জেন-জি প্রজন্মের কাছে ‘ভালো চাকরি’ মানে কী

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ২৯
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

সকাল সাড়ে আটটা। ঢাকার রাস্তায় তখন তীব্র যানজট। মিরপুর থেকে বনানীতে অফিসে যাচ্ছেন তানভীর। কিছুদিন হলো চাকরিজীবনে পা রেখেছেন তিনি। অফিস শুরু নয়টায়। কিন্তু রাস্তায় বসে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হচ্ছে, দিনের শুরুটাই হলো যেন ক্লান্তি দিয়ে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। অফিস ছুটির সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে আবার বসের মেসেজ ‘এটা আজকেই দরকার।’

অফিসের বেতনও ফ্রেশার হিসেবে খারাপ নয়। কিন্তু তবুও দিনশেষে একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে, ‘এইভাবেই কি প্রতিদিন যাবে?’

তানভীরের এই ভাবনাটা শুধু তার একার নয়। কর্মজীবনে প্রবেশ করা নতুন প্রজন্ম জেনারেশন জেড বা জেন জি কাজকে মূল্যায়ন করছে নতুনভাবে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির মধ্যে বড় হয়েছে এই প্রজন্ম। তাই তাদের কাছে চাকরি মানে শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়া নয়। তারা জানতে চায়, কাজটা কেন করছি, কীভাবে করছি, কাদের সঙ্গে করছি এবং এই কাজ আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?

২০২৫ সালের র‍্যান্ডস্ট্যাড ওয়ার্কমনিটর ৩৫টি দেশের ২৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা জরিপে কর্মীদের এই পরিবর্তিত ভাবনাই উঠে এসেছে। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রেও তাই জেন জিদের জন্য নতুন ধরনের কাজের পরিবেশ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

ভালো বেতন মানেই ভালো চাকরি নয়

একসময় ভালো চাকরি বলতে আমরা বুঝতাম, ভালো বেতন, ভালো পোস্ট আর নামী প্রতিষ্ঠানে কাজ। এগুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টা এখন আর শুধু এই শর্তগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তাদের মতে, জীবনের জন্যই যেহেতু কাজ, তাই কাজের পাশাপাশি জীবনকেও সময় দেওয়া দরকার।

র‍্যান্ডস্ট্যাডের গবেষণায় ৮৩ শতাংশ কর্মী বলেছেন, তাদের কাছে ওয়ার্কলাইফ ব্যালেন্স বা কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ৮২ শতাংশ কর্মী বলেছেন, তাদের কাছে বেতন গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বেতনের তুলনায় আরও বেশি মানুষ এখন ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সকে’ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার দীর্ঘ যানজট পার হয়ে অফিসে যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বাড়তি সময় দিতে হয় কাজে। আবার অনেকের ছুটির দিনেও কাজ করতে হয় বা কাজের ফোন আসে; এক্ষেত্রে নিজের জন্য ব্যক্তিগত সময় থাকে না বললেই চলে। তাই জেন জিদের জন্য ভালো কর্মপরিবেশ মানে এই নয় যে তারা কাজ করতে চায় না। বরং তারা চায় কাজের সময় কাজ করতে, আর বাকী সময়টা নিজের মতো করে কাটাতে।

জেন-জি এমন জায়গায় কাজ করতে চায় যেখানে প্রশ্ন করলে তাকে বোকা ভাবা হবে না

অফিসে নতুন যোগ দেওয়া তরুণের হয়তো অভিজ্ঞতা কম। কিন্তু তার মানেই এই নয় যে কোনো বিষয়ে তার কোনো মতামত নেই বা কথা নেই। এই জেন জি প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে নিজের মত প্রকাশের সুযোগকে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখেন। তারা এমন জায়গায় কাজ করতে চায়, যেখানে প্রশ্ন করলে তাকে বোকা ভাবা হবে না, কোনো ভুল ধরিয়ে দিলে তাকে অপছন্দ করা হবে না। র‍্যান্ডস্ট্যাডের গবেষণায় ২০২৫ সালে ২৭ শতাংশ কর্মী বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে নিজের কথা বলতে স্বস্তি না পাওয়ার কারণে তারা চাকরি ছেড়েছেন। ৪৪ শতাংশ বলেছেন, টক্সিক বা বিষাক্ত কর্মপরিবেশের কারণে তারা চাকরি ছেড়েছেন। নতুন কর্ম পরিবেশ বলছে, একজন জুনিয়র কর্মী কোনো বিষয়ে ভিন্ন মত দিলে তার কথা শোনা যেতে পারে। তার যুক্তি ভুল হলে বোঝানো যেতে পারে। আবার সে ঠিক হলে তার কথাটাও গ্রহণ করতে হবে।

যুক্তি দিয়ে, সম্মান রেখে পেশাদারভাবে নিজের কথা বলাও কাজের সংস্কৃতির অংশ।

অফিস যেন শুধু কাজের জায়গা না হয়

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই অফিসে যাদের সঙ্গে সময় কাটানো হয়, তাদের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মী যদি অফিসে গিয়ে মনে করেন, ‘এখানে আমার কেউ নেই’, তাহলে শুধু বেতন দিয়ে তাকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন।

র‍্যান্ডস্ট্যাডের গবেষণায় ৮৩ শতাংশ কর্মী বলেছেন, তারা এমন কর্মক্ষেত্র চান যেখানে কমিউনিটি বা কর্ম পরিবেশ নিজের অনুকূলে থাকবে। ৫৫ শতাংশ বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে নিজেদের আপন মনে না হলে তারা চাকরি ছাড়ার কথা ভাববেন। বাংলাদেশের অফিসে তাই সহকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্মানের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

নতুন কেউ অফিসে যোগ দিলে তাকে একা ছেড়ে না দিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সিনিয়ররা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে জুনিয়রদের সাহায্য করতে পারেন। আবার জুনিয়ররাও প্রযুক্তি বা নতুন কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে সিনিয়রদের সাহায্য করতে পারে।

অর্থাৎ অফিসে শুধু “বস” আর “কর্মচারী” এমন সম্পর্ক না রেখে একসঙ্গে শেখার একটা পরিবেশ তৈরি করা দরকার।

শুধু চাকরি করব নাকি নতুন কিছু শিখব

আজকের দিনে শুধু একটা চাকরি পেলেই সব শেষ নয়। কারণ কাজের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশেষ করে এআই অনেক পেশায় নতুন পরিবর্তন আনছে।

আজ যে কাজটি একজন কর্মী করছেন, কয়েক বছর পর সেই কাজের একটা অংশ হয়তো প্রযুক্তি করে দেবে। আবার নতুন ধরনের কাজও তৈরি হবে। তাই জেন জিদের জন্য ভালো কর্মসংস্কৃতিতে নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকা দরকার।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ কর্মী বলেছেন, প্রতিষ্ঠান যদি তাদের ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখার সুযোগ না দেয়, তাহলে তারা চাকরি ছাড়তে পারেন। এআই-এর সঠিক ব্যবহার কিংবা প্রযুক্তি শেখার বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই জেন জিদের প্রত্যাশা, ভালো প্রতিষ্ঠান শুধু কর্মীর কাছ থেকে কাজ আদায় করবে এমন না। তাকে শেখার সুযোগও দেবে।

উন্নত প্রশিক্ষণ, নতুন সফটওয়্যারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে শেখার সুযোগ কিংবা নতুন দায়িত্ব; এসব একজন তরুণকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।

তবে তরুণদেরও নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠান শেখাবে এমনটা ভাবলে চলবে না। নিজের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন দক্ষতা শেখার মানসিকতা থাকতে হবে।

‘দুই বছর পর আমি কোথায় থাকব?’

চাকরিতে ঢোকার পর একজন তরুণের মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন আসে ‘এখানে আমি সামনে এগোব কীভাবে?’

অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়।

কোন কাজ ভালো করলে পদোন্নতি হবে? নতুন কী দায়িত্ব পাওয়া যাবে? কোন দক্ষতা অর্জন করলে বেতন বাড়বে? ভবিষ্যতে কোন পদে যাওয়া সম্ভব?

এসব যদি কর্মী না জানেন, তাহলে একসময় তার মনে হতে পারে, এখানে থেকে লাভ কী?

জেন জিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অনেকেই শুধু চাকরি ধরে রাখতে চান না; তারা এই চাকরি থেকে শিখে সামনে এগিয়ে যেতে চান।

জেন জিদের জন্য ভালো ওয়ার্কপ্লেস তৈরি করতে গিয়ে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি— স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়।

তরুণ কর্মীরা ডেডলাইনের ক্ষেত্রে ফ্লেক্সিবলিটি চাইতে পারেন, কিন্তু কাজ সময়মতো শেষ করার দায়িত্বও তাদের। নিজের মতামত জানানোর সুযোগ চাইতে পারেন, কিন্তু অন্যের মতামত শোনার মানসিকতাও থাকতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত