এনসিপির ওপর হামলায় অন্যদের নিন্দা, ‘চুপ’ জামায়াত

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

হবিগঞ্জে হামলায় আহত সারজিস আলমসহ এনসিপি নেতা। সংগৃহীত ছবি

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীর ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে ইসলামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে এনসিপির ১১-দলীয় ঐক্যর প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এমনকি দলটির শীর্ষ নেতাদের সামাজিক মাধ্যমে তেমন কোনো পোস্টও দেখা যায়নি।

বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানায় মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এই জোটের শরিক বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এর বাইরে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে সহাবস্থানের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক হাসান জুনাইদের পাঠানো বিবৃতিতে মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ‘পরিণতি’ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) হবিগঞ্জে এনসিপির পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত হামলা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের। নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জালালুদ্দীন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষ একটি সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও ভিন্নমত-সহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাবে হামলা, ভাঙচুর ও শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব হামলা দিয়ে নয়, যুক্তি, তথ্য ও রাজনৈতিক শালীনতার মাধ্যমে দিতে হয়। আজ যদি একজন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য সহ্য করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে সরকারের অন্যায়, দুর্নীতি ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার হলে, তাদের বিরুদ্ধেও কি দলীয় সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেওয়া হবে? এই ধরনের প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে বিএনপি, এর সহযোগী ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের– হামলাকারীদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের অংশগ্রহণের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করে এটিকে গর্বের সঙ্গে প্রচার করছেন। তারা দলীয় নেতৃত্বের কাছে নিজেদের তথাকথিত ‘বীরত্ব’ প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন। অপরাধ সংঘটনের পর এমন প্রকাশ্য আত্মপ্রচার রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করারই নামান্তর।

১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন
১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন

জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের আরেক শরিক নেজামে ইসলাম পার্টি বিকেল ৫টায় বিবৃতি দিয়ে এনসিপি নেতাকর্মীদের ওপর ‘সন্ত্রাসী হামলায়’ দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।

বিবৃতিতে দলটির আমির (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইযহার বলেছেন, রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে হামলা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের আশ্রয় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি।

তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হলে তা হতে হবে যুক্তি, আদর্শ ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে; সন্ত্রাস ও সহিংসতার মাধ্যমে নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করে– এমন যেকোনো অপচেষ্টা দেশের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর।

সম্প্রতি ১১-দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বিবৃতিতে এনসিপির জুলাই পদযাত্রার গাড়িবহরে হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, হবিগঞ্জে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা, সাংবাদিকদের মারধর, গাড়িবহরে ভাঙচুর, মোবাইল ফোন, ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম লুটের ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ওপর আক্রমণ নয়; এটি দেশের সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর প্রকাশ্য আঘাত।

খেলাফত মজলিসের নেতারা হামলায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তাঁরা আরও বলেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশে সরকার বিরোধী দলকেও সংবিধান সম্মত অধিকার দিতে প্রশাসন বাধ্য। আমরা দেশে নতুনভাবে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হতে দেব না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জনগণ তা আর দেখতে চায় না।

বিএনপি জোটে থাকা কওমি ধারার ইসলামপন্থী দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী।

বিবৃতিতে তাঁরা রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিতে সবাইকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান। জমিয়ত নেতারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের অভিপ্রায় জাগ্রত হয়েছে, তার সঙ্গে এই ধরনের অসহিষ্ণু রাজনৈতিক আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে না। আর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে না।

তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান সব রাজনৈতিক পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। একদিকে অসৌজন্যমূলক ও উসকানিমূলক আচরণ পরিহার করতে হবে। অন্যদিকে, সহিংস প্রতিক্রিয়ার পথ এড়িয়ে চলতে হবে সব পক্ষকে।

জমিয়ত নেতারা আরও বলেন, সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারও উসকানিতে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী যেন দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ না পায়, তাদেরই এটি নিশ্চিত করতে হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত