অভিমত
হানিফ রাশেদীন

মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, খাদ্যসংকট ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় আক্রান্ত এক রাষ্ট্র। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান যে উন্নয়ন-দর্শন হাজির করেন, তার কেন্দ্র ছিল গ্রাম। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের প্রাণ শহরে নয়, গ্রামে। ফলে তাঁর বক্তৃতা ও কর্মসূচিতে বারবার ফিরে এসেছে কৃষি, সেচ, খাল খনন, উৎপাদন ও স্থানীয় অংশগ্রহণের কথা।
জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্বনির্ভরতার ধারণা। বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে তিনি স্থানীয় সম্পদ, শ্রম ও জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেন। ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করার প্রচেষ্টা ছিল রাষ্ট্রকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস। তাঁর মূল দর্শন ছিল উন্নয়ন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; মানুষকে তার অংশীদার করে তোলা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল খাদ্যঘাটতি, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা এবং অনুন্নত কৃষিব্যবস্থার একটি দেশ। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান কৃষিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসেন। তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এ জন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেন। ‘সবুজ বিপ্লব’ কৃষি নীতির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল বীজ, সার, সেচ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রসারে জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গভীর ও অগভীর নলকূপে ভর্তুকি দেওয়ার ফলে কৃষকের সেচনির্ভর চাষ বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষি কেবল জীবিকার ক্ষেত্র নয়, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবেও গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কৌশল। নদীমাতৃক আমাদের দেশের বহু অঞ্চল বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের শিকার হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই বাস্তবতায় খাল খনন ছিল জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির একটি কার্যকর উদ্যোগ।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও উন্মুক্ত ও উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ নেন। শিল্প-বাণিজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত এবং উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করেন। তাঁর ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ ধারণা ছিল স্থানীয় সম্পদ ও উদ্যোগের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা একটি জাতিকে দুর্বল করে দেয়। তাই স্থানীয় সম্পদ, শ্রম ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্প আজ প্রধান চালিকাশক্তি; এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের সময়ে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শুধু কৃষিনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়। ‘রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার ধারণা ছিল সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজারের সুযোগ তৈরি করেন। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহের সূচনা ঘটে, যা পরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। তিনি দেশের জনশক্তিকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতেও তাঁর উন্নয়ন-দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। পরিবার পরিকল্পনা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সম্প্রসারণ করেন জনসেবামূলক কার্যক্রম।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসে জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন-দর্শন নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। সেতু, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল ও বহুতল নগরায়ন উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সঙ্গে কৃষিজমি হ্রাস, নদী-খাল দখল, জলাবদ্ধতা, গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। উন্নয়ন তো কেবল কংক্রিটের পরিমাণ নয়; মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সমাজের স্থিতিও—এই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে গত দুই দশকে প্রসার ঘটেছে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার বিস্তার দৃশ্যমান হলেও মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সংকট উন্নয়নের সুফলকে সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে খাল খননের ধারণা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা ও পানিসংকট মোকাবিলায় এখন খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে স্থানীয় সম্পদের সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য, জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনা নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একসময় যে খাল খননকে পুরোনো উন্নয়ননীতি বলা হয়েছিল, আজকের বাস্তবতা সেটিকে নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার গ্রাম বেঁচে থাকে, নদী বেঁচে থাকে, কৃষক টিকে থাকে এবং মানুষ জীবিকার তাগিদে নিজের শেকড় ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হয় না।
আজকের বাংলাদেশ প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দেখছি, একসময় যে খাল ছিল গ্রামের প্রাণ, তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে; যে কৃষিজমি খাদ্যের নিরাপত্তা দিত, তা হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের বর্তমান ধারা যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি মানুষকে মাটি, প্রকৃতি ও প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে দূরেও সরিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়ন যদি মানুষের সামাজিক স্থিতি, পরিবেশগত ভারসাম্য ও অংশগ্রহণকে দুর্বল করে ফেলে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা দীর্ঘস্থায়ী—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন-দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে আসে। তাঁর চিন্তার সব দিক হয়তো আজ হুবহু প্রয়োগযোগ্য নয়, কিন্তু মূল বোধটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ—উন্নয়নকে মানুষের অংশগ্রহণ, স্থানীয় বাস্তবতা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। কারণ কেবল কেন্দ্রভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন নিয়েও একই কথা বলা হচ্ছে—স্থানীয় সম্পদের সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য, জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে, কিন্তু সংকট ও সমাধানের মূল ভাবনা অনেকটাই একই রয়ে গেছে।
জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনাকে শুধু রাজনৈতিক স্মৃতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা মনে করিয়ে দেয় উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু ভবন নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। শুধু শহরকে আধুনিক করা নয়, গ্রামকে মর্যাদা দেওয়া। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে প্রযুক্তি ও প্রকৃতি, শহর ও গ্রাম, প্রবৃদ্ধি ও মানবিকতার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া। আমরা কি শুধু উঁচু শহরের বাংলাদেশ গড়ছি, নাকি বাসযোগ্য গ্রামেরও বাংলাদেশ গড়ছি—এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের উন্নয়নের চরিত্র নির্ধারণ করবে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলে, ইতিহাসের ভেতর থেকে জিয়াউর রহমানের মাটিমুখী উন্নয়ন-দর্শন আবারও আলোচনায় ফিরে আসবে।

মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, খাদ্যসংকট ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় আক্রান্ত এক রাষ্ট্র। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান যে উন্নয়ন-দর্শন হাজির করেন, তার কেন্দ্র ছিল গ্রাম। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের প্রাণ শহরে নয়, গ্রামে। ফলে তাঁর বক্তৃতা ও কর্মসূচিতে বারবার ফিরে এসেছে কৃষি, সেচ, খাল খনন, উৎপাদন ও স্থানীয় অংশগ্রহণের কথা।
জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্বনির্ভরতার ধারণা। বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে তিনি স্থানীয় সম্পদ, শ্রম ও জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেন। ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করার প্রচেষ্টা ছিল রাষ্ট্রকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস। তাঁর মূল দর্শন ছিল উন্নয়ন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; মানুষকে তার অংশীদার করে তোলা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল খাদ্যঘাটতি, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা এবং অনুন্নত কৃষিব্যবস্থার একটি দেশ। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান কৃষিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসেন। তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এ জন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেন। ‘সবুজ বিপ্লব’ কৃষি নীতির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল বীজ, সার, সেচ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রসারে জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গভীর ও অগভীর নলকূপে ভর্তুকি দেওয়ার ফলে কৃষকের সেচনির্ভর চাষ বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষি কেবল জীবিকার ক্ষেত্র নয়, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবেও গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কৌশল। নদীমাতৃক আমাদের দেশের বহু অঞ্চল বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের শিকার হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই বাস্তবতায় খাল খনন ছিল জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির একটি কার্যকর উদ্যোগ।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও উন্মুক্ত ও উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ নেন। শিল্প-বাণিজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত এবং উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করেন। তাঁর ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ ধারণা ছিল স্থানীয় সম্পদ ও উদ্যোগের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা একটি জাতিকে দুর্বল করে দেয়। তাই স্থানীয় সম্পদ, শ্রম ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্প আজ প্রধান চালিকাশক্তি; এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের সময়ে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শুধু কৃষিনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়। ‘রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার ধারণা ছিল সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজারের সুযোগ তৈরি করেন। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহের সূচনা ঘটে, যা পরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়। তিনি দেশের জনশক্তিকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতেও তাঁর উন্নয়ন-দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। পরিবার পরিকল্পনা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সম্প্রসারণ করেন জনসেবামূলক কার্যক্রম।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসে জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন-দর্শন নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। সেতু, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল ও বহুতল নগরায়ন উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সঙ্গে কৃষিজমি হ্রাস, নদী-খাল দখল, জলাবদ্ধতা, গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। উন্নয়ন তো কেবল কংক্রিটের পরিমাণ নয়; মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সমাজের স্থিতিও—এই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে গত দুই দশকে প্রসার ঘটেছে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার বিস্তার দৃশ্যমান হলেও মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সংকট উন্নয়নের সুফলকে সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে খাল খননের ধারণা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা ও পানিসংকট মোকাবিলায় এখন খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে স্থানীয় সম্পদের সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য, জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনা নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একসময় যে খাল খননকে পুরোনো উন্নয়ননীতি বলা হয়েছিল, আজকের বাস্তবতা সেটিকে নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার গ্রাম বেঁচে থাকে, নদী বেঁচে থাকে, কৃষক টিকে থাকে এবং মানুষ জীবিকার তাগিদে নিজের শেকড় ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হয় না।
আজকের বাংলাদেশ প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দেখছি, একসময় যে খাল ছিল গ্রামের প্রাণ, তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে; যে কৃষিজমি খাদ্যের নিরাপত্তা দিত, তা হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের বর্তমান ধারা যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি মানুষকে মাটি, প্রকৃতি ও প্রান্তিক বাস্তবতা থেকে দূরেও সরিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়ন যদি মানুষের সামাজিক স্থিতি, পরিবেশগত ভারসাম্য ও অংশগ্রহণকে দুর্বল করে ফেলে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা দীর্ঘস্থায়ী—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন-দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে আসে। তাঁর চিন্তার সব দিক হয়তো আজ হুবহু প্রয়োগযোগ্য নয়, কিন্তু মূল বোধটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ—উন্নয়নকে মানুষের অংশগ্রহণ, স্থানীয় বাস্তবতা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। কারণ কেবল কেন্দ্রভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন নিয়েও একই কথা বলা হচ্ছে—স্থানীয় সম্পদের সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য, জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। সময় বদলেছে, ভাষা বদলেছে, কিন্তু সংকট ও সমাধানের মূল ভাবনা অনেকটাই একই রয়ে গেছে।
জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনাকে শুধু রাজনৈতিক স্মৃতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা মনে করিয়ে দেয় উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু ভবন নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। শুধু শহরকে আধুনিক করা নয়, গ্রামকে মর্যাদা দেওয়া। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে প্রযুক্তি ও প্রকৃতি, শহর ও গ্রাম, প্রবৃদ্ধি ও মানবিকতার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া। আমরা কি শুধু উঁচু শহরের বাংলাদেশ গড়ছি, নাকি বাসযোগ্য গ্রামেরও বাংলাদেশ গড়ছি—এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের উন্নয়নের চরিত্র নির্ধারণ করবে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলে, ইতিহাসের ভেতর থেকে জিয়াউর রহমানের মাটিমুখী উন্নয়ন-দর্শন আবারও আলোচনায় ফিরে আসবে।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত
৩ ঘণ্টা আগে
একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ধরা যায়।
১ দিন আগে
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির মুখ দেখেছিল। পরবর্তীতে এপ্রিলের শেষভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণা দিলেও, মাঠপর্যায়ের বর্তমান বাস্তবতা এক ভিন
১ দিন আগে