জন্মদিন

আমাদের একজন মঈদুল হাসান আছেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৯: ১০
আমাদের একজন মঈদুল হাসান আছেন। স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই বগুড়ায় মঈদুল হাসানের জন্ম। শৈশব কেটেছে সেখানেই। তাঁর বেড়ে ওঠার সময়টাও ছিল অস্থিতিশীল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, পঞ্চাশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে আন্দোলন। সবকিছুই তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সমাজ, ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে।

মঈদুল হাসান প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক-এ কাজ করার সময় পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখালেখি ও গবেষণাকে সমৃদ্ধ করে। সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কয়েক বছর পর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি যুক্ত হন। সেসময় তিনি প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

মঈদুল হাসান সাক্ষাতকারে বলেছেন, তাজউদ্দীন আহমদ এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলেন। অথচ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চায় তিনি যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। এই আক্ষেপ তিনি বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছেন।

মূলধারা ৭১–এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তথ্যভিত্তিক নির্মাণ। মঈদুল হাসান নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত ডায়েরি, সমসাময়িক নথি, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন, পরবর্তীকালে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন দলিল ব্যবহার করে বইটি লিখেছেন। ফলে পাঠক এখানে একই ঘটনার একাধিক দিক দেখতে পারেন। ইতিহাসকে প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বইটির আলোচনার পরিধি ১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত। শুরুতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রাজনৈতিক প্রস্তুতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। এরপর মার্চ মাসের ঘটনাবলির দিকে অগ্রসর হয়েছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যা থেকে বইটির আলোচনা আরও বিস্তারিত হয়ে ওঠে।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর ঘটনাপ্রবাহ। তাজউদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখক দেখিয়েছেন, মার্চের প্রথম দিকে ভারতের হাইকমিশনের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ হলেও আগে থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বিত ব্যবস্থা ছিল না। বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর একটি গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বইটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেই বৈঠকে কার্যকর আলোচনা এগিয়ে নিতে তাজউদ্দীন আহমদ নিজেকে বাংলাদেশের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। পরে অন্যান্য নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। লেখক এই ঘটনাগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন।

১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

বইটিতে আরও দেখানো হয়েছে, বিভিন্ন নেতার মধ্যে যোগাযোগে বিলম্বের কারণে কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এগুলো অস্থায়ী সরকারের ভেতরে দ্বিধা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। লেখকের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর স্বার্থে নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ থাকতে সক্ষম হয়।

মূলধারা ৭১ ছাড়াও মঈদুল হাসানের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধে কসবা’, ‘উপধারা একাত্তর: মার্চ-এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ (এ কে খন্দকার ও এস আর মীর্জার সঙ্গে যৌথভাবে রচিত), ‘শব্দের পদ্মফুল’ ইত্যাদি। মইদুল হাসান ২০২৫ সালে একুশে পদক এবং ২০২৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পান।

মঈদুল হাসান সাক্ষাতকারে বলেছেন, তাজউদ্দীন আহমদ এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলেন। অথচ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চায় তিনি যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। এই আক্ষেপ তিনি বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে হলে সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অবদানই নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের নানা বিতর্কের মধ্যেও দলিল, তথ্য ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে রচিত এই গ্রন্থ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত