leadT1ad

প্রস্তাবিত বাজেট: কর দেওয়া, না দেওয়ার মনস্তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তের ফাঁদ

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১২: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানম্যান তাঁর 'থিংকিং ফাস্ট অ্যান্ড স্লো' গ্রন্থে বলেছেন, মানুষ দুটি প্রক্রিয়ায় সাধারণত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়- সিস্টেম-১ (দ্রুত, স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগতাড়িত) এবং সিস্টেম-২ (ধীর, যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণধর্মী)। প্রচলিত অর্থনীতিতে ধরে নেয়া হয় মানুষ সব সময় সিস্টেম-২-এ সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু বাস্তবে সিস্টেম-১-ই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে। সদ্যঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে এই আচরণগত অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিচার করলে রাজস্ব আহরণ, সামাজিক কার্যক্রম গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেক নতুন বিষয়ের আভাস মেলে।

বাজেটটি একটি 'প্রত্যাশার ফ্রেম'-এ উপস্থাপন করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের লুটপাটের তুলনায় বর্তমান সরকারের সংস্কার উদ্যোগ- জনগণের মধ্যে একটি আশার সঞ্চার করে। এটি একধরনের চতুর 'ফ্রেমিং ইফেক্ট': মানুষ লাভের চেয়ে ক্ষতি এড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দেয় ('লস অ্যাভার্শন')। সুতরাং 'দেড় দশকের লুটপাটের পরে পুনরুদ্ধার' বার্তাটিতে মনোবৈজ্ঞানিকভাবে জনগণ দ্রুত সংযোগ ঘটাতে পারে।

কর আহরণ কেন কঠিন

কানম্যান ও থালারের মতে, আর্থিক স্বার্থ পরিবর্তন না করে শুধু নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করা যায়। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ—এটি কেবল সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা নয়, এটি একটি গভীর আচরণগত ব্যর্থতাও।

করদাতারা কর দেওয়াকে আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখেন (লস অ্যাভার্শন), কর সিস্টেমকে জটিল ও ভয়ের বিষয় মনে করেন এবং ফাঁকি দেওয়াকে 'সামাজিক নর্ম' হিসেবে গ্রহণ করেন।

বাজেটে কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অটোমেশনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কর আহরণ করা হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন কর কর্মকর্তার মুখোমুখি হন, তখন 'সিস্টেম-১' চালু হয়। করদাতা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে ঘুষ দেওয়া বা আলোচনায় রফা করা অনেক সহজ মনে করে। কিন্তু ফেসলেস, অটোমেটেড সিস্টেমে সেই পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং সৎ পথ অনুসরণ একমাত্র বিকল্প হয়ে ওঠে।

সেরা করদাতা সম্মাননা পুরস্কার নীতিমালা ২০২৬- প্রবর্তন একটি চমৎকার পদক্ষেপ। গবেষণায় দেখা গেছে সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা মানুষের আচরণ পরিবর্তনে আর্থিক পুরস্কারের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। 'গর্বিত করদাতা' পরিচয় তৈরি করা কর সংস্কৃতি পরিবর্তনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

বিকল্প ও আচরণগত সংস্কার

কানম্যান ও থালার দেখিয়েছেন 'ডিফল্ট' অপশন—মানে যা না করলেও এমনিতেই হয়ে যায় তা মানুষের সিদ্ধান্তকে শক্তিশালীভাবে প্রভাবিত করে। বাজেটে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আচরণগত অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি বেশ শক্তিশালী পদ্ধতি—ব্যাংকিং সিস্টেমে প্রবেশের মুহূর্তকে কর নিবন্ধনের পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই যুক্তিতে ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য আয়কর ও মূসক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও যুক্তিসংগত।

তবে এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি মানুষ মনে করে রাষ্ট্র তাদের জোর করে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি করদানের সুবিধা ও সহজ কাঠামো তৈরি করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক নিরাপত্তা ও আচরণগত অর্থনীতি

ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের নকশায় আচরণগত অর্থনীতির বেশ কিছু উপাদান রয়েছে। দুই হাজার ৫০০ টাকা প্রতি মাসে পাওয়া এবং একসঙ্গে বড় অংকের অর্থ পাওয়ার মধ্যে মনোবৈজ্ঞানিক পার্থক্য রয়েছে। কানম্যানের 'মানসিক হিসাব' তত্ত্ব বলে—মানুষ নিয়মিত আয় থেকে একটি অংশ দৈনন্দিন ব্যয়ের জন্য আলাদা করে রাখে, যা একবারে অর্থ পাওয়ার চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়। এই দৃষ্টিতে মাসিক অর্থ হস্তান্তর সঠিক। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো দরিদ্র পরিবারের সম্পদ তৈরি, যা দিয়ে সে দীর্ঘমেয়াদে ঠিকে থাকতে পারে।

তবে মানুষের ক্ষতির ভয় লাভের আনন্দের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ । ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া এবং হারানোর ভয়—অর্থাৎ শর্তভঙ্গ হলে কার্ড বাতিলের হুমকি—নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায গ্রহণে পরিবারকে পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও কার্যকর প্রণোদনা হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে শর্ত আরোপে সতর্কতা দরকার, কারণ অতি জটিল শর্ত মানুষকে কর্মসূচি বিমুখ করে তুলতে পারে।

বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক আস্থা

গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে 'আস্থা' একটি বড় বিষয়। আস্থা বাড়লে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও গতিশীল হয়। বিনিয়োগকারীরা তখনই বিনিয়োগ করেন যখন তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সঠিক এবং ইতিবাচক ধারণা থাকে। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে সংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আস্থাহীনতা বেসরকারি বিনিয়োগকে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

বাজেটে পাঁচ বছরের জন্য ব্যক্তিকর হারের পূর্বঘোষণা—একটি চমৎকার পদক্ষেপ। এটি করদাতাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য সহায়ক হবে। মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারবে। একইভাবে মধ্যমেয়াদী কর নীতির স্থিতিশীলতার ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।

বাজেটে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের কথা জানলে উদ্যোক্তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও আশাবাদী হয়ে উঠবেন। বড় সংখ্যা আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে, যা বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করবে।

পক্ষপাত ও নীতির ফাঁদ

কানম্যানের 'কগনিটিভ বায়াস' তত্ত্বের আলোয় এই বাজেটে কিছু ফাঁদও দৃশ্যমান। প্রথমত, 'অপ্টিমিজম বায়াস': জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ অনেকটা কল্পনাপ্রসুত। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত আশাবাদ নিজেই পরিকল্পনা ব্যর্থতার কারণ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, 'প্ল্যানিং ফ্যালাসি': এনবিআর এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আহরণ থেকে পিছিয়ে ছিল, তবু আগামী অর্থবছরের জন্য আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে সরকার। এটিও অতিরিক্ত আশাবাদের একটি উদাহরণ।

তৃতীয়ত, 'স্ট্যাটাস কো বায়াস': বাজেটে অনেক কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হলেও অর্থনীতির অনেক মৌলিক সমস্যা—যেমন শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির স্বল্প সুযোগ, কৃষি থেকে শিল্পে রূপান্তরের ধীর গতি—নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি কম। 'যা আছে তাই রাখতে চাওয়ার' প্রবণতা কাঠামোগত সংস্কারের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা।

ইলেকট্রিক ভেহিকল ও সবুজ প্রণোদনা

বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর ছাড়, সৌরবিদ্যুতে শূন্য কর হার এবং ই-বাইকে প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে মানুষের পরিবহন ও জ্বালানি আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এখানে একটি আচরণগত সীমাবদ্ধতা আছে। ২৫ হাজার ডলার মূল্যের ইভি গাড়ির কর ৬৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও এটি সাধারণ মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থেকে যাবে। প্রণোদনা তখনই কার্যকর হয় যখন সেটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর ক্রয় সীমানার মধ্যে থাকে। এক্ষেত্রে ইভি গাড়ির করছাড়ে সাধারণ মানুষের আচারণে তেমন প্রভাব ফেলবে না। সাধারণ মানুষের জন্য ই-বাইক ও ই-রিকশার প্রণোদনা আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

নীতির মনোবিজ্ঞান

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভালো নীতির জন্য শুধু সঠিক অর্থনৈতিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়, দরকার মানুষের মন ও আচারণ বোঝা। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু চমৎকার আচরণগত উদ্ভাবন রয়েছে- পাঁচ বছরের পূর্বনির্ধারিত কর হার, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট, সেরা করদাতা পুরস্কার এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড।

তবে অপ্টিমিজম বায়াস, প্ল্যানিং ফ্যালাসি এবং বাস্তবায়নের মনোবৈজ্ঞানিক জটিলতাকে অবমূল্যায়ন করার প্রবণতা এই বাজেটের বড় দুর্বলতা। যা সহজ মনে হয় তা প্রায়ই সহজ নয়, যা কঠিন মনে হয় তার মাঝেও পথ থাকে—শুধু সঠিক প্রশ্ন করতে হয়। বাংলাদেশের জন্য সঠিক প্রশ্নটি হলো- প্রস্তাবিত বাজেটের সুবিধা কি সত্যিই তাদের কাছে পৌঁছাবে যাদের জন্য তা তৈরি করা হয়েছে? নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তথ্যের অপ্রতুলতা ও দুর্নীতি সব পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেবে।

  • এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত