বাংলাদেশের সাংবাদিকতা কি বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে

আহত দৈনিক সকালের রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির। স্ট্রিম ছবি

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যা ঘটেছে, সেটাকে আলাদা কোনো ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। জামায়াতে ইসলামীর একটি কর্মসূচি শেষে সংবাদ সংগ্রহের সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক মারধরের শিকার হন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত শোভাযাত্রার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিং চলার সময় তাঁদের ‘আওয়ামী লীগের সহযোগী’ বলে আক্রমণ করা হয়, এমনটাই জানা যায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে। ঘটনার পর সমালোচনার মুখে দুঃখ প্রকাশ করেই দায় সেরেছে দলটি।

এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটা দীর্ঘ ও ধারাবাহিক চিত্রের সাম্প্রতিকতম সংযোজন মাত্র। গত ডিসেম্বরে ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর জের ধরে উত্তেজিত জনতা প্রথম আলোডেইলি স্টারের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, পত্রিকা দুটিকে ‘ভারতের তোষামোদকারী’ ও ‘শেখ হাসিনার পক্ষাবলম্বী’ বলে অভিযুক্ত করে।

আল জাজিরা মিডিয়া ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে জেষ্ঠ্য সাংবাদিক এম আবুল কালাম আজাদ পর্যবেক্ষণ দেন, শেখ হাসিনার আমলে অন্তত জানা ছিল গণমাধ্যমের শত্রু কারা; তাঁর পতনের পর সেই চাপ মিটে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। এখন একাধিক পক্ষ রাতারাতি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং প্রত্যেকেই সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরি করছে।

জানুয়ারিতে নরসিংদীতে চাঁদাবাজির প্রতিবেদন করতে গিয়ে অন্তত দশজন সাংবাদিক স্থানীয় সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর হাতে আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুরে দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি সোহাগ খানকে হাতুড়ি ও ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হয়। একটি ক্লিনিকের চিকিৎসা-অবহেলা নিয়ে প্রতিবেদনের জের ধরে, যার আগের দিনই তিনি প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন। তাঁকে সাহায্য করতে যাওয়া আরও তিনজন সাংবাদিকও আহত হন।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এই প্রবণতা নিয়ে স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে সাংবাদিকদের ওপর গুরুতর হামলা বেড়েছে। পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মী দুই পক্ষের হাত থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া একাধিক নিউজরুমে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও আইনি অনিশ্চয়তা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন উভয়েই নের্তৃত্বহীন ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে, যাকে তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটি দৃষ্টান্ত বলে বর্ণনা করেছেন।

সাংবাদিকরা এতটাই সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন যে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতেও দ্বিধা বোধ করেন। প্রেস কার্ড সঙ্গে না রাখা, রাজনৈতিক সমাবেশ এড়িয়ে চলা, দলীয় সূত্র থেকে পাওয়া ছবির ওপর নির্ভর করা—এসব আচরণ এখন পেশাগত বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।

এই প্রবণতাকে বোঝার জন্য ফিলিপাইনের মাগুইনদানাও প্রদেশের দিকে একটু তাকানো দরকার। ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন আমপাতুয়ান পরিবারের দীর্ঘদিনের অপশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গভর্নর নির্বাচনে এসমায়েল মানগুদাদাতুর প্রার্থিতার কাগজ জমা দেওয়ার গাড়িবহরে অংশ নিয়েছিলেন বহু সাংবাদিক।

জামায়াতের হামলা, প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের পোড়া ভবন, নরসিংদী ও শরীয়তপুরের রক্তাক্ত প্রতিবেদকেরা—এগুলো আলাদা আলাদা খবর হিসেবে পড়লে গুরুত্ব হারিয়ে যায়। একসঙ্গে দেখলে এটি একটি প্রবণতা, যার ফলাফল হলো ধীরে ধীরে ঠিক করে দেওয়া—কে কথা বলার সাহস দেখাবে এবং কে নীরবতাকেই নিরাপদ আশ্রয় বলে বেছে নেবে।

সেই বহরকে শতাধিক অস্ত্রধারী থামিয়ে দেয়, তাদেরকে অপহরণ করে এবং সবাইকে হত্যা করা হয়। মোট ৫৮ জন নিহতের মধ্যে ৩২ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের নথিভুক্ত ইতিহাসে এটিই সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত সবচেয়ে বড় ও নৃশংস হামলা।

মৃতদেহগুলো পাহাড়ি এলাকায় তিনটি গর্ত খুড়ে এক্সক্যাভেটরের সাহায্যে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল প্রমাণ লোপাটের চেষ্টায়। বিচার পেতে সময় লেগেছিল দশ বছরের বেশি। ২০১৯ সালে আদালত মূল অভিযুক্ত আন্দাল আমপাতুয়ান জুনিয়র ও তাঁর ভাই জালদিকে দোষী সাব্যস্ত করে, যদিও মোট অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ খালাস পায়। সিপিজে নিজেই পরে মন্তব্য করেছে, এত বছর পরও এই মামলার ‘সমাধান হয়েছে’ বলাটা ছিল অতি তাড়াহুড়োয় নেওয়া সিদ্ধান্ত। কারণ ফিলিপাইনে গণমাধ্যমকর্মী হত্যার সংস্কৃতি তখনও অব্যাহত ছিল।

মাগুইনদানাওয়ের উত্তরাধিকার এখানে একটি মাত্র শব্দ—‘দায়মুক্তি’। সাংবাদিক হত্যার বিচার যখন দশকের পর দশক আটকে থাকে, তখন বার্তাটা স্পষ্ট হয়ে যায়—ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার মূল্য অপরিসীম, আর তার শাস্তিদাতাদের জবাবদিহির মূল্য প্রায় শূন্য।

বাংলাদেশ এখনও এই মাত্রার সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়নি। এই তুলনাটা যথাযথ মাত্রায় টানাই উচিত। কিন্তু যে উপাদানগুলো মাগুইনদানাওয়ের পথ তৈরি করেছিল—স্থানীয় ক্ষমতাবলয়ের অসহিষ্ণুতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব, এবং আক্রমণের পর বিচার না হওয়ার অভ্যাস—এই উপাদানগুলোর কয়েকটি বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রেও স্পষ্ট চোখে পড়ছে।

নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারমান তাঁদের প্রোপাগান্ডা মডেলে যে ‘ফ্ল্যাক ফিল্টার’ ধারণার কথা বলেছিলেন, তা এই প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। তাঁদের যুক্তি অনুযায়ী, ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করেও প্রভাবিত করতে পারে, যদি প্রতিটি অস্বস্তিকর প্রতিবেদনের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রতিক্রিয়া বা ‘ফ্ল্যাক’—আইনি মামলা, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, শারীরিক হামলা, অনলাইন আক্রমণ তৈরি করা যায়।

এই কৌশলের লক্ষ্য সাধারণত সত্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং প্রতিবেদনকে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা যাতে সাংবাদিক বা সম্পাদক নিজেই দ্বিতীয়বার ভাবেন প্রকাশের আগে। বাংলাদেশে গত কয়েক মাসে যা ঘটেছে, তাকে এই তত্ত্বের আলোকেই বিশ্লেষণ করা যায়—প্রতিটি হামলা, প্রতিটি অগ্নিসংযোগ, প্রতিটি সাইবার মামলা একসঙ্গে একটি খরচের তালিকা তৈরি করে, যা সাংবাদিকতাকে আরও সতর্ক, আরও নিরাপত্তা প্রবণ এবং কখনো কখনো আরও নীরব করে তোলে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়। সাংবাদিকতার কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, ক্ষমতাকে স্বস্তি দেওয়া নয়। যে মুহূর্তে একজন প্রতিবেদক ক্ষমতার কাছে সম্পূর্ণ ‘নিরাপদ’ হয়ে ওঠেন, সেই মুহূর্তে তাঁর কাজের সামাজিক মূল্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশে আজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে শারীরিক ঝুঁকি, আইনি জটিলতা এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার মাধ্যমে। যখন একজন সাংবাদিক নিজের পরিচয়পত্র গলায় ঝোলানোকেই নিরাপদ মনে করেন না, তখন সেটি শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার প্রশ্ন।

জামায়াতের হামলা, প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের পোড়া ভবন, নরসিংদী ও শরীয়তপুরের রক্তাক্ত প্রতিবেদকেরা—এগুলো আলাদা আলাদা খবর হিসেবে পড়লে গুরুত্ব হারিয়ে যায়। একসঙ্গে দেখলে এটি একটি প্রবণতা, যার ফলাফল হলো ধীরে ধীরে ঠিক করে দেওয়া—কে কথা বলার সাহস দেখাবে এবং কে নীরবতাকেই নিরাপদ আশ্রয় বলে বেছে নেবে।

মাগুইনদানাও আমাদের শিখিয়েছে, দায়মুক্তির সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় প্রতিটি ছোট হামলার পর, যখন জবাবদিহি দাবি করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ইচ্ছা বা সামর্থ্য অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি—এই প্রবণতাকে এখনই স্বীকৃতি দিয়ে তার প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি আরও একটি প্রজন্মকে নীরবতার ভাষা শিখতে হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত