জাভেদ হুসেনের লেখা

উর্দু কবি বশির বদ্রের প্রয়াণে কিছু পঙক্তি

স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারতের সংসদীয় রাজনীতির চত্বরে বাগযুদ্ধ নতুন কিছু নয়। তাতে উর্দু কবিদের কবিতাও সেই জওহারলাল নেহরুর আমল থেকেই হয়ে আসছে। ২০১৮ সালে লোকসভায় কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদী সরকারকে লক্ষ্য করে বশির বদ্রের শের আওড়ান—

দুশমনি জমকর করো লেকিন ইয়ে গুঞ্জাইশ রহে,

জব কভি হম দোস্ত হো যায়েঁ তো শর্মিন্দা না হোঁ...

মানে, জমিয়ে দুশমনি করো তবে যেন মনে থাকে, বন্ধু হয়ে গেলে পরে যেন লজ্জায় না পড়ো।

ঠিক তার পরের দিনই সেই কথার পিঠে পিঠ রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একই কবির পঙ্‌ক্তি ধার করে জবাব দেন—

জী বহুত চাহতা হ্যায় সচ বোলেঁ

ক্যা করেঁ হওসলা নেহিঁ হোতা।

মন তো খুব চায় যে সত্য বলি, কিন্তু সাহস যে হয় না। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও ২০১৬ সালে নোটবন্দীর বিরোধিতায় এই কবিরই একটি শের ব্যবহার করেছিলেন।

ক্ষমতার অলিন্দে থাকা চরম দুই পক্ষকে একই সুতোয় বাঁধার জাদুকরী ক্ষমতা যিনি ধারণ করতেন, উর্দু সাহিত্যের সেই প্রবাদপ্রতিম কবি ড. বশির বদ্র মারা গেছেন ২৭ মে, ২০২৬।

ভোপালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন পদ্মশ্রী ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কবি। ১৯৩৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় জন্ম নেওয়া বশির বদ্র আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এ, এম এ এবং পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর মিরাট কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে দীর্ঘ ১৭ বছর সেখানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় দারুণ দখল থাকা এই মানুষটি মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই শের লেখা শুরু করেছিলেন বলে জানা যায়।

বশির বদ্র উর্দুর চিরায়ত আভিজাত্য ও কোমলতাকে আধুনিক কথ্য ভাষার মোড়কে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর গজলে সমসাময়িক উর্দুর এমন এক রূপ ধরা দিত, যা বুঝতে সাধারণ পাঠকের কোনো বাড়তি আয়াসের প্রয়োজন হতো না। তাঁর লেখায় প্রেম যেমন এসেছে এক গভীর আর্তি নিয়ে, তেমনি জীবনের নিগূঢ় রহস্যগুলোও উন্মোচিত হয়েছে অতি সহজ শব্দে। ১৮ হাজারের বেশি দ্বিপদী উপহার দেওয়া বশির বদ্র ছিলেন সমকালীন কবিদের মধ্যে জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা সবচেয়ে বেশি গাওয়া এবং আবৃত্তি করা হয়েছে।

১৯৮৭ সালের এপ্রিলে মিরাটের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তাঁর সাজানো বাড়িটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই সাথে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁর বহু অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম। শূন্য থেকে নতুন করে জীবন শুরু করতে তিনি চলে আসেন ভোপালে। এই আঘাত, ভাঙন আর কষ্টই পরবর্তীতে তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ও গভীর বিষাদের উৎস হয়ে ওঠে।

আপনি য়াদোঁ কে হামারে সাথ রেহনে দো

না জানে কিস গলি মেঁ যিন্দেগি কি শাম হো যায়ে

তোমার স্মৃতির আলোটুকু আমার সাথেই থাকতে দাও

কে জানে জীবনের সন্ধ্যা কোন গলিতে নেমে আসে

০০০০০

না জি ভর কে দেখা না কুছ বাত কি

বড়ি আরজু থি মুলাকাত কি

না মন ভরে একটু দেখলাম, না কোনো কথা হলো

কতই না সাধ ছিল এই দেখা পাওয়ার

০০০০

হাম ভি দরিয়া হ্যায়ঁ হামেঁ আপনা হুনর মালুম হ্যায়

জিস তরফ ভি চল পড়েঙ্গে রাস্তা হো যায়েগা

আমিও এক নদী, নিজের ক্ষমতা আমার জানা আছে

যেদিকেই চলা শুরু করব, সেদিকেই পথ হয়ে যাবে

০০০০

জিন্দেগি তূ নে মুঝে কবর সে কম দি হ্যায় যমিঁ

পাওঁ ফ্যায়লাঁউ তো দিওয়ার মেঁ সর লাগতা হ্যায়

হে জীবন, তুমি আমাকে কবরের চেয়েও কম জায়গা দিলে

পা ছড়াতে গেলেই দেয়ালে মাথা ঠুকে যায়

০০০০

বড়ে লোগোঁ সে মিলনে মেঁ হামেশা ফাসলা রাখনা

যাহা দরিয়া সমুন্দর সে মিলা দরিয়া নেহিঁ রেহতা

বড় মানুষদের সঙ্গে মেশার সময় সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রেখো

নদী যখন সমুদ্রের সাথে মেশে, তখন নদী আর নদী থাকে না

০০০০

হর ধড়কতে পাত্থর কো লোগ দিল সমঝতে হ্যায়ঁ

উমরেঁ বিত জাতি হ্যায়ঁ দিল কো দিল বানানে মেঁ

প্রতিটি স্পন্দিত পাথরকেই মানুষ হৃদয় ভেবে বসে

একটা হৃদয়কে সত্যিই 'হৃদয়' করে তুলতে জীবন পার হয়ে যায়

০০০০

তুমেঁ যরুর কোই চাহতোঁ সে দেখেগা

মগর ও আঁখেঁ হামারি কাহাঁ সে লায়েগা

কেউ না কেউ নিশ্চয়ই তোমাকে ভালোবাসা নিয়ে দেখবে

কিন্তু সে আমাদের এই চোখ দুটো পাবে কোথায়?

০০০০

য়ে ফুল মুঝে কোই বিরাসত মেঁ মিলে হ্যায়ঁ

তুম নে মেরা কাঁটোঁ ভরা বিস্তর নেহিঁ দেখা

এই ফুলগুলো আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি ভাবছ?

তুমি তো আমার কাঁটাভরা বিছানাটা দেখোইনি

০০০০

খুদা কি ইতনি বড়ি কায়েনাত মেঁ ম্যায়ঁ নে

বস এক শখস কো মাঁগা মুঝে ওহি না মিলা

খোদার এত বড় সৃষ্টিতে আমি কেবল

একজনকেই চেয়েছিলাম, পেলাম না তাকেই

০০০০

পাত্থর মুঝে কহতা হ্যায় মেরা চাহনে ওয়ালা

ম্যায়ঁ মোম হুঁ উস নে মুঝে ছূ কর নেহিঁ দেখা

আমার ভালোবাসার মানুষ আমাকে পাথর বলে

অথচ আমি যে মোম, কোনোদিন ছুঁয়েই দেখল না

০০০০

সর ঝুকাওগে তো পাত্থর দেওতা হো যাওয়েগা

ইতনা মত চাহো উসে বো বেওয়াফা হো যাওয়েগা

মাথা নোয়ালেই তো পাথর দেবতা হয়ে যাবে

তাকে এত বেশি ভালোবেসো না সে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাবে

০০০০

ম্যায়ঁ জব সো জাঁউ ইন আঁখোঁ পে অপনে হোঁঠ রাখ দেনা

য়কিঁ আ যাওয়েগা পলকোঁ তলে ভি দিল ধড়কতা হ্যায়

যখন ঘুমিয়ে পড়ব, এই চোখ দুটোর ওপর তোমার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিও

বিশ্বাস হবে যে চোখের পাতার নিচেও একটা হৃদয় স্পন্দিত হয়

০০০০

ইসি লিয়ে তো য়াহা আব ভি আজনবি হুঁ ম্যায়ঁ

তমাাম লোগ ফরিশতে হ্যায়ঁ আদমি হুঁ ম্যায়ঁ

এই কারণেই তো আমি এখানে আজও পরবাসী

চারপাশের সব ফেরেশতা, একা আমিই মানুষ

০০০০

লোগ টুট জাতে হ্যায়ঁ এক ঘর বানানে মেঁ

তুম তরস নেহিঁ খাতে বস্তিয়াঁ জানে মেঁ

একটা ঘর গড়তে গিয়ে মানুষ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়

তোমার একটুও দয়া হয় না একটা জনপদ পুড়িয়ে দিতে?

০০০০

উন্হিঁ রাস্তোঁ নে জিন পর কাভি তুম থে সাথ মেরে

মুঝে রোক রোক পুছা তেরা হম-সফর কাহাঁ হ্যায়

যে পথগুলোয় একসময় তুমি আমার পাশে পাশে চলতে

আজ তারা থামিয়ে থামিয়ে জিজ্ঞেস করছে—তোমার সঙ্গীটি কোথায়?

০০০০

আগর ফুসরত মিলে পানি কি তহরিরোঁ কো পঢ় লেনা

হর ইক দরিয়া হাযারোঁ সাল কা আফসানা লিখতা হ্যায়

কখনো সময় পেলে জলের বুকে লেখা অক্ষরগুলো পড়ে নিয়ো

প্রতিটি নদী আসলে হাজার বছরের এক একটা গল্প লিখে চলে

০০০০

চারাগোঁ কো আঁখোঁ মেঁ ম্যাহফুয রাখনা

বড়ি দূর তক রাত হি রাত হোগি

প্রদীপগুলোকে চোখের তারায় সযতনে বাঁচিয়ে রেখো

সামনে অনেক দূর পর্যন্ত শুধু রাত আর রাত

০০০০

য়াজব চাগ হুঁ দিন রাত জলতা রেহতা হুঁ

ম্যায়ঁ থক গয়া হুঁ হাওইয়া সে কহো বুঝায়ে মুঝে

আমি এক অদ্ভুত প্রদীপ, দিন-রাত শুধু জ্বলতেই থাকি

এবার ক্লান্ত, বাতাসকে বলো যেন আমাকে নিভিয়ে দেয়

০০০০

আঁখোঁ মেঁ রাহা দিল মেঁ উতর কর নেহিঁ দেখা

কশতি কে মুসাফির নে সমন্দর নেহিঁ দেখা

চোখেই রইল মনের গভীরে নেমে দেখল না

নৌকার যাত্রী সমুদ্রই দেখল না

০০০০

ম্যায়ঁ তামাাম দিন কা থকা হুয়া তু তামাাম শব কা জাগা হুয়া

যারা ঠ্যাহের জা ইসি মোড় পর তেরে সাথ শাম গুজার লুঁ

আমি সারাদিনের ক্লান্ত, আর তুমি সারারাত জেগে থাকা

একটুখানি থামো এই মোড়ে, তোমার সাথে এই সন্ধ্যাটা কাটিয়ে নিই

০০০০

খুদা হম কো এয়সি খুদায়ি না দে

কি অপনে সিওয়া কুছ দিখায়ি না দে

খোদা, আমাদের এমন অহংকার দিও না

যেখানে নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ে না

০০০০

বড়া রহিম ও করিম হ্যায় মুঝে য়ে সিফত ভি আতা করে

তুঝে ভুলনে কি দুয়া করুঁ তো মেরী দুয়া মেঁ আসর না হো

তিনি বড় দয়ালু কৃপাময়, আমাকেও এই গুণটুকু দিন

যদি কখনো তোমাকে ভুলে যাওয়ার প্রার্থনা করি, যেন প্রার্থনা বিফল হয়

০০০০

উদাস আঁখোঁ সে য়াঁসু নেহিঁ নিকলতে হ্যায়ঁ

য়ে মোতিয়োঁ কি তরহ সিপিয়োঁ মেঁ পলতে হ্যায়ঁ

উদাস চোখ থেকে হুট করে জল ঝরে পড়ে না

অশ্রু মুক্তোর মতো ঝিনুকের বুকে সযতনে বড় হয়

০০০০

নেহিঁ হ্যায় মেরে মুকদ্দর মেঁ রওশনি না সহি

য়ে খিড়কি খোলো যারা সুব্হ কি হাওয়া হি লাগে

আমার ভাগ্যে যদি আলো না-ই থাকে, তবে না-ই থাক

জানালাটা একটু খোলো, সকালের হাওয়া তো আসুক

০০০০

হাঁসো আজ ইতনা কি ইস শোর মেঁ

সদা সিসকিয়োঁ কি সুনায়ি না দে

আজ এত জোরে হাসো যেন হাসির শব্দে

ভেতরের ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ কেউ শুনতে না পায়

০০০০

জিস পর হামারি আঁখ নে মোতি বিছায়ে রাত ভর

ভেজা ওহি কাগয উসে হম নে লিখা কুছ ভি নেঁহি

সারা রাত জেগে যে কাগজে আমার চোখ অশ্রুর মুক্তো ছড়িয়েছে

তাকে সেই কাগজ পাঠিয়ে দিলাম, নতুন করে লিখিনি কিছুই

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত