তাপদাহের মধ্যে পরীক্ষা: রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে

বৈরী অবস্থার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। স্ট্রিম গ্রাফিক

তীব্র গরমের কারণে জনজীবন ভোগান্তির মুখে পড়েছে। এটাকে বলা যায় এক ধরণের জনস্বাস্থ্যের বিপদ। চলমান এই তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

এমন বৈরী অবস্থার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শহরের স্কুলগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম। কিছু বিদ্যালয়ে এসি বা ফ্যানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও আছে। গ্রাম বা থানা পর্যায়ের স্কুলগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরীক্ষার তিন ঘণ্টা সময়ে সব স্কুলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র গরমে গাদাগাদি করে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অজ্ঞান হয়ে পড়া বা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঢাকা শহরের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফলাফল করলেও, গ্রামের শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। একে স্পষ্ট বৈষম্য ছাড়া আর কী বলা যায়?

লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাতের বেলায়। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২-১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। সাধারণত ঘুমের সময় মানবদেহ নিজেকে শীতল করে হারানো শক্তি ফিরে পায়। কিন্তু এই তীব্র গরমে রাতের বেলা বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। এতে শরীর চরম ক্লান্ত থাকছে। রাতে ঘুমাতে না পারা একটি শিশু পরদিন কীভাবে পরীক্ষার হলে ৩ ঘণ্টার মানসিক চাপ সামলে মনোযোগ ধরে রাখবে?

বৈরী অবস্থার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শহরের স্কুলগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম। গ্রাম বা থানা পর্যায়ের স্কুলগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এপ্রিল মাসের এই চরম উত্তপ্ত সময়ে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়াটা সরকারের একটি বড় ধরণের নীতিগত ত্রুটি বলে মনে করি। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখলে পাওয়া যায়, তীব্র গরমের কারণে শ্রেণিকক্ষে বা মাঠে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে আবহাওয়া পরিস্থিতি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।

বর্তমান আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন আচরণের পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাব রয়েছে। এ বছর পশ্চিমা লঘুচাপ অত্যন্ত শক্তিশালী। এর ফলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতও পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত মার্চ মাসে ঢাকা ও রংপুর বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০০% এবং ময়মনসিংহ ও সিলেটে প্রায় ২০০% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এপ্রিল মাসেও নীলফামারীর ডালিয়ায় স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ১০২ মিলিমিটার হলেও ২১ তারিখের মধ্যেই তা ২৬৪ মিলিমিটার ছাড়িয়েছে। কুড়িগ্রামের চিলমারীতেও ১১৬ মিলিমিটারের বিপরীতে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এছাড়া, আবহাওয়ায় 'এল নিনো'র প্রভাব তৈরি হচ্ছে, যা সেপ্টেম্বর নাগাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে পারে। শক্তিশালী পশ্চিমা লঘুচাপ মূলত ভূমধ্যসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প বয়ে আনছে। ঐতিহাসিকভাবে এবার ভূমধ্যসাগরের পানির তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছে। পাশাপাশি, গ্লোবাল ওয়েদার প্যাটার্নে পরিবর্তনের কারণে জেট স্ট্রিমগুলো অনেকটা দক্ষিণে সরে আসায় প্রচুর আর্দ্রতা নিয়ে আসছে। ফলে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখলে পাওয়া যায়, তীব্র গরমের কারণে শ্রেণিকক্ষে বা মাঠে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে আবহাওয়া পরিস্থিতি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।

পশ্চিমা লঘুচাপের অগ্রবর্তী অংশ যখন অতিক্রম করে তখন বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এর পেছনের অংশটি অতিক্রম করার সময় ‘উচ্চচাপ বলয়’ তৈরি হয়, যা তীব্র তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভের সৃষ্টি করে। বাতাসে প্রচুর আর্দ্রতা থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাইরের অনুভূত তাপমাত্রা এর চেয়ে বেশি হলে, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘামের মাধ্যমে শরীর প্রাকৃতিকভাবে শীতল হতে পারে না। উল্টো বাইরের অতিরিক্ত তাপ শরীরে প্রবেশ করে। এ সময় রক্তকে ঠান্ডা রাখার জন্য হৃৎপিণ্ড অতিরিক্ত পাম্প করতে বাধ্য হয়। শরীর এই অতিরিক্ত চাপ নিতে ব্যর্থ হলে 'হিটস্ট্রোক'-এর মতো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটে।

তাই এই ধরনের চরম আবহাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল ও বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক: আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক, সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত