ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ

মানুষের জীবন কোনো নিরবচ্ছিন্ন সাফল্যের গল্প নয়। জীবন মূলত একটি দীর্ঘ যুদ্ধ—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই লড়াই আছে, সিদ্ধান্ত আছে, হার–জিত আছে। কিন্তু এই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য কী? প্রতিটি ছোট লড়াইয়ে জয়ী হওয়া, নাকি সামগ্রিকভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা ও মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়া?
আজকের সমাজে আমরা ক্রমেই সন্তানদের শেখাচ্ছি—জীবনের প্রতিটি ধাপে জিততেই হবে। ক্লাস টেস্ট থেকে শুরু করে বোর্ড পরীক্ষা, ভর্তি যুদ্ধ, চাকরি, পদোন্নতি—সবখানেই আমরা সন্তানের কাছে ‘জয়’ প্রত্যাশা করি। আমাদের কাছে সন্তানের সাফল্য যেন ব্যক্তিগত অক্সিজেনের মতো। সন্তান জিতলে আমরা আনন্দ পাই, গর্ব করি, বাঁচার প্রেরণা খুঁজি। আর সন্তান কোনো এক লড়াইয়ে হেরে গেলে আমাদের মনে হয়—এই বুঝি সেই অক্সিজেন ফুরিয়ে গেল।
এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয় বকাঝকা, তুলনা, চাপ। ‘অমুকের ছেলে কত ভালো করছে’, ‘তুমি কেন পারছো না’—এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সন্তানের আত্মবিশ্বাস ক্ষয় করে। ফলস্বরূপ, অনেক সন্তান প্রতিযোগিতাপ্রবণ নয়, বরং প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। অন্যের সাফল্যকে নিজের পরাজয় হিসেবে দেখতে শেখে।
এই চাপের অযৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায়। যে দেশে পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরও নিশ্চিত চাকরি বা ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে আমরা ক্লাস ওয়ানের একটি সামান্য ক্লাস টেস্টের ফলাফলের জন্যও সন্তানকে শাসন করতে দ্বিধা করি না। অথচ সেই পরীক্ষায় ভালো করলে আমাদের আনন্দের যেন শেষ থাকে না—এমন এক আনন্দ, যা অনেক সময় সন্তানকে কেন্দ্র করে হলেও আসলে নিজের সামাজিক অবস্থান ও আত্মতৃপ্তির সঙ্গেই বেশি সম্পর্কিত।
এই আনন্দ–বেদনার পরিধি ধীরে ধীরে পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক পরিসরে বিস্তৃত হয়। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা নিজেদের সামাজিকভাবে ‘অপর্যাপ্ত’ ভাবতে শুরু করেন। এতে করে অভিভাবকদের মধ্যেও একধরনের নীরব প্রতিযোগিতা ও প্রতিহিংসার জন্ম হয়—যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করে শিশুরাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটাই কি জীবনযুদ্ধের শিক্ষা?
জীবনযুদ্ধে জয় মানে কি প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া? প্রতিটি প্রতিযোগিতায় অন্যকে পেছনে ফেলা? নাকি জীবনযুদ্ধে জয় মানে নিজের ভয়, দুর্বলতা, হতাশা ও নেতিবাচক প্রবণতাগুলোকে অতিক্রম করা?
সন্তানকে শেখানো উচিত—জীবনের সব লড়াই জেতা সম্ভব নয়, এবং সেটি প্রয়োজনীয়ও নয়। কোনো এক লড়াইয়ে হার মানেই জীবনযুদ্ধে পরাজয় নয়। বরং হার থেকে শেখার ক্ষমতাই মানুষকে শক্তিশালী করে। কোনো ব্যর্থতার পর নিজের ভুল–ত্রুটি বিশ্লেষণ করে, ইতিবাচকভাবে পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়াই হলো প্রকৃত শিক্ষা।
আমাদের মনে রাখতে হবে—অন্যের জয় মানেই আমার হার নয়। জীবনের মাপকাঠি একমাত্র তুলনামূলক সাফল্য হতে পারে না। জীবনযুদ্ধে জয় মানে নিজেকে একটু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে চেনা, নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করা।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সন্তানকে সর্বক্ষণ ‘জয়ী’ হতে উৎসাহিত করা নয়, বরং তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এমন মানুষ, যে ব্যর্থতাকে ভয় পায় না; যে অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত নয়; যে নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারে।
তাই সন্তানকে শেখান—
জীবনযুদ্ধে জিততে, জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে নয়।
এই একটিমাত্র বোধই হয়তো আমাদের সন্তানদের মানসিকভাবে সুস্থ, মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
আর এ বোধটির উদয় না হলে আমাদেরকে গ্রিক রাজা পাইরুহাস-এর অবস্থা বরণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি এমন কিছু যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন, যেখানে ক্ষয়ক্ষতি এতটাই বেশি ছিল যে সেই জয় শেষ পর্যন্ত তার সামগ্রিক পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তেমনই শিশুকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করানো হলো, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তার আত্মবিশ্বাস, আনন্দ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি হলো। বাইরে থেকে সেটি জয় মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে সেটি হয়তো জীবনযুদ্ধের পরাজয়।

মানুষের জীবন কোনো নিরবচ্ছিন্ন সাফল্যের গল্প নয়। জীবন মূলত একটি দীর্ঘ যুদ্ধ—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই লড়াই আছে, সিদ্ধান্ত আছে, হার–জিত আছে। কিন্তু এই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য কী? প্রতিটি ছোট লড়াইয়ে জয়ী হওয়া, নাকি সামগ্রিকভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা ও মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়া?
আজকের সমাজে আমরা ক্রমেই সন্তানদের শেখাচ্ছি—জীবনের প্রতিটি ধাপে জিততেই হবে। ক্লাস টেস্ট থেকে শুরু করে বোর্ড পরীক্ষা, ভর্তি যুদ্ধ, চাকরি, পদোন্নতি—সবখানেই আমরা সন্তানের কাছে ‘জয়’ প্রত্যাশা করি। আমাদের কাছে সন্তানের সাফল্য যেন ব্যক্তিগত অক্সিজেনের মতো। সন্তান জিতলে আমরা আনন্দ পাই, গর্ব করি, বাঁচার প্রেরণা খুঁজি। আর সন্তান কোনো এক লড়াইয়ে হেরে গেলে আমাদের মনে হয়—এই বুঝি সেই অক্সিজেন ফুরিয়ে গেল।
এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয় বকাঝকা, তুলনা, চাপ। ‘অমুকের ছেলে কত ভালো করছে’, ‘তুমি কেন পারছো না’—এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সন্তানের আত্মবিশ্বাস ক্ষয় করে। ফলস্বরূপ, অনেক সন্তান প্রতিযোগিতাপ্রবণ নয়, বরং প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। অন্যের সাফল্যকে নিজের পরাজয় হিসেবে দেখতে শেখে।
এই চাপের অযৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায়। যে দেশে পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরও নিশ্চিত চাকরি বা ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে আমরা ক্লাস ওয়ানের একটি সামান্য ক্লাস টেস্টের ফলাফলের জন্যও সন্তানকে শাসন করতে দ্বিধা করি না। অথচ সেই পরীক্ষায় ভালো করলে আমাদের আনন্দের যেন শেষ থাকে না—এমন এক আনন্দ, যা অনেক সময় সন্তানকে কেন্দ্র করে হলেও আসলে নিজের সামাজিক অবস্থান ও আত্মতৃপ্তির সঙ্গেই বেশি সম্পর্কিত।
এই আনন্দ–বেদনার পরিধি ধীরে ধীরে পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক পরিসরে বিস্তৃত হয়। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা নিজেদের সামাজিকভাবে ‘অপর্যাপ্ত’ ভাবতে শুরু করেন। এতে করে অভিভাবকদের মধ্যেও একধরনের নীরব প্রতিযোগিতা ও প্রতিহিংসার জন্ম হয়—যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করে শিশুরাই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটাই কি জীবনযুদ্ধের শিক্ষা?
জীবনযুদ্ধে জয় মানে কি প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া? প্রতিটি প্রতিযোগিতায় অন্যকে পেছনে ফেলা? নাকি জীবনযুদ্ধে জয় মানে নিজের ভয়, দুর্বলতা, হতাশা ও নেতিবাচক প্রবণতাগুলোকে অতিক্রম করা?
সন্তানকে শেখানো উচিত—জীবনের সব লড়াই জেতা সম্ভব নয়, এবং সেটি প্রয়োজনীয়ও নয়। কোনো এক লড়াইয়ে হার মানেই জীবনযুদ্ধে পরাজয় নয়। বরং হার থেকে শেখার ক্ষমতাই মানুষকে শক্তিশালী করে। কোনো ব্যর্থতার পর নিজের ভুল–ত্রুটি বিশ্লেষণ করে, ইতিবাচকভাবে পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়াই হলো প্রকৃত শিক্ষা।
আমাদের মনে রাখতে হবে—অন্যের জয় মানেই আমার হার নয়। জীবনের মাপকাঠি একমাত্র তুলনামূলক সাফল্য হতে পারে না। জীবনযুদ্ধে জয় মানে নিজেকে একটু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে চেনা, নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করা।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সন্তানকে সর্বক্ষণ ‘জয়ী’ হতে উৎসাহিত করা নয়, বরং তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এমন মানুষ, যে ব্যর্থতাকে ভয় পায় না; যে অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত নয়; যে নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারে।
তাই সন্তানকে শেখান—
জীবনযুদ্ধে জিততে, জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে নয়।
এই একটিমাত্র বোধই হয়তো আমাদের সন্তানদের মানসিকভাবে সুস্থ, মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
আর এ বোধটির উদয় না হলে আমাদেরকে গ্রিক রাজা পাইরুহাস-এর অবস্থা বরণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি এমন কিছু যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন, যেখানে ক্ষয়ক্ষতি এতটাই বেশি ছিল যে সেই জয় শেষ পর্যন্ত তার সামগ্রিক পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তেমনই শিশুকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করানো হলো, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তার আত্মবিশ্বাস, আনন্দ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি হলো। বাইরে থেকে সেটি জয় মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে সেটি হয়তো জীবনযুদ্ধের পরাজয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন সাতজন। তাঁরা মূলত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এককভাবে প্রার্থী হওয়ার কারণে তাদেরকে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলা হয়। যদিও সংবিধান বা নির্বাচনি আইনে ‘বিদ্রোহী প্রার
১৪ ঘণ্টা আগে
প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জীবন ও সম্পদের প্রাণহানিও ব্যাপক। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
১৭ ঘণ্টা আগে
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানের সামনে এখন ‘বিচক্ষণ কূটনীতি’ এবং একমুখী আমেরিকা-নির্ভরতা কাটিয়ে চীন-রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন এবং নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
২ দিন আগে
বোরো মৌসুম মানে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই একটি মৌসুম থেকে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষকের পুরো জীবন আবর্তিত হয় এই ফসলকে ঘিরে। হাল চাষ থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের শরীরে ঘাম, চোখে স্বপ্ন। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের গায়ে
২ দিন আগে