আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

অবশেষে জুয়েল হাসান সাদ্দাম ফিরলেন প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। ফিরলেন ৯ মাস বয়সী পুত্র সেজানের কাছে। কিন্তু ফিরতে হলো তাদের কবরের কাছে। দেশবাসীকে ছুঁয়েছে তাঁর মায়ের আক্ষেপ—‘এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া সমান। বাড়ি এসে দেখবে ছেলে–বউয়ের কবর। তাহলে এই জামিন দিয়ে কী হবে?’
আমাদেরও প্রশ্ন—জামিনটা পরে হতে পারলে, আগে হলো না কেন? স্ত্রী–সন্তানের মৃত্যুর তিন দিন পরে যদি সে জামিন পাওয়ার যোগ্য হয়, তাহলে তিন দিনের আগে হলো না কেন? স্ত্রী–সন্তানকে শেষ বিদায়ের জন্য তাকে অন্তত প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলো না কেন? বাধাটা তাহলে কোথায়? সেটা আইনের? নাকি এটাই রাজনীতি—আইনের দোহাই মাত্র? চলুন, একটু বিশ্লেষণ করা যাক।
জামিন কি অধিকার? হ্যাঁ, জামিনযোগ্য মামলায় মৌলিকভাবে তাই। তবে সে অধিকার কিছু শর্তসাপেক্ষ। আদালতের নির্দেশমতো হাজির না হলে, প্রভাব খাটানোর ঝুঁকি থাকলে, সাক্ষী ভয় পেলে, বিচার ব্যাহত হলে—অধিকার থামে।
অন্যদিকে, জামিন মানে অপরাধীর মুক্তি নয়। আইনের ভাষায়, এটি কিছু শর্ত সাপেক্ষে বিচার পর্যন্ত স্বাধীন থাকার সুযোগ। আইন বলে—দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ। সাদ্দাম কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়নি। জামিনবঞ্চিত বন্দীদের জন্য জরুরি ও মানবিক বিবেচনায় ‘প্যারোল’-এর বিশেষ বিধান রয়েছে। সব সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে এই বিধান প্রচলিত।
আইনের চোখে প্যারোলটা তাহলে কী? এ সুযোগ কে পায়? কখন পায়? এটা কি অধিকার? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যাক।
‘প্যারোল’ একটি ফরাসি শব্দ। এর অর্থ ‘প্রতিশ্রুতি’। আইনে বিশেষ শর্তে কারাবন্দীর সাময়িক মুক্তির নাম প্যারোল। বাংলাদেশে প্যারোল কোনো দয়া নয়। আবার নাগরিক অধিকারও নয়। এটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়। তবে সেই বিবেচনা আইন ও যুক্তির বাইরে নয়।
প্যারোলের মূল উৎস বা ভিত্তি হলো ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি। এই বিধির ৪০১(১) ধারা সরকারকে বিনা শর্তে বা শর্তসাপেক্ষে কোনো সাজাপ্রাপ্তের সম্পূর্ণ বা আংশিক সাজা স্থগিত বা তাকে মুক্তির পূর্ণ ক্ষমতা দেয়। তবে শর্ত ভঙ্গ করলে পুলিশ তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারে [ধারা ৪০১(৩)]। আর সরকার প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন বা আদেশ জারির মাধ্যমে এই পুরো বিষয়টি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করবে [ধারা ৪০১(৬)]। এই ধারার আলোকে ২০১৬ সালের ১ জুন প্রকাশ পায় ‘প্যারোল মুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালা’, যা প্যারোলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা।
এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিকটাত্মীয়ের (বাবা–মা, স্বামী–স্ত্রী, সন্তান, ভাই–বোন, শ্বশুর–শাশুড়ি) মৃত্যুতে জানাজা বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু ছাড়াও আদালতের আদেশ বা সরকারি বিশেষ সিদ্ধান্তেও ওই মুক্তি সম্ভব। সাধারণত ওই মুক্তির মেয়াদ হয় সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা। তবে সরকার চাইলে ওই সময়সীমা কম–বেশি করতে পারে।
আগেই বলেছি, প্যারোল কোনো ‘অধিকার’ নয়; বরং এটি সরকার বা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। মূলত সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’। এ ব্যবস্থায় মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীকে সারাক্ষণ পুলিশ পাহারায় থাকতে হয়। পুলিশ কারাগারের ফটক থেকে তাকে বুঝে নিয়ে আবার নির্ধারিত সময়ে ফেরত দেয়।
প্যারোলের আবেদন অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো বন্দীর নিরাপত্তা ও গন্তব্যস্থলের দূরত্ব। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বন্দীকে প্যারোলে মুক্তির আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
সাদ্দামের পরিবার বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে। কারণ মামলা বাগেরহাটে। তাদের বাড়ি বাগেরহাটে। তাকে প্রথমে রাখাও হয়েছিল বাগেরহাট কারাগারে। পরে যশোর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কেন করা হয়, কেউ জানে না। আবেদনের পর বাগেরহাট ডিসি অফিস বলেছে—বন্দী যশোর কারাগারে, তাই তাদের প্যারোলের এখতিয়ার নেই। আবেদন নিয়ে পরিবার গেল বাগেরহাট কারাগারে। জেলার বলল—আমরা আদেশ বাস্তবায়ন করি, দিই না। যশোর ডিসি অফিস বলেছে—আবেদন আসেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে—আবেদন হয়নি। যশোর কারাগার বলছে—আবেদন বা আদেশ নেই। পরিবারের মৌখিক আবেদনে মানবিক বিবেচনায় কারা ফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দোষ বা ভুলটা তাহলে কার? কেন এমন নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ অমানবিক ঘটনার জন্ম হলো?
২০১৬ সালের প্যারোল নীতিমালার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো বন্দী যদি জেলার কেন্দ্রীয়, জেলা বা বিশেষ কারাগার বা সাবজেলে আটক থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই জেলার অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। অপরদিকে, কোনো বন্দী যদি নিজ জেলার বাইরে অন্য জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়, জেলা বা বিশেষ কারাগার বা সাবজেলে আটক থাকেন, তাহলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনায় ‘মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ’ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। সাদ্দামের ঘটনায় ধোঁয়াশাটা এখানেই—এখানে ‘মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ’ কে? সাদ্দামের নিজ জেলা বাগেরহাটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, না কি যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট? সে তো বাগেরহাট থেকে যশোর কারাগারে ‘স্থানান্তরিত বন্দী’।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সাদ্দামের প্যারোলের আবেদনটি ভুল জেলায় করা হয়েছে। ২০১৬ সালের নীতিমালার কোথাও বলা নেই—ভুল জেলায় আবেদন হলে তা গ্রহণ করা যাবে না। বরং সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ বলছে—আবেদন গ্রহণ করতে হবে। যুক্তিসংগত সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্য কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার হলে ফরওয়ার্ড করতে হবে।
অন্যদিকে, বাগেরহাট থেকে যশোরের দূরত্বটা বেশ লম্বা। যোগাযোগ ব্যবস্থা বা রাস্তাঘাটও যথেষ্ট খারাপ। তাই সেখানে গিয়ে আবেদন করাটা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ওই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য লাশ দাফন ও জানাজার মতো ‘অতীব জরুরি’ ও স্পর্শকাতর বিষয় কতক্ষণ আটকে রাখা যাবে? বাগেরহাটের ডিসি অফিস চাইলে বিষয়টি ‘জরুরি ও স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় ফোনেই যশোর ডিসি অফিসকে জানাতে পারতেন। কিংবা ই-মেইলে, হোয়াটসঅ্যাপে বা অন্য কোনো মেসেঞ্জারে ৩০ সেকেন্ডেই আবেদনটি ফরওয়ার্ড করতে পারতেন। সময় ছিল। ইচ্ছা ছিল না। এটাই মূল অভিযোগ।
এটি শুধু একটি প্যারোল নয়। এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। অনেকে বলছেন—সাদ্দাম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। একটি মামলার জামিন আদেশ কারাগারে পৌঁছালে আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এভাবে তার মাথায় এখন ১১টি মামলার খড়গ। রাষ্ট্র প্রয়োজনে কঠোর হতেই পারে। কিন্তু কঠোরতা আর নিষ্ঠুরতা এক নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ বলছে—কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শিকার করা যাবে না। বিচারাধীন বন্দী হলেও না। সাদ্দামের এই ঘটনা সংবিধানসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সম্পূর্ণ নির্লজ্জ লঙ্ঘন।
অথচ পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে রাজনৈতিক বন্দীসহ বিভিন্ন কারাবন্দীর প্যারোলে মুক্তির দৃষ্টান্ত প্রচুর। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে সামরিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্যারোলের একটি বড় উদাহরণ। তাছাড়া কোভিডে হাজারো বন্দী ছাড়া পেয়েছেন। অথচ এখানে—স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের একই দিনে মৃত্যু হলো। বন্দীকে শেষ বিদায় জানানো, জানাজা ও দাফন–কাফন—সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হলো।
প্রহসন হলো—২৬ জানুয়ারি, চাপে পড়ে ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে সাদ্দামকে জামিন দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটা এখানেই—কার জামিন হবে, আর কার হবে না—তা কি অপরাধের ওজন মাপে? নাকি আইন মাপে? নাকি পরিচয়ের ভারে? কিংবা জনমতের চাপে?
যখন স্ত্রী–পুত্রের লাশের বিনিময়ে জামিনের খবর আসে, তখন মনে হয়—মৃত্যুরও কি দরকষাকষি হয়? কাগজে–কলমে হয়তো তা নয়। কিন্তু বাস্তবতা? একটি মৃত্যু আমাদের কাঁদায়। দুটি মৃত্যু আমাদের থামিয়ে দেয়। কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু—এটি সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তখন এটি আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ছায়া ফেলে।
প্রশাসন দায় এড়াতে শিখে গেছে। আর সাধারণ মানুষ দিশেহারা। আজ সাদ্দাম। কাল অন্য কেউ। আইন যদি কেবল কাগজে থাকে, আর মানুষ যদি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে মরে—তাহলে সেটি আইন নয়। সেটি কেবল ক্ষমতার ভাষা।

অবশেষে জুয়েল হাসান সাদ্দাম ফিরলেন প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। ফিরলেন ৯ মাস বয়সী পুত্র সেজানের কাছে। কিন্তু ফিরতে হলো তাদের কবরের কাছে। দেশবাসীকে ছুঁয়েছে তাঁর মায়ের আক্ষেপ—‘এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া সমান। বাড়ি এসে দেখবে ছেলে–বউয়ের কবর। তাহলে এই জামিন দিয়ে কী হবে?’
আমাদেরও প্রশ্ন—জামিনটা পরে হতে পারলে, আগে হলো না কেন? স্ত্রী–সন্তানের মৃত্যুর তিন দিন পরে যদি সে জামিন পাওয়ার যোগ্য হয়, তাহলে তিন দিনের আগে হলো না কেন? স্ত্রী–সন্তানকে শেষ বিদায়ের জন্য তাকে অন্তত প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলো না কেন? বাধাটা তাহলে কোথায়? সেটা আইনের? নাকি এটাই রাজনীতি—আইনের দোহাই মাত্র? চলুন, একটু বিশ্লেষণ করা যাক।
জামিন কি অধিকার? হ্যাঁ, জামিনযোগ্য মামলায় মৌলিকভাবে তাই। তবে সে অধিকার কিছু শর্তসাপেক্ষ। আদালতের নির্দেশমতো হাজির না হলে, প্রভাব খাটানোর ঝুঁকি থাকলে, সাক্ষী ভয় পেলে, বিচার ব্যাহত হলে—অধিকার থামে।
অন্যদিকে, জামিন মানে অপরাধীর মুক্তি নয়। আইনের ভাষায়, এটি কিছু শর্ত সাপেক্ষে বিচার পর্যন্ত স্বাধীন থাকার সুযোগ। আইন বলে—দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ। সাদ্দাম কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়নি। জামিনবঞ্চিত বন্দীদের জন্য জরুরি ও মানবিক বিবেচনায় ‘প্যারোল’-এর বিশেষ বিধান রয়েছে। সব সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে এই বিধান প্রচলিত।
আইনের চোখে প্যারোলটা তাহলে কী? এ সুযোগ কে পায়? কখন পায়? এটা কি অধিকার? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যাক।
‘প্যারোল’ একটি ফরাসি শব্দ। এর অর্থ ‘প্রতিশ্রুতি’। আইনে বিশেষ শর্তে কারাবন্দীর সাময়িক মুক্তির নাম প্যারোল। বাংলাদেশে প্যারোল কোনো দয়া নয়। আবার নাগরিক অধিকারও নয়। এটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়। তবে সেই বিবেচনা আইন ও যুক্তির বাইরে নয়।
প্যারোলের মূল উৎস বা ভিত্তি হলো ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি। এই বিধির ৪০১(১) ধারা সরকারকে বিনা শর্তে বা শর্তসাপেক্ষে কোনো সাজাপ্রাপ্তের সম্পূর্ণ বা আংশিক সাজা স্থগিত বা তাকে মুক্তির পূর্ণ ক্ষমতা দেয়। তবে শর্ত ভঙ্গ করলে পুলিশ তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারে [ধারা ৪০১(৩)]। আর সরকার প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন বা আদেশ জারির মাধ্যমে এই পুরো বিষয়টি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করবে [ধারা ৪০১(৬)]। এই ধারার আলোকে ২০১৬ সালের ১ জুন প্রকাশ পায় ‘প্যারোল মুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালা’, যা প্যারোলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা।
এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিকটাত্মীয়ের (বাবা–মা, স্বামী–স্ত্রী, সন্তান, ভাই–বোন, শ্বশুর–শাশুড়ি) মৃত্যুতে জানাজা বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু ছাড়াও আদালতের আদেশ বা সরকারি বিশেষ সিদ্ধান্তেও ওই মুক্তি সম্ভব। সাধারণত ওই মুক্তির মেয়াদ হয় সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা। তবে সরকার চাইলে ওই সময়সীমা কম–বেশি করতে পারে।
আগেই বলেছি, প্যারোল কোনো ‘অধিকার’ নয়; বরং এটি সরকার বা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। মূলত সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’। এ ব্যবস্থায় মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীকে সারাক্ষণ পুলিশ পাহারায় থাকতে হয়। পুলিশ কারাগারের ফটক থেকে তাকে বুঝে নিয়ে আবার নির্ধারিত সময়ে ফেরত দেয়।
প্যারোলের আবেদন অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো বন্দীর নিরাপত্তা ও গন্তব্যস্থলের দূরত্ব। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বন্দীকে প্যারোলে মুক্তির আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
সাদ্দামের পরিবার বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে। কারণ মামলা বাগেরহাটে। তাদের বাড়ি বাগেরহাটে। তাকে প্রথমে রাখাও হয়েছিল বাগেরহাট কারাগারে। পরে যশোর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কেন করা হয়, কেউ জানে না। আবেদনের পর বাগেরহাট ডিসি অফিস বলেছে—বন্দী যশোর কারাগারে, তাই তাদের প্যারোলের এখতিয়ার নেই। আবেদন নিয়ে পরিবার গেল বাগেরহাট কারাগারে। জেলার বলল—আমরা আদেশ বাস্তবায়ন করি, দিই না। যশোর ডিসি অফিস বলেছে—আবেদন আসেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে—আবেদন হয়নি। যশোর কারাগার বলছে—আবেদন বা আদেশ নেই। পরিবারের মৌখিক আবেদনে মানবিক বিবেচনায় কারা ফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দোষ বা ভুলটা তাহলে কার? কেন এমন নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ অমানবিক ঘটনার জন্ম হলো?
২০১৬ সালের প্যারোল নীতিমালার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো বন্দী যদি জেলার কেন্দ্রীয়, জেলা বা বিশেষ কারাগার বা সাবজেলে আটক থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই জেলার অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। অপরদিকে, কোনো বন্দী যদি নিজ জেলার বাইরে অন্য জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়, জেলা বা বিশেষ কারাগার বা সাবজেলে আটক থাকেন, তাহলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনায় ‘মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ’ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। সাদ্দামের ঘটনায় ধোঁয়াশাটা এখানেই—এখানে ‘মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ’ কে? সাদ্দামের নিজ জেলা বাগেরহাটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, না কি যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট? সে তো বাগেরহাট থেকে যশোর কারাগারে ‘স্থানান্তরিত বন্দী’।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সাদ্দামের প্যারোলের আবেদনটি ভুল জেলায় করা হয়েছে। ২০১৬ সালের নীতিমালার কোথাও বলা নেই—ভুল জেলায় আবেদন হলে তা গ্রহণ করা যাবে না। বরং সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ বলছে—আবেদন গ্রহণ করতে হবে। যুক্তিসংগত সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্য কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার হলে ফরওয়ার্ড করতে হবে।
অন্যদিকে, বাগেরহাট থেকে যশোরের দূরত্বটা বেশ লম্বা। যোগাযোগ ব্যবস্থা বা রাস্তাঘাটও যথেষ্ট খারাপ। তাই সেখানে গিয়ে আবেদন করাটা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ওই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য লাশ দাফন ও জানাজার মতো ‘অতীব জরুরি’ ও স্পর্শকাতর বিষয় কতক্ষণ আটকে রাখা যাবে? বাগেরহাটের ডিসি অফিস চাইলে বিষয়টি ‘জরুরি ও স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় ফোনেই যশোর ডিসি অফিসকে জানাতে পারতেন। কিংবা ই-মেইলে, হোয়াটসঅ্যাপে বা অন্য কোনো মেসেঞ্জারে ৩০ সেকেন্ডেই আবেদনটি ফরওয়ার্ড করতে পারতেন। সময় ছিল। ইচ্ছা ছিল না। এটাই মূল অভিযোগ।
এটি শুধু একটি প্যারোল নয়। এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। অনেকে বলছেন—সাদ্দাম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। একটি মামলার জামিন আদেশ কারাগারে পৌঁছালে আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এভাবে তার মাথায় এখন ১১টি মামলার খড়গ। রাষ্ট্র প্রয়োজনে কঠোর হতেই পারে। কিন্তু কঠোরতা আর নিষ্ঠুরতা এক নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ বলছে—কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শিকার করা যাবে না। বিচারাধীন বন্দী হলেও না। সাদ্দামের এই ঘটনা সংবিধানসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সম্পূর্ণ নির্লজ্জ লঙ্ঘন।
অথচ পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে রাজনৈতিক বন্দীসহ বিভিন্ন কারাবন্দীর প্যারোলে মুক্তির দৃষ্টান্ত প্রচুর। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে সামরিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্যারোলের একটি বড় উদাহরণ। তাছাড়া কোভিডে হাজারো বন্দী ছাড়া পেয়েছেন। অথচ এখানে—স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের একই দিনে মৃত্যু হলো। বন্দীকে শেষ বিদায় জানানো, জানাজা ও দাফন–কাফন—সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হলো।
প্রহসন হলো—২৬ জানুয়ারি, চাপে পড়ে ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে সাদ্দামকে জামিন দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটা এখানেই—কার জামিন হবে, আর কার হবে না—তা কি অপরাধের ওজন মাপে? নাকি আইন মাপে? নাকি পরিচয়ের ভারে? কিংবা জনমতের চাপে?
যখন স্ত্রী–পুত্রের লাশের বিনিময়ে জামিনের খবর আসে, তখন মনে হয়—মৃত্যুরও কি দরকষাকষি হয়? কাগজে–কলমে হয়তো তা নয়। কিন্তু বাস্তবতা? একটি মৃত্যু আমাদের কাঁদায়। দুটি মৃত্যু আমাদের থামিয়ে দেয়। কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু—এটি সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তখন এটি আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ছায়া ফেলে।
প্রশাসন দায় এড়াতে শিখে গেছে। আর সাধারণ মানুষ দিশেহারা। আজ সাদ্দাম। কাল অন্য কেউ। আইন যদি কেবল কাগজে থাকে, আর মানুষ যদি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে মরে—তাহলে সেটি আইন নয়। সেটি কেবল ক্ষমতার ভাষা।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা—স
৪ ঘণ্টা আগে
ঢাকার একটি চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে তিনজন মধ্যবয়সী মানুষ মোবাইলের পর্দায় একটি ভিডিও দেখছিলেন। স্ক্রিনে একজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতা কথা বলছেন। তার গলার আওয়াজ, মুখের ভাব, এমনকি বলার ঢং পর্যন্ত সম্পূর্ণ আসল নেতার মতো। কিন্তু কথার বিষয়বস্তু? এসব তিনি কখনো বলেননি। ভিডিওটি বানানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধি
১০ ঘণ্টা আগে
দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। সমসাময়িক রাজনীতি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন পথচলা এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
২ দিন আগে
গণমাধ্যম চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা ছিল পাহাড়সম। গণমাধ্যমের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ, মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ সবসময়ই ছিল। সব ক্ষেত্রে সেই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না।
৩ দিন আগে