leadT1ad

বাংলাদেশ-তুরস্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম গ্রাফিক

​একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতির সনাতন একমেরুকেন্দ্রিক কাঠামো ভেঙে একটি জটিল, বহুমুখী এবং তীব্র মেরুকরণযুক্ত বিশ্বব্যবস্থা আত্মপ্রকাশ করেছে। ইউরেশিয়া থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের যুগে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মাঝারি শক্তি’ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রগুলোর আচরণ ও কৌশলগত গুরুত্ব আমূল পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ এবং এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত সামরিক-কূটনৈতিক পরাশক্তি তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল প্রথাগত কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা একটি গভীর ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ রূপান্তরিত হয়েছে।

​বাংলাদেশ তার ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর আওতায় নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়ন করছে, যেখানে তুরস্ক একটি নির্ভরযোগ্য ও অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, আঙ্কারা তার ‘আফ্রিকান ইনিশিয়েটিভ’ এবং ‘এশিয়া অ্যানিউ’ নীতির মাধ্যমে এশীয় অঞ্চলে নিজের ভূকৌশলগত এবং বাণিজ্যিক প্রভাব বলয় সম্প্রসারণ করতে বদ্ধপরিকর। এই দ্বি-পাক্ষিক অক্ষটি দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা সমীকরণকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে।

​আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ-তুরস্কের সমসাময়িক সম্পর্কটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র দুটির জাতীয় স্বার্থের যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ।

​নব্য-বাস্তববাদ বা কাঠামোগত বাস্তববাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো একক কোনো পরাশক্তির আধিপত্য ঠেকাতে এবং নিজেদের নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করতে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ বজায় রাখার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, তার বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সামরিক আধিপত্য এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ গ্রহণ করেছে। তুরস্কের মতো একটি উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিসম্পন্ন ও ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রের সাথে সামরিক অংশীদারত্ব স্থাপন করে বাংলাদেশ মূলত তার ‘হার্ড পাওয়ার’ বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে। এটি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীল ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

​উন্নয়নশীল ও মধ্যম সারির রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘হেজিং’ একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল, যেখানে একটি রাষ্ট্র কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে বা কোনো একক পরাশক্তির জোটে পূর্ণভাবে যোগ না দিয়ে, একাধিক বিকল্প শক্তির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস করে।

​বাংলাদেশ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে ভারত ও চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখলেও, একক কোনো শক্তির ওপর কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চায় না। আঙ্কারার সাথে ঢাকার প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলার সিদ্ধান্তটি মূলত একটি ক্লাসিক ‘হেজিং’ কৌশল। তুরস্কের সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বৈচিত্র্যকরণ ঘটাচ্ছে। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বা ভূরাজনৈতিক চাপের মুখেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে না।

বাংলাদেশ-তুরস্ক কৌশলগত সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত

​বাংলাদেশ ও তুরস্কের সমসাময়িক কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের সুদৃঢ় ভিত্তিটি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো, গভীর, ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এই দুই ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংহতি প্রকাশ পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, অবিভক্ত বাংলায় পরিচালিত খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) এবং তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৯১৯-১৯২৩) সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর দ্বারা তুরস্কের মূল ভূখণ্ড ব্যবচ্ছেদের খসড়া তৈরি হলে, ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে বাংলার মুসলমানরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

​তৎকালীন বাংলায় মোস্তফা কামাল পাশার (পরবর্তী সময়ে আতাতুর্ক) নেতৃত্বে পরিচালিত তুর্কি জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ যুদ্ধ বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। বাঙালি মুসলমানরা কেবল রাজপথে আন্দোলনই করেনি, বরং নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্য থেকেও অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার সংগ্রহ করে আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী সরকারের তহবিলে পাঠিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক অবদানের কথা আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসেও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়।

​ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে একটি ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (এফটিএ) স্বাক্ষরের মধ্যে, যা নিয়ে দুই দেশের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় তাদের এককভাবে এফটিএ করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।

​১৯২৩ সালে লোজান চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর, মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের সংস্কারবাদী নীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিকায়নের মডেল বাঙালি মুসলিম আধুনিকতাবাদীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরে ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দুই দেশের সম্পর্ক মূলত ‘কমন রিলিজিয়ন’ বা ইসলামি ঐতিহ্যের অভিন্ন মেলবন্ধনে গতি পায়। ১৯৭৪ সালে ওআইসি এবং পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী নাজমুদ্দিন এরবাকানের উদ্যোগে গঠিত ডি-৮ ফোরামের মাধ্যমে ঢাকা ও আঙ্কারা বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা প্রসারের একটি আনুষ্ঠানিক মঞ্চ লাভ করে। এই বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোই মূলত দুই দেশের প্রথাগত ধর্মীয় সংহতিকে সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তরের প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সমীকরণ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান

​১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তুরস্কের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে তৎকালীন বৈশ্বিক ঠান্ডা যুদ্ধের জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক সামরিক জোটের আলোকেই কেবল বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে আন্তর্জাতিক রাজনীতি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে দ্বিমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোয় বিভক্ত, তখন তুরস্ক ছিল ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থানে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি প্রতিবেশী হওয়ায় এবং কৃষ্ণসাগরীয় প্রণালিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায়, তুরস্ক নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ১৯৫২ সালে ন্যাটোর সদস্যপদ গ্রহণ করে এবং সম্পূর্ণভাবে মার্কিন ব্লকে যোগ দেয়।

​এই একই ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সমীকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশীয় কৌশলগত মিত্র ছিল পাকিস্তান। তৎকালীন সময়ে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত সেন্টো (সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন) এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা আরসিডি (রিজিওনাল কোঅপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) এর মাধ্যমে তুরস্ক, ইরান এবং পাকিস্তান একটি সুদৃঢ় সামরিক ও রাজনৈতিক অক্ষে আবদ্ধ ছিল। ফলে, ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তুরস্ক তার দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার নীতিকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়। আঙ্কারার তৎকালীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত তাদের ন্যাটোভুক্ত অবস্থান এবং সেন্টো জোটের প্রতি দায়বদ্ধতার দ্বারা চালিত। ফলে কৌশলগত বাধ্যবাধকতা থেকেই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুরস্কের অবস্থান ছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে, যা ছিল মূলত স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার বিপরীত।

​তবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আসার পর তুরস্কের নীতিতেও দ্রুত বাস্তবসম্মত পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগদানের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়। এই সম্মেলনের ঠিক পরপরই, ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির আইনি বাধা দূর হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তুরস্কও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে ঠান্ডা যুদ্ধকালীন কূটনৈতিক দূরত্বের অবসান ঘটে এবং আঙ্কারা ও ঢাকার মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন একটি দ্বিপাক্ষিক ও বাস্তবসম্মত সম্পর্কের সূচনা হয়, যা পরবর্তী তিন দশকে ক্রমাগত বিকশিত হতে থাকে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিবর্তন ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন

​১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভের পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মূলত প্রথাগত কূটনৈতিক সৌজন্য, সীমিত বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। ১৯৮১ সালে ঢাকায় তুর্কি দূতাবাস এবং ১৯৭৬ সালে আঙ্কারায় বাংলাদেশি দূতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের সূচনা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের পারস্পরিক সফর এবং ওআইসি ও ডি-৮ ফোরামে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেও, তা কোনো বড় ধরনের কৌশলগত বা সামরিক রূপ নেয়নি। মূলত দুই দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ব্যস্ততার কারণে এই সম্পর্কটি দীর্ঘকাল একটি ধীরগতির সমান্তরাল রেখায় চলেছে।

​তবে, চার দশকের এই মসৃণ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন বা ছেদ দেখা দেয় ২০১২ থেকে ২০১৬ সময়পর্বে। বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ এর রায় কার্যকর করাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র শীতলতা তৈরি হয়। তুরস্কের তৎকালীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) সরকার এবং বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এই বিচার প্রক্রিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে তীব্র কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আঙ্কারার পক্ষ থেকে একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই তীব্র বিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৬ সালের মে মাসে, যখন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করার পর তুরস্ক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা থেকে তাদের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত দেভরিম ওজতুর্ক-কে আঙ্কারায় প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে পতিত হয়।

উন্নয়নশীল ও মধ্যম সারির রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘হেজিং’ একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল, যেখানে একটি রাষ্ট্র কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে বা কোনো একক পরাশক্তির জোটে পূর্ণভাবে যোগ না দিয়ে, একাধিক বিকল্প শক্তির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস করে।

​এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত, কিন্তু ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সংঘটিত দুটি ঘটনা এই সম্পর্কের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

প্রথমত, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তুরস্কে এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এই সংকটের সময় বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কোনো দ্বিধা না রেখে এরদোগানের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি পূর্ণ কূটনৈতিক সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করে। ঢাকার এই দ্রুত ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আঙ্কারার তৎকালীন ক্ষোভ প্রশমনে অত্যন্ত কার্যকরী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, ব্যর্থ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতিতে পশ্চিম-কেন্দ্রিক বলয়ের বাইরে গিয়ে এশিয়ায় নতুন অংশীদার খোঁজার কৌশলগত নীতি (এশিয়া অ্যানিউ) গ্রহণ করে। এই দুই বাস্তবতায় দুই দেশই বুঝতে পারে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে পাশে রেখে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে একযোগে কাজ করা বেশি যৌক্তিক। ফলে, ২০১৬ সালের শেষের দিকে তুর্কি রাষ্ট্রদূত পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক নতুন ও অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়।

​কূটনৈতিক বরফ গলার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ও সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরটি ঘটে ৪ থেকে ৬ জুন ২০২৬ তারিখে, যখন তুরস্কের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকা সফর করেন। এই সফরটি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিবর্তনে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের ‘যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন’(জেইসি) এবং নিয়মিত ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি) কাঠামোকে আরও জোরদার করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সফরটি প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী দশকের রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতপার্থক্যকে সম্পূর্ণ পেছনে ফেলে ঢাকা ও আঙ্কারা এখন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে একটি অত্যন্ত পরিপক্ক ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের যুগে প্রবেশ করেছে।

কৌশলগত অংশীদারত্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব

​তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর ২০২৬ সালের জুনের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার অভূতপূর্ব সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে। এই সফরের মূল বার্তা ছিল, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক এখন কেবল প্রথাগত কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ তার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর আওতায় একক কোনো দেশের ওপর সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে উৎসের বৈচিত্র্যকরণ করতে চায়। এই কৌশলে তুরস্ক একটি আদর্শ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, কারণ ন্যাটোভুক্ত দেশ হিসেবে তুর্কি সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত, অথচ আঙ্কারা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত শর্তারোপ করে না।

​হাকান ফিদান-এর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনের রোডম্যাপ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এই হার্ড পাওয়ার সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিপূর্বেই তুরস্কের কাছ থেকে সমসাময়িক যুদ্ধক্ষেত্রের গেম-চেঞ্জার হিসেবে পরিচিত ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ ড্রোন, ‘টিআরজি-৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম, রাডার ব্যবস্থা, মাইন-প্রতিরোধী সাঁজোয়া যান এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে। ২০২৬ সালের এই সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের দিকে প্রসারিত হচ্ছে। এই আধুনিক তুর্কি সামরিক সরঞ্জাম দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের আত্মরক্ষা ও সামরিক প্রতিবন্ধকতার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আঙ্কারার দৃষ্টিকোন থেকেও, বাংলাদেশের কাছে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব তাদের নিজস্ব সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের অর্থনৈতিক বিকাশ এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের ভূকৌশলগত উপস্থিতি বা ‘ফুটপ্রিন্ট’ নিশ্চিত করার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

​সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি সফট পাওয়ার এবং মানবিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও এই অংশীদারিত্বের গভীরতা স্পষ্ট হয় রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের ক্ষেত্রে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিন এরদোগান এবং তৎকালীন তুর্কি নীতিনির্ধারকদের ঢাকা ও কক্সবাজার সফরের মধ্য দিয়ে যে মানবিক কূটনীতির সূচনা হয়েছিল, হাকান ফিদান-এর ২০২৬ সালের সফরে তা নতুন কূটনৈতিক গতি লাভ করে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশেষ করে ওআইসি, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে তুরস্কের লবিং আরও জোরদার করার বিষয়ে এই সফরে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বর্তমান বৈশ্বিক মেরুকরণের এই অস্থির সময়ে, যেখানে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর মনোযোগ অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেখানে তুরস্কের মতো একটি প্রভাবশালী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা এসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বড় একটি কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বস্তি। এই যৌথ প্রয়াসটি প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিদের উদাসীনতা বা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিলতার মধ্যেও দুটি রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক ও সামরিক ফ্রন্টে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং নিজেদের একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে পারে।

সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

​বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান এই সামরিক ও কৌশলগত অক্ষটি কোনো শূন্যস্থানে সংঘটিত হচ্ছে না; বরং তা দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সক্রিয় বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের রাডারে প্রতিনিয়ত পর্যালোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের 'হেজিং' কৌশল অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র যখন নতুন কোনো কৌশলগত অংশীদার বেছে নেয়, তখন বিদ্যমান অন্য পরাশক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রেক্ষিতে ঢাকা-আঙ্কারা অক্ষকে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার ভূকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরী।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ

​দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহে বহিরাগত কোনো শক্তির অতিরিক্ত সামরিক ও কৌশলগত প্রবেশকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তবে তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের এই সম্পর্ককে ভারত সরাসরি কোনো সামরিক হুমকি হিসেবে দেখবে না, কারণ তুরস্কের মূল ভূরাজনৈতিক ফোকাস মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়ায়। কিন্তু তুরস্ক যেভাবে পাকিস্তানের সাথে গভীর সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আঙ্কারার সাথে ঢাকার এই অতি-ঘনিষ্ঠতা ভারতের থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলোর কাছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

​অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ জটিল এবং টানাপোড়েনযুক্ত, বিশেষ করে রাশিয়ার কাছ থেকে তুরস্কের ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের পর থেকে আঙ্কারার ওপর ওয়াশিংটনের এক ধরনের কৌশলগত অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যখন ন্যাটোভুক্ত অথচ মার্কিন-বিরোধী অবস্থানে থাকা তুরস্কের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে, তখন ওয়াশিংটন একে তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অধীনে বাংলাদেশের ওপর পশ্চিমা একক প্রভাব বলয় ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন বিচ্যুতি হিসেবে দেখতে পারে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু অত্যন্ত কৌশলের সাথে তার প্রতিরক্ষা কূটনীতি পরিচালনা করছে, তাই এখন পর্যন্ত এটি ঢাকা-ওয়াশিংটন বা ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে সরাসরি কোনো নেতিবাচক ঝুঁকি তৈরি করেনি।

চীন ও রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ

​বাংলাদেশের সামগ্রিক সামরিক সরঞ্জামের সিংহভাগই আসে চীন থেকে, এবং দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বৃহৎ অবকাঠামো খাত রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সামরিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি চীনের জন্য একটি মৃদু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে। চীন বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হলেও, বাংলাদেশ যখন তুরস্কের কাছ থেকে ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে, তখন তা বেইজিংয়ের ওপর ঢাকার একক সামরিক নির্ভরতা কিছুটা হ্রাস করে।

​রাশিয়ার ক্ষেত্রেও ভূরাজনৈতিক সমীকরণটি আকর্ষণীয়। কারণ বৈশ্বিক মঞ্চে রাশিয়ার সাথে তুরস্কের তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতা থাকলেও (যেমন সিরিয়া বা লিবিয়া সংকটে), দ্বিপাক্ষিক স্তরে পুতিন ও এরদোগান সরকারের মধ্যে এক ধরনের বাস্তবসম্মত কাজের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের এই তুর্কি অক্ষ রাশিয়ার স্বার্থে সরাসরি কোনো আঘাত হানে না। মূল ঝুঁকিটি হলো, বাংলাদেশ যদি পরাশক্তিদের এই বহুমুখী স্বার্থের টানাপোড়েনে নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে না পারে, তবে আঙ্কারা-ঢাকা অক্ষটি বৈশ্বিক মেরুকরণের কোনো এক পক্ষে ঢলে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে এই চার পরাশক্তির নিজস্ব স্বার্থের সাথে তুর্কি অক্ষের একটি চমৎকার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

​কৌশলগত সম্পর্কের সামরিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি যতটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গভীরতা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রায় উন্নীত করার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশই বেশ কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক,ওষুধ এবং পাটজাত পণ্য তুরস্কের বাজারে প্রবেশ করছে; অন্যদিকে তুরস্কের উন্নত যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বাংলাদেশে আমদানির হার বাড়ছে। তবে দুই দেশের মধ্যকার প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

​ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে একটি ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (এফটিএ) স্বাক্ষরের মধ্যে, যা নিয়ে দুই দেশের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় তাদের এককভাবে এফটিএ করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। সমসাময়িক বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় এই অক্ষের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে দুই দেশের যৌথ বিনিয়োগের ওপর। বাংলাদেশ তার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে তুর্কি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যা সফল হলে এই সম্পর্ক কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে একটি যৌথ উৎপাদনশীল অংশীদারিত্বে রূপ নেবে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই বাণিজ্যিক বহুমুখীকরণই হবে ঢাকা-আঙ্কারা অক্ষের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্বের মূল চালিকাশক্তি।

​বৈশ্বিক মেরুকরণের এই জটিল ও অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সম্পর্কটি কেবল অতীতের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংহতির আবেগে চালিত নয়, বরং তা সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবসম্মত অক্ষ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ ও তুরস্ক উভয় রাষ্ট্রই পরাশক্তিদের একক আধিপত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সুসংহত করতে একে অপরকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

​ঐতিহাসিক টানাপোড়েন এবং পরাশক্তিদের প্রচ্ছন্ন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ঢাকা ও আঙ্কারা যেভাবে প্রতিরক্ষা ও মানবিক কূটনীতিতে নিজেদের পরিপূরক হিসেবে প্রমাণ করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছে। বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার এই নতুন বিন্যাসে বাংলাদেশ-তুরস্কের এই মৈত্রী আগামী দিনে মাঝারি শক্তিগুলোর স্বাধীন কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে টিকে থাকবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

Ad 300x250

সম্পর্কিত