বিশ্ব বাঘ দিবস

বাঘের গর্জনেই বেঁচে থাকুক সুন্দরবন

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩: ২৭
বাঘের-গর্জনেই-বেঁচে-থাকুক-সুন্দরবন

প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব বাঘ দিবস। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই দিবসের সূচনা হয়। বিশ্বে দ্রুত কমে আসা বাঘের সংখ্যা এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে সরকার, বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করাই ছিল এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশও এই উদ্যোগে শামিল হয়।

এক শতাব্দী আগে পৃথিবীতে বুনো বাঘ ছিল প্রায় এক লাখ। আজ তার মাত্র ৫ শতাংশের মতো বাঘ টিকে আছে। একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাঘের বিচরণ থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৩টি দেশের বুনো পরিবেশে বাঘ বিচরণ করে। এর মধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামের বন থেকে বাঘ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারে বাঘের সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক হারে কমছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একবার কোনো দেশে বাঘ হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বাঘ রয়েছে ভারতে—প্রায় ৩,৭০০টি। এর পরেই রয়েছে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও থাইল্যান্ড। বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘ আছে ১২৫টি। সংখ্যাটি হয়তো ভারতের তুলনায় ছোট, কিন্তু এর গুরুত্ব মোটেও কম নয়। কারণ সুন্দরবন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো ম্যানগ্রোভ বনে আজ বাঘ বেঁচে নেই। জোয়ার-ভাটার নদী, লবণাক্ত পানি, কাদাময় বনাঞ্চলীয় দ্বীপের মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অনন্য সক্ষমতা সুন্দরবনের বাঘকে বৈশ্বিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রধান রক্ষক। খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরের শিকারি হিসেবে বাঘ হরিণ ও বুনো শূকরের মতো তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বনভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে, উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্র ভালো থাকে। তাই বাঘ হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রজাতিই নয়, পুরো সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে।

তবে সুন্দরবনের বাঘ আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতীতে অবৈধ শিকার ছিল সবচেয়ে বড় হুমকি। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট টহল, ক্যামেরা ট্র্যাপ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে এই হুমকি অনেকটা কমেছে। কিন্তু বাঘের শিকারপ্রাণী চিত্রা হারিণের চোরাশিকার বন্ধ করা যায়নি। এ ছাড়া নতুন করে সামনে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বনভূমির অবক্ষয় সুন্দরবনের আবাসস্থলকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

বাংলাদেশের জন্য বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রধান রক্ষক। খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরের শিকারি হিসেবে বাঘ হরিণ ও বুনো শূকরের মতো তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বনভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে, উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্র ভালো থাকে।

গত এক দশকে বাংলাদেশ বাঘ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। নিয়মিত ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ, বৈজ্ঞানিক জনসংখ্যা নিরূপণ, বনরক্ষীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মার্ট প্যাট্রোলিং, এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ফলে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা স্থিতিশীল থেকে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে। এটি নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি সাফল্য। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে মাঠ পর্যায়ে বাঘ সংরক্ষণ প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।

প্রথমত, সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা যাতে বাঘ, শিকার প্রাণী ও বনভূমির পরিবর্তন নিয়মিত মূল্যায়ন করা যায়। দ্বিতীয়ত, মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, সুন্দরবন রক্ষায় উজানের পানিপ্রবাহ বিশেষত গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি অপরিহার্য। তাই এই মিষ্টি পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে ভারত ও বাংলাদেশকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

একটি গল্প বলে শেষ করি।

বাঘ না থাকলে কী সুন্দরবন টিকে থাকবে? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগে। এই প্রশ্নটিই আমার দিকে ছুড়ে দিলেন জাঁদরেল প্রাণিবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মাইক ব্রোফর্ড। সকাল সকাল উপস্থিত হয়েছি পিএইচডি ভাইভা বোর্ডে, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের ডাইচ বিল্ডিং এর নিচ তলার একটি কক্ষে। ছোট্ট একটি গোলাকার টেবিলের একপাশে আমি বসেছি, হাতে থিসিসের কপি। আমার সামনে প্রফেসর ডেভিড রবার্টস, তাঁর পাশে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মাইক। আমার থিসিস সুপারভাইজর প্রফেসর জিম গ্রোমব্রিজ আমাদের জন্য কফি নিয়ে রুমে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে আমার মনের ভয় কিছুটা কাটল। ভাবলাম, বিপদে পড়লে উদ্ধার করার জন্য একজন আছে।

তিনি এসেই বোর্ডের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, ”ওকে রেখে গেলাম, ’বাজিয়ে’ দেখতে পারেন”। বলেই, চলে গেলেন, আমি বেশ হতাশ হলাম। আমার সামনে বসা দুই প্রফেসরের হাতে আগেই পাঠানো আমার থিসিসের কপি। দুজনের কপিতেই কম করে হলেও শখানেক স্টিকার নোট লাগানো, তাতে লেখা তাঁদের নানা প্রশ্ন, এক এক করে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। এভাবে ঘণ্টা তিনেক চলল।

সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমে বাঘের ভূমিকা ছাড়া আর কোনো গুরুত্ব আছে? মাইক প্রশ্ন করলেন। কিছুটা সময় নিয়ে বললাম, “আজ যদি ঘোষিত হয় সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ বেঁচে নেই, শেষ বাঘটি গতকাল মারা গেছে, তাহলে আগামীকাল থেকেই লাখ লাখ জেলে-বাওয়ালি একযোগে সুন্দরবনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কয়েক বছরের মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। বাঘই সুন্দরবনের বড় পাহারাদার।” আমার উত্তর শুনে মাইক বললেন, “আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই, তোমাকে কনগ্রাচুলেশন।”

বিশ্ব বাঘ দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সুন্দরবনের বাঘ বেঁচে থাকলে সুন্দরবন বেঁচে থাকবে, আর সুন্দরবন বেঁচে থাকলে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।

আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক এই বাঘ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বইয়ের পাতায় নয়, সুন্দরবনে জীবন্ত বাঘের গর্জন শুনতে পারে সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। বিশ্ব বাঘ দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

  • লেখক: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত