leadT1ad

মতামত

গোল, গ্ল্যামার ও গ্লোবাল পুঁজির ছায়া: বিশ্বকাপ ফুটবলের রাজনৈতিক অর্থনীতি

বাঙালি রাত তিনটায় অনলাইন ফুড ডেলিভারির অফার খোঁজে, দিনে জার্সি-পতাকা-চিৎকারে মেতে ওঠে; অথচ একই সময়ে কোথাও বোমা পড়ে, কোথাও সীমান্ত বন্ধ হয়, কোথাও ভিসা আটকে যায়। এ কি অদ্ভুত দ্বৈরথ? বিশ্বকাপ ফুটবলকে স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম ও বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই বিশ্লেষণ।

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১৪: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিন দেশে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের বর্ণাঢ্য আয়োজন শুরু হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪। ফিফা এই আয়োজনকে বলছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ। কথাটি শুনতে সুন্দর। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে আছে আরেকটি প্রশ্ন—অন্তর্ভুক্তি কাদের জন্য? যারা মাঠে খেলবে, নাকি যারা সীমান্ত, ভিসা, টিকিটমূল্য ও যুদ্ধের কারণে মাঠের বাইরে থেকে যাবে?

পৃথিবীর ইতিহাসে এক অদ্ভুত দ্বৈরথের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বৈশ্বিক আয়োজন প্রত্যক্ষ করছি। একদিকে বিশ্বকাপের মতো আয়োজন মানবিক মিলন, সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও বৈশ্বিক সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছে; অন্যদিকে একই সময়ে পৃথিবীর কয়েকটি প্রান্তে বড় শক্তিগুলোর আগ্রাসন, যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—যে সময়ে বিশ্বরাজনীতি বিভাজন, সংঘাত ও আধিপত্যের ভাষায় কথা বলছে, সেই সময়ে বিনোদনের মঞ্চে ‘অন্তর্ভুক্তি’র উচ্চারণ কতটা বাস্তব, আর কতটা প্রতীকী প্রদর্শন?

ফুটবলকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু বৈশ্বিক পুঁজির কারসাজিতে বিশ্বকাপ কখনোই শুধু ‘ফুটবল’ নয়। এটি একসঙ্গে বিনোদন, পণ্য, কূটনীতি, জাতীয় পরিচয়, করপোরেট বাজার, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক যোগাযোগের মঞ্চ। মাঠে বল ঘোরে, কিন্তু বলের চারপাশে ঘোরে রাষ্ট্র, পুঁজি, মিডিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিজ্ঞাপন ও দর্শকের আবেগ। তাই বিশ্বকাপকে বুঝতে হলে শুধু গোল, পাস, ড্রিবল বা ট্রফির ভাষায় নয়; রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষাতেও পড়তে হয়।

রাজনৈতিক যোগাযোগের দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ একটি বিশাল ‘ফ্রেমিং মেশিন’। রবার্ট এন্টম্যানের ভাষায়, ফ্রেমিং হলো বাস্তবতার কিছু অংশকে দৃশ্যমান করে তোলা এবং কিছু অংশকে আড়াল করা। বিশ্বকাপও তাই করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, পতাকা, সংগীত, আলো, আতশবাজি ও ক্যামেরার ভাষা আমাদের সামনে ‘ঐক্য’, ‘উৎসব’ ও ‘মানবতার খেলা’ তুলে ধরে। কিন্তু একই সময়ে যুদ্ধ, সীমান্তনীতি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, শ্রম, ব্যয়, বাণিজ্যিক শোষণ ও বৈষম্যের বাস্তবতাকে পর্দার আড়ালে ঠেলে দেয়। দর্শককে বলা হয়—এটি ফুটবল; কিন্তু বাস্তবে এটি এক রাজনৈতিক বার্তা: আয়োজক রাষ্ট্র নিরাপদ, শক্তিশালী, আধুনিক ও বিশ্বকে স্বাগত জানানোর ক্ষমতাসম্পন্ন।

ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বিশ্বকাপ কখনোই রাজনীতির বাইরে ছিল না। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বৈধতা ও শক্তির প্রদর্শনীতে রূপ দিয়েছিল। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ সামরিক জান্তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ—প্রতিটি আসরই দেখিয়েছে, ফুটবল শুধু মাঠের খেলা নয়; এটি রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার, ইমেজ ম্যানেজমেন্ট এবং কখনো কখনো স্পোর্টসওয়াশিংয়ের কৌশল।

২০২৬ বিশ্বকাপের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে ইরানকে ঘিরে। একদিকে ইরান মাঠে একটি স্বীকৃত অংশগ্রহণকারী দল; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা এবং সমর্থকদের প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন বিশ্বকাপের ‘ইনক্লুসিভ’ দাবিকে দুর্বল করে। ইরানের খেলোয়াড়রা খেলবে, কিন্তু তাদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ যদি ভিসা, নিষেধাজ্ঞা বা টিকিট বরাদ্দ-সংক্রান্ত বাধার কারণে মাঠে থাকতে না পারে, তাহলে বিশ্বকাপের সার্বজনীনতার ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একটি দলকে মাঠে জায়গা দেওয়া এবং সেই দলের জনগণকে উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া—দুটি বিষয় এক নয়।

এখানেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দ্বৈততা। একদিকে ফিফা বলে, ফুটবল মানুষকে এক করে; অন্যদিকে আয়োজক রাষ্ট্রের সীমান্তনীতি মানুষকে আলাদা করে। একদিকে বলা হয়, বিশ্বকাপ রাজনীতির ঊর্ধ্বে; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ভিসা, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যুদ্ধ তার প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়ে। ফিফা নিজেকে নিরপেক্ষ ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে সে নিরপেক্ষ বাজারে কাজ করে না; সে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা কাঠামো ও করপোরেট পুঁজির সঙ্গে জড়িত এক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান।

এই বিশ্বকাপ যুদ্ধোন্মত্ত সাম্প্রতিক পৃথিবীরও প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, আগ্রাসন, সামরিক উত্তেজনা ও মানবিক বিপর্যয় চলতে থাকে; একই সময়ে টেলিভিশন পর্দায় ভেসে ওঠে উৎসব, হাসি, জার্সি, পতাকা ও গোলের উল্লাস। এটিই আধুনিক স্পেক্ট্যাকলের শক্তি। গি দ্য বোর্দ তাঁর ‘সোসাইটি অব দ্য স্পেকটাকল’-এ বলেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদ বাস্তবতাকে দৃশ্যমান প্রদর্শনীতে রূপ দেয়। বিশ্বকাপ সেই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় সংস্করণগুলোর একটি। যুদ্ধের সংবাদ ও ফুটবলের বিজ্ঞাপন একই স্ক্রিনে পাশাপাশি থাকে, কিন্তু দর্শকের আবেগকে শেষ পর্যন্ত খেলার দিকে টেনে নেওয়া হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ফুটবল মিথ্যা বা দর্শকের আনন্দ মূল্যহীন। ফুটবলের সৌন্দর্য বাস্তব: ব্রাজিলের ছন্দ, আর্জেন্টিনার আবেগ, আফ্রিকার উত্থান, এশিয়ার আকাঙ্ক্ষা, ছোট দেশের বড় স্বপ্ন—এসব সত্যিই মানুষকে এক করে। কিন্তু সমস্যাটি ‘আনন্দ’-তে নয়; সমস্যাটি আনন্দের ‘মালিকানা’য়। প্রশ্ন হলো, এই আনন্দ থেকে লাভ করে কারা? ফুটবলের আবেগকে কে পণ্য বানায়? বিশ্বকাপের উল্লাস কার হাতে মুনাফায় রূপ নেয়?

পুঁজিবাদী ক্রীড়া অর্থনীতিতে দর্শক শুধু দর্শক নয়; সে বাজার। তার চোখ বিজ্ঞাপনের পণ্য, তার আবেগ ব্র্যান্ডের সম্পদ, তার জাতীয়তাবোধ জার্সি বিক্রির চালিকা শক্তি, তার স্মৃতি ডিজিটাল কনটেন্টের ডেটা। ফিফার টিকিট, সম্প্রচার অধিকার, স্পনসরশিপ, আতিথেয়তা প্যাকেজ, জার্সি, স্ট্রিমিং, সোশ্যাল মিডিয়া ক্লিপ—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন এক বিশাল স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম। এখানে খেলা হচ্ছে মূল কনটেন্ট, কিন্তু তার চারপাশে তৈরি হচ্ছে পুঁজি সঞ্চয়ের বহুমাত্রিক কাঠামো।

২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের মূল্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি এই পুঁজিবাদী চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফুটবল ঐতিহাসিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের খেলা। কিন্তু ডায়নামিক প্রাইসিং, করপোরেট হসপিটালিটি, অফিসিয়াল রিসেল মার্কেট এবং কয়েক হাজার ডলারের টিকিট ফুটবলকে ধীরে ধীরে ‘গ্লোবাল প্রিমিয়াম ইভেন্টে’ পরিণত করছে। যে খেলা একসময় পাড়ার মাঠ, কারখানার শ্রমিক, অভিবাসী কমিউনিটি ও সাধারণ মানুষের আবেগের ওপর দাঁড়িয়েছিল, সেটি এখন ধনীদের অভিজ্ঞতা-ভোগের পণ্য হয়ে উঠছে। ফলে বিশ্বকাপের প্রশ্নটি শুধু কে জিতবে তা নয়; প্রশ্নটি হলো, কে উপস্থিত থাকতে পারবে?

মাঠে বল ঘোরে, কিন্তু বলের চারপাশে ঘোরে রাষ্ট্র, পুঁজি, মিডিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিজ্ঞাপন ও দর্শকের আবেগ। তাই বিশ্বকাপকে বুঝতে হলে শুধু গোল, পাস, ড্রিবল বা ট্রফির ভাষায় নয়; রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষাতেও পড়তে হয়।

মেগা-ইভেন্ট নিয়ে গবেষক জন হর্ন দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্রীড়া-মেগা ইভেন্ট কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এগুলো শহর, বাজার, ভোক্তা সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বকাপ শহরকে সাজায়, রাস্তা মেরামত করে, স্টেডিয়াম উজ্জ্বল করে, পর্যটন বাড়ায়—কিন্তু একই সঙ্গে নজরদারি, পুলিশি উপস্থিতি, স্থানচ্যুতি, ব্যয়বৃদ্ধি ও বাজারমুখী নগরনীতিকেও জোরদার করে। অর্থনীতিবিদ ভিক্টর ম্যাথেসনও দেখিয়েছেন, মেগা-ইভেন্টের অর্থনৈতিক লাভ নিয়ে আয়োজকদের পূর্বাভাস অনেক সময় অতিরঞ্জিত হয়; প্রকৃত নেট লাভ সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পৌঁছায় না।

গ্লোবাল সাউথ বা বাংলাদেশের মতো দেশেও বিশ্বকাপের প্রভাব দ্বিমুখী। মধ্যরাতের ম্যাচ মানে অনলাইন ফুড ডেলিভারি, রাতজাগা ফেসবুক কনটেন্ট ও ইউটিউবের ডাটা ‘অফার’ এর বাজার। পতাকা ও জার্সি নিয়ে দেশীয় ছোট উদ্যোক্তারাও এই আবেগ থেকে আয় করেন। কিন্তু এর উল্টো দিকও আছে। গভীর রাতের ম্যাচের পর কর্মক্ষমতা কমে, অপ্রয়োজনীয় ভোগ বাড়তে পারে, আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর চাপ পড়ে, এবং তরুণদের মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে বাজার-নির্মিত উত্তেজনার ভেতরে আটকে যায়। অর্থাৎ বিশ্বকাপ একদিকে আনন্দের অর্থনীতি, অন্যদিকে মনোযোগেরও অর্থনীতি।

সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমালোচনাটি আসলে মাঠে নয়, নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে: এই আসরকে কোথাও জোর দিয়ে ‘পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপ’ বলা হয় না; যেন পুরুষের খেলাই ফুটবলের স্বাভাবিক, সার্বজনীন ও নিরপেক্ষ রূপ, আর নারীর ফুটবল তার বন্ধনী-যুক্ত সংস্করণ। ফিফার ২০২৬ আসর অফিসিয়ালি ‘FIFA World Cup’ নামে প্রচারিত হলেও নারীদের আসরকে আলাদাভাবে ‘FIFA Women’s World Cup’ বলা হয়—এই ভাষাগত পার্থক্যই দেখায়, পুরুষ এখনো ‘ডিফল্ট’, নারী এখনো ‘চিহ্নিত’ বা মার্কড ক্যাটাগরি।

কেমব্রিজের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও দেখায়, ‘ফুটবল’ শব্দটি সাধারণত পুরুষ ফুটবলকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়, আর নারীর ফুটবলকে আলাদা করে নামকরণ করা হয়; অর্থাৎ ভাষার ভেতরেই পিতৃতন্ত্র তার সবচেয়ে ভদ্র মুখোশ পরে থাকে। তাই ফিফা যখন অন্তর্ভুক্তির ভাষা বলে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই অন্তর্ভুক্তি কি সত্যিই সমান মর্যাদার, নাকি পুরুষের বিশ্বকাপকে ‘বিশ্ব’ বানিয়ে নারীর বিশ্বকাপকে আলাদা তাকের ওপর সাজিয়ে রাখার আরেক পরিশীলিত কৌশল?

বিশ্লেষক ক্যারিক ও শোয়াব দেখিয়েছেন, ফিফার নিজস্ব লিঙ্গ বৈষম্য নিষেধ থাকা সত্ত্বেও নারী ফুটবলে বেতন, প্রাইজমানি ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। ফলে ‘বিশ্বকাপ’ নামটি নিজেই এক রাজনৈতিক ভাষ্য: পুরুষ খেললে সেটি বিশ্ব; নারী খেললে সেটি নারী-সংযোজিত বিশ্ব।

বিশ্বকাপের রাজনৈতিক অর্থনীতি তাই আমাদের শেখায়, বিনোদন কখনো নিরীহ নয়। যে অনুষ্ঠানকে আমরা ‘খেলা’ বলে দেখি, সেটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, করপোরেট মুনাফা, মিডিয়া এজেন্ডা এবং জনমত ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে। আয়োজক রাষ্ট্র বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে; ফিফা তার বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তার করে; করপোরেশন দর্শকের আবেগকে পণ্যে রূপ দেয়; মিডিয়া যুদ্ধ ও সংকটের ভেতরেও উৎসবের বয়ান তৈরি করে। দর্শক খেলা দেখে, কিন্তু দর্শক নিজেও ব্যবহৃত হয়—রেটিং, ক্লিক, ডেটা, বিজ্ঞাপন ও বাজারের জ্বালানি হিসেবে।

তবুও বিশ্বকাপকে বাতিল করার কথা বলা সহজ নয়। কারণ ফুটবল শুধু পুঁজির নয়; মানুষেরও। এক শিশুর স্বপ্ন, এক দেশের পতাকা, এক পরিবারের রাতজাগা, এক শহরের উল্লাস—এসবও বাস্তব। সমালোচনার লক্ষ্য ফুটবলকে অপমান করা নয়; বরং ফুটবলের নামে নির্মিত ক্ষমতা ও মুনাফার অদৃশ্য কাঠামোকে দৃশ্যমান করা। আমরা খেলা ভালোবাসতে পারি, কিন্তু খেলার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ব্যবহারের সমালোচনা করতেও পারি।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই এক অদ্ভুত আয়না। এতে ফুটবলের সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে যুদ্ধের ছায়া; অন্তর্ভুক্তির ভাষা যেমন আছে, তেমনি আছে সীমান্তের নিষেধ; বৈশ্বিক উৎসব যেমন আছে, তেমনি আছে করপোরেট পণ্যে রূপ নেওয়া জনতার আবেগ। মাঠে যখন গোল হবে, কোটি মানুষ উল্লাস করবে। কিন্তু সেই উল্লাসের পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করে, তাকে না দেখলে আমরা শুধু খেলার অর্ধেকটাই দেখব।

অতএব বিশ্বকাপকে শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, ক্ষমতার ভাষা হিসেবেও পড়তে হবে। কারণ আধুনিক পৃথিবীতে বল শুধু মাঠে গড়ায় না; তা রাষ্ট্রের কূটনীতি, পুঁজির বাজার, মিডিয়ার পর্দা এবং মানুষের আবেগের ভেতর দিয়েও গড়ায়।

বিশ্বকাপ এলেই কি পৃথিবী হঠাৎ এক হয়ে যায়—কমপক্ষে স্ক্রিনের সামনে? বাঙালি রাত তিনটায় অনলাইন ফুড ডেলিভারির অফার খোঁজে, দিনে জার্সি-পতাকা-চিৎকারে মেতে ওঠে; অথচ একই সময়ে কোথাও বোমা পড়ে, কোথাও সীমান্ত বন্ধ হয়, কোথাও ভিসা আটকে যায়। ফিফা বলে—‘সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপ।’ বাস্তবতা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে—‘কার জন্য?’ কারণ মাঠে বল গড়ালেও তার ছায়ায় গড়ায় যুদ্ধ, পুঁজি, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং বিনোদনের নামে সাজানো এক বিশাল রাজনৈতিক মেলা। এ কি অদ্ভুত দ্বৈরথ নয়—নাকি আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে ঝকঝকে ভণ্ডামি? বিশ্বকাপ ফুটবলকে স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম ও বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে পড়লে বোঝা যায়, গোল শুধু মাঠে হয় না; গোল হয় দর্শকের আবেগ, বাজারের হিসাব আর রাষ্ট্রের ইমেজ ম্যানেজমেন্টেও।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

Ad 300x250

সম্পর্কিত