শামীম হোসেন

সম্প্রতি এক মাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশে কাটিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসার পর আমার মনে হয়েছে, ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৪ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ এক নয়। এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক বা দৃশ্যমান ভাঙনের মাধ্যমে হয়নি। এটি ঘটেছে অসংখ্য ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে—দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক আচরণ, মানসিক অবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতর দিয়ে। ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলো একত্রে মিলেই একটি বড় সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
আমি ২০২০ সালে ৩৫ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে চলে আসি। তবে প্রবাসে থাকা মানেই নিজের দেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। স্মৃতি, ভাষা, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনের গঠনমূলক অভিজ্ঞতা আমাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বারবার বাংলাদেশমুখী করে তোলে। তাই এই পর্যবেক্ষণগুলো কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক অবস্থান থেকে দেখা কিছু প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে আমার চোখে পড়েছে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে আস্থার ক্রমাগত ক্ষয়। পারিবারিক, ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক কিংবা দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সতর্কতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষ এখন অনেক বেশি রক্ষণশীল ও প্রতিরক্ষামূলক আচরণ করে। যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন ও তার প্রয়োগকে অনিশ্চিত মনে করা হয়, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ধীরে ধীরে লেনদেননির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক উষ্ণতা ও আন্তরিকতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি স্পষ্ট মানসিক ক্লান্তি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, নির্ভার হাসি বা সামাজিক উচ্ছ্বাস কমে গেছে। জীবন এখন অনেক বেশি দ্রুতগামী, চাপযুক্ত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। অবসর ও সামাজিক মেলামেশার ধরনও বদলে গেছে—আগে যেখানে খোলা জায়গা, পাড়া-মহল্লার আড্ডা বা অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলা ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্র, এখন সেখানে বাণিজ্যিক খাবারের দোকান বা নির্দিষ্ট ভেন্যু প্রধান হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তন শুধু স্থানগত নয়, বরং সামাজিক অভ্যাসের গভীর রূপান্তর।
অর্থনৈতিক জীবনেও কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অবস্থানের মধ্যে একটি ব্যবধান অনুভূত হয়, যা নিয়ে মানুষ সরাসরি না বললেও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক ও সেবামূলক ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবার মান অনেক জায়গায় কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা সামগ্রিক আস্থার পরিবেশকে আরও দুর্বল করছে।
দৈনন্দিন জীবনের গতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপযুক্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির চলাচলকে সীমিত করেছে। অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত বা ভাড়া করা যানবাহনের ওপর নির্ভর করছে। গণপরিবহনের কাঠামোগত উন্নয়ন খুব একটা দৃশ্যমান নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি এখন স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়। অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এখন ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসির উপস্থিতি খুব সাধারণ হয়ে গেছে। সামান্য শারীরিক সমস্যায়ও চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। এটি একদিকে স্বাস্থ্যসেবার প্রসার নির্দেশ করে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য-উদ্বেগ ও চিকিৎসা নির্ভরতার বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
গ্রাম ও পাড়া-মহল্লার সামাজিক কাঠামোও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কি? পরিস্থিতি দেখে অন্তত তা-ই মনে হলো। আগে যেখানে নিয়মিত যাতায়াত, খোঁজখবর, আড্ডা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল স্বাভাবিক, এখন সেখানে সম্পর্ক অনেকটাই মোবাইল ফোননির্ভর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনে পারস্পরিক আস্থাও কমে গেছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা এবং স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং বৈশ্বিক সুযোগের আকর্ষণ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বহির্মুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক অভিমুখী করে সাজাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও একটি নীরব সংকোচন দেখা যায়। সংগীত, সাহিত্য, নাটক বা অন্যান্য শিল্পচর্চা দৈনন্দিন জীবনে আগের মতো দৃশ্যমান নয়। এসব এখন অনেকাংশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। একইভাবে খেলাধুলার মাঠও আগের মতো সক্রিয় নয়; অনেক জায়গায় মাঠ পরিত্যক্ত বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল অ্যাপ ও বিকাশ-নগদ জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টাকা লেনদেন এখন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এটি যেমন সুবিধা ও গতি এনেছে, তেমনি মানুষের মধ্যে মুখোমুখি যোগাযোগ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যগত আস্থার সংকট। আইন, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনেকেই এখন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিকল্প বা অনানুষ্ঠানিক পথ খোঁজে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও অনেকেই গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে না, বরং সন্দেহের চোখে দেখে।
ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। কোথাও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রবণতা বেড়েছে, আবার কোথাও প্রশ্ন ও বিতর্কের জায়গাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক আচরণ ও সামাজিক প্রত্যাশার ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে হয়, যদিও একই সমাজে ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতাও পাশাপাশি বিদ্যমান।
সব মিলিয়ে একটি সাধারণ কিন্তু গভীর অনুভূতি হলো অনিশ্চয়তার বোধ। মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রেই কম আস্থাশীল, বেশি সতর্ক এবং তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মরক্ষামূলক। এটি কোনো প্রকাশ্য সংকট নয়, বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক মানসিকতা।
এই পর্যবেক্ষণগুলোকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। সমাজ সবসময় পরিবর্তনশীল আর পরিবর্তন সবসময় অবক্ষয় নয়, অনেক সময় তা অভিযোজন ও পুনর্গঠনের অংশ। বাংলাদেশ এখনো একটি প্রাণবন্ত, সম্ভাবনাময় এবং গতিশীল সমাজ। তবে আস্থা, সামাজিক সংযোগ এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের যে সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
সবশেষে প্রশ্নটি শুধু ‘বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে’ নয়; বরং ‘কোন ধরনের সামাজিক আস্থা, সম্পর্ক ও মানবিক সংযোগের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকবে’—এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি এক মাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশে কাটিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসার পর আমার মনে হয়েছে, ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৪ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ এক নয়। এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক বা দৃশ্যমান ভাঙনের মাধ্যমে হয়নি। এটি ঘটেছে অসংখ্য ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে—দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক আচরণ, মানসিক অবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতর দিয়ে। ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলো একত্রে মিলেই একটি বড় সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
আমি ২০২০ সালে ৩৫ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে চলে আসি। তবে প্রবাসে থাকা মানেই নিজের দেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। স্মৃতি, ভাষা, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনের গঠনমূলক অভিজ্ঞতা আমাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বারবার বাংলাদেশমুখী করে তোলে। তাই এই পর্যবেক্ষণগুলো কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক অবস্থান থেকে দেখা কিছু প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে আমার চোখে পড়েছে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে আস্থার ক্রমাগত ক্ষয়। পারিবারিক, ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক কিংবা দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সতর্কতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষ এখন অনেক বেশি রক্ষণশীল ও প্রতিরক্ষামূলক আচরণ করে। যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন ও তার প্রয়োগকে অনিশ্চিত মনে করা হয়, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ধীরে ধীরে লেনদেননির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক উষ্ণতা ও আন্তরিকতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি স্পষ্ট মানসিক ক্লান্তি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, নির্ভার হাসি বা সামাজিক উচ্ছ্বাস কমে গেছে। জীবন এখন অনেক বেশি দ্রুতগামী, চাপযুক্ত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। অবসর ও সামাজিক মেলামেশার ধরনও বদলে গেছে—আগে যেখানে খোলা জায়গা, পাড়া-মহল্লার আড্ডা বা অনানুষ্ঠানিক মিলনমেলা ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্র, এখন সেখানে বাণিজ্যিক খাবারের দোকান বা নির্দিষ্ট ভেন্যু প্রধান হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তন শুধু স্থানগত নয়, বরং সামাজিক অভ্যাসের গভীর রূপান্তর।
অর্থনৈতিক জীবনেও কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অবস্থানের মধ্যে একটি ব্যবধান অনুভূত হয়, যা নিয়ে মানুষ সরাসরি না বললেও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক ও সেবামূলক ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবার মান অনেক জায়গায় কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা সামগ্রিক আস্থার পরিবেশকে আরও দুর্বল করছে।
দৈনন্দিন জীবনের গতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপযুক্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির চলাচলকে সীমিত করেছে। অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত বা ভাড়া করা যানবাহনের ওপর নির্ভর করছে। গণপরিবহনের কাঠামোগত উন্নয়ন খুব একটা দৃশ্যমান নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি এখন স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়। অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এখন ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসির উপস্থিতি খুব সাধারণ হয়ে গেছে। সামান্য শারীরিক সমস্যায়ও চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। এটি একদিকে স্বাস্থ্যসেবার প্রসার নির্দেশ করে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য-উদ্বেগ ও চিকিৎসা নির্ভরতার বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
গ্রাম ও পাড়া-মহল্লার সামাজিক কাঠামোও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে কি? পরিস্থিতি দেখে অন্তত তা-ই মনে হলো। আগে যেখানে নিয়মিত যাতায়াত, খোঁজখবর, আড্ডা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল স্বাভাবিক, এখন সেখানে সম্পর্ক অনেকটাই মোবাইল ফোননির্ভর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনে পারস্পরিক আস্থাও কমে গেছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা এবং স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং বৈশ্বিক সুযোগের আকর্ষণ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বহির্মুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক অভিমুখী করে সাজাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও একটি নীরব সংকোচন দেখা যায়। সংগীত, সাহিত্য, নাটক বা অন্যান্য শিল্পচর্চা দৈনন্দিন জীবনে আগের মতো দৃশ্যমান নয়। এসব এখন অনেকাংশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। একইভাবে খেলাধুলার মাঠও আগের মতো সক্রিয় নয়; অনেক জায়গায় মাঠ পরিত্যক্ত বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল অ্যাপ ও বিকাশ-নগদ জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টাকা লেনদেন এখন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এটি যেমন সুবিধা ও গতি এনেছে, তেমনি মানুষের মধ্যে মুখোমুখি যোগাযোগ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যগত আস্থার সংকট। আইন, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনেকেই এখন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিকল্প বা অনানুষ্ঠানিক পথ খোঁজে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও অনেকেই গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে না, বরং সন্দেহের চোখে দেখে।
ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। কোথাও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রবণতা বেড়েছে, আবার কোথাও প্রশ্ন ও বিতর্কের জায়গাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক আচরণ ও সামাজিক প্রত্যাশার ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে হয়, যদিও একই সমাজে ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতাও পাশাপাশি বিদ্যমান।
সব মিলিয়ে একটি সাধারণ কিন্তু গভীর অনুভূতি হলো অনিশ্চয়তার বোধ। মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রেই কম আস্থাশীল, বেশি সতর্ক এবং তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মরক্ষামূলক। এটি কোনো প্রকাশ্য সংকট নয়, বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক মানসিকতা।
এই পর্যবেক্ষণগুলোকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। সমাজ সবসময় পরিবর্তনশীল আর পরিবর্তন সবসময় অবক্ষয় নয়, অনেক সময় তা অভিযোজন ও পুনর্গঠনের অংশ। বাংলাদেশ এখনো একটি প্রাণবন্ত, সম্ভাবনাময় এবং গতিশীল সমাজ। তবে আস্থা, সামাজিক সংযোগ এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের যে সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
সবশেষে প্রশ্নটি শুধু ‘বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে’ নয়; বরং ‘কোন ধরনের সামাজিক আস্থা, সম্পর্ক ও মানবিক সংযোগের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকবে’—এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
৯ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬