মীর হুযাইফা আল মামদূহ

জশনে জুলুস বা ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন কেবল বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ইতিহাস ও চর্চার দিকে তাকালে দেখা যায়—মিশর, ইয়েমেন থেকে শুরু করে আফ্রিকার নানা দেশে যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনকে কেন্দ্র করে মিলাদ ও উৎসবের আয়োজন করা হয়ে আসছে। এটি সামগ্রিক মুসলিম ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিলাদ উদযাপনের ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু বহু মুসলমানের কাছে এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশের একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদযাপনের একটি গভীর ও সুস্পষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমের ৩০তম পারার সূরা আদ-দোহায় বলা হয়েছে—‘ওয়া আম্মা বিনি’মাতি রব্বিকা ফাহাদ্দিছ’। এর অর্থ হলো: ‘আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহ বা নেয়ামতের কথা আপনি প্রকাশ ও বর্ণনা করুন।’ একজন মুমিনের জীবনে পরম স্রষ্টার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলেন স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সারা জাহানের জন্য ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ অর্থাৎ বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও শান্তির প্রতীক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। মুসলিম হিসেবে মানবজাতি যে আত্মিক দিশা ও অনুগ্রহ পেয়েছে, সেই পরম প্রাপ্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। ফলত, যাঁর মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা অনুগ্রহ এলো, তাঁর আগমনের পুণ্যময় দিনটিতে আনন্দ প্রকাশ করা, শুকরিয়া জ্ঞাপন করা এবং আনন্দ-আয়োজন না করলে একজন বিশ্বাসী আর কখন তা করবে? এই আনন্দের প্রকাশ তাই কেবল সামাজিক উৎসব নয়। এটি রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্ব চিরায়তভাবেই প্রবল উৎসবপ্রবণ, আবেগপ্রবণ এবং আনন্দপ্রিয়। উৎসব এবং সম্মিলিত আনন্দের মধ্য দিয়েই এখানকার মানুষ নিজেদের জীবন ও ভাবকে প্রকাশ করতে ভালোবাসে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই জনপদে যখন ইসলামের আগমন ঘটে, তখন এখানকার স্থানীয় মানুষেরা কীর্তন, ভজন এবং ঢোল-তবলা সহযোগে পরম শক্তির বন্দনা শুনতে অভ্যস্ত ছিল। এই অঞ্চলের মানুষের সেই সুরপ্রেম ও আবেগী স্বভাবকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তৎকালীন সুফি-সাধক ও পীর-আউলিয়াগণ। তাঁরা মানুষের এই দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বকে জোরপূর্বক ধ্বংস বা নাকচ করেননি। সুর ও ভাব ঠিক রেখে আল্লাহর নামের জিকির, খোদার প্রশংসাগীতি, মরমি ভাবগান এবং ভক্তিমূলক কাওয়ালির প্রবর্তন করেছিলেন। সুরের মাধ্যমে তাঁরা মানুষের মনকে পরম করুণাময়ের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ এই অঞ্চলে ইসলামের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ইসলামী আধ্যাত্মিকতার নানা ধরনের মিথস্ক্রিয়া।
বস্তুত ধর্ম কোনো প্রাণহীন, শুষ্ক খোলস নয়। ধর্ম একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। তা প্রাত্যহিক পালনীয় রেওয়াজ ও সামাজিক অনুভূতির মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। মানুষের আধ্যাত্মিক বা আত্মিক তৃপ্তি একক কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেউ হয়তো নিবিষ্টভাবে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মাধ্যমেই স্রষ্টার সান্নিধ্যে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করেন। কিন্তু সমাজে এমন অনেকেই আছেন যাঁদের আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ঘটে গভীর সুর, ভাব ও ভক্তির প্রকাশে। তাঁরা মিলাদের সুর কিংবা মরমি বন্দনার মাধ্যমে আত্মিক সংযোগ অনুভব করেন। এখন যদি কোনো কঠোর ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কারও কাছ থেকে সেই সুর বা উৎসবের অনুভূতি ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তবে প্রকারান্তরে তাকে আধ্যাত্মিকভাবে নিঃস্ব ও শূন্য করে ফেলা হয়। মানুষের অন্তর্গত এই আত্মিক খোরাক হরণ করার কোনো বৈধ অধিকার কারও নেই।
আমাদের অঞ্চলের মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো তারা কাহিনী, গল্প ও আবেগী উপাদানে জড়িয়ে থাকতে পছন্দ করে। ঐতিহাসিকভাবেই এই জনপদ পুঁথিপাঠ ও মরমি আখ্যানের আবহে পরিবেষ্টিত ছিল। এ অঞ্চলের তৎকালীন ধর্মীয় নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের সেই আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা মেটানোর লক্ষ্যেই মিলাদের প্রচলন করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালেও দেখা যায়, মীর মশাররফ হোসেনের মতো লেখকেরা ‘বিষাদ সিন্ধু’র মতো সাহিত্য রচনা করে গেছেন। এই সৃষ্টি এখানকার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে বাংলা মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতি কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, আখ্যান, সঙ্গীত, স্মরণ ও সম্মিলিত আবেগের মধ্য দিয়েও তার প্রকাশ ঘটেছে।
অথচ বর্তমান সময়ে তথাকথিত সালাফি কিংবা অতি-রক্ষণশীল ধারা থেকে এসব পালনীয় রেওয়াজকে ‘বেদাত’ তকমা দিয়ে নির্বিচারে বাতিল ও স্তব্ধ করার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কোনো ধর্মীয় রেওয়াজকে নিজের ধর্মতাত্ত্বিক বিবেচনায় বিদআত মনে করতেই পারেন। মতভিন্নতা ইসলামী সমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু নিজের মতকে অন্যের ওপর বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যদি মিলাদ, জশনে জুলুস, শবে বরাত কিংবা শবেকদরের মতো ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজগুলোকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে চাওয়া হয়, তবে কার্যত এই অঞ্চলের মানুষের শত শত বছরের সাংস্কৃতিক ইসলামের সম্পূর্ণ ইতিহাসকেই মুছে ফেলা হবে। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে এটি একটি মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ। কারণ এর ফলে একজন বাঙালি মুসলমান যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং যে পারম্পর্যে তার ধর্মীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে, সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বা পূর্বপুরুষের ধারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। নিজের শেকড় ও সংস্কৃতি হারিয়ে মানুষ তার মুসলমানিত্বের শিকড়হীন এক শূন্যতায় গিয়ে পতিত হতে পারে।
একটি সমাজে ধর্মীয় মতভিন্নতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারও ব্যক্তিগত ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি মিলাদ বা জশনে জুলুস উদযাপনকে ‘বেদাত’ বা অনুচিত মনে হয়, তবে তিনি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে তা মনে করতেই পারেন। কিন্তু যখনই কেউ অন্যের বিশ্বাসের চর্চা ও ধর্মীয় আয়োজনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে চায়, হুমকি-ধামকি দেয় কিংবা নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে—তখন তা এক জঘন্য ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কারও বিশ্বাস ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চা হরণ করা যায় না, তেমনি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক নীতির আলোতেও তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব বিশ্বাস ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে দেশের সিংহভাগ মানুষ সালাফিদের মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট মতের হয়ে গেল, তবুও যদি দেশের মাত্র একজন মানুষও ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জশনে জুলুস পালন করতে চায়—তবে সরকারের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সেই একজন নাগরিকের ধর্মীয় বোঝাপড়া, আবেগ ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চার নিরাপত্তা প্রদান করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাবের অজুহাতে কারও আত্মিক চর্চাকে নস্যাৎ করার সুযোগ কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে থাকতে পারে না।
অবশ্যই ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে আইন ও জননিরাপত্তার ঊর্ধ্বে কোনো অনুষ্ঠান নয়। কোনো ধর্মীয় সমাবেশে জননিরাপত্তা, যান চলাচল বা অন্য নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র যুক্তিসঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হতে হবে আইন, কোনো গোষ্ঠীর ধর্মতাত্ত্বিক পছন্দ বা হুমকি নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো একটি ধর্মীয় মতকে সত্য বা মিথ্যা ঘোষণা করা নয়; বরং ভিন্ন মতের নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
সুতরাং, হুমকি-ধামকি ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি বন্ধ করে সকল নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের মূল কর্তব্য। আজ ঈদে মিলাদুন্নবী বা জশনে জুলুসের প্রশ্নটি তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি আরও বড় একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি নিজের ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অন্য নাগরিকের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চার ওপর veto প্রয়োগ করতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্তর অবশ্যই ‘না’ হতে হবে।
• মীর হুযাইফা আল মামদূহ: লেখক ও গবেষক

জশনে জুলুস বা ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন কেবল বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ইতিহাস ও চর্চার দিকে তাকালে দেখা যায়—মিশর, ইয়েমেন থেকে শুরু করে আফ্রিকার নানা দেশে যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনকে কেন্দ্র করে মিলাদ ও উৎসবের আয়োজন করা হয়ে আসছে। এটি সামগ্রিক মুসলিম ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিলাদ উদযাপনের ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু বহু মুসলমানের কাছে এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশের একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদযাপনের একটি গভীর ও সুস্পষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমের ৩০তম পারার সূরা আদ-দোহায় বলা হয়েছে—‘ওয়া আম্মা বিনি’মাতি রব্বিকা ফাহাদ্দিছ’। এর অর্থ হলো: ‘আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহ বা নেয়ামতের কথা আপনি প্রকাশ ও বর্ণনা করুন।’ একজন মুমিনের জীবনে পরম স্রষ্টার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলেন স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সারা জাহানের জন্য ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ অর্থাৎ বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও শান্তির প্রতীক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। মুসলিম হিসেবে মানবজাতি যে আত্মিক দিশা ও অনুগ্রহ পেয়েছে, সেই পরম প্রাপ্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। ফলত, যাঁর মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা অনুগ্রহ এলো, তাঁর আগমনের পুণ্যময় দিনটিতে আনন্দ প্রকাশ করা, শুকরিয়া জ্ঞাপন করা এবং আনন্দ-আয়োজন না করলে একজন বিশ্বাসী আর কখন তা করবে? এই আনন্দের প্রকাশ তাই কেবল সামাজিক উৎসব নয়। এটি রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্ব চিরায়তভাবেই প্রবল উৎসবপ্রবণ, আবেগপ্রবণ এবং আনন্দপ্রিয়। উৎসব এবং সম্মিলিত আনন্দের মধ্য দিয়েই এখানকার মানুষ নিজেদের জীবন ও ভাবকে প্রকাশ করতে ভালোবাসে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই জনপদে যখন ইসলামের আগমন ঘটে, তখন এখানকার স্থানীয় মানুষেরা কীর্তন, ভজন এবং ঢোল-তবলা সহযোগে পরম শক্তির বন্দনা শুনতে অভ্যস্ত ছিল। এই অঞ্চলের মানুষের সেই সুরপ্রেম ও আবেগী স্বভাবকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তৎকালীন সুফি-সাধক ও পীর-আউলিয়াগণ। তাঁরা মানুষের এই দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বকে জোরপূর্বক ধ্বংস বা নাকচ করেননি। সুর ও ভাব ঠিক রেখে আল্লাহর নামের জিকির, খোদার প্রশংসাগীতি, মরমি ভাবগান এবং ভক্তিমূলক কাওয়ালির প্রবর্তন করেছিলেন। সুরের মাধ্যমে তাঁরা মানুষের মনকে পরম করুণাময়ের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ এই অঞ্চলে ইসলামের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ইসলামী আধ্যাত্মিকতার নানা ধরনের মিথস্ক্রিয়া।
বস্তুত ধর্ম কোনো প্রাণহীন, শুষ্ক খোলস নয়। ধর্ম একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। তা প্রাত্যহিক পালনীয় রেওয়াজ ও সামাজিক অনুভূতির মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। মানুষের আধ্যাত্মিক বা আত্মিক তৃপ্তি একক কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেউ হয়তো নিবিষ্টভাবে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মাধ্যমেই স্রষ্টার সান্নিধ্যে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করেন। কিন্তু সমাজে এমন অনেকেই আছেন যাঁদের আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ঘটে গভীর সুর, ভাব ও ভক্তির প্রকাশে। তাঁরা মিলাদের সুর কিংবা মরমি বন্দনার মাধ্যমে আত্মিক সংযোগ অনুভব করেন। এখন যদি কোনো কঠোর ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কারও কাছ থেকে সেই সুর বা উৎসবের অনুভূতি ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তবে প্রকারান্তরে তাকে আধ্যাত্মিকভাবে নিঃস্ব ও শূন্য করে ফেলা হয়। মানুষের অন্তর্গত এই আত্মিক খোরাক হরণ করার কোনো বৈধ অধিকার কারও নেই।
আমাদের অঞ্চলের মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো তারা কাহিনী, গল্প ও আবেগী উপাদানে জড়িয়ে থাকতে পছন্দ করে। ঐতিহাসিকভাবেই এই জনপদ পুঁথিপাঠ ও মরমি আখ্যানের আবহে পরিবেষ্টিত ছিল। এ অঞ্চলের তৎকালীন ধর্মীয় নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের সেই আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষুধা মেটানোর লক্ষ্যেই মিলাদের প্রচলন করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালেও দেখা যায়, মীর মশাররফ হোসেনের মতো লেখকেরা ‘বিষাদ সিন্ধু’র মতো সাহিত্য রচনা করে গেছেন। এই সৃষ্টি এখানকার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে বাংলা মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতি কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, আখ্যান, সঙ্গীত, স্মরণ ও সম্মিলিত আবেগের মধ্য দিয়েও তার প্রকাশ ঘটেছে।
অথচ বর্তমান সময়ে তথাকথিত সালাফি কিংবা অতি-রক্ষণশীল ধারা থেকে এসব পালনীয় রেওয়াজকে ‘বেদাত’ তকমা দিয়ে নির্বিচারে বাতিল ও স্তব্ধ করার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কোনো ধর্মীয় রেওয়াজকে নিজের ধর্মতাত্ত্বিক বিবেচনায় বিদআত মনে করতেই পারেন। মতভিন্নতা ইসলামী সমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু নিজের মতকে অন্যের ওপর বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যদি মিলাদ, জশনে জুলুস, শবে বরাত কিংবা শবেকদরের মতো ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজগুলোকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে চাওয়া হয়, তবে কার্যত এই অঞ্চলের মানুষের শত শত বছরের সাংস্কৃতিক ইসলামের সম্পূর্ণ ইতিহাসকেই মুছে ফেলা হবে। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে এটি একটি মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ। কারণ এর ফলে একজন বাঙালি মুসলমান যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং যে পারম্পর্যে তার ধর্মীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে, সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বা পূর্বপুরুষের ধারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। নিজের শেকড় ও সংস্কৃতি হারিয়ে মানুষ তার মুসলমানিত্বের শিকড়হীন এক শূন্যতায় গিয়ে পতিত হতে পারে।
একটি সমাজে ধর্মীয় মতভিন্নতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারও ব্যক্তিগত ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি মিলাদ বা জশনে জুলুস উদযাপনকে ‘বেদাত’ বা অনুচিত মনে হয়, তবে তিনি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে তা মনে করতেই পারেন। কিন্তু যখনই কেউ অন্যের বিশ্বাসের চর্চা ও ধর্মীয় আয়োজনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে চায়, হুমকি-ধামকি দেয় কিংবা নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে—তখন তা এক জঘন্য ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কারও বিশ্বাস ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চা হরণ করা যায় না, তেমনি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক নীতির আলোতেও তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব বিশ্বাস ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে দেশের সিংহভাগ মানুষ সালাফিদের মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট মতের হয়ে গেল, তবুও যদি দেশের মাত্র একজন মানুষও ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জশনে জুলুস পালন করতে চায়—তবে সরকারের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সেই একজন নাগরিকের ধর্মীয় বোঝাপড়া, আবেগ ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চার নিরাপত্তা প্রদান করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাবের অজুহাতে কারও আত্মিক চর্চাকে নস্যাৎ করার সুযোগ কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে থাকতে পারে না।
অবশ্যই ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে আইন ও জননিরাপত্তার ঊর্ধ্বে কোনো অনুষ্ঠান নয়। কোনো ধর্মীয় সমাবেশে জননিরাপত্তা, যান চলাচল বা অন্য নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র যুক্তিসঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হতে হবে আইন, কোনো গোষ্ঠীর ধর্মতাত্ত্বিক পছন্দ বা হুমকি নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো একটি ধর্মীয় মতকে সত্য বা মিথ্যা ঘোষণা করা নয়; বরং ভিন্ন মতের নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
সুতরাং, হুমকি-ধামকি ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি বন্ধ করে সকল নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের মূল কর্তব্য। আজ ঈদে মিলাদুন্নবী বা জশনে জুলুসের প্রশ্নটি তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি আরও বড় একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি নিজের ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অন্য নাগরিকের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় চর্চার ওপর veto প্রয়োগ করতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্তর অবশ্যই ‘না’ হতে হবে।
• মীর হুযাইফা আল মামদূহ: লেখক ও গবেষক
.png)

মানুষের তৈরি সমস্ত শৃঙ্খল, বৈষম্য এবং দাসত্ব দূর করে একটি সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি কখনোই কোনো বংশগত রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্য বা ক্ষমতার মসনদ প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। প্রিয়নবীর (সা.) সুমহান আদর্শ ছিল মানুষ যেন শু
১২ মিনিট আগে
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনে আফরোজা খানম রিতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এটিকে শুধু মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হিসেবে না দেখে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।
১ দিন আগে
রোহিঙ্গা সংকট নয় বছর পেরিয়ে দশম বছরে পদার্পণ করলো। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ এর টেকসই সমাধানে একটুও এগোতে পারেনি। বিগত পুরো সময়টা জুড়ে প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদার যোগানোই যেন ছিল বাংলাদেশের প্রধান কাজ। নয় বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে নানা রকম টানাপোড়েনও দেখা যায়।
২৫ আগস্ট ২০২৬
কোক-পেপসি যেহেতু আলাদা বোতলে একই বস্তু, ফলে বর্জনীয়—কল্লোল মোস্তফার এই যুক্তিটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় লেগেছে। আপদ-বিপদ তত্ত্ব শুনেছি আগে, জ্বলন্ত চুলা-ফুটন্ত কড়াই ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। কিন্তু এটা আমার কাছেও নতুন একভাবে উপস্থাপন। এই উপমাটা আগে শুনিনি, ফলে ভালো লেগেছে।
২৪ আগস্ট ২০২৬