তত্ত্বাবধায়কের ফিরে আসা এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর তর্ক

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৮: ১৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সংসদেই ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। মাঝখানে ব্যবধান ১৫ বছর। পরবর্তী ১৩ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে নির্বাচনি ব্যবস্থায় তৈরি হয় পরপর তিনটি ‘ব্ল্যাকহোল’—যার চূড়ান্ত পরিণতি জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগের পতন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, অতএব এটি অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি—এই যুক্তিতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে এই পদ্ধতিটি বাতিল করে দেয়া হয়। অথচ দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে না—এই যুক্তিতেই রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল।

কী এমন ঘটনা ঘটেছিল যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুক্ত হওয়া বিধানটি গণতন্ত্রের দোহাই বাতিল করে দিতে হলো? তার উত্তর খুব সহজ। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জয় সুনিশ্চিত করা। এখানে গণতন্ত্র নিছকই একটি অজুহাত। এমনকি সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন, সেখানেও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছিল কি না—এই প্রশ্নও উঠেছে। তাছাড়া যে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত এখন বলছেন যে গণতন্ত্র নিজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। অতএব এই মৌলিক কাঠামো সুরক্ষার স্বার্থেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এসেছিল।

সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বলতে কী বুঝায়? এই বিষয়ে নানা মত রয়েছে। মতভিন্নতাও প্রবল। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ‘সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য’ শিরোনামে একটি নতুন অনুচ্ছেদ (৭খ) যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয় যে সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রজাতন্ত্র, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানা, রাষ্ট্রধর্ম, রাষ্ট্রভাষা, জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক, জাতির পিতার প্রতিকৃতিসহ প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ; সংবিধানের ৪ মূলনীতি, সুযোগের সমতা, নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণসহ দ্বিতীয় ভাগের সব অনুচ্ছেদ; চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতাসহ তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের সব অনুচ্ছেদ এবং নবম-ক ভাগ অর্থাৎ জরুরি অবস্থা ঘোষণা; একাদশ ভাগের ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী সংশোধন করা যাবে না।

অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদগুলোকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে শুরু থেকেই এটি বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ পৃথিবীর কোনো দেশেই সংবিধানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে মৌলিক কাঠামো বলে ঘোষণা করা হয়েছে কি না সন্দেহ। তাছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এমন কিছু বিধানকেও মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলো সংশোধন অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যেসব বিধান সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন বা সংশোধন হতে পারে। কিছু অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সংশোধন এমনকি বাতিলেরও প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে এমন অনেক বিধানকে মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে যা শুধু রাজনৈতিক নয় বরং কিছু গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।

২০১৭ সালে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করা সম্পর্কিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে (পৃষ্ঠা ৩৪৮) আইনের শাসনকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে।

ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনই ছিল এর উদ্দেশ্য। ফলে এই সংশোধনীকে গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত হয়েছিল সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। সেটিকে অবৈধ বলে দেয়া রায়টি বাতিল করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ২০ নভেম্বর এই রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। এরপরই পঞ্চদশ সংশোধনীরও অংশবিশেষ বাতিল করা হয়—যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটিও রয়েছে। তার মানে, পরপর দুটি রায়ের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে—এটিই আইনের যুক্তি। কিন্তু এটিও ঠিক যে, এখন বল সংসদের কোর্টে। সংসদ অষ্টাদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংবিধানে যুক্ত না করলে বিতর্কের সুযোগ থেকে যাবে। আইনমন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন যে তারা জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানে সংশোধন আনবেন। অবশ্য জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে পদ্ধতি বলা হয়েছে সেটি অত্যন্ত জটিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাস্তব। ফলে সংসদকেই এটা ঠিক করতে হবে যে এই সরকারের গঠন প্রক্রিয়া কী হবে এবং কারা এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা হতে পারবেন বা পারবেন না। এসব নিয়ে সংসদে কী ধরনের বিতর্ক হয় সেটি সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তার আগে মৌলিক কাঠামোর মীমাংসা করা দরকার।

উল্লেখ্য, আপিল বিভাগে ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়ের আপিল শুনানিতে অধিকাংশ অ্যামিকাস কিউরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখা ব্যাপারে মতামত দিয়েছিলেন। সিনিয়র আইনজীবী টি এইচ খান বলেছিলেন,‘ভোট ছিনতাই রোধ করার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কত বছর বলবৎ থাকা উচিত—আদালতের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন— পঞ্চাশ বছর (ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়, পৃষ্ঠা ২৯)।

সিনিয়র আইনজীবী মাহমুদুল ইসলাম বলেছিলেন, বাংলাদেশের জনগণের বর্তমান রাজনৈতিক পরিপক্কতা অনুযায়ী দেশের ও সংবিধানের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বল্প সময়ের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থগিত রাখা দোষের নয়।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়েও আপিল বিভাগ বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হলেও এর পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে আদালত বলছেন, নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী এবং এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা দরকার যাতে সব সময়ই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হয়। সাথে সাথে সর্বোচ্চ আদালত এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত না জাতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংসদ অপরিপক্কই থেকে যাবে।

সবশেষ গত বছরের ২০ নভেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনীর রিভিউয়ের আলোকে আপিল বিভাগের দিকে নজর দেয়া যাক। রায়ে বলা হয়েছে, মূলত এই যুক্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলা হয়েছিল যে, এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—বিশেষ করে জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্র লঙ্ঘন করেছে। কারণ, এই সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচিত নয় এমন ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য হওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল। যুক্তি ছিল, এতে একজন দায়িত্বে থাকা প্রধান বিচারপতি ভবিষ্যতে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনায় প্রভাবিত হতে পারেন এবং এর ফলে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে।

কিন্তু এখন এই আদালতের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে যে ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকেই শক্তিশালী করেছিল। আর গণতন্ত্র নিজেই সংবিধানের একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক কাঠামো। তাছাড়া সংশোধনীটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে প্রতীয়মান হয় যে এটি দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে গড়ে ওঠা বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের ফল। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বৈধতা-সংকটের একটি সাংবিধানিক সমাধান নিশ্চিত করা।

ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনই ছিল এর উদ্দেশ্য। ফলে এই সংশোধনীকে গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সুতরাং গণতন্ত্রই শেষ কথা হলে তার স্বার্থেই সংবিধানে এমন একটি বিধান থাকা বাঞ্ছনীয় যে বিধানের আলোকে নির্বাচনকালীন এমন একটি পদ্ধতি থাকবে যেখান থেকে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে না। অর্থাৎ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীদের জয়ী হওয়া, ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা কিংবা আমি-ডামির নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে এটা নিশ্চিত করা যায় না। অতএব এমন একটি মধ্যবর্তী ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে যেখানে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না। আবার কারো জন্য নির্বাচনের মাঠ অনেক বেশি উঁচুনিচুও হবে না। সেই পদ্ধতির নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি অন্তর্বর্তী—সেই আলোচনা বরং সংসদেই হোক। কিন্তু গণতন্ত্র আর আদালতের দোহাই দিয়ে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়া হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি দেশের মানুষ চায় না। এর দ্বারা রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দেশের মানুষের।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত