ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে কি কেউ জয়ী হতে পারবে

লেখা:
লেখা:
শাহির শাহিদসালেস

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪: ৩৪
ইরান যুদ্ধ। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া

তেহরান ও ওয়াশিংটন সম্ভবত মনে করছে, সময় তাদের নিজেদের পক্ষেই আছে। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর মূল্য। আর সেই ক্রমবর্ধমান চাপই শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত এখন আর শুধু তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে নয়। এমনকি এটি আর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধও নয়—যে লক্ষ্য সামনে রেখেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সংঘাতে জড়াতে চেয়েছিলেন।

এখন এই যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুদ্ধের প্রথম মাস শেষে দেখা গেছে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তেহরানকে বৈশ্বিক তেলের দাম প্রভাবিত করার সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে।

গত কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এটিই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা। আর ঠিক এই সুবিধাটিই কেড়ে নিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে ওয়াশিংটন।

সমঝোতা থেকে সংঘাতে

জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও জুলাই মাসে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর পুনরায় সংঘাতের শুরু হয়।

চুক্তিটি স্পষ্টভাবেই ইরানের পক্ষে ছিল। বিশেষ করে এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ইরানকে ‘বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার’ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরপর তেহরান তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক জলসীমার ভেতর দিয়েই একটি বাণিজ্যিক নৌপথ নির্ধারণ করে।

চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র তিন দিন পর, ২০ জুন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ দিকের পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে। এর মাধ্যমে কার্যত ইরানের নতুন অর্জিত কৌশলগত সুবিধাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়।

তেহরানের অভিযোগ, এভাবে হস্তক্ষেপ করে ওয়াশিংটন চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে। কারণ ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল ইরানের।

ইরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া। দক্ষিণ দিকের বিকল্প পথে জাহাজ চলাচল শুরু হলে সেগুলো ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। ফলে ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে হরমুজের গুরুত্বও কমে যেত।

এর জবাবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই যুদ্ধ ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, কেউ কি দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে পারবে?

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপত্র নুরনিউজ-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন দ্রুত সামরিক বিজয়ের আশা ছেড়ে এখন ক্ষয়যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দেওয়া।

যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও দ্রুত কমছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পলিটিকো-এর এক জরিপ অনুযায়ী, মে মাসে ট্রাম্পের ‘এমএজিএ’ সমর্থকদের অর্ধেক মনে করতেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অর্থনৈতিক মূল্য দেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে।

বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়, ইরানের উচিত শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে না থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর আরও বেশি খরচ চাপিয়ে দেওয়া।

তবে এই পাল্টা কৌশলের অন্তত তিনটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গত মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ৮৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ এবং ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মাসউদ নিলি সতর্ক করে বলেছেন, দেশটি অতি-মূল্যস্ফীতির বা ‘হাইপারইনফ্লেশন’ দিকে এগোতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভেনেজুয়েলার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘চার মাস আগেও কোনো প্রদেশে তিন অঙ্কের মূল্যস্ফীতি না থাকলেও গত মাসে তা ১১ টি প্রদেশে দাঁড়িয়েছে।’

ইরানের শ্রমবাজারও একইভাবে চাপে রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ৩০ থেকে ৪৫ লাখ ইরানি চাকরি হারিয়েছেন। জীবনযাত্রার মানের অবনতির সঙ্গে এই পরিস্থিতি মিলিয়ে আবারও সহিংস সরকারবিরোধী আন্দোলনের আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ যুদ্ধ ধীরে ধীরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে, কারণ ট্রাম্প এমন একটি কৌশল নিয়েছেন, যাকে অনেকেই ‘ব্রিজ ফর এ শিপ’ কৌশল বলে অভিহিত করছেন। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের প্রতিটি হামলার জবাবে একটি করে সেতু অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন তিনি।

এভাবে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ইরানের বড় অংশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেশটিকে কার্যত শাসন-অযোগ্য অবস্থায়ও ঠেলে দিতে পারে।

তৃতীয়ত, ওমানের জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কৌশলগত দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ। ইতোমধ্যেই ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। অর্থাৎ তারা কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

তাহলে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা আরও বাড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা কী?

কৌশলগত অচলাবস্থা

দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছেন। তাঁর প্রশাসনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য সত্ত্বেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘নিরাপদভাবে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের কাছে যথেষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার গোলাবারুদ নেই। আমার মনে হয়, হোয়াইট হাউসও বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি করছে না।’

ওয়াশিংটন পোস্টের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্রাম্পের সম্প্রসারিত সামরিক অভিযান কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মূল্যায়ন ওয়াশিংটনের সামনে তৈরি হওয়া কঠিন সংকটকেই তুলে ধরছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন মার্কিন নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। পরে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং তেলের দাম কমে যাওয়ার পর জুনে তা সামান্য কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে।

যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও দ্রুত কমছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পলিটিকো-এর এক জরিপ অনুযায়ী, মে মাসে ট্রাম্পের ‘এমএজিএ’ সমর্থকদের অর্ধেক মনে করতেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অর্থনৈতিক মূল্য দেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে।

দ্য ইকোনমিস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব মার্কিন যুদ্ধ নিয়ে জনমত জরিপ করা হয়েছে, এর মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ সবচেয়ে কম জনপ্রিয়। এর প্রভাব পড়তে পারে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও।

বর্তমানে পূর্বাভাস বলছে, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা ৭০ শতাংশেরও বেশি। যদিও সিনেটের লড়াই এখনও তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় এবং এর তীব্রতা বাড়ে, তাহলে জনঅসন্তোষও বাড়বে। এতে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতির সম্ভাবনা আরও বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প যদিও ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন, বাস্তবে দেশটির অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগে ঠেলে দেওয়া এতটা সহজ নয়। এ ধরনের অভিযানের ক্ষেত্রে সামরিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক—তিন ধরনের বড় সীমাবদ্ধতাই রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন এবং আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে যান। এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁর বক্তব্য যতই কঠোর হোক না কেন, বাস্তবের সীমাবদ্ধতাগুলো তাঁর ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত কি আবার আলোচনাতেই ফিরতে হবে

এখানেই তৈরি হয়েছে এক কৌশলগত বৈপরীত্য। তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই হয়তো বিশ্বাস করছে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের আর্থিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় যত বাড়বে, তাদের কৌশলগত বিকল্প ততই সীমিত হয়ে আসবে।

আর শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তে থাকা চাপই হয়তো দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে।

  • শাহির শাহিদসালেস: ইরানি-কানাডিয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

(মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250

সম্পর্কিত