নতুন নেতৃত্ব: শুরুতেই প্রয়োজন ১০০ দিনের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা

ড. মো. শরীফুল ইসলাম
ড. মো. শরীফুল ইসলাম

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

মানুষের জীবনে এমন কিছু প্রয়োজন আছে, যা নিয়ে কোনো আপস চলে না। এর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি কিংবা কৃষকের গোলার ধান—সবকিছুর পেছনেই একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থাকে। দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানোর কাজও এই ব্যবস্থার অংশ। আর এই পুরো ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হলো খাদ্য মন্ত্রণালয়।

তাই খাদ্য মন্ত্রণালয়কে কেবল চাল-গমের মন্ত্রণালয় ভাবলে ভুল হবে। এটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে এবং ভোক্তাকে স্বস্তি দেয়। পাশাপাশি, এটি দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তারও প্রধান প্রতিষ্ঠান। বাজারে চালের দাম কয়েক টাকা বাড়লে তার ঢেউ পৌঁছে যায় কোটি মানুষের সংসারে। আবার ধানের দাম কমে গেলে তার কষ্ট জমে কৃষকের ঘরে। এই দুই প্রান্তের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই খাদ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কঠিন কাজ।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনে আফরোজা খানম রিতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন একটি দৃশ্যমান, সংবেদনশীল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডনির্ভর খাত। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে বিমানবন্দরের সেবার মান, যাত্রীসেবা ও কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে বিমানবন্দর পরিদর্শন করে কার্গো কার্যক্রম হয়রানিমুক্ত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার পর তাঁকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো আরও জনস্পর্শী ও জাতীয়ভাবে কৌশলগত একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো।

এটিকে শুধু মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হিসেবে না দেখে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়। এক অর্থে, ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এটি তাঁর জন্য একটি মূল্যবান উপহার—তবে সেই উপহারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় দায়িত্ব। কারণ বিমানবন্দরের একটি ভালো সিদ্ধান্ত হাজারো যাত্রীর অভিজ্ঞতা বদলে দিতে পারে; কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

গুদামে খাদ্য থাকা আর প্রতিটি পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা থাকা এক কথা নয়। বাজারে খাদ্য পর্যাপ্ত থাকতে পারে, কিন্তু কেনার সামর্থ্য না থাকলে দরিদ্র পরিবারের কাছে সেই খাদ্য কার্যত নাগালের বাইরে। এখানেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সামাজিক দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএসসহ সরকারি খাদ্য সহায়তাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা প্রয়োজন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ছিল প্রায় ২৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। একটি জনবহুল দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। কিন্তু গুদামের স্বস্তি তখনই অর্থবহ, যখন তার প্রতিফলন বাজার ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুলাই ২০২৬-এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কমা ইতিবাচক; কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির শেষ হিসাবটি হয় বাজারের ব্যাগে—একই টাকায় কতটুকু খাদ্য ঘরে নেওয়া যাচ্ছে, সেটিই বাস্তবতা।

তাই নতুন নেতৃত্বের সামনে সমীকরণটি স্পষ্ট—কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার জন্য সহনীয় বাজার এবং রাষ্ট্রের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা মজুত। তিনটির একটিকেও বাদ দিয়ে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব নয়।

আমাদের কৃষক উৎপাদন করেন, কিন্তু উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য সব সময় তাঁর হাতে পৌঁছায় না। কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে যত অদক্ষতা, অপচয় ও অস্বচ্ছতা তৈরি হয়, শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হয় দুই পক্ষকেই। এ কারণে খাদ্য ব্যবস্থাপনার নতুন দর্শন হতে পারে—‘ফার্ম টু ফুড সিকিউরিটি’: কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনা।

প্রকৃত কৃষকের ডিজিটাল নিবন্ধন, সরাসরি খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং দ্রুত অর্থ পরিশোধ আরও সহজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোথায় কত মজুত, কত সংগ্রহ ও আমদানি হচ্ছে, কোথায় সরবরাহ কমছে এবং কোন বাজারে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ছে—এসব তথ্য একটি ‘ন্যাশনাল ফুড সিচুয়েশন ড্যাশবোর্ড’-এ রিয়েল-টাইম দেখা গেলে সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে। সংকট তৈরি হওয়ার পর শুধু প্রতিক্রিয়া নয়; সংকট আসার আগেই তার পদধ্বনি শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

গুদামে খাদ্য থাকা আর প্রতিটি পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা থাকা এক কথা নয়। বাজারে খাদ্য পর্যাপ্ত থাকতে পারে, কিন্তু কেনার সামর্থ্য না থাকলে দরিদ্র পরিবারের কাছে সেই খাদ্য কার্যত নাগালের বাইরে। এখানেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সামাজিক দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএসসহ সরকারি খাদ্য সহায়তাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের প্রতিটি কেজি ভর্তুকির খাদ্য যেন সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়—এটি নিশ্চিত করাই দক্ষ ব্যবস্থাপনার পরিচয়।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ইতিহাস অনেকটাই চালের ইতিহাস। একসময় প্রধান প্রশ্ন ছিল—মানুষের পেটে ভাত পৌঁছাবে কি না। আজ সেই প্রশ্নের সঙ্গে নতুন প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে—যে খাবার পৌঁছাচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ ও পুষ্টিকর? মানুষের শুধু ক্যালরি নয়; মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, ফল, শাকসবজি এবং প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টও দরকার। তাই আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘ফুড সিকিউরিটি’ থেকে ‘ফুড অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি’-তে উত্তরণ।

কোথায় কত মজুত, কত সংগ্রহ ও আমদানি হচ্ছে, কোথায় সরবরাহ কমছে এবং কোন বাজারে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ছে—এসব তথ্য একটি ‘ন্যাশনাল ফুড সিচুয়েশন ড্যাশবোর্ড’-এ রিয়েল-টাইম দেখা গেলে সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে। সংকট তৈরি হওয়ার পর শুধু প্রতিক্রিয়া নয়; সংকট আসার আগেই তার পদধ্বনি শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

এ কাজ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একার নয়। খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের দেয়াল আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের খাবারের থালা একটিই।

নতুন নেতৃত্বের শুরুতেই একটি পরিমাপযোগ্য ‘১০০ দিনের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা’ ঘোষণা করা যেতে পারে। সেখানে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ কতটা বাড়বে, সরকারি মজুত ও গুদাম ব্যবস্থাপনা কতটা ডিজিটাল হবে, বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে আগাম শনাক্ত হবে, খাদ্য সহায়তায় স্বচ্ছতা কীভাবে বাড়বে এবং নিরাপদ খাদ্যের নজরদারি কতটা শক্তিশালী হবে—এসবের সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। বড় পরিবর্তন সব সময় বড় ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না; ছোট কিন্তু দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য সিদ্ধান্তও মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

আফরোজা খানম রিতার সামনে এখন বড় সুযোগ। বিমান পরিবহন ও পর্যটনের পর তিনি এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, যার সঙ্গে দেশের প্রতিটি কৃষক, প্রতিটি বাজার এবং প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘর কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। তাই সাফল্যের হিসাব শুধু ফাইলের অগ্রগতি কিংবা গুদামের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।

সাফল্যের প্রশ্নগুলো বরং সহজ—কৃষক কি তাঁর ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন? বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ কি স্বস্তি পাচ্ছেন? দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারি খাদ্য সহায়তা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে? আমাদের সন্তানদের খাবারের থালা কি আরও নিরাপদ ও পুষ্টিকর হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ক্রমেই ইতিবাচক হয়, তবে নতুন নেতৃত্বের সাফল্য আলাদা করে প্রচারের প্রয়োজন হবে না। মানুষের বাজারের ব্যাগ, কৃষকের মুখের হাসি এবং পরিবারের খাবারের থালাই সেই সাফল্যের কথা বলবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন যাত্রার মূলমন্ত্র তাই হতে পারে—মজুত থেকে মানুষের থালা, উৎপাদন থেকে পুষ্টি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য থেকে ভোক্তার স্বস্তি। এই সমন্বয়েই গড়ে উঠুক একটি খাদ্য-নিরাপদ, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বস্তির বাংলাদেশ।

  • ড. মো. শরীফুল ইসলাম: মৎস্যবিজ্ঞানী এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (মৎস্য), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ফার্মগেট, ঢাকা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত