সংস্কৃতি চর্চা নির্বিঘ্ন রাখার দাবি শিল্পীদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন

গান বন্ধের হুঙ্কার, পুলিশ লাইন্সে হামলা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শিল্পীরা। স্ট্রিম গ্রাফিক
গান বন্ধের হুঙ্কার, পুলিশ লাইন্সে হামলা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শিল্পীরা। স্ট্রিম গ্রাফিক

কিশোরগঞ্জে কনসার্ট স্থগিত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান বাজানোর জেরে সংঘাত এবং এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের পর সংস্কৃতি অঙ্গনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। উগ্রতার কাছে নতি স্বীকার না করে সংস্কৃতি চর্চা নির্বিঘ্ন রাখতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন সঙ্গীত শিল্পীরা।

কিশোরগঞ্জে গত ১৯ আগস্ট ‘অ্যাশেজ’ ব্যান্ডের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। এ আয়োজনকে স্থানীয় ‘ইমাম-উলামা পরিষদ’ ও একটি গোষ্ঠী ‘শরিয়তবিরোধী’ দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বিক্ষোভের ডাক দেয়। উত্তেজনার মুখে ওই দিন দুপুরে আয়োজক রেস্তোরাঁটির ‘হোটেল নিবন্ধন সংক্রান্ত জটিলতা’র কথা বলে প্রশাসন কনসার্টটি স্থগিত ঘোষণা করে।

একই দিন মধ্যরাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে উচ্চস্বরে গান বাজানোর অভিযোগ করে স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন। ২২ আগস্ট এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে পরিবেশগতভাবেই গান-বাজনা কিংবা সিনেমা বহু বছর ধরে এক প্রকার নিষিদ্ধের মতো। সেখানকার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে সংস্কৃতি অঙ্গনে অসন্তোষ তৈরি হয়। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন এই দুটি ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কোনো আয়োজনের বৈধতা কি আইন ও প্রশাসনিক বিধি দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি কোনো এলাকার সংগঠিত আপত্তি ও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত সেই আয়োজনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে হামলা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সভাপতি হামিন আহমেদ। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘সংগীত চর্চায় বাধা দেওয়ার এই বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বহু বছর ধরে চলে আসা একটি বড় সমস্যা। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কিশোরগঞ্জ এবং রাজশাহীতেও এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা এবং সরকারকেই এর সমাধান করতে হবে।’

পুলিশ লাইন্সের ভেতরে হামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ সদস্যরা সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করলেও তাদের কেন চাকরি থেকে প্রত্যাহার করা হলো? কার স্বার্থে এটা করা হলো? আর থানার ওসি কীভাবে আপস করে এমন জোরপূর্বক অন্যায্য দাবি মেনে নিলেন?’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে হামিন আহমেদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা এক প্রকার নিষিদ্ধের মতো—এমন বক্তব্য কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। গত ৫৪-৫৫ বছর ধরে এ দেশের মানুষ সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতি চর্চা করে আসছে। সমাজে এ ধরনের উগ্র আচরণ কখনোই ছিল না। উগ্রতার এই উৎস সরকারকে বের করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই এমন অপতৎপরতা আশকারা পেয়ে আসছে।’

প্রশ্ন উঠছে, কোনো আয়োজনের বৈধতা কি আইন ও প্রশাসনিক বিধি দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি কোনো এলাকার সংগঠিত আপত্তি ও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত সেই আয়োজনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

এদিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশের শীর্ষ ব্যান্ড ‘শিরোনামহীন’-এর দলনেতা ও বেজ গিটারিস্ট জিয়াউর রহমান জিয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘যদি দেশে সংস্কৃতিই সুরক্ষিত না থাকে, তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থাকার যৌক্তিকতা কোথায়? সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজই হলো সংস্কৃতি রক্ষা করা। তারা যদি পদক্ষেপ না নেয়, তবে বুঝতে হবে এ মন্ত্রণালয় আর কার্যকরী নেই। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ দেশে আইনের শাসন বজায় রাখা। আইন অনুযায়ী যা বৈধ তা চলবে, যা অবৈধ তা হবে না। এই শৃঙ্খলা বজায় না থাকলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।’

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি দুই পক্ষের ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘটেছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্ত করা হবে এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হামিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সংগীত একটি পেশা। মানুষের এই পেশা ও জীবিকায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা, হুমকি দেওয়া ও অনুষ্ঠান বানচাল করা মানে তাদের রুটিরুজির ওপর সরাসরি আঘাত করা। নির্বাচিত সরকারের অধীনে এটি কোনোভাবেই মানা যায় না। যারা এসব করছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।

জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘গান-বাজনা হোক বা নৌকাবাইচ, এসব আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের আবহমান সংস্কৃতি ও শিল্পের বহমান ধারা যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় থাকে।’

সামগ্রিক এই পরিস্থিতিকে কাঠামোগত অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংগীতশিল্পী আহমেদ হাসান সানি। উদ্বেগ প্রকাশ করে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টাই হতাশাজনক। রাষ্ট্র যদি কাঠামোগত জায়গা থেকে কালচারকে ব্যাকবেঞ্চে বসিয়ে রাখে, তবে সময়ের ব্যবধানে সমাজে এমন অসহনশীল পরিস্থিতিই তৈরি হবে। আপনি শিশুদের গান শেখাবেন না, প্রাইমারি স্কুলে লাইব্রেরি থাকবে না, পাঠাগার থাকবে না; তাহলে মানুষকে সংস্কৃতি কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করবে? মানুষ ও সমাজকে ধারণ করার মতো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র তৈরি না করলে এমন পরিণতি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।’

আহমেদ হাসান বলেন, ‘আমাদের সমাজে কেন পাঠাগার নেই, মানুষ কেন সাহিত্যের গল্প পড়ে না; এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। উগ্রতার বিপরীতে ইতিবাচক সংস্কৃতির যে কাউন্টার বা জানালা, সেটা কোথায়? গান গাওয়ার পরিবেশ আটকে দিলে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।’

আহমেদ হাসানের মতে, সাংস্কৃতিক পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হলে তার ফল শুধু একটি অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজে ভিন্নমত, বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের জায়গাও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার স্মরণ করিয়ে দিয়ে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সবার মতামত প্রকাশের অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। কিন্তু নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সংবিধানে আমাদের সংস্কৃতি চর্চা, মতামত প্রকাশ ও পেশা পরিচালনার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কেউ এতে বাধা দিলে তা সাংবিধানিক অধিকারকে বিপন্ন করে।’

কিশোরগঞ্জের কনসার্ট স্থগিত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘাত কিংবা আর্কের হাসানের কনসার্টে বোতল নিক্ষেপের মতো ধারাবাহিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। শিল্পীদের সম্মিলিত দাবি, উগ্রতার কাছে নতি স্বীকার না করে রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং দেশের সংস্কৃতি চর্চাকে যেকোনো মূল্যে নির্বিঘ্ন রাখতে হবে।

এই ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোনো অঞ্চলের সামাজিক পরিবেশ বা সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বিবেচনায় নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ‘পরিস্থিতি’ যদি দীর্ঘদিন ধরে গান-বাজনা বা সিনেমার মতো বৈধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে কার্যত অসম্ভব করে তোলে, তবে সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করার দায়িত্ব কার? শিল্পীদের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে সেই প্রশ্নই—রাষ্ট্র কি আইন অনুযায়ী নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করবে, নাকি চাপ প্রয়োগে সক্ষম গোষ্ঠীগুলোর আপত্তিই নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত কোন সংস্কৃতি চলবে আর কোনটি চলবে না?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত