বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি কেন দরকার?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে’র গল্পটি মনে আছে? এই গল্পে শিয়াল বাঘকে মামা বলতেই নিজের রাগ ও হিংস্রতা ভুলে গিয়েছিল বাঘ। আর সেই সুযোগে শিয়ালও তার মতলব হাসিল করেছিল। আমরাও কি সেই শিয়াল যে বাঘমামা বলে আমাদের মতলব হাসিল করে চলেছি। আর বোকা বনে যেতে যেতে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই বাঘ।

অথচ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখার অন্যতম চালিকাশক্তি বাঘ। কেননা বাঘের সংখ্যা বাড়লে হরিণ, শূকর ইত্যাদির সংখ্যা কমবে বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে। হরিণ, শূকরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গাছপালা, নতুন উদ্ভিদের সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু বাঘের সংখ্যা কমে গেলে হরিণ প্রভৃতি তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাবে। এতে গাছপালার সংখ্যা কমে গিয়ে অন্যান্য প্রাণী প্রজাতির বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করবে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশে বাঘ জরিপের ফলাফল ঘোষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৯.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঘের সংখ্যা হয়েছে এখন ১২৫। একটি তথ্য মতে সুন্দরবনে প্রথম বাঘ জরিপ হয় ২০১৩-১৪ সালে। সে সময় বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে বাঘ শুমারিতে পাওয়া গিয়েছিল ১১৪টি। আরেকটি তথ্য মতে ২০০১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে কমপক্ষে ৪৬টি বাঘ মারা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে বাঘের বিচরণ ক্ষেত্র ও বাংলাদেশে সুন্দরবনের মোট এলাকার প্রেক্ষিতে ২০০ থেকে ২৫০টি বাঘ থাকা দরকার। এক সময় অধিকাংশ দেশে বাঘ পাওয়া গেলেও এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৩টি দেশে একে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে গত ১০০ বছরে বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমলেও গত বছরের তুলনায় এর সংখ্যা খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু এই খানিক বেড়ে যাওয়ার ঘটনাটা আবার ব্যর্থতা ঢাকার মতো নয় তো?

অথচ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখার অন্যতম চালিকাশক্তি বাঘ। কেননা বাঘের সংখ্যা বাড়লে হরিণ, শূকর ইত্যাদির সংখ্যা কমবে বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে। হরিণ, শূকরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গাছপালা, নতুন উদ্ভিদের সংখ্যা বাড়বে।

হাতি-মানব দ্বন্দ্বের মতো বাঘ-মানব দ্বন্দ্বের ঘটনাও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বাঘের আক্রমণের শিকার হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ জন মানুষ। আর মানুষের আক্রমণে বাঘ মারা যায় দুই থেকে তিনটি বন অধিদফতরের সূত্র দিয়ে একটি নিউজ পোর্টাল খবরে জানায় যে গত ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে বাঘ মানব দ্বন্দ্বে ৩২৮ জন মানুষ মারা গেছে আর বাঘ মারা পড়েছে ২৬টি। এই ২৬টি বাঘের মধ্যে অবশ্য ১৩টি বাঘ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে।

২০০০ সালে বাঘ-মানব দ্বন্দ্বে মানুষ মারা গেছে ৩০জন আর বাঘের মৃত্যু হয়েছে ৫টি, ২০০১ সালে মানুষ মারা গেছে ১৯ জন আর বাঘ মারা পড়েছে একটি, ২০০২ সালে মানুষ মারা গেছে ২৮ জন আর বাঘ মারা পড়েছে ৩টি, ২০০৩ সালে ২১ জন মানুষ আর ৪টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে, ২০০৪ সালে ১৫ জন মানুষ আর ৩টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে, ২০০৫ সালে ১৩ জন মানুষ মারা গেছে, বাঘ মারা যায় নি। ২০০৬ সালে ৬জন মানুষ মারা গেছে, ২০০৭ সালে ১০জন মানুষ ও ৩টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে, ২০০৮ সালে ২১ জন মানুষ ও ১টি বাঘ মারা পড়েছে, ২০০৯ সালে ৩২ জন মানুষ ও ৩ টি বাঘ মারা পড়েছে, ২০১০ সালে ৫০ জন মানুষ ও ২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে, ২০১১ সালে ৪২ জন মানুষ ও ১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে, ২০১২ সালে ২৯ জন মানুষ মারা গেছে কিন্তু কোনো বাঘের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এই তথ্যগুলো দেখে স্পষ্ট যে বাঘ-মানব দ্বন্দ্বে মানুষ মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়। তবে এই দ্বন্দ্ব বাঘের সংখ্যা হ্রাসে খানিকটা ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশে বাঘের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় হুমকি চোরা শিকার।

২০২৩ সালেরই জুলাই মাসে বাংলাদেশের বাঘ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয় বাঘ পাচারে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশ। বাঘ নিয়ে গবেষণা করে প্যানথেরা নামের একটি সংগঠন এবং চাইনিজ একাডেমি অফ সাইন্সেস এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয় সুন্দরবনে শিকার হওয়া বাঘের বিভিন্ন অংশ বিশ্বের ১৫ টি দেশে পাচার করা হয়।

যদিও সরকার দাবি করে আসছে যে বাঘ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তারা যথাযথ ব্যবস্থা রেখেছে। কনজারভেশন সায়েন্স ও প্রাকটিস জার্নালে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। এতে বাংলাদেশের বাইরে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কোথায় কোথায় যায় তাও চিহ্নিত করা হয়েছে। বাঘের এসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের চাহিদা রয়েছে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশে।

২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের চ্যানেলগুলো নিয়ন্ত্রণ করত প্রায় ৩০টি জলদস্যু দল। তাদের মধ্যে ৭ টি জলদস্যু দল প্রত্যক্ষভাবে বাঘ শিকার করে এবং বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চোরাচালানে নেতৃত্ব দেয়। গবেষক দলটি স্থল, সমুদ্র এবং আকাশপথে বাঘ পাচারের সাথে জড়িত ১৬৩ জন চোরাকারবারি ও ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এতে তারা বাঘ শিকারের চারটি উৎসস্থল চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন, ভারতের কাজিরাঙ্গা-গরমপানি পার্ক, মায়ানমারের নর্দার্ন ফরেস্ট কমপ্লেক্স ও ভারতের নামদাফা-রয়্যাল মানস পার্ক।

বাঘ পাচারে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশ। বাঘ নিয়ে গবেষণা করে প্যানথেরা নামের একটি সংগঠন এবং চাইনিজ একাডেমি অফ সাইন্সেস এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয় সুন্দরবনে শিকার হওয়া বাঘের বিভিন্ন অংশ বিশ্বের ১৫ টি দেশে পাচার করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক চক্র ছাড়াও দেশের ভিতরেও বাঘের বিভিন্ন অংশের চাহিদা আছে বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও বন বিভাগ বলেছে গবেষণার এই বিষয়টি বিতর্কিত। গবেষণায় বলা হয় বাংলাদেশের সুন্দরবন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর মায়ানমার অঞ্চলে বাঘ শিকার ও চোরাচালান হয়।

তবে অনেকের দাবি সুন্দরবেনে চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যও অনেকটা থামানো গেছে। সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করলে শিকার একেবারেই কমে যাবে। এছাড়া পাচার ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। ফাঁদ পেতে, বিষ টোপ দিয়ে বাঘ শিকার করা হয়। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের সমস্বয়ে দক্ষ টিম থাকতে পারে সুন্দরবনে। বাঘ শিকারি বা হত্যাকারীর শাস্তি সর্বনিম্ন ২ বছর ও সর্বোচ্চ ৭ বছর এবং জরিমানা ১ লাখ থেকে ১০ লাখ। দোষীদের শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। জাতিসংঘের মতেও সুন্দরবনে বাঘ কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ চোরাকারবারি। সেক্ষেত্রে সুন্দরবনের পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি চোরাকারবারিদের ঠেকাতে পারলে বাঘের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে অনেকেই মনে করেন।

প্রতি বছরই ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বাঘ সংরক্ষণ দিবস পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য বাঘের বসবাসের বন সুরক্ষিত রাখা, বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে বাঘ সম্মেলন হয়েছিল। এতে বাঘ আছে এমন ১৩টি দেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ১৩ টি দেশের মধ্যে নেপাল ও ভারতের অগ্রগতি দেখার মত। ভারতে এক দশকে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করেছে। দেশটিতে এখন বাঘের সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০ এরও বেশি। নেপালেও বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে হয়েছে ৩৫৫। কিন্তু বাংলাদেশে সে হিসেবে তেমন অগ্রগতি হয় নি। বরঞ্চ বাঘের সংখ্যা যেখানে আগে ৪০০ ছিল বলে বলা হয়, সে হিসেবে ১২৫ টি বাঘ অনেক কম।

ফলে আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে বলে আত্মতৃপ্তির এখানে কিছু নেই। বরং বাঘ সম্মেলনে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলাম তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি এটিই স্পষ্ট। এই অবস্থায় কীভাবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায় সেদিকে নজর দেয়াটা দরকার। বিশেষ করে যে চোরাকারবারির কারণে বাঘের সংখ্যা কমছে তাদের ব্যাপারে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটা জরুরি। কেননা বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে।

  • ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত