ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। সরকারকে বিপুল অংকের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে হচ্ছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতি বা কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ইঙ্গিত আসে যে এই সাশ্রয়ের প্রথম বলি হবে শিক্ষা খাত। বিশেষ করে মহানগর এলাকার স্কুল-কলেজগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা হচ্ছে। তখন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মনে তীব্র শঙ্কার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন জাগে, যেকোনো জাতীয় সংকটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন প্রথম লক্ষ্যবস্তু বা 'সফট টার্গেট' হিসেবে বেছে নেওয়া হয়? শিক্ষা ব্যবস্থাকে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ বানানো কি একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়?
একে তো করোনাকালীন দীর্ঘ আড়াই বছরের স্থবিরতা শিক্ষার্থীদের শিখনে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এর রেশ এখনো কাটেনি। আবার বছরের প্রথম তিন মাসে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, জাতীয় নির্বাচন এবং রমজানের ছুটির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার সম্প্রতি ১০ সপ্তাহ ধরে শনিবারও ক্লাস চালু রাখার সাহসী ও প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাবনা সেই অর্জনকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেবে। একদিকে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা, আর অন্যদিকে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের নামে প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল রাখা—এই দ্বিমুখী নীতি নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। করোনাকালে আমরা দেখেছি, ডিজিটাল বিভাজন কীভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। মহানগর এলাকায় উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা হয়তো দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং আধুনিক ডিভাইসের সুবিধা পায়। কিন্তু একই মহানগরের বস্তি এলাকা বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য একটি স্মার্টফোন বা ডেটা প্যাক কেনা বিলাসিতার নামান্তর। তদুপরি, বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো এখনো এতটাই নাজুক যে, জুম বা গুগল মিট-এ নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের সমস্যা তো রয়েছেই। ফলে অনলাইন ক্লাস মানেই হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য নামমাত্র হাজিরা, যা প্রকৃত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে মিথস্ক্রিয়া ও সামাজিকীকরণের সুযোগ থাকে, তা কোনো স্ক্রিনের মাধ্যমেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের যে অজুহাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার গাণিতিক ভিত্তিও বেশ নড়বড়ে। মহানগর এলাকার পরিবহন ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, সিংহভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে রিকশায়। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের সকল মহানগর এলাকায় যে রিকশাগুলো চলে, তার অধিকাংশই ব্যাটারিচালিত। এই রিকশাগুলো বিদ্যুতে চার্জ হয়, যা সরাসরি জ্বালানি তেল (অকটেন বা ডিজেল) ব্যবহারের সাথে যুক্ত নয়। যারা ব্যক্তিগত গাড়িতে বা স্কুল বাসে যাতায়াত করে, তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় নগণ্য। এখন প্রশ্ন হলো, এই সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর যাতায়াত বন্ধ করে সরকার আসলে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারবে? এর বিপরীতে অনলাইন ক্লাসের জন্য যে লাখ লাখ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং রাউটার ঘণ্টার পর ঘণ্টা সচল থাকবে, তাতে কি বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে না? জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে যদি আমরা এক প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করি, তবে সেই লাভ-ক্ষতির সমীকরণ কোনোভাবেই দেশের পক্ষে যাবে না।
সরকার বলছে, এক জরিপে ৫৫ শতাংশ মানুষ অনলাইন ক্লাসের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ রয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই জরিপটি কি কেবল প্রযুক্তিবান্ধব একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ওপর চালানো হয়েছে? যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন বা যাদের সন্তানরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের মতামত কি এই জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে? বাংলাদেশে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সবসময় সক্রিয় থাকে যারা চায় না শিক্ষাব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকুক। সংকটের অজুহাত পেলেই তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অনলাইনে নেওয়ার সুপারিশ করতে থাকে। সরকারকে বুঝতে হবে, এই মহলটি দেশের মঙ্গল চায় নাকি শিক্ষাকে পঙ্গু করে দিতে চায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এই মহলের প্রেসক্রিপশনে চলে, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সমাধান খুঁজতে হলে সরকারকে আমলাতন্ত্র এবং বিলাসিতার দিকে নজর দিতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের অসংখ্য বিকল্প ক্ষেত্র অবহেলায় পড়ে আছে। প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রটোকল এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে বিশাল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়, সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। যুগ্ম-সচিব পর্যায় পর্যন্ত সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার বন্ধ করা এবং তেলের রেশন কমিয়ে আনা হতে পারে একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, দেশের শপিং মল, সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং বাসাবাড়িতে এসির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার (যেমন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নিচে নামানো নিষিদ্ধ করা এবং সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জা পুরোপুরি বন্ধ রাখা অনেক বেশি কার্যকর সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে। তৃতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার অযৌক্তিক চার্জিং এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেই বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদন বা অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যুদ্ধ বা চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবার শেষে বন্ধ করে এবং সবার আগে খোলে। কারণ তারা জানে, একটি প্রজন্ম যদি সঠিকভাবে শিক্ষিত না হয়, তবে সেই জাতি কখনো সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। অথচ আমাদের দেশে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয় বা যেকোনো কৃচ্ছ্রসাধনের বেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই কেন ‘সফট টার্গেট’ করা হবে? কেন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই প্রথম আত্মাহুতি দিতে বলা হয়? অন্য সব মন্ত্রণালয় যখন তাদের বিলাসিতা ও অপচয় অব্যাহত রাখে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন নতিস্বীকার জনগণের কাছে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। মানুষ মনে করছে, সরকার শিক্ষার চেয়ে অন্যান্য খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকার যদি সত্যিই জ্বালানি সাশ্রয় নিয়ে আন্তরিক হয়, তবে তাদের উচিত হবে একটি জাতীয় জ্বালানি অডিট পরিচালনা করা। প্রতিটি মন্ত্রণালয় থেকে তাদের অপচয় কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সংকট প্রলম্বিত হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে নেওয়ার পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি আরও জোরদার করা যেতে পারে যাতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দূরত্ব কমে। স্কুলবাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সরাসরি পাঠদান বা অফলাইন ক্লাস বন্ধ করা উচিত নয়। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়া মানে হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং তাদের বিপথে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। করোনাকালে দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার এবং বাল্যবিবাহ যেভাবে বেড়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি আমরা আর দেখতে চাই না।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে নেওয়ার এই পরিকল্পনাটি কেবল অদূরদর্শী নয়, এটি জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনার নামান্তর। অতীতের কোনো ভুল সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি বর্তমান সরকারের কাছ থেকে কাম্য নয়। জ্বালানি সংকট একটি সাময়িক বৈশ্বিক সমস্যা হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি একটি স্থায়ী ও প্রজন্মব্যাপী সমস্যা। সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গায়ে হাত দেওয়ার আগে অন্য সব বিকল্প পথ শতভাগ ব্যবহার করে দেখতে হবে। শিক্ষাকে যদি আমরা জাতির মেরুদণ্ড বলে বিশ্বাস করি, তবে সেই মেরুদণ্ডে কুঠারাঘাত করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে চরম হঠকারিতা। আমরা আশা করি, সরকার জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল রাখার সিদ্ধান্ত নেবে।
লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। সরকারকে বিপুল অংকের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে হচ্ছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতি বা কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ইঙ্গিত আসে যে এই সাশ্রয়ের প্রথম বলি হবে শিক্ষা খাত। বিশেষ করে মহানগর এলাকার স্কুল-কলেজগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা হচ্ছে। তখন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মনে তীব্র শঙ্কার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন জাগে, যেকোনো জাতীয় সংকটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন প্রথম লক্ষ্যবস্তু বা 'সফট টার্গেট' হিসেবে বেছে নেওয়া হয়? শিক্ষা ব্যবস্থাকে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ বানানো কি একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়?
একে তো করোনাকালীন দীর্ঘ আড়াই বছরের স্থবিরতা শিক্ষার্থীদের শিখনে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এর রেশ এখনো কাটেনি। আবার বছরের প্রথম তিন মাসে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, জাতীয় নির্বাচন এবং রমজানের ছুটির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার সম্প্রতি ১০ সপ্তাহ ধরে শনিবারও ক্লাস চালু রাখার সাহসী ও প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাবনা সেই অর্জনকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেবে। একদিকে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা, আর অন্যদিকে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের নামে প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল রাখা—এই দ্বিমুখী নীতি নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। করোনাকালে আমরা দেখেছি, ডিজিটাল বিভাজন কীভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। মহানগর এলাকায় উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা হয়তো দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং আধুনিক ডিভাইসের সুবিধা পায়। কিন্তু একই মহানগরের বস্তি এলাকা বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য একটি স্মার্টফোন বা ডেটা প্যাক কেনা বিলাসিতার নামান্তর। তদুপরি, বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো এখনো এতটাই নাজুক যে, জুম বা গুগল মিট-এ নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের সমস্যা তো রয়েছেই। ফলে অনলাইন ক্লাস মানেই হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য নামমাত্র হাজিরা, যা প্রকৃত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে মিথস্ক্রিয়া ও সামাজিকীকরণের সুযোগ থাকে, তা কোনো স্ক্রিনের মাধ্যমেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের যে অজুহাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার গাণিতিক ভিত্তিও বেশ নড়বড়ে। মহানগর এলাকার পরিবহন ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, সিংহভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে রিকশায়। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের সকল মহানগর এলাকায় যে রিকশাগুলো চলে, তার অধিকাংশই ব্যাটারিচালিত। এই রিকশাগুলো বিদ্যুতে চার্জ হয়, যা সরাসরি জ্বালানি তেল (অকটেন বা ডিজেল) ব্যবহারের সাথে যুক্ত নয়। যারা ব্যক্তিগত গাড়িতে বা স্কুল বাসে যাতায়াত করে, তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় নগণ্য। এখন প্রশ্ন হলো, এই সামান্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর যাতায়াত বন্ধ করে সরকার আসলে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারবে? এর বিপরীতে অনলাইন ক্লাসের জন্য যে লাখ লাখ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং রাউটার ঘণ্টার পর ঘণ্টা সচল থাকবে, তাতে কি বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে না? জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে যদি আমরা এক প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করি, তবে সেই লাভ-ক্ষতির সমীকরণ কোনোভাবেই দেশের পক্ষে যাবে না।
সরকার বলছে, এক জরিপে ৫৫ শতাংশ মানুষ অনলাইন ক্লাসের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ রয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই জরিপটি কি কেবল প্রযুক্তিবান্ধব একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ওপর চালানো হয়েছে? যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন বা যাদের সন্তানরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের মতামত কি এই জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে? বাংলাদেশে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সবসময় সক্রিয় থাকে যারা চায় না শিক্ষাব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকুক। সংকটের অজুহাত পেলেই তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অনলাইনে নেওয়ার সুপারিশ করতে থাকে। সরকারকে বুঝতে হবে, এই মহলটি দেশের মঙ্গল চায় নাকি শিক্ষাকে পঙ্গু করে দিতে চায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এই মহলের প্রেসক্রিপশনে চলে, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সমাধান খুঁজতে হলে সরকারকে আমলাতন্ত্র এবং বিলাসিতার দিকে নজর দিতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের অসংখ্য বিকল্প ক্ষেত্র অবহেলায় পড়ে আছে। প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রটোকল এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে বিশাল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়, সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। যুগ্ম-সচিব পর্যায় পর্যন্ত সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার বন্ধ করা এবং তেলের রেশন কমিয়ে আনা হতে পারে একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, দেশের শপিং মল, সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং বাসাবাড়িতে এসির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার (যেমন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নিচে নামানো নিষিদ্ধ করা এবং সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জা পুরোপুরি বন্ধ রাখা অনেক বেশি কার্যকর সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে। তৃতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার অযৌক্তিক চার্জিং এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেই বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদন বা অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যুদ্ধ বা চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবার শেষে বন্ধ করে এবং সবার আগে খোলে। কারণ তারা জানে, একটি প্রজন্ম যদি সঠিকভাবে শিক্ষিত না হয়, তবে সেই জাতি কখনো সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। অথচ আমাদের দেশে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয় বা যেকোনো কৃচ্ছ্রসাধনের বেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই কেন ‘সফট টার্গেট’ করা হবে? কেন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই প্রথম আত্মাহুতি দিতে বলা হয়? অন্য সব মন্ত্রণালয় যখন তাদের বিলাসিতা ও অপচয় অব্যাহত রাখে, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন নতিস্বীকার জনগণের কাছে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। মানুষ মনে করছে, সরকার শিক্ষার চেয়ে অন্যান্য খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকার যদি সত্যিই জ্বালানি সাশ্রয় নিয়ে আন্তরিক হয়, তবে তাদের উচিত হবে একটি জাতীয় জ্বালানি অডিট পরিচালনা করা। প্রতিটি মন্ত্রণালয় থেকে তাদের অপচয় কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সংকট প্রলম্বিত হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে নেওয়ার পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি আরও জোরদার করা যেতে পারে যাতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের দূরত্ব কমে। স্কুলবাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সরাসরি পাঠদান বা অফলাইন ক্লাস বন্ধ করা উচিত নয়। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়া মানে হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা এবং তাদের বিপথে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। করোনাকালে দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার এবং বাল্যবিবাহ যেভাবে বেড়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি আমরা আর দেখতে চাই না।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে নেওয়ার এই পরিকল্পনাটি কেবল অদূরদর্শী নয়, এটি জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনার নামান্তর। অতীতের কোনো ভুল সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি বর্তমান সরকারের কাছ থেকে কাম্য নয়। জ্বালানি সংকট একটি সাময়িক বৈশ্বিক সমস্যা হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি একটি স্থায়ী ও প্রজন্মব্যাপী সমস্যা। সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গায়ে হাত দেওয়ার আগে অন্য সব বিকল্প পথ শতভাগ ব্যবহার করে দেখতে হবে। শিক্ষাকে যদি আমরা জাতির মেরুদণ্ড বলে বিশ্বাস করি, তবে সেই মেরুদণ্ডে কুঠারাঘাত করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে চরম হঠকারিতা। আমরা আশা করি, সরকার জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল রাখার সিদ্ধান্ত নেবে।
লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ অদ্ভুত ‘ক্লান্তির ফাঁদে’ আটকা পড়েছে। সংকট সমাধানের সমস্ত প্রচেষ্টাই কেবল এই ক্লান্তি সামাল দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কৌশল পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
৭ ঘণ্টা আগে
একটি গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় যখন নাইট্রোজেনের অভাব হয়। ফল ঝরে পড়ে যখন ফসফরাস নেই। ডাল শুকিয়ে আসে পটাশিয়াম না পেলে। এই তিনটি উপাদান ছাড়া গাছ বাঁচে না, ফসল হয় না। আর এই তিনটি উপাদানের মূল বাহক হলো রাসায়নিক সার।
৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা যে, এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব কাজ, এমনকি ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেয়। এই ‘ভাঙা-গড়ার’ প্রবণতার কারণে সময় ও অর্থ—দুটোরই অপচয় হয়। আমরা এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।
৯ ঘণ্টা আগে
নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। রবিবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি দাবি করে বলেন, ‘আমি এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি, বাংলাদেশে
১১ ঘণ্টা আগে