সুকুকে বিপুল আগ্রহ এবং প্রকল্পের স্বচ্ছতার প্রশ্ন

ফরহাদ জাকারিয়া
ফরহাদ জাকারিয়া

স্ট্রিম গ্রাফিক

সুকুক বন্ডের প্রতি যে বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ রয়েছে, সর্বশেষ নিলামে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এই বন্ডের নিলাম এর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আটবার। প্রতিবারই লক্ষ করা গেছে এ আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগকারীদের সমান আগ্রহ। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সুকুকের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ কি শুধু আকর্ষণীয় মুনাফা এবং মূল টাকা ফেরত পাওয়ার সরকারি গ্যারান্টির কারণে?

উত্তর সম্ভবত, না। বলাবাহুল্য, সঞ্চয়পত্রের মতো সরকারি আর্থিক পণ্য বহু আগে থেকেই রয়েছে বাজারে। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে এ খাতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্বক। এ ধারা অব্যাহত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরেও। অর্থাৎ আকর্ষণীয় মুনাফা এবং মেয়াদান্তে মূল টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেও এ আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগকারীরা আরও কিছু প্রত্যাশা করেন কিনা, সে প্রশ্ন এখন উঠবে সঙ্গত কারণেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এ দেশে গত তিন দশকে ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের বিকাশ ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এ খাতে শুধু আমানত কিংবা ঋণ স্থিতিরই প্রবৃদ্ধি হয়নি; বেড়েছে পরিপূর্ণ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক। সম্ভবত এ সাফল্যই প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকেও উদ্বুদ্ধ করেছে আলাদা ইসলামী ব্যাংকিং শাখা কিংবা একই শাখার অভ্যন্তরে ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালুতে। এর প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে মানুষ। এ থেকে স্পষ্ট, ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে ধর্মপ্রাণ মানুষের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই চায় শরীয়াহ অনুমোদিত অর্থব্যবস্থা এবং আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করতে।

অস্বীকার করা যাবে না, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী ধারার ব্যাংকব্যবস্থা, আর্থিক পণ্য ও অর্থায়নের বিস্তার ঘটেছে মূলত বেসরকারি উদ্যোগে; বেসরকারি ব্যাংক ও কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ২০২০ সালে সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ সুবিধা শুরুর আগে দেশে বেসরকারি খাত ছাড়া শরীয়াহ অনুমোদিত সরকারি কোনো আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। অথচ অন্যান্য মুসলিম দেশে সরকারি এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে আরও আগে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ থাকলে খাতটির বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হতো বলেই বিশ্বাস।

অস্বীকার করা যাবে না, বাস্তব কিছু কারণে ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইসলামী ধারার বেশ কিছু ব্যাংক। তারল্য সংকটেও রয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। তবে এর অর্থ এই নয়, শরীয়াহসম্মত আর্থিক পণ্যে আগ্রহ কমেছে মানুষের। বরং দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। আংশিক ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ছে আমানত; প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঋণ স্থিতিতেও। তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অংশ ২৭ শতাংশ। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আগামীতেও। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা অত্যুক্তি নয়, সরকারি উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক পণ্য উদ্ভাবন খাতটির ভিত্তিকে বরং শক্তিশালী করবে। সুকুক বন্ড ইস্যুর মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে।

অবশ্য মনে রাখা দরকার, সঞ্চয়পত্র সম্পর্কে মানুষ যেভাবে জানে; সুকুক সম্পর্কে সাধারণের ধারণা ততটাই অপ্রতুল। এমনকি সুস্পষ্ট ধারণার ঘাটতি রয়েছে ব্যাংক খাতে নিয়োজিত কর্মীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশে। জনসাধারণের সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাংককর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের পদক্ষেপও প্রত্যাশিত। এর বার্তা জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা যথেষ্ট মনে হয় না। যদিও নিলামে বিড হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের কয়েকগুণ, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ ব্যাপারে জানাবোঝা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এ পণ্যেও আগ্রহ কমলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সংশ্লিষ্ট সবার জানা, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয় সরকার। ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণের বড় একটি অংশ নিত সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। কয়েক বছর ধরে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। এ পরিস্থিতিতে নবম সুকুক বন্ডের নিলামে যে পরিমাণ বিড হয়েছে, তাতে অবশ্য আশান্বিত হতে পারেন নীতিনির্ধারকরা। তথ্যমতে, এই বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বাজার থেকে ৫৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেছে সরকার। সরকার সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে এ ধারায় ঋণ করলে তার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের চাহিদা হয়তো মেটানো সম্ভব হবে; কিন্তু ব্যাংক খাতে এর একটা প্রভাব পড়বে বলেই মনে হয়। এজন্য এই উৎস থেকে সরকার ঠিক কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করবে, সেই সিদ্ধান্তও নিতে হবে ভেবেচিন্তে।

আমরা এখনো একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে পারিনি। এটি করা গেলে নানাভাবে সুফল পেত দেশের অর্থনীতি। সুকুক কি আমাদের বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে বাড়তি কোনো ভূমিকা রাখবে?

সুকুক বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। আমাদের দেশে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট পণ্য ক্রয় এবং সে ক্ষেত্রে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। কোনো প্রকল্প ঘিরে যে পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে, বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কতটুকু? এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এমন আর্থিক পণ্যেও তৈরি হতে পারে অনাগ্রহ। ধারণামতে, বন্ড হোল্ডাররা মালিকানার অংশ হিসেবে পাবেন প্রকল্পের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রকল্পের আয়-ব্যয় সম্পর্কে তাদের কি অবহিত করা হবে? এ ধরনের উদ্যোগ এ পণ্যের প্রতি মানুষের আস্থাকে সুদৃঢ় করতে রাখবে যথাযথ ভূমিকা।

স্বল্প মেয়াদের জন্য সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা না হলেও সুকুক বন্ড ইস্যু করা হয়েছে সম্প্রতি। মনে রাখা দরকার, দেশের ব্যাংক খাত রয়েছে তারল্য সংকটে। চাহিদামতো সময়ে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ টাকা ফেরত না পাওয়ায় ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। সে ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত আর্থিক পণ্যে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ থাকবে স্বভাবতই। তবে সরকার যদি স্বল্পমেয়াদি বন্ডেও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা বিনিয়োগকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুযোগ অবারিত রাখে, তাহলে এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বৈকি। স্বল্পমেয়াদী বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে সরকার ব্যাপকভাবে অর্থ সংগ্রহ করলে বিশেষত ইসলামী ধারার ব্যাংক খাতের আমানতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কিনা, ভেবে দেখতে হবে সেটিও। এতে খাতটির বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিলে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন হয়ে ওঠে। সঞ্চয়পত্র কিংবা সুকুক বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে জনসাধারণ থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ অব্যাহত থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সাশ্রয়ী করা সহজ হবে না। উচ্চমূল্যের ঋণে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ হতাশাচ্ছন্ন বলা যায়। আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাস পেলে কিংবা নেতিবাচক হলে তার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি প্রবৃদ্ধিতে। অনস্বীকার্য, উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনীয়তা ও উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে। তবে অবিবেচনাপ্রসূত প্রকল্পের কারণে যেন কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখাতে হবে নীতিনির্ধারকদের।

আমরা এখনো একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে পারিনি। এটি করা গেলে নানাভাবে সুফল পেত দেশের অর্থনীতি। সুকুক কি আমাদের বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে বাড়তি কোনো ভূমিকা রাখবে? সরকারের আহরণ করা রাজস্বের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ব্যয় হয় সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধে। সে ক্ষেত্রে সুকুক বন্ডের পার্থক্য হলো, এর মুনাফা পরিশোধ হবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আয় থেকে। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কিন্তু লোকসান করার অনেক উদাহরণ রয়েছে দেশে। সুকুকের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ তৈরি হলে এমন আর্থিক পণ্য ইস্যুর মাধ্যমে ভবিষ্যতে অর্থ উত্তোলন কঠিন হবে বৈকি। সেজন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা এবং সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দিকে রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি।

সবচেয়ে বড় কথা, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এখন আর সঞ্চয় করতে পারছে না। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে নাভিশ্বাস উঠছে তাদের। একইসঙ্গে আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা চলমান দেশের ব্যাংক খাতে। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাতে আকর্ষণীয় আর্থিক পণ্য উদ্ভাবন সময়ের দাবি। মূলধন ফেরত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, আকর্ষণীয় মুনাফা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে শরীয়াহ অনুমোদিত আর্থিক পণ্যই প্রত্যাশিত অনেকের। যেসব দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে; সুকুকের বাইরেও আরও অনেক আর্থিক পণ্য রয়েছে তাদের। সুকুকের ধারাবাহিকতায় সরকারি উদ্যোগে ভোক্তাদের প্রত্যাশিত শরীয়াহ অনুমোদিত অন্যান্য আর্থিক পণ্য প্রচলনেও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেই আশা।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

Ad 300x250

সম্পর্কিত