৌশল।
এর চেয়েও বড় আইনি ধাক্কাটি এসেছে সরকারের সাম্প্রতিক একটি নীতিমালার মাধ্যমে, যেখানে বলা হয়েছে-যেকোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বা কোরবানির জন্য পশু জবাই করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আগাম অনুমোদন নিতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে পশুপাখি কল্যাণ বা পরিবেশ সুরক্ষার মোড়কে পেশ করা হলেও, একাডেমিক দৃষ্টিতে এটি স্পষ্টতই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপ।
এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫-এর ওপর এক ধারালো আঘাত। অনুচ্ছেদ ২৫ নাগরিককে কেবল মনে মনে ধর্ম বিশ্বাস করার অধিকার দেয় না, বরং তার বাহ্যিক আচার ও ধর্মীয় রীতি স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকারও গ্যারান্টি করে। শত শত বছর ধরে চলে আসা একটি ধর্মীয় রীতি পালনের জন্য যখন আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটি আর অক্ষুণ্ন থাকে না। এটি স্পষ্টতই প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বারবার বলা হয়েছে যে, কোনো ধর্মীয় রীতির অপরিহার্য অংশ কী হবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার রাষ্ট্রের বা প্রশাসনের নেই। ফলে, শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের এই আইনি মোড়কের নীতি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী এজেন্ডারই এক সুচতুর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।
পশ্চিমবঙ্গের এই বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর এক গভীর কাঠামোগত সংকটকে নির্দেশ করে। যখন কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতাসীন দল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উগ্র এজেন্ডাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে এবং তাকে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় দেয়, তখন তার প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় রাষ্ট্রের ‘আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা’। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধের সময় লক্ষ্য করা গেছে যে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বহু ক্ষেত্রে উগ্র গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডবের সময় পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কিংবা ভুক্তভোগী সংখ্যালঘুদেরই পাল্টা আইনি হয়রানির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় আইনের শাসনকে ধ্বংস করে দেয় এবং সংখ্যালঘুদের মনে রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি এক স্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক এই নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ মদদের ইতিহাস ভারতের রাজনীতিতে নতুন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী নকশার অংশ। ২০০২ সালে গুজরাটে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর যে বর্বরতম তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, যেখানে শত শত মানুষকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় (যেমনঃ গুলবার্গ সোসাইটি হত্যাকাণ্ড বা নরোদা পাটিয়া গণহত্যা), তা ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী উন্মাদনার এক চরমতম ও নৃশংস উদাহরণ। গুজরাটের সেই উদাহরণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের কাছে তার নিরপেক্ষতা বন্ধক রাখে, তখন তা কীভাবে এক বিভীষিকাময় মানবতাবিরোধী অপরাধে রূপ নিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় মুসলমানদের ওপর হামলা এবং প্রশাসনের উদাসীনতা মূলত গুজরাটের সেই পুরোনো আধিপত্যবাদী মডেলেরই এক নতুন আঞ্চলিক সংস্করণ মাত্র।
এই প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত ভারতকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি ভারতকে তার মূল সাংবিধানিক আদর্শ-‘ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী গণতন্ত্র’ -থেকে বিচ্যুত করে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ হলো এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে সংখ্যার জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পছন্দ-অপছন্দকে সমগ্র রাষ্ট্রের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারকে সংকুচিত করা হয়। এই রূপান্তর যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করে, তবে ভারতের মতো একটি বহু-সাংস্কৃতিক দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অস্তিত্বকেই এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নীতি ও হস্তক্ষেপ কেবল একটি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবনতির বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে ভারতের সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর গভীরে বাসা বাঁধা এক তীব্র ক্ষতের অবয়ব। প্রাচীন ভারতের বহুত্ববাদী ইতিহাস, সুফি-ভক্তি আন্দোলনের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি এবং ভারতীয় সংবিধানের সুনির্দিষ্ট আইনি গ্যারান্টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমানের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি ভারতকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট নীতি এবং কোরবানির মতো মৌলিক ধর্মীয় আচারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে আজ এক চূড়ান্ত ও কঠিন কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই অন্ধকার সময় থেকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং বহুত্ববাদী গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে বহুমাত্রিক প্রতিরোধের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও উচ্চতর বিচার বিভাগকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন ঘটলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একই সাথে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ভারতের শক্তি চিরকালই ছিল এর বৈচিত্র্যের মাঝে, কোনো চাপিয়ে দেওয়া সমরূপতায় নয়। সেই আদি ও অকৃত্রিম বহুত্ববাদী সাংবিধানিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমেই কেবল ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোকে এই অভূতপূর্ব হুমকি থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির মুখ দেখেছিল। পরবর্তীতে এপ্রিলের শেষভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণা দিলেও, মাঠপর্যায়ের বর্তমান বাস্তবতা এক ভিন
৮ ঘণ্টা আগে
ড. জাইদি সাত্তার, বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আগামী জাতীয় বাজেট, রাজস্ব সংস্কারসহ নানা বিষয় নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
১২ ঘণ্টা আগে
বৈশ্বিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জ্বালানি প্রবাহের এক সম্মিলন বিন্দুতে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। এই জলরাশি কেবল বাংলাদেশের নয়; বরং গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানির সিংহভাগই এই উপসাগর নির্ভর, যা একইসঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক সহজ ও বিকল্প মাধ্যম।
১ দিন আগে
দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকারের তিন মাস পেরিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত ‘মধুচন্দ্রিমা সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যে সময়ে জনগণ নতুন নেতৃত্বকে বাড়তি আস্থা, রাজনৈতিক সুযোগ এবং প্রত্যাশার সুবিধা দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এক অস্থির সন্ধিক্ষণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচ
২ দিন আগে