এম এম আকাশ

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস খাতের বাজার রক্ষায় একটি বড় বিজয়। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে এই ‘বিজয়’-এর ফাঁকিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুক্তির ফলে তারা যে ট্যারিফ বা শুল্ক কমিয়ে আমাদের তৈরি পোশাকের বাজার রক্ষা করেছে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। শেষ পর্যন্ত ১৫ শতাংশের সঙ্গে আরও ১৯ শতাংশ ট্যারিফ আমাদের ঠিকই দিতে হবে। তার মানে, আমেরিকা আমাদের খুব সুবিধাজনক বা প্রেফারেনশিয়াল কোনো অ্যাক্সেস দিচ্ছে না; বড়জোর আমাদের পণ্য বিক্রির একটি ন্যূনতম সুযোগ হয়তো জিইয়ে রাখল।
কিন্তু এই সামান্য সুবিধার বিনিময়ে আমরা কী হারালাম? আমরা হারালাম ১৮ কোটি মানুষের এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় দেশীয় বাজার, যা আমরা বিনা শর্তে তাদের হাতে তুলে দিলাম। বাণিজ্যের এই অসম খেলায় আমেরিকা তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাবে। শুল্কের হিসাব কষলে দেখা যায়, তাদের রপ্তানি থেকে আমরা যে শুল্ক আয় করব, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুল্ক তারা আমাদের রপ্তানি পণ্য থেকে আদায় করবে। সোজা কথায়, আমরা আমেরিকার কাছ থেকে যা পেলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে দিলাম। একটি নতজানু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, অনেকটা ব্ল্যাকমেইল করেই আমেরিকা তাদের ঘাটতি মেটানোর এই বাড়তি সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির জায়গাটি হলো আমাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড’ বা কৌশলগত বাণিজ্যের স্বাধীনতা হরণ। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের যেখানে কম দামে পণ্য পাওয়ার কথা, সেখান থেকেই তা কেনার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে আমাদের সেই পথ আটকে দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের সস্তায় জ্বালানি তেল, গম বা অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য চীন বা রাশিয়া থেকে আনতে হলে আমেরিকার অঘোষিত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেশি দাম দিয়ে হলেও আমেরিকা থেকে বোয়িং বিমান, সয়াবিন বা গম কিনতে আমাদের একপ্রকার বাধ্য করা হচ্ছে।
চুক্তির পরতে পরতে রয়েছে অসমতার ছাপ। তাদের পণ্য যখন আমাদের দেশে প্রবেশ করবে, তখন আমাদের মাননিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (বিএসটিআই) সেগুলোর মান যাচাই করতে পারবে না; তাদের দেওয়া ছাড়পত্রই আমাদের মেনে নিতে হবে। অথচ আমাদের পণ্য যখন তাদের বাজারে যাবে, তখন তারা ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ বা মানের অজুহাতে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার (অশুল্ক বাধা) দিয়ে তা আটকে দিতে পারবে।
এই চুক্তির শেকড় লুকিয়ে আছে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ যুদ্ধের মধ্যে। আমেরিকার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই চীন, ভারত, রাশিয়া বা ব্রিকস-এর বলয়ে চলে না যায়। তারা চায় বাংলাদেশ পুরোপুরি আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ুক। যে দেশ রাজনৈতিকভাবে বশ্যতা স্বীকার করে, কেবল তাদের ওপরেই এমন অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। মাল্টিল্যাটারাল ফ্রি-ট্রেড বা বহুপাক্ষিক মুক্তবাণিজ্যের যে স্বাধীনতা আমাদের ছিল, তা এখন আমেরিকার ‘গাইডেড ইন্টারেস্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত স্বার্থের বেড়াজালে বন্দি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক রাজনীতির মূল দর্শনই হলো থ্রেট বা ব্ল্যাকমেইল—যে মেনে নেবে, তাকে আরও চাপ দাও এবং চূড়ান্তভাবে চীনকে পরাজিত করো। ভারত কিন্তু আমেরিকার এই চাপের কাছে পুরোপুরি মাথা নত করেনি; তারা রাশিয়া থেকে ঠিকই সস্তায় তেল কিনছে এবং ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে দরকষাকষিতে কিছুটা পিছাতেও বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশকে সেই দরকষাকষির সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আমাদের সরকারও জাতীয় স্বার্থে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো আমেরিকাকে চিঠি লিখে আমাদের অনুমতি চাইতে হচ্ছে!
যে আমেরিকা সারাজীবন মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ফ্রি ট্রেডের সবক দিয়েছে, তারাই এখন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) ও মুক্তবাজার নীতি থেকে সরে আসছে। এটি চরম স্ববিরোধী। ‘এভরিথিং ফর মার্কেট’ নীতির কথা বলে আজ আমেরিকা নিজেই প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে। চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তারা আর পেরে উঠছে না। আমেরিকার লেবার কস্ট ও হাই-টেক কস্ট এতই বেড়ে গেছে যে, তাদের কম্পিটিটিভনেস বা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই চূড়ান্ত পর্যায়ে আমেরিকা ক্রমেই নিচে নামছে এবং চীন বড় হয়ে উঠছে। নিজের এই পতন ঠেকাতেই আমেরিকা এখন মরিয়া হয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করছে।
এই চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। গত ১৪ মার্চ ক্যাবের জ্বালানি সংকট নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারকে এই চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, চুক্তিতে ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ বা গোপনীয়তার শর্ত থাকায় পুরো চুক্তিটি কাউকেই দেখানো হয়নি। শুধু তার মন্ত্রণালয়ের অংশটুকু তাকে দেখানো হয়েছিল এবং সেখানে বিএসটিআই-এর ক্ষমতা খর্ব করার অসম শর্তটি দেখে তিনি আপত্তিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আপত্তি ধোপে টেকেনি। অন্যদিকে, এই চুক্তির নেপথ্যের রূপকার হিসেবে পরিচিত আমলাদেরই যখন পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। প্রবাদ আছে— ‘সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? আমাদের অর্থনীতিকে ইস্ট এশিয়ান মডেলে (চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া) ঢেলে সাজাতে হবে। দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে, ভূমি সংস্কার করতে হবে, কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে এবং ধনী গোষ্ঠীগুলোকে সুশাসনের আওতায় আনতে হবে।
আমরা যদি স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই, তবে আমেরিকার শর্তে তাদের হাই-টেক বা বিনিয়োগ দিয়ে তা সম্ভব নয়। আমাদের ডাইভার্সিফাইড মার্কেট বা বহুমুখী বাজারে যেতে হবে। সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল—সবার সঙ্গেই দরকষাকষি করতে হবে। যারা আমাদের পণ্য বেশি কিনবে এবং আমাদের কাছে সস্তায় পণ্য বিক্রি করবে, তাদের সাথেই আমাদের বাণিজ্য বাড়াতে হবে। কারো সঙ্গেই ‘জি-হুজুর’ নীতিতে চলা যাবে না।
আজ বিশ্ব আর একমেরুকেন্দ্রিক নেই; এটি এখন মাল্টিপোলার বা বহুমেরুর বিশ্ব। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে হবে। চুক্তিতে একবার স্বাক্ষর হয়ে গেলে তা বাতিল করা কঠিন। কিন্তু যে দেশে জনগণের কণ্ঠস্বর প্রবল, যে দেশের মানুষ নিজেদের শিল্প ধ্বংস করে চড়া দামে বিদেশি পণ্য কিনতে রাজি নয়, সেখানে এই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী চুক্তি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর দোদুল্যমানতা কাটিয়ে ওঠা এবং একটি ব্রড-বেসড অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট ও অ্যান্টি-নিওলিবারেল (সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া-উদারতাবাদ বিরোধী) যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা। জনগণকে বোঝাতে হবে যে, এই চুক্তি আমাদের কৃষি, শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এটি আমাদের নীতি-সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করে দেবে। একমাত্র সচেতন জনপ্রতিরোধ ও সংগ্রামই পারে দেশকে এই নব্য-উপনিবেশবাদী ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।
অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ, গবেষক; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস খাতের বাজার রক্ষায় একটি বড় বিজয়। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে এই ‘বিজয়’-এর ফাঁকিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুক্তির ফলে তারা যে ট্যারিফ বা শুল্ক কমিয়ে আমাদের তৈরি পোশাকের বাজার রক্ষা করেছে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। শেষ পর্যন্ত ১৫ শতাংশের সঙ্গে আরও ১৯ শতাংশ ট্যারিফ আমাদের ঠিকই দিতে হবে। তার মানে, আমেরিকা আমাদের খুব সুবিধাজনক বা প্রেফারেনশিয়াল কোনো অ্যাক্সেস দিচ্ছে না; বড়জোর আমাদের পণ্য বিক্রির একটি ন্যূনতম সুযোগ হয়তো জিইয়ে রাখল।
কিন্তু এই সামান্য সুবিধার বিনিময়ে আমরা কী হারালাম? আমরা হারালাম ১৮ কোটি মানুষের এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় দেশীয় বাজার, যা আমরা বিনা শর্তে তাদের হাতে তুলে দিলাম। বাণিজ্যের এই অসম খেলায় আমেরিকা তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাবে। শুল্কের হিসাব কষলে দেখা যায়, তাদের রপ্তানি থেকে আমরা যে শুল্ক আয় করব, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুল্ক তারা আমাদের রপ্তানি পণ্য থেকে আদায় করবে। সোজা কথায়, আমরা আমেরিকার কাছ থেকে যা পেলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে দিলাম। একটি নতজানু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, অনেকটা ব্ল্যাকমেইল করেই আমেরিকা তাদের ঘাটতি মেটানোর এই বাড়তি সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির জায়গাটি হলো আমাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড’ বা কৌশলগত বাণিজ্যের স্বাধীনতা হরণ। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের যেখানে কম দামে পণ্য পাওয়ার কথা, সেখান থেকেই তা কেনার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে আমাদের সেই পথ আটকে দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের সস্তায় জ্বালানি তেল, গম বা অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য চীন বা রাশিয়া থেকে আনতে হলে আমেরিকার অঘোষিত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেশি দাম দিয়ে হলেও আমেরিকা থেকে বোয়িং বিমান, সয়াবিন বা গম কিনতে আমাদের একপ্রকার বাধ্য করা হচ্ছে।
চুক্তির পরতে পরতে রয়েছে অসমতার ছাপ। তাদের পণ্য যখন আমাদের দেশে প্রবেশ করবে, তখন আমাদের মাননিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (বিএসটিআই) সেগুলোর মান যাচাই করতে পারবে না; তাদের দেওয়া ছাড়পত্রই আমাদের মেনে নিতে হবে। অথচ আমাদের পণ্য যখন তাদের বাজারে যাবে, তখন তারা ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ বা মানের অজুহাতে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার (অশুল্ক বাধা) দিয়ে তা আটকে দিতে পারবে।
এই চুক্তির শেকড় লুকিয়ে আছে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ যুদ্ধের মধ্যে। আমেরিকার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই চীন, ভারত, রাশিয়া বা ব্রিকস-এর বলয়ে চলে না যায়। তারা চায় বাংলাদেশ পুরোপুরি আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ুক। যে দেশ রাজনৈতিকভাবে বশ্যতা স্বীকার করে, কেবল তাদের ওপরেই এমন অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। মাল্টিল্যাটারাল ফ্রি-ট্রেড বা বহুপাক্ষিক মুক্তবাণিজ্যের যে স্বাধীনতা আমাদের ছিল, তা এখন আমেরিকার ‘গাইডেড ইন্টারেস্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত স্বার্থের বেড়াজালে বন্দি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক রাজনীতির মূল দর্শনই হলো থ্রেট বা ব্ল্যাকমেইল—যে মেনে নেবে, তাকে আরও চাপ দাও এবং চূড়ান্তভাবে চীনকে পরাজিত করো। ভারত কিন্তু আমেরিকার এই চাপের কাছে পুরোপুরি মাথা নত করেনি; তারা রাশিয়া থেকে ঠিকই সস্তায় তেল কিনছে এবং ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে দরকষাকষিতে কিছুটা পিছাতেও বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশকে সেই দরকষাকষির সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আমাদের সরকারও জাতীয় স্বার্থে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো আমেরিকাকে চিঠি লিখে আমাদের অনুমতি চাইতে হচ্ছে!
যে আমেরিকা সারাজীবন মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ফ্রি ট্রেডের সবক দিয়েছে, তারাই এখন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) ও মুক্তবাজার নীতি থেকে সরে আসছে। এটি চরম স্ববিরোধী। ‘এভরিথিং ফর মার্কেট’ নীতির কথা বলে আজ আমেরিকা নিজেই প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে। চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তারা আর পেরে উঠছে না। আমেরিকার লেবার কস্ট ও হাই-টেক কস্ট এতই বেড়ে গেছে যে, তাদের কম্পিটিটিভনেস বা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই চূড়ান্ত পর্যায়ে আমেরিকা ক্রমেই নিচে নামছে এবং চীন বড় হয়ে উঠছে। নিজের এই পতন ঠেকাতেই আমেরিকা এখন মরিয়া হয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করছে।
এই চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। গত ১৪ মার্চ ক্যাবের জ্বালানি সংকট নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারকে এই চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, চুক্তিতে ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ বা গোপনীয়তার শর্ত থাকায় পুরো চুক্তিটি কাউকেই দেখানো হয়নি। শুধু তার মন্ত্রণালয়ের অংশটুকু তাকে দেখানো হয়েছিল এবং সেখানে বিএসটিআই-এর ক্ষমতা খর্ব করার অসম শর্তটি দেখে তিনি আপত্তিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আপত্তি ধোপে টেকেনি। অন্যদিকে, এই চুক্তির নেপথ্যের রূপকার হিসেবে পরিচিত আমলাদেরই যখন পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। প্রবাদ আছে— ‘সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? আমাদের অর্থনীতিকে ইস্ট এশিয়ান মডেলে (চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া) ঢেলে সাজাতে হবে। দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে, ভূমি সংস্কার করতে হবে, কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে এবং ধনী গোষ্ঠীগুলোকে সুশাসনের আওতায় আনতে হবে।
আমরা যদি স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই, তবে আমেরিকার শর্তে তাদের হাই-টেক বা বিনিয়োগ দিয়ে তা সম্ভব নয়। আমাদের ডাইভার্সিফাইড মার্কেট বা বহুমুখী বাজারে যেতে হবে। সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল—সবার সঙ্গেই দরকষাকষি করতে হবে। যারা আমাদের পণ্য বেশি কিনবে এবং আমাদের কাছে সস্তায় পণ্য বিক্রি করবে, তাদের সাথেই আমাদের বাণিজ্য বাড়াতে হবে। কারো সঙ্গেই ‘জি-হুজুর’ নীতিতে চলা যাবে না।
আজ বিশ্ব আর একমেরুকেন্দ্রিক নেই; এটি এখন মাল্টিপোলার বা বহুমেরুর বিশ্ব। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে হবে। চুক্তিতে একবার স্বাক্ষর হয়ে গেলে তা বাতিল করা কঠিন। কিন্তু যে দেশে জনগণের কণ্ঠস্বর প্রবল, যে দেশের মানুষ নিজেদের শিল্প ধ্বংস করে চড়া দামে বিদেশি পণ্য কিনতে রাজি নয়, সেখানে এই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী চুক্তি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর দোদুল্যমানতা কাটিয়ে ওঠা এবং একটি ব্রড-বেসড অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট ও অ্যান্টি-নিওলিবারেল (সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া-উদারতাবাদ বিরোধী) যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা। জনগণকে বোঝাতে হবে যে, এই চুক্তি আমাদের কৃষি, শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এটি আমাদের নীতি-সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করে দেবে। একমাত্র সচেতন জনপ্রতিরোধ ও সংগ্রামই পারে দেশকে এই নব্য-উপনিবেশবাদী ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।
অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ, গবেষক; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ব্যক্তি ও পরিবার যেভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলায়, সরকার সেভাবে মেলাবে না, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে এটা বেশি করে প্রযোজ্য। আমাদের তো উন্নয়নের চাহিদা এখনও বিরাট। কিছুটা উন্নয়ন দেখতে পেলে এর চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পর আমরা আবার সহজেই জানতে পার
২ ঘণ্টা আগে
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থান ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা দেশটির নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। দেশের প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণে নদীটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
রেহান আসিফ আসাদ, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি পেশাদার। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আগে বুধবার (১০ জুন) স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে তিনি তুলে ধরেছেন সিম ট্যাক্স, স্টার্টআপ তহবিল, ডেটা সেন্টারসহ ডিজিটাল অবকাঠামো ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা।
১৮ ঘণ্টা আগে
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে পাঠানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এই তথ্য জানাচ্ছে খোদ বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)।
২০ ঘণ্টা আগে