‘ককরোচ’ আন্দোলনে যে কারণে নীরব ছিলেন ভারতের মুসলিম নেতারা

লেখা:
লেখা:
রাশিদ আহমেদ

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ উদযাপন করছেন ভারতের মুসলিম নারীরা। স্ক্রল থেকে নেওয়া ছবির ইলাস্ট্রেশন: এআই

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি ‘দ্য মিলি গেজেট’-এ লিখেছিলাম, ভারতে নতুন কোনো আন্দোলন শুরু হলে মুসলিমদের প্রথমেই শুধু নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব করা উচিত নয়। কারণ কেবল নিজের অধিকার বিপদে পড়লেই যে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং সাধারণ মানুষ যখন ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চায়, তখন তার পাশে দাঁড়ানোও গণতন্ত্র রক্ষারই অংশ।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের আন্দোলনটিকে বেশ বড় হতে দেখছি। পাশাপাশি এই আন্দোলনে মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কেমন, সেটাও খেয়াল করেছি। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যাঁদের মুসলিম সমাজের নেতা বা প্রতিনিধি ভাবা হয়, তাঁদের ভূমিকাও আমার চোখে পড়েছে।

আমার পর্যবেক্ষণ হলো, হঠাৎ গড়ে ওঠা এ ধরনের আন্দোলনে সাধারণ মুসলিমরা খুব উৎসাহ নিয়ে যোগ দেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সংগঠন বা পরিচিত নেতারা একটু সতর্ক থাকেন। কেউ পরিস্থিতি দেখার জন্য অপেক্ষা করেন, কেউ সমালোচনা করেন, কেউ আবার আন্দোলনের খুঁত খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই ভাবেন, এর পেছনে অন্য কোনো মতলব লুকিয়ে আছে কি না। আবার অনেক নেতা একেবারে চুপ থাকেন।

এই সতর্কতার কারণ আছে

নেতাদের এই মনোভাবকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যাবে না। বছরের পর বছর ধরে নজরদারি, বেছে বেছে মামলা দেওয়া, সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচার, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রের নানা চাপ—এসব তেতো অভিজ্ঞতা মুসলিমদের সতর্ক থাকতে শিখিয়েছে। একই ঘটনা বারবার ঘটলে মানুষের মনে অবিশ্বাস তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

তবে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নিয়ে সন্দেহ যে শুধু মুসলিমদের মনেই ছিল, তা নয়। বিজেপির বাইরের অনেক রাজনৈতিক দলের ও বিশ্লেষকদের মনেও একই প্রশ্ন ছিল। অনেক অভিজ্ঞ বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ভয় ছিল, এই আন্দোলন হয়তো আবার ‘আন্না হাজারে’-এর আন্দোলনের মতো হয়ে যেতে পারে। তাঁদের মতে, আন্না আন্দোলনই এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার কারণে ২০১৪ সালে বিজেপির ক্ষমতায় আসা সহজ হয়েছিল।

নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম এখন আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের নামে নিতে আগ্রহী নন; তাঁরা শুধু চান ভালো কোনো উদ্যোগ সফল হোক এবং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক।

তাই শুরু থেকেই অনেকে এই আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রল’-এর শুরুর দিকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল যে, এই আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ এখনো স্পষ্ট নয় এবং এটি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

এসব প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর আন্দোলন থেকে পুরোপুরি দূরে সরে থাকা—দুটো এক জিনিস নয়।

প্রশ্ন তুলেও আন্দোলনে থাকা যায়

সমাজের অনেক মানুষ একসঙ্গে দুটি কাজই করেন। তারা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সমালোচনা করেন, বিতর্ক করেন—আবার সেই আন্দোলনে অংশও নেন। কিন্তু মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে দেখা যায়, এই সন্দেহের কারণেই তারা শেষ পর্যন্ত আন্দোলন থেকে দূরে থাকেন। রাষ্ট্রের চাপ বা হয়রানির ভয় না কমা পর্যন্ত তারা শুধু অপেক্ষাই করতে চান।

তবে সাধারণ মুসলিমদের অনেকেই কিন্তু অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনেক সাধারণ মুসলিম এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ছোট ব্যবসায়ীরা খাবার ও পানি বিলি করেছেন, অনেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও কাজ করেছেন।

তেমনই একজন হলেন গাজিয়াবাদের মুহাম্মদ জুনাইদ। তিনি ৬ জুন থেকে দিল্লির জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের পানি দেওয়া শুরু করেন। পরে খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসও সরবরাহ করেছেন। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, এই অংশগ্রহণের একটা ঝুঁকিও আছে। জুনাইদের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ তাঁকে আটকে রেখেছিল এবং উত্তর প্রদেশে থাকা তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও পুলিশ আটক করেছিল।

নীরব থাকার একটি সুবিধা

এই আন্দোলনে মুসলিম সংগঠনগুলোর চোখে পড়ার মতো কোনো উপস্থিতি ছিল না। এর ফলে একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাও পাওয়া গেছে।

সরকার চাইলেও এই আন্দোলনকে ‘হিন্দু-মুসলিম’ ইস্যু বানিয়ে মূল দাবি থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে পারেনি। যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক বিতর্কে রূপ দেওয়া রাজনীতির একটি পুরোনো কৌশল। কিন্তু এবার সরকারের জন্য সেটা করা বেশ কঠিন হয়েছে। তবে এই সুবিধাকে অজুহাত বানিয়ে ভবিষ্যতেও আন্দোলন থেকে দূরে থাকাটা মোটেই ঠিক হবে না।

শুরুতে যারা থাকে, তারাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে

যেকোনো বড় কাজের শুরুটা সবসময় কঠিন হয়। শুরুতে যারা আন্দোলনে যোগ দেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা তারাই নেন। কারণ তখন কেউ জানে না আন্দোলনটি সফল হবে কি না। যারা পরে যোগ দেন, তাঁদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যারা শুরুতেই এগিয়ে আসেন, তারাই সাধারণত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন।

যেকোনো সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্যি। অনিশ্চয়তার সময় যারা নিজেদের সময়, পরিচিতি ও সামর্থ্য নিয়ে সবার আগে এগিয়ে আসেন, তারা হয়তো ব্যর্থ হতে পারেন বা বিপদে পড়তে পারেন। কিন্তু তারাই যেকোনো আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পান। আর যারা সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন, তারা হয়তো ঝুঁকি কম নেন। কিন্তু আন্দোলনের গতিপথ বদলানোর সুযোগটাও তারা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন।

আমরা কি অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে গেছি

মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, সতর্ক থাকাটা যেন মুসলিম সমাজের একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রের চাপ অনেক প্রবীণ নেতাকে শিখিয়েছে যে, নিরাপদ থাকতে হলে যতটা সম্ভব আড়ালে থাকতে হবে। ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় কেন তাদের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতেও যে আমাদের একইভাবে চলতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

নতুন প্রজন্ম অন্যভাবে ভাবছে

অনেক তরুণ মুসলিম এখন আর প্রথমেই জানতে চান না যে, কোনো আন্দোলন মুসলিমদের জন্য কি না। বরং তাঁরা জানতে চান—আন্দোলনটি কি ন্যায়বিচারের পক্ষে? এটি কি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়? এটি কি দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে? মানুষের কথা বলার ও অংশ নেওয়ার সুযোগ কি আরও বাড়াবে? আমার কাছে এগুলোই বেশি জরুরি প্রশ্ন।

নিখুঁত না হলেও পাশে থাকা যায়

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনটি যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে, তা নয়। এটি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল নয়। এর পরিষ্কার কোনো আদর্শও এখনো তৈরি হয়নি। যেকোনো দ্রুত বড় হওয়া আন্দোলনের মতো এটিও ভুল করতে পারে, অন্যের প্রভাবে চলতে পারে বা ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয় না।

সাধারণ মুসলিমদের অনেকেই কিন্তু অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনেক সাধারণ মুসলিম এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ছোট ব্যবসায়ীরা খাবার ও পানি বিলি করেছেন, অনেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবেও কাজ করেছেন।

তা ছাড়া, কোনো আন্দোলনের প্রতিটি দাবি নিজের মতের সঙ্গে হুবহু না মিললে তার পাশে দাঁড়ানো যাবে না—এমন চিন্তাও ঠিক নয়। ভারতের মুসলিমদের সামনে আসল প্রশ্ন এটা নয় যে, প্রতিটি দাবি আমাদের সব চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে মিলছে কি না। আসল প্রশ্ন হলো—আমরা কি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়ার অংশীদার হতে চাই, নাকি দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেই যেতে চাই?

গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব সবার

কোনো সম্প্রদায় শুধু নিজের অধিকার রক্ষা করেই প্রভাবশালী হতে পারে না। যখন গণতন্ত্রের মূল নীতিগুলো চাপের মুখে পড়ে, তখন সেগুলোর পক্ষেও শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হয়। এর জন্য দরকার বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সাহস এবং কখনো কখনো ফলাফল কী হবে তা না জেনেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

আমি আশাবাদী। তার কারণ এই নয় যে দেশের সমস্যা কমে গেছে। বরং নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম এখন আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের নামে নিতে আগ্রহী নন; তাঁরা শুধু চান ভালো কোনো উদ্যোগ সফল হোক এবং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক।

এখন দায়িত্ব প্রবীণ নেতৃত্বের

এখন এই দায়িত্ব মুসলিম সমাজের প্রবীণ বা বয়স্ক নেতাদের। অভিজ্ঞতার আসল মূল্য শুধু অতীতের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মধ্যে নেই। বরং সময় যে বদলাচ্ছে তা বুঝতে পারা, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব নিয়ে ঝুঁকি নিতে সাহস জোগানো এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদের প্রস্তুত করাও অভিজ্ঞতার একটা বড় অংশ।

অভিজ্ঞতা এমন হওয়া উচিত, যা নতুন প্রজন্মকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অভিজ্ঞতা যেন এমন কোনো দেয়াল না হয়, যা তরুণদের গণতান্ত্রিক পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

হয়তো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাও এটাই। এটি শুধু রাজনীতির জন্যই নয়, মুসলিম সমাজের জন্যও বড় শিক্ষা। কারণ, সতর্কতা মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচায় ঠিকই; কিন্তু সেই সতর্কতা যদি সব সময় আমাদের থামিয়ে রাখে, তাহলে একসময় সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়।

  • রাশিদ আহমেদ: ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক

(দ্য স্ক্রল থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250

সম্পর্কিত