বুলবুল সিদ্দিকী

রোহিঙ্গা সংকট নয় বছর পেরিয়ে দশম বছরে পদার্পণ করলো। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ এর টেকসই সমাধানে একটুও এগোতে পারেনি। বিগত পুরো সময়টা জুড়ে প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদার যোগানোই যেন ছিল বাংলাদেশের প্রধান কাজ। নয় বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে নানা রকম টানাপোড়েনও দেখা যায়।
এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে নিয়মিত বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত অর্থের জোগান দেওয়া। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশ কখনোই এই বিপুল চাহিদার পুরোটা মেটাতে পারেনি। তাছাড়া, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নিজ দেশের মানুষের চাহিদাই ঠিকমতো মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় গত নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতির জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
গত নয় বছর ধরে বাংলাদেশ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছে—কখন মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাঁদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এই নতুন বাস্তবতায় মিয়ানমার চাইলেও এখন রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি রাখাইনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
বর্তমান রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য কোনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। বরং সেখানকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের ভেতরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘাত পুরো দেশের রাজনীতিকেই এক ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি মিয়ানমার জানিয়েছে, তারা তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে। কারণ, তারা এদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের দিক থেকে সমস্যাজনক। কারণ, প্রকৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, মিয়ানমার এমন সময়ে এই দাবি করছে যখন আরাকানের ওপর তাদের নিজেদেরই খুব একটা নিয়ন্ত্রণ নেই। রাখাইনে এখন যুদ্ধাবস্থা চলছে। এই অবস্থায় সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ আছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে দুই ধরনের দরকষাকষির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রথমত, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসনের সকল ধরনের পূর্ব শর্ত নিশ্চিত করার আলোচনা। এখানে শর্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, এর ওপরই নির্ভর করছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়া এবং সেখানে নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ তৈরি করার প্রক্রিয়া।
এসব জটিলতার পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গারাও নানা ঝুঁকির মুখে আছে। জীবন বাঁচাতে তারা প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। গত কয়েক বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। পুরোনো শরণার্থী শিবিরগুলোতেই তাদের আশ্রয় হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের বর্তমান অসহায়ত্ব এবং বাংলাদেশে প্রবেশের ধরন দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। আগে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আর এখন তারা আরাকান আর্মির হাতেও মার খাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে তারা বাধ্য হয়েই রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আসছে। তবে এভাবে তারা শুধু জীবনই বাঁচাচ্ছে, বিনিময়ে হারাচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তাদের নাগরিকত্ব। দেশত্যাগের এই যাত্রা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন নৌকডুবিতে অনেকের মৃত্যু হয়। সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমাতেও গিয়েও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা আরাকান আর্মির নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য রোহিঙ্গাদের হাতে আসলে সম্মানজনক কোনো বিকল্প নেই।
আগের সরকারের সময়ে বলা হতো, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং এর সমাধানও মিয়ানমারের ভেতরেই রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই যুক্তি হয়তো আর টিকবে না। কারণ, গত ৯ বছরে মিয়ানমার এবং রাখাইন প্রদেশ—দুটোই বদলে গেছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মির উত্থান ঘটেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ, এই অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু একটি জনগোষ্ঠীর অস্থায়ীভাবে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শরণার্থী শিবিরে একটি নতুন প্রজন্মের জন্ম হয়েছে। এদের সঙ্গে নিজেদের দেশের কোনো স্মৃতি কিংবা মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শিবিরে থাকা এই রোহিঙ্গাদের না দেখা হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, না তারা বিবেচিত হচ্ছে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে। ফলে তারা সম্মান নিয়ে একটি ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে চলাফেরা বা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে নিজেদের দেশের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও বাড়ছে। এই কারণে রোহিঙ্গাদের অনেকেই মারাত্মক পরিচয়-সংকটে ভুগছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথটিও আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে হবে।
আমরা যদি চিরাচরিত নিয়মে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা ভাবি, তাহলে প্রশ্ন জাগে—তারা আসলে কোথায় গিয়ে থাকবে? প্রত্যাবাসন মানে শুধু এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ঢুকে যাওয়া নয়। এর একটি রাজনৈতিক দিক আছে। এর সঙ্গে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া, নিরাপত্তা এবং নিজেদের পরিচয় ফিরে পাওয়ার বিষয়গুলো জড়িত। বর্তমান বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তাই আমাদের অবশ্যই বিকল্প চিন্তাভাবনা ও নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—২০১৮ সালের কূটনৈতিক কৌশল কি আসলেই কার্যকর ছিল? অতীতের কূটনৈতিক চেষ্টাগুলো কি আদৌ কোনো ইতিবাচক ফল এনেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজলে আমরা রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই কোনো সমাধান খুঁজে পাব না।
তাই শুধু আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই হবে না। রাখাইনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে একটি নতুন ধরনের কূটনৈতিক বলয় বা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ, রাখাইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত (হলিস্টিক) কৌশল সাজানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান কাজ। এই পরিকল্পনায় অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশকেও রাখতে হবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর যত সমালোচনাই করি না কেন, এখন পর্যন্ত তারাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যোগাযোগের একটি নতুন প্রস্তাবনা এসেছে, যাকে 'বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর' বলা হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে এটিও আলোচনার দাবি রাখে। এই অঞ্চল নিয়ে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাই চীনের সঙ্গে ভালোভাবে দরকষাকষি করতে পারলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমাধানের ক্ষেত্রেও সুবিধা আদায় করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগটি কাজে লাগানো। যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান আপাতত দেখা যাচ্ছে না, তাই বাংলাদেশকে এই দরকষাকষির সুযোগটা নিতে হবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কারণ, এখানে আঞ্চলিক দেশগুলোর, বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই করিডর নিয়ে কাজ করতে গেলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে সাবধানে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যা খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে কাজটা কঠিন হলেও, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে এমন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সমাধানের ছোট কোনো সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশকে তা কাজে লাগাতে হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাদের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় একটি দায়িত্ব পালন করা যে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে একা সম্ভব নয়—এই সত্যটি বিশ্ববিবেককে বোঝাতে হবে। আর এই কাজটুকু বাংলাদেশকেই করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট নয় বছর পেরিয়ে দশম বছরে পদার্পণ করলো। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ এর টেকসই সমাধানে একটুও এগোতে পারেনি। বিগত পুরো সময়টা জুড়ে প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদার যোগানোই যেন ছিল বাংলাদেশের প্রধান কাজ। নয় বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে নানা রকম টানাপোড়েনও দেখা যায়।
এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে নিয়মিত বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত অর্থের জোগান দেওয়া। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশ কখনোই এই বিপুল চাহিদার পুরোটা মেটাতে পারেনি। তাছাড়া, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নিজ দেশের মানুষের চাহিদাই ঠিকমতো মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় গত নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতির জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
গত নয় বছর ধরে বাংলাদেশ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছে—কখন মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাঁদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এই নতুন বাস্তবতায় মিয়ানমার চাইলেও এখন রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি রাখাইনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
বর্তমান রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য কোনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। বরং সেখানকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের ভেতরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘাত পুরো দেশের রাজনীতিকেই এক ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি মিয়ানমার জানিয়েছে, তারা তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে। কারণ, তারা এদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের দিক থেকে সমস্যাজনক। কারণ, প্রকৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, মিয়ানমার এমন সময়ে এই দাবি করছে যখন আরাকানের ওপর তাদের নিজেদেরই খুব একটা নিয়ন্ত্রণ নেই। রাখাইনে এখন যুদ্ধাবস্থা চলছে। এই অবস্থায় সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ আছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে দুই ধরনের দরকষাকষির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রথমত, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসনের সকল ধরনের পূর্ব শর্ত নিশ্চিত করার আলোচনা। এখানে শর্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, এর ওপরই নির্ভর করছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়া এবং সেখানে নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ তৈরি করার প্রক্রিয়া।
এসব জটিলতার পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গারাও নানা ঝুঁকির মুখে আছে। জীবন বাঁচাতে তারা প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। গত কয়েক বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। পুরোনো শরণার্থী শিবিরগুলোতেই তাদের আশ্রয় হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের বর্তমান অসহায়ত্ব এবং বাংলাদেশে প্রবেশের ধরন দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। আগে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আর এখন তারা আরাকান আর্মির হাতেও মার খাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে তারা বাধ্য হয়েই রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আসছে। তবে এভাবে তারা শুধু জীবনই বাঁচাচ্ছে, বিনিময়ে হারাচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তাদের নাগরিকত্ব। দেশত্যাগের এই যাত্রা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন নৌকডুবিতে অনেকের মৃত্যু হয়। সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমাতেও গিয়েও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা আরাকান আর্মির নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য রোহিঙ্গাদের হাতে আসলে সম্মানজনক কোনো বিকল্প নেই।
আগের সরকারের সময়ে বলা হতো, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং এর সমাধানও মিয়ানমারের ভেতরেই রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই যুক্তি হয়তো আর টিকবে না। কারণ, গত ৯ বছরে মিয়ানমার এবং রাখাইন প্রদেশ—দুটোই বদলে গেছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মির উত্থান ঘটেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ, এই অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু একটি জনগোষ্ঠীর অস্থায়ীভাবে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শরণার্থী শিবিরে একটি নতুন প্রজন্মের জন্ম হয়েছে। এদের সঙ্গে নিজেদের দেশের কোনো স্মৃতি কিংবা মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শিবিরে থাকা এই রোহিঙ্গাদের না দেখা হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে, না তারা বিবেচিত হচ্ছে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে। ফলে তারা সম্মান নিয়ে একটি ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে চলাফেরা বা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে নিজেদের দেশের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও বাড়ছে। এই কারণে রোহিঙ্গাদের অনেকেই মারাত্মক পরিচয়-সংকটে ভুগছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথটিও আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে হবে।
আমরা যদি চিরাচরিত নিয়মে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা ভাবি, তাহলে প্রশ্ন জাগে—তারা আসলে কোথায় গিয়ে থাকবে? প্রত্যাবাসন মানে শুধু এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ঢুকে যাওয়া নয়। এর একটি রাজনৈতিক দিক আছে। এর সঙ্গে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া, নিরাপত্তা এবং নিজেদের পরিচয় ফিরে পাওয়ার বিষয়গুলো জড়িত। বর্তমান বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তাই আমাদের অবশ্যই বিকল্প চিন্তাভাবনা ও নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—২০১৮ সালের কূটনৈতিক কৌশল কি আসলেই কার্যকর ছিল? অতীতের কূটনৈতিক চেষ্টাগুলো কি আদৌ কোনো ইতিবাচক ফল এনেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজলে আমরা রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই কোনো সমাধান খুঁজে পাব না।
তাই শুধু আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই হবে না। রাখাইনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে একটি নতুন ধরনের কূটনৈতিক বলয় বা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ, রাখাইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত (হলিস্টিক) কৌশল সাজানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান কাজ। এই পরিকল্পনায় অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশকেও রাখতে হবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর যত সমালোচনাই করি না কেন, এখন পর্যন্ত তারাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যোগাযোগের একটি নতুন প্রস্তাবনা এসেছে, যাকে 'বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর' বলা হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে এটিও আলোচনার দাবি রাখে। এই অঞ্চল নিয়ে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাই চীনের সঙ্গে ভালোভাবে দরকষাকষি করতে পারলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমাধানের ক্ষেত্রেও সুবিধা আদায় করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগটি কাজে লাগানো। যেহেতু রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান আপাতত দেখা যাচ্ছে না, তাই বাংলাদেশকে এই দরকষাকষির সুযোগটা নিতে হবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কারণ, এখানে আঞ্চলিক দেশগুলোর, বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই করিডর নিয়ে কাজ করতে গেলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে সাবধানে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যা খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে কাজটা কঠিন হলেও, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে এমন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সমাধানের ছোট কোনো সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশকে তা কাজে লাগাতে হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাদের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এত বড় একটি দায়িত্ব পালন করা যে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে একা সম্ভব নয়—এই সত্যটি বিশ্ববিবেককে বোঝাতে হবে। আর এই কাজটুকু বাংলাদেশকেই করতে হবে।
.png)

কোক-পেপসি যেহেতু আলাদা বোতলে একই বস্তু, ফলে বর্জনীয়—কল্লোল মোস্তফার এই যুক্তিটা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় লেগেছে। আপদ-বিপদ তত্ত্ব শুনেছি আগে, জ্বলন্ত চুলা-ফুটন্ত কড়াই ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। কিন্তু এটা আমার কাছেও নতুন একভাবে উপস্থাপন। এই উপমাটা আগে শুনিনি, ফলে ভালো লেগেছে।
১ দিন আগে
হাঁড়ির ইন্সপেক্টর হবার দরকার করে না, একটা ভাত টিপে দেখাই যথেষ্ট। দিনাজপুরের ওই এক ঘটনাই সব খবর বলে দিচ্ছে। কিশোরী ইয়াসমিন মারা গিয়ে বলে গেলো আমরা কেউই ভাল নেই। ব্যাপার দুঃখের, ব্যাপার লজ্জারও। সরকার দুঃখ-লজ্জা এসব পাবে এমন ধারণা করা অন্যায়। কোন সরকারই পায়নি, এ সরকারও পাবে না।
২৪ আগস্ট ২০২৬
শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়; কলমের নিব ভেঙে যায়; কম্পিউটারের পর্দা মৃত কালো হয়ে যায়; ‘চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, চোখ ভেসে যায়’ সেই কবে ‘অন্তর্গত’ কথাকাব্যে এমত লিখেছিলাম এক ক্রন্দন-কথা; এখন মধ্যরাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং আমি দেখি আমার দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে; আমার মেরুদন্ডে বরফ এবং আমার এই
২৪ আগস্ট ২০২৬
আজ তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের চোখে নয়, সেই ছাত্রীর চোখ দিয়েও দেখতে চাই। তার রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন হোক যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে, তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি আসুক মানবিকতার জায়গা থেকে।
২৩ আগস্ট ২০২৬