সুমন সুবহান

হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে রহস্যজনক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ক্ষণস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে দুই পরাশক্তি এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায় লিপ্ত হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণ উপকূলে মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা আঘাত হেনেছে। এই সামরিক উত্তেজনা ও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নির্ধারিত পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
মার্কিন নীতিনির্ধারক মার্কো রুবিও এবং জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানি সহিংসতার জবাব সামরিক পথেই দেওয়া হবে। অন্যদিকে তেহরান একে আমেরিকার আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসিসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত আধিপত্য নিয়ে দুই দেশের অনমনীয় অবস্থান চুক্তিটিকে প্রথম থেকেই নাজুক করে তুলেছিল। ফলশ্রুতিতে এই শান্তি প্রচেষ্টা এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই চরম সংকটময় ভূরাজনৈতিক পটভূমিতেই প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ব কি তবে পারস্য উপসাগরে নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ‘হরমুজ প্রণালী’। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এই জলপথটিতে আংশিক অবরোধ আরোপ করেছিল। তেহরানের এই আকস্মিক অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তির শর্তানুযায়ী, উভয় পক্ষই ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ওমান উপকূলের কাছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই শান্তি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করে বিবৃতি প্রকাশ করে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ধরনের উসকানিমূলক আচরণ আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলশ্রুতিতে এই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের প্রাথমিক প্রচেষ্টা এবং কূটনৈতিক আলোচনা এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সিঙ্গাপুরের জাহাজে হামলার কঠোর জবাব দিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড শুক্রবার গভীর রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূল বরাবর তীব্র বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, এই অভিযানে বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত করার স্থান এবং রাডার সাইটগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপকে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার কঠোর জবাব’ বলে আখ্যা দেন। একই সাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের এই কর্মকাণ্ডকে সদ্য স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ‘চুক্তির লঙ্ঘন’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেন।
মার্কিন সামরিক কমান্ড আরও দাবি করেছে, তারা একই অভিযানে আকাশপথে ধেয়ে আসা ইরানের আরও তিনটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি সিরিক বন্দরের একটি জেটির কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর নিশ্চিত করেছে। তবে ইরানের স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মেহর নিউজ জানায়, হামলায় বন্দরের মূল সরঞ্জামগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যকার ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, শনিবার তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। বাহরাইন সরকার এই আকস্মিক ইরানি হামলাকে তাদের ‘সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য তেহরানকে দায়ী করেছে। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা-কে দেওয়া বিশেষ বিবৃতিতে আইআরজিসি এই সামরিক পদক্ষেপের দায় স্বীকার করে মার্কিন প্রশাসনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পুনরাবৃত্ত আগ্রাসনের ক্ষেত্রে আমাদের পরবর্তী জবাব এর চেয়েও ব্যাপক এবং ভয়াবহ হবে।’
এছাড়াও শনিবার ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমান সংলগ্ন জলপথে আরেকটি ট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে বাহরাইন ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে।
গত সোমবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রথম দফার সফল আলোচনা শেষে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে একটি নতুন ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর সেই উদীয়মান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই সামরিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে জেনেভায় নির্ধারিত পরবর্তী গোলটেবিল বৈঠকটি উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তির মাধ্যমে যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এই কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা এখন আলোচনার টেবিল ছেড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো ইরানি সহিংসতার জবাব সামরিক সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের এই শীর্ষ কর্মকর্তারা দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর জোরপূর্বক টোল আরোপ করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মার্কিন অবস্থান ও সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা দাবি উত্থাপন করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে বিমান হামলা চালিয়ে গত ১৫ জুনের সমঝোতা স্মারকের ১ নং অনুচ্ছেদ—যা সকল ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল—তা সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। তেহরান আরও জোর দিয়ে বলেছে, মার্কিন এই আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী এবং এর ফলেই তারা পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য হয়েছে। এই দুই দেশের চরম বিপরীতমুখী অবস্থান এবং চুক্তি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সংকটের মুখে পতিত হয়েছে।
কুইন্স ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট-এর নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি এবং রোমের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্দ্রেয়া দেসির মতো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ জুনের সমঝোতা স্মারকটি প্রথম থেকেই অত্যন্ত নাজুক ছিল। ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালী হলো আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় দর কষাকষির হাতিয়ার, যা হারালে তাদের অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরে তেহরানের এই একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নিতে কোনোভাবেই রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো। এই দুই অনমনীয় অবস্থানের কারণে কূটনৈতিক সমঝোতাটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উদ্ভূত এই সামরিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত, দুই পক্ষকেই অবিলম্বে উসকানিমূলক সামরিক শক্তি প্রদর্শন বন্ধ করে একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় পুনরায় টেবিলে বসতে হবে। হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে একটি সার্বজনীন বহুপাক্ষিক নৌ-নিরাপত্তা প্রোটোকল গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়কেই তাদের চরম অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে তার একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, ঠিক তেমনি ইরানকেও আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার গ্যারান্টি দিতে হবে। জাতিসংঘ সনদের আলোকেই কেবল এই সংকট সমাধান সম্ভব, অন্যথায় আঞ্চলিক এই ছায়াযুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে রহস্যজনক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ক্ষণস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে দুই পরাশক্তি এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায় লিপ্ত হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণ উপকূলে মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা আঘাত হেনেছে। এই সামরিক উত্তেজনা ও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নির্ধারিত পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
মার্কিন নীতিনির্ধারক মার্কো রুবিও এবং জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানি সহিংসতার জবাব সামরিক পথেই দেওয়া হবে। অন্যদিকে তেহরান একে আমেরিকার আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসিসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত আধিপত্য নিয়ে দুই দেশের অনমনীয় অবস্থান চুক্তিটিকে প্রথম থেকেই নাজুক করে তুলেছিল। ফলশ্রুতিতে এই শান্তি প্রচেষ্টা এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই চরম সংকটময় ভূরাজনৈতিক পটভূমিতেই প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ব কি তবে পারস্য উপসাগরে নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ‘হরমুজ প্রণালী’। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এই জলপথটিতে আংশিক অবরোধ আরোপ করেছিল। তেহরানের এই আকস্মিক অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তির শর্তানুযায়ী, উভয় পক্ষই ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ওমান উপকূলের কাছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই শান্তি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করে বিবৃতি প্রকাশ করে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ধরনের উসকানিমূলক আচরণ আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলশ্রুতিতে এই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের প্রাথমিক প্রচেষ্টা এবং কূটনৈতিক আলোচনা এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সিঙ্গাপুরের জাহাজে হামলার কঠোর জবাব দিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড শুক্রবার গভীর রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূল বরাবর তীব্র বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, এই অভিযানে বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত করার স্থান এবং রাডার সাইটগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপকে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার কঠোর জবাব’ বলে আখ্যা দেন। একই সাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের এই কর্মকাণ্ডকে সদ্য স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ‘চুক্তির লঙ্ঘন’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেন।
মার্কিন সামরিক কমান্ড আরও দাবি করেছে, তারা একই অভিযানে আকাশপথে ধেয়ে আসা ইরানের আরও তিনটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি সিরিক বন্দরের একটি জেটির কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর নিশ্চিত করেছে। তবে ইরানের স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মেহর নিউজ জানায়, হামলায় বন্দরের মূল সরঞ্জামগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যকার ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, শনিবার তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। বাহরাইন সরকার এই আকস্মিক ইরানি হামলাকে তাদের ‘সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য তেহরানকে দায়ী করেছে। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা-কে দেওয়া বিশেষ বিবৃতিতে আইআরজিসি এই সামরিক পদক্ষেপের দায় স্বীকার করে মার্কিন প্রশাসনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পুনরাবৃত্ত আগ্রাসনের ক্ষেত্রে আমাদের পরবর্তী জবাব এর চেয়েও ব্যাপক এবং ভয়াবহ হবে।’
এছাড়াও শনিবার ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমান সংলগ্ন জলপথে আরেকটি ট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে বাহরাইন ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে।
গত সোমবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রথম দফার সফল আলোচনা শেষে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে একটি নতুন ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নেভাল বেইজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর সেই উদীয়মান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই সামরিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে জেনেভায় নির্ধারিত পরবর্তী গোলটেবিল বৈঠকটি উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তির মাধ্যমে যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এই কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা এখন আলোচনার টেবিল ছেড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো ইরানি সহিংসতার জবাব সামরিক সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের এই শীর্ষ কর্মকর্তারা দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর জোরপূর্বক টোল আরোপ করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মার্কিন অবস্থান ও সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা দাবি উত্থাপন করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে বিমান হামলা চালিয়ে গত ১৫ জুনের সমঝোতা স্মারকের ১ নং অনুচ্ছেদ—যা সকল ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল—তা সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। তেহরান আরও জোর দিয়ে বলেছে, মার্কিন এই আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী এবং এর ফলেই তারা পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য হয়েছে। এই দুই দেশের চরম বিপরীতমুখী অবস্থান এবং চুক্তি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সংকটের মুখে পতিত হয়েছে।
কুইন্স ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট-এর নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি এবং রোমের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্দ্রেয়া দেসির মতো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ জুনের সমঝোতা স্মারকটি প্রথম থেকেই অত্যন্ত নাজুক ছিল। ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালী হলো আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় দর কষাকষির হাতিয়ার, যা হারালে তাদের অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরে তেহরানের এই একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নিতে কোনোভাবেই রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো। এই দুই অনমনীয় অবস্থানের কারণে কূটনৈতিক সমঝোতাটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উদ্ভূত এই সামরিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত, দুই পক্ষকেই অবিলম্বে উসকানিমূলক সামরিক শক্তি প্রদর্শন বন্ধ করে একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় পুনরায় টেবিলে বসতে হবে। হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে একটি সার্বজনীন বহুপাক্ষিক নৌ-নিরাপত্তা প্রোটোকল গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়কেই তাদের চরম অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে তার একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, ঠিক তেমনি ইরানকেও আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার গ্যারান্টি দিতে হবে। জাতিসংঘ সনদের আলোকেই কেবল এই সংকট সমাধান সম্ভব, অন্যথায় আঞ্চলিক এই ছায়াযুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
.png)

সুকুক বন্ডের প্রতি যে বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ রয়েছে, সর্বশেষ নিলামে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এই বন্ডের নিলাম এর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আটবার। প্রতিবারই লক্ষ করা গেছে এ আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগকারীদের সমান আগ্রহ।
৫ ঘণ্টা আগে
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের প্রথম বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব’ বলে বর্ণনা করলেও এর বাস্তবায়ন যে কঠিন, সেটা অনস্বীকার্য। জনজীবনে স্বস্তি আনতে তিনি বাজেটের কিছু কর প্রস্তাবে সংশোধনীর পরামর্শ দিয়েছেন। সেসব পরিবর্তন এনেই বাজেট পাসের ব্যবস্থা হবে, সন্দেহ নেই।
১৯ ঘণ্টা আগে
জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর এখন বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটছে। কিন্তু এই রূপান্তরের আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—এই রূপান্তর কতটা ন্যায্য, এবং এর সুফল শেষ পর্যন্ত কারা ভোগ করবে?
১৯ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক আন্দোলনে নাগরিকের নিহত হওয়া ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। এমনটা ঘটলে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানে আবু সাঈদ আর মুগ্ধর নিহত হওয়ার ঘটনাও আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়ে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল।
১৯ ঘণ্টা আগে