আমীন আল রশীদ

যখন এই লেখা লিখছি, তার দুই-তিন ঘণ্টা বাদেই জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করার কথা অর্থমন্ত্রীর। আর এই ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে আমাদের বাসায় গ্যাস নেই। কেন্দ্রীয় লাইনে ত্রুটি নাকি আমাদের ভবনে, সেটি এখনও জানা যায়নি। বাড়ির মালিক জানালেন যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, বৃষ্টি হলেই তারপরে দীর্ঘ সময় এরকম গ্যাস না থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের এই বাসায় আগেও হয়েছে। সুতরাং বৃষ্টির সঙ্গে গ্যাস লাইনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এটি হচ্ছে ঢাকা শহরের একজন সাধারণ নাগরিকের গ্যাস নিয়ে নিয়মিত ভোগান্তির একটি খণ্ডচিত্র—যাকে প্রতি মাসে সরকারের বেঁধে দেয়া এক হাজার ৮০ টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়, আবার দিনের একটি বড় সময় গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হয়। তাতে মাস শেষে বিদ্যুতের বিল বাড়ে। আবার বিদ্যুতেরও ঝামেলা হলে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে আনতে হয়। তাতে মাসের খাবার খরচও বেড়ে যায়। সেবা না পেয়েও তার মূল্য পরিশোধের এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক নিয়ম কেবল পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারীদেরকেই মেনে নিতে হয়। এর কোনো প্রতিকার নেই। রাষ্ট্রও এর জন্য কখনো দুঃখ বা লজ্জাবোধ করেছে বলে শোনা যায়নি।
শুধুমাত্র গ্যাসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে কত টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়, সে বিষয়ে একটা গবেষণা হতে পারে। যদিও এই মানুষদের জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে আয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। আয় ও ব্যয়ের এই যে ভারসাম্যহীনতা, সেটিকে ম্যানেজ করার নামই বাজেট—যা বাস্তবায়ন যেকোনো সরকারের জন্যই বিরাট চ্যালেঞ্জ।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে গত ৭ জুন। এর তিন দিন পরে ১০ জুন অর্থাৎ বাজেট পেশ করার আগের দিন জাতীয় সংসদের বৈঠকে দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার আগের দিনও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে এমপিদের সমালোচনার মুখে পড়েন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও তার নিজ জেলা ভোলায় গ্যাস থাকলেও সেখানকার মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বলে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১০ জুন বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের আলোচনা হয়। নাটোরের এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার তাঁর এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগের দাবির জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের সবার শ্বশুরবাড়ি আছে। সিলেটে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে সিলেটের দামান, আর নাটোরে গেলে আমাকে বলে নাটোরের জামাই। নাটোর বাংলা ভাষার গালির জায়গা, আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে তো গ্যাস দিতেই হবে।’
দেশে বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট আসলে অনেক দিন ধরেই রসিকতার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সংসদে যেদিন শ্বশুরবাড়ি নিয়ে এমন রসিকতা হলো, সেদিনই ঝালকাঠি শহরের একজন গ্রাহকের সঙ্গে বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির এটি ফোনালাপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই অডিও কলটি আসল নাকি বানানো, সেটি অন্য তর্ক। তবে এরকম ফোনকলের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। বিশেষ করে যারা মফস্বল শহরে বড় হয়েছি। এই ঝালকাঠি শহরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিদ্যুৎ অফিস ভাঙচুর করবার দৃশ্যও দেখেছি।
সময়ের সাথে সাথে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এখনও বিরাট ফারাক। এর খেসারত দিতে হয় ঢাকার বাইরে ছোট শহর ও গ্রাম এলাকার মানুষকে। অনেক জায়গায় এখন দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না বলে গত ৯ জুন সংসদে আক্ষেপ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বিদ্যুৎমন্ত্রী।
মত ও দ্বিমতের এই স্বাধীনতার মধ্যেই অবশ্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। দুই তৃতীয়াংশ ভোটারের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের কিছুদিন পরে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। সিস্টেম লস বা চুরি কমিয়ে বিদ্যুতের লোকসান কমানো হবে। এর তিন মাসের মাথায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। মাত্র তিন মাসের মধ্যে সরকার কেন নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এলো? বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে কি সরকারের উপায় ছিল না? সরকার ওই সিদ্ধান্তের কিছুটা পরিবর্তন করে জানিয়েছে, গ্রাহক পর্যায়ে যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের দাম বাড়ানো হবে না। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলো নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হলেও, সেখানে অগ্রগতি কতটুকু? গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাই বা কতটুকু বাড়ানো হচ্ছে?
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে থেকেই উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের কারণে বেড়ে যায় জ্বালানির দাম। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তেলের সংকট দেখা দেয় নানা দেশে। এর ঢেউ এসে লাগে বাংলাদেশেও। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুই দফায় বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। গ্যাসের এই সংকট কেন হবে? বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কেন উচ্চমূল্যে কেনা তেলনির্ভর হবে? বিদ্যুৎ উৎপাদনের সস্তা মাধ্যম গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে রাষ্ট্রের কতটা নজর আছে?
চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর পেছনে বড় কারণ গ্যাসের উৎপাদন কমে গেছে। মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অথচ যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার পরেও তৎপরতার সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। বরং এলএনজি আমদানির প্রতি সরকারের বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তি দেয়া হয় যে, গ্যাস অনুসন্ধান করে পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। ফলে অনুসন্ধান কার্যক্রমে খরচ করা অর্থ পুরোটাই অপচয় হতে পারে। আবার গ্যাস পাওয়া গেলে বিপুল লাভও হতে পারে। সরকার সেই ঝুঁকিটা নিতে চায়নি। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বিদ্যমান গ্যাস দিয়ে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাকিটা তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং এলএনজি আমদানি করে মোকাবেলা করতে চেয়েছে। এলএনজি একটি বিরাট ব্যবসা। যারা এই পণ্য আমদানির সাথে যুক্ত তারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়ার জন্য সরকার জ্বালানিকে আমদানিনির্ভর করেছে এমন অভিযোগও বেশ পুরোনো।
সাধারণত গ্যাস অনুসন্ধানের বৈশ্বিক সাফল্যের হার প্রতি সাত কূপে একটি। কিন্তু বাংলাদেশে এ অনুপাত প্রতি তিন কূপে একটি। গ্যাস অনুসন্ধানে প্রায় দ্বিগুণ সাফল্যের হার থাকা সত্ত্বেও দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ সেভাবে শুরু হয়নি। গত ১৫-২০ বছর যদি অব্যাহতভাবে গ্যাস অনুসন্ধান করা হলে অন্তত একটি নতুন ক্ষেত্রও হয়তো আবিষ্কৃত হতে পারতো। বাংলাদেশের মাটির নিচে যে গ্যাস রয়েছে, সে কথা প্রমাণিত। বেশি সম্ভাবনার জায়গায়ও গভীর অনুসন্ধান করা হয়নি। সাগরের মীমাংসিত ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকার নিজের করা টেন্ডারও বাতিল করেছে।
সবশেষ ১০ জুন জাতীয় সংসদে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে রসিকতার সময়ে জ্বালানিমন্ত্রীও বলেছেন, ‘এখন আমাদের দেশে গ্যাসের সঞ্চালন কমে যাচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকার গত ১৭-১৮ বছর একটা কূপও খনন করে নাই। নিয়মিত অনুসন্ধান চালানো হলে দেশে গ্যাস উৎপাদন আরও বাড়তে পারত।’ সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের পরও সমুদ্রের জ্বালানিসম্পদ কাজে লাগানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রশ্ন হলো, বিএনপি সরকার কী করছে বা কী করবে? জ্বালানিমন্ত্রী জানান, স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাদেশের অফশোর এবং অনশোর গ্যাস উত্তোলনের জন্য দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুতের কাঁচামাল জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির্ভর হয়ে গেলে উৎপাদন খরচ অনেক বাড়বে। আমদানির্ভরতা মানেই হলো ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা। গত ৫ জুন রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে—যা একটি বড় অশনিসংকেত। তিনি জানান, ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ ছিল যেখানে ২৫ শতাংশ, সেটি গত বছর এসে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে।
এই বছরের হিসাব পেলে হয়তো দেখা যাবে এটি ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এভাবে একসময় যদি ৯০ শতাংশ জ্বালানিই আমদানি করতে হয় তাহলে পুরো জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাবে এই খাতে। তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম আরও বাড়াতে হবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। সুতরাং জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের ভেতরে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও মনোযোগ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

যখন এই লেখা লিখছি, তার দুই-তিন ঘণ্টা বাদেই জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করার কথা অর্থমন্ত্রীর। আর এই ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে আমাদের বাসায় গ্যাস নেই। কেন্দ্রীয় লাইনে ত্রুটি নাকি আমাদের ভবনে, সেটি এখনও জানা যায়নি। বাড়ির মালিক জানালেন যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, বৃষ্টি হলেই তারপরে দীর্ঘ সময় এরকম গ্যাস না থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের এই বাসায় আগেও হয়েছে। সুতরাং বৃষ্টির সঙ্গে গ্যাস লাইনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এটি হচ্ছে ঢাকা শহরের একজন সাধারণ নাগরিকের গ্যাস নিয়ে নিয়মিত ভোগান্তির একটি খণ্ডচিত্র—যাকে প্রতি মাসে সরকারের বেঁধে দেয়া এক হাজার ৮০ টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়, আবার দিনের একটি বড় সময় গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হয়। তাতে মাস শেষে বিদ্যুতের বিল বাড়ে। আবার বিদ্যুতেরও ঝামেলা হলে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে আনতে হয়। তাতে মাসের খাবার খরচও বেড়ে যায়। সেবা না পেয়েও তার মূল্য পরিশোধের এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক নিয়ম কেবল পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারীদেরকেই মেনে নিতে হয়। এর কোনো প্রতিকার নেই। রাষ্ট্রও এর জন্য কখনো দুঃখ বা লজ্জাবোধ করেছে বলে শোনা যায়নি।
শুধুমাত্র গ্যাসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে কত টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়, সে বিষয়ে একটা গবেষণা হতে পারে। যদিও এই মানুষদের জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে আয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। আয় ও ব্যয়ের এই যে ভারসাম্যহীনতা, সেটিকে ম্যানেজ করার নামই বাজেট—যা বাস্তবায়ন যেকোনো সরকারের জন্যই বিরাট চ্যালেঞ্জ।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে গত ৭ জুন। এর তিন দিন পরে ১০ জুন অর্থাৎ বাজেট পেশ করার আগের দিন জাতীয় সংসদের বৈঠকে দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার আগের দিনও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে এমপিদের সমালোচনার মুখে পড়েন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও তার নিজ জেলা ভোলায় গ্যাস থাকলেও সেখানকার মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বলে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১০ জুন বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের আলোচনা হয়। নাটোরের এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার তাঁর এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগের দাবির জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের সবার শ্বশুরবাড়ি আছে। সিলেটে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে সিলেটের দামান, আর নাটোরে গেলে আমাকে বলে নাটোরের জামাই। নাটোর বাংলা ভাষার গালির জায়গা, আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে তো গ্যাস দিতেই হবে।’
দেশে বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট আসলে অনেক দিন ধরেই রসিকতার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সংসদে যেদিন শ্বশুরবাড়ি নিয়ে এমন রসিকতা হলো, সেদিনই ঝালকাঠি শহরের একজন গ্রাহকের সঙ্গে বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির এটি ফোনালাপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই অডিও কলটি আসল নাকি বানানো, সেটি অন্য তর্ক। তবে এরকম ফোনকলের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। বিশেষ করে যারা মফস্বল শহরে বড় হয়েছি। এই ঝালকাঠি শহরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিদ্যুৎ অফিস ভাঙচুর করবার দৃশ্যও দেখেছি।
সময়ের সাথে সাথে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এখনও বিরাট ফারাক। এর খেসারত দিতে হয় ঢাকার বাইরে ছোট শহর ও গ্রাম এলাকার মানুষকে। অনেক জায়গায় এখন দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না বলে গত ৯ জুন সংসদে আক্ষেপ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বিদ্যুৎমন্ত্রী।
মত ও দ্বিমতের এই স্বাধীনতার মধ্যেই অবশ্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। দুই তৃতীয়াংশ ভোটারের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের কিছুদিন পরে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। সিস্টেম লস বা চুরি কমিয়ে বিদ্যুতের লোকসান কমানো হবে। এর তিন মাসের মাথায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। মাত্র তিন মাসের মধ্যে সরকার কেন নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এলো? বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে কি সরকারের উপায় ছিল না? সরকার ওই সিদ্ধান্তের কিছুটা পরিবর্তন করে জানিয়েছে, গ্রাহক পর্যায়ে যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের দাম বাড়ানো হবে না। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলো নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হলেও, সেখানে অগ্রগতি কতটুকু? গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাই বা কতটুকু বাড়ানো হচ্ছে?
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে থেকেই উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের কারণে বেড়ে যায় জ্বালানির দাম। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তেলের সংকট দেখা দেয় নানা দেশে। এর ঢেউ এসে লাগে বাংলাদেশেও। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুই দফায় বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। গ্যাসের এই সংকট কেন হবে? বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কেন উচ্চমূল্যে কেনা তেলনির্ভর হবে? বিদ্যুৎ উৎপাদনের সস্তা মাধ্যম গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে রাষ্ট্রের কতটা নজর আছে?
চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর পেছনে বড় কারণ গ্যাসের উৎপাদন কমে গেছে। মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অথচ যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার পরেও তৎপরতার সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। বরং এলএনজি আমদানির প্রতি সরকারের বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তি দেয়া হয় যে, গ্যাস অনুসন্ধান করে পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। ফলে অনুসন্ধান কার্যক্রমে খরচ করা অর্থ পুরোটাই অপচয় হতে পারে। আবার গ্যাস পাওয়া গেলে বিপুল লাভও হতে পারে। সরকার সেই ঝুঁকিটা নিতে চায়নি। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বিদ্যমান গ্যাস দিয়ে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাকিটা তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং এলএনজি আমদানি করে মোকাবেলা করতে চেয়েছে। এলএনজি একটি বিরাট ব্যবসা। যারা এই পণ্য আমদানির সাথে যুক্ত তারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়ার জন্য সরকার জ্বালানিকে আমদানিনির্ভর করেছে এমন অভিযোগও বেশ পুরোনো।
সাধারণত গ্যাস অনুসন্ধানের বৈশ্বিক সাফল্যের হার প্রতি সাত কূপে একটি। কিন্তু বাংলাদেশে এ অনুপাত প্রতি তিন কূপে একটি। গ্যাস অনুসন্ধানে প্রায় দ্বিগুণ সাফল্যের হার থাকা সত্ত্বেও দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ সেভাবে শুরু হয়নি। গত ১৫-২০ বছর যদি অব্যাহতভাবে গ্যাস অনুসন্ধান করা হলে অন্তত একটি নতুন ক্ষেত্রও হয়তো আবিষ্কৃত হতে পারতো। বাংলাদেশের মাটির নিচে যে গ্যাস রয়েছে, সে কথা প্রমাণিত। বেশি সম্ভাবনার জায়গায়ও গভীর অনুসন্ধান করা হয়নি। সাগরের মীমাংসিত ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সরকার নিজের করা টেন্ডারও বাতিল করেছে।
সবশেষ ১০ জুন জাতীয় সংসদে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে রসিকতার সময়ে জ্বালানিমন্ত্রীও বলেছেন, ‘এখন আমাদের দেশে গ্যাসের সঞ্চালন কমে যাচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকার গত ১৭-১৮ বছর একটা কূপও খনন করে নাই। নিয়মিত অনুসন্ধান চালানো হলে দেশে গ্যাস উৎপাদন আরও বাড়তে পারত।’ সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের পরও সমুদ্রের জ্বালানিসম্পদ কাজে লাগানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রশ্ন হলো, বিএনপি সরকার কী করছে বা কী করবে? জ্বালানিমন্ত্রী জানান, স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাদেশের অফশোর এবং অনশোর গ্যাস উত্তোলনের জন্য দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুতের কাঁচামাল জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির্ভর হয়ে গেলে উৎপাদন খরচ অনেক বাড়বে। আমদানির্ভরতা মানেই হলো ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা। গত ৫ জুন রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে—যা একটি বড় অশনিসংকেত। তিনি জানান, ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ ছিল যেখানে ২৫ শতাংশ, সেটি গত বছর এসে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে।
এই বছরের হিসাব পেলে হয়তো দেখা যাবে এটি ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এভাবে একসময় যদি ৯০ শতাংশ জ্বালানিই আমদানি করতে হয় তাহলে পুরো জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাবে এই খাতে। তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম আরও বাড়াতে হবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। সুতরাং জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের ভেতরে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও মনোযোগ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

এই বাজেটে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ও ভালো উদ্যোগ রয়েছে, তবে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারকে সমানতালে অনেকগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
২ ঘণ্টা আগে
এমন এক সময়ে জাতীয় বাজেট পেশ করা হলো, যখন ব্যাংক খাতে অস্থিরতা বিরাজমান। এ সময়ে খাতটি ঘিরে বাজেটে এমন আশার আলো থাকা বরং দরকার ছিল, যাতে অস্থিরতা প্রশমিত হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে খাতটি। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে আমানতের ওপর আবগারি শুল্কে ছাড় এবং সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুঁজি জোগাতে ৪০ হাজার কোটি টাক
৩ ঘণ্টা আগে
এই বাজেটটি সাধারণ আর দশটা বাজেটের মতো নয়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে চলা বিনিয়োগ খরা, ব্যাংকিং খাতের সংকট, পুঁজিবাজারের দুর্দশা, বেকারত্ব ও বৈষম্য থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করার একটি ব্লু-প্রিন্ট হলো এই বাজেট। এটিকে কেবল এক বছরের পরিকল্পনা না ভেবে আগামী পাঁচ বছরের একটি ‘রোডম্যাপ’ হিসেবে দেখা উচিত।
৩ ঘণ্টা আগে
অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীর সড়কগুলো মানুষের মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে বললে ভুল হবে না। গত রোববার ভোরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা সোহেলি ইসলাম।
৪ ঘণ্টা আগে