তারা তো শুধু পড়তে এসেছিল

হা মীম কেফায়েত
হা মীম কেফায়েত

স্ট্রিম গ্রাফিক

কোরবানির ঈদের সকাল মানে একটা বিশেষ আলো। মসজিদ বা ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে মানুষের মুখে হাসি, কোলাকুলি, ছোটদের নতুন জামা, উঠানে-পার্কিংয়ে-রাস্তায় পশু বাঁধা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গন্ধ। এই দিনটার জন্য বছর ধরে অপেক্ষা করে সবাই। বিশেষ করে যারা দূরে থাকে, যারা পরিবার ছেড়ে শহরে বা বোর্ডিংয়ে আছে, তাদের কাছে এই দিনটা শুধু উৎসব নয়, ঘরে ফেরার বিরল আনন্দও।

কিন্তু দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসার ছাত্রের জন্য এই সকালটা ভিন্ন। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই তাদের মাথায় থাকে আজকের কাজের তালিকা। মাদ্রাসার নির্ধারিত এলাকা ভাগ করা হয়েছে, প্রতিটি ছাত্রের জন্য নির্দিষ্ট গলি বা মহল্লা আছে। নামাজ শেষে বেরিয়ে পড়তে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে হবে। ঘরে ফেরার কথা মনে এলে মনে পড়ে যায় অবাধ্য হওয়ার খড়্গ। সঙ্গে জরিমানা, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা গুনতে হবে। যে ছেলেটির পকেটে এমনিতেই কিছু নেই, সে জরিমানার ভয়কে আর পাঁচটা বোঝার মতোই বহন করে। আর যে এতিম নয়, তার বোঝা গিয়ে পড়বে তার বাবার ঘাড়ে।

এটাই আজ বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর কোরবানির ঈদের চিত্র।

এই প্রথার শুরু হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর আগে। কথিত আছে, ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসা থেকে এর সূত্রপাত। তারপর ধীরে ধীরে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ এটা এমন এক রুটিনে পরিণত হয়েছে যে মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ এটাকে ছাড়া মাদ্রাসা পরিচালনার কথা ভাবতেই পারেন না। অথচ চল্লিশ বছর আগেও মাদ্রাসা চলত। এতিম ও গরিব ছাত্রদের পড়ার সুযোগ ছিল। তখন এই পদ্ধতি ছিল না। এখন তো শুধু এতিমরাই পড়ে, তা নয়, টাকাওয়ালা ঘরের সন্তানরাও পড়ে। তাহলে আজ এটা কেন অপরিহার্য হয়ে উঠল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বুঝতে হবে কওমি মাদ্রাসার অর্থনৈতিক কাঠামোটা কী। কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দানের ওপর। সরকারি কোনো অনুদান নেই, কোনো বেতন কাঠামো নেই, কোনো নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরে একটি মাত্র নিশ্চিত আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে কোরবানির চামড়া। মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড বা দরিদ্র তহবিলে এই চামড়া থেকে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে চলে এতিম ও গরিব ছাত্রদের খাওয়া-পরা-থাকা। শিক্ষকদের অনেকাংশের বেতন। ফলে কর্তৃপক্ষের কাছে এই সংগ্রহ শুধু একটি আর্থিক কার্যক্রম নয়, এটা প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার প্রশ্নও।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার দায়টা চাপানো হচ্ছে সেই ছেলেগুলোর ওপর, যাদের জন্য প্রতিষ্ঠানটা দাঁড়িয়ে আছে।

বিষয়টা একটু গভীরে দেখা দরকার। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও ধর্মীয় কাজের ক্ষেত্রে আলেমরা কিছু মৌলিক নীতির কথা আলোচনা করেন। যেমন তাওয়াক্‌কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা, মাসলাহাত বা বৃহত্তর কল্যাণ বিবেচনা, কিফায়াত বা সক্ষমতার সীমার মধ্যে থাকা এবং ইসতিগনা বা অন্যের মুখাপেক্ষী না হওয়ার চেষ্টা। এই নীতিগুলোর আলোকে প্রশ্ন করা যায়, অপমানজনক পরিস্থিতিতে শ্রম নিয়ে চামড়া সংগ্রহ করা কি এই নীতিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কি এই পদ্ধতিতে রক্ষা পায়?

এই প্রশ্নগুলো আজকের নয়। দেওবন্দি ধারার শীর্ষ আলেমরা অনেক আগেই এসব নিয়ে কথা বলে গেছেন।

থানভি, হাফেজ্জী, চাটগামী (রহ.) তিনজনসহ আরো অনেকেই কোরবানি চামড়া সংগ্রহ এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মর্যাদা নিয়ে যে–কথাগুলো বলে গেছেন, তা সময়ের সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ চামড়ার দাম কমছে কিন্তু ছাত্রদের ওপর চাপ কমছে না। পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, কিন্তু পদ্ধতি বদলাচ্ছে না।

মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের প্রভাবশালী দেওবন্দি আলেমদের একজন। তাঁর লেখা আল-ইলমু ওয়াল-উলামা বইতে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, আলেমদের চাঁদা বা দান কালেকশনে যাওয়া ধর্মের জন্য বড় অসম্মানের কারণ হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা হয় যে আলেমরা নিজেদের স্বার্থেই এত দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, আলেমরা সমাজের গণ্যমান্য ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের জমায়েত করবেন এবং ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তার কথা জানাবেন। যদি তারা সেটা জরুরি মনে করেন তাহলে নিজে উদ্যোগ নিয়ে ব্যবস্থা করবেন। আর যদি না করেন, তাহলে আলেমরা ঘরে বসে থাকবেন, কিন্তু দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ভিক্ষার ভঙ্গিতে কালেকশন করবেন না।

থানভির এই বক্তব্যের ভেতরে একটি গভীর দার্শনিক অবস্থান আছে। আলেম ও তালিবুল ইলমের মর্যাদা তাঁর নিজের আচরণে প্রতিফলিত হয়। যদি জ্ঞানের সাধক দিনের পর দিন দরজায় দরজায় ঘুরে চামড়া চাইতে থাকে তাহলে সমাজ তাকে কীভাবে দেখবে? সেই দেখার প্রভাব কি শুধু ওই মানুষটির ওপর পড়ে নাকি ইসলামি জ্ঞানের প্রতি সামগ্রিক শ্রদ্ধার ওপরেও?

নব্বই দশকের আলোচিত ইসলামি রাজনীতিক মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ছিলেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নূরিয়াসহ দেশের বহু মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। তাঁর খোলামেলা বক্তব্য ছিল, মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা যেভাবে শহরের অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করে, এটা দীন–ইসলামের জন্য বেইজ্জতির কথা। এতে মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বিকল্প পথও বলেছিলেন; মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এবং শহরের নির্দিষ্ট জায়গায় সংগ্রহ কেন্দ্র রাখো, মাদ্রাসাদরদী মানুষ নিজে এসে দিয়ে যাবেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলো। অপমানজনক কাজ বন্ধ করো।

হাটহাজারী মাদ্রাসার সাবেক মহাপরিচালক মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী (মৃ. ২০২১ খ্রি.) তাঁর আত্মজীবনীতে মাদ্রাসার চামড়া সংগ্রহ নিয়ে লিখেছেন, এই পদ্ধতিটি তাঁর কাছে অত্যন্ত অপমানজনক মনে হয়। পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানে দেওবন্দি মাদ্রাসাগুলোতে এভাবে হয় না। এটা জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দেওবন্দি ধারার মাদ্রাসাগুলোতে কীভাবে এই পদ্ধতি চালু হলো সেটা তিনি বুঝতে পারেন না বলে জানিয়েছেন।

দেখা যাচ্ছে, এই তিনজন বিজ্ঞ ও কিংবদন্তী আলেম একই কথা বলছেন। কিন্তু সেসব শোনার মানসিকতা কি আজকের মাদ্রাসা প্রধান বা পরিচালকদের আছে?

এখানেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্নটা আসে। বাংলাদেশের অনেক কওমি মাদ্রাসায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও আধুনিক অর্থায়ন পরিকল্পনার অভাব দেখা যায়। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দক্ষতা দরকার, অর্থায়নের বিকল্প পথ খোঁজার মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনার যে সক্ষমতা এবং সমাজের মৌলিক বোঝাপড়া প্রয়োজন, তা তো শুধু ধর্মশাস্ত্রীয় জ্ঞান থেকে আসে না। যে মানুষটি চল্লিশ বছর ধরে চামড়া সংগ্রহ করে আসছেন তিনি হয়তো এই পথের বাইরে অন্য কিছু ভাবতেই পারছেন না। এটা তাঁর সীমাবদ্ধতা। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মাশুল দিচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা, যারা ঈদের সকালে মায়ের মুখ মনে করতে করতে অচেনা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ইতস্তত হয়ে কড়া নাড়ছে।

কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দানের ওপর। সরকারি কোনো অনুদান নেই, কোনো বেতন কাঠামো নেই, কোনো নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরে একটি মাত্র নিশ্চিত আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে কোরবানির চামড়া। মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড বা দরিদ্র তহবিলে এই চামড়া থেকে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে চলে এতিম ও গরিব ছাত্রদের খাওয়া-পরা-থাকা।

এই পদ্ধতির অর্থনৈতিক যুক্তিটাও আসলে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বারবার সিন্ডিকেটের কথা আসছে। গত কয়েক বছরে চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে বা নামানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ঈদুল আজহার পর দেখা গেছে ঢাকায় একটি বড় গরুর কাঁচা চামড়া মিলেছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। ঢাকার বাইরে গ্রামে সেটা আরও কম, লক্ষ্মীপুরের একটি মাদ্রাসা ১৮০ পিস চামড়া সংগ্রহ করে আড়তদারের কাছে নিয়ে গিয়ে পেয়েছে প্রতিটি মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা করে। ছাগলের চামড়ার তো ক্রেতাই পাওয়া যায় না। চট্টগ্রামে গত ঈদে ১০ টনের বেশি চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিতে হয়েছে বলে সিটি করপোরেশন জানিয়েছে।

এই হিসাব করলে বোঝা যায়, শত শত ছাত্র-শিক্ষক দিনভর ঘুরে যে চামড়া সংগ্রহ করলেন, তার অর্থমূল্য দাঁড়াচ্ছে কতটুকু? সেই পরিমাণ অর্থ কি একটু সুচিন্তিত প্রচার ও যোগাযোগের মাধ্যমে দাতাদের কাছ থেকে সরাসরি পাওয়া সম্ভব নয়?

সরকারও এই সমস্যাটা অনুভব করছে। ২০২৫ সালে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে এবং মাদ্রাসা ও এতিমখানায় ৩০ হাজার টন লবণ সরবরাহ করা হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে সিলেট বিভাগের কওমি মাদ্রাসাগুলো এবার ঘোষণা দিয়েছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা এই ঈদুল আজহায় চামড়া সংগ্রহ করবে না। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

অর্থাৎ, যে মাদ্রাসাগুলো দশকের পর দশক ধরে ছাত্রদের বাধ্য করে চামড়া সংগ্রহ করে এসেছে, তারাই আজ বলছে এই পরিশ্রম আর লাভজনক নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে আছে অর্থনৈতিক হিসাব, ছাত্রদের মর্যাদার প্রশ্ন নয়। সুতরাং সরকারের উদ্যোগ চামড়ার দামের সমস্যার সমাধান করলেও ছাত্রদের বাধ্যতামূলক শ্রমের সমস্যার সমাধান হবে না।

আর চামড়া কালকেশন করতে না গেলে শিক্ষার্থীদের জরিমানা করাটা আইনত সিদ্ধ নয়। বাংলাদেশ সংবিধানে সকল প্রকার জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ এবং এর লঙ্ঘন আইনত দণ্ডনীয় বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী জরিমানা বা শাস্তির ভয়ে কাউকে কাজ করতে বাধ্য করা জোরপূর্বক শ্রমের সংজ্ঞায় পড়ে। কিন্তু আইনি প্রশ্নের চেয়েও বড় হলো মানবিক প্রশ্ন।

বারো বা তেরো বছর বয়সের একটা ছেলে, যার বাবা নেই, মা দূরের গ্রামে কোনোমতে দিন কাটান। ঈদের আগে তার মা নিশ্চয় অপেক্ষা করেছেন, ছেলে আসবে। একটু ভালো রান্না করবেন ভেবেছেন। কিন্তু ছেলে আসেনি। অথবা ছেলেটা সচ্ছল পরিবারের, সে বাড়িতে খবর পাঠিয়েছে ছুটি হবে কোরবানির পর দিন, যেন বাবার ওপর জরিমানার চাপ না পড়ে। ঈদের দিন ছেলে দুটি সে অপরিচিত মানুষের বাড়ির দরজায় চামড়ার রক্ত ও ময়লা লাগা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে বলছে ‘চামড়া দিন’, আর মনে ভাসছে মায়ের মুখ। ওদিকে ছেলে না–আসায় বাড়িতে মা–বাবার মনেও নেই আনন্দ।

এই দৃশ্যটা বাংলাদেশে প্রতি বছর ঘটছে। হাজার হাজার ছেলের ক্ষেত্রে ঘটছে। যারা এই ব্যবস্থা চালু রেখেছেন, তাদের অনেকে হয়তো বুঝতেই পারছেন না এটা ওই ছেলেগুলোর কাছে কতটা যন্ত্রণার।

মাদ্রাসা পড়ুয়া লেখকদের সংগঠন ইসলামি লেখক ফোরামের সাবেক সভাপতি জহির উদ্দিন বাবর তার এক লেখায় জানিয়েছেন, চামড়া সংগ্রহে যুক্ত অধিকাংশই ভেতরে ভেতরে এটাকে পছন্দ করেন না। মনে মনে ঘৃণা করেন। উস্তাদরা চাকরি বাঁচাতে করেন, ছাত্ররা মাদ্রাসার আইন মানতে বাধ্য হয়ে করেন।

হা মীম কেফায়েত। ছবি: সংগৃহীত
হা মীম কেফায়েত। ছবি: সংগৃহীত

এর সঙ্গে যোগ হয় সামাজিক অবমাননার অভিজ্ঞতা। ঢাকা শহরে একই এলাকায় একাধিক মাদ্রাসার ছাত্ররা চামড়া পেতে প্রায় প্রতিযোগিতায় নামেন। কোরবানিদাতারা বিরক্ত হন। কেউ কেউ পাইকারের মতো দাম কষেন। কেউ কপাল কুচকে তীর্যক মন্তব্য করেন। কেউ হাসাহাসি করেন। এই পরিবেশে একটি কিশোরের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়, সেটা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনেক বেদনার। এই ছেলেটি ভবিষ্যতে আলেম হবে, মানুষকে ইসলামের পথ দেখাবে। কিন্তু ছোটবেলায় যে অভিজ্ঞতাটা তার মধ্যে গেঁথে যাচ্ছে, সেটা কি তাকে একজন মর্যাদাবান ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়তে সাহায্য করছে? নাকি তার মধ্যে একটা হীনমন্ম্যতা বোধ তৈরি করছে?

ভারত ও পাকিস্তানের দেওবন্দি মাদ্রাসাগুলোতে চামড়া সংগ্রহের প্রক্রিয়া ভিন্ন। মাদ্রাসায় কোরবানির ব্যবস্থা থাকে, এলাকার লোকেরা এসে কোরবানি করে চামড়া দিয়ে যায়। আমাদের দেশেও চাইলে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে বা কাছে একটি সংগ্রহ কেন্দ্র রাখা যায়। এলাকার মসজিদগুলোতে আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া যায় যে এই বছর চামড়া মাদ্রাসায় দিয়ে যাবেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মরিয়া হয়ে কালেকশনের এই রেওয়াজ দেওবন্দের ঐতিহ্যে নেই। বাংলাদেশে যে পদ্ধতিটি গড়ে উঠেছে, তা একটি স্থানীয় চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে আকাবিরদের বর্ণিত নীতিমালার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আরও একটু বড় পরিসরে ভাবলে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর স্থায়ী তহবিলের চিন্তা করা দরকার। অনেক বড় মাদ্রাসায় পর্যাপ্ত পরিমাণ জমি ও সম্পদ আছে। সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করলে স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক দান সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি আছে যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে। সেই পথে মানুষের আস্থা বাড়ে এবং দানও বাড়ে।

কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। লাখো মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র ঘরের হাজারো ছেলে এখানে ধর্মীয় শিক্ষা পাচ্ছে, যা না হলে তাদের পড়ার কোনো সুযোগই হতো না। এই অবদানকে ছোট করা যাবে না। কিন্তু ভালোবাসা মানে অন্ধ সমর্থন নয়। যে প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসি, তার ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো দেখিয়ে দেওয়াও একটা দায়িত্ব। থানভি, হাফেজ্জী, চাটগামী (রহ.) তিনজনসহ আরো অনেকেই কোরবানি চামড়া সংগ্রহ এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মর্যাদা নিয়ে যে–কথাগুলো বলে গেছেন, তা সময়ের সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ চামড়ার দাম কমছে কিন্তু ছাত্রদের ওপর চাপ কমছে না। পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, কিন্তু পদ্ধতি বদলাচ্ছে না।

ঈদের দিন সব মানুষের ঘরে পরিবারের মায়ামমতায় থাকার দিন। সেদিন যে ছেলেগুলো অচেনা মানুষের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, চামড়া চায়, অপমান সয়, মায়ের কথা মনে করে, তাদের জন্য কি আমাদের কিছু বলার নেই?

তারা তো শুধু পড়তে এসেছিল, দান ভিক্ষা করতে তো নয়।

লেখক: সাংবাদিক

সম্পর্কিত