ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা চুক্তি ২০২৬
সুমন সুবহান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিস্ফোরণটি ঘটল ওয়াশিংটন ডিসিতে। গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক ‘ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা চুক্তি’। চুক্তিতে লেবাননের পক্ষে দেশটির রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াদ এবং ইসরায়েলের পক্ষে রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার স্বাক্ষর করেন।
১৯৮৩ সালের ব্যর্থ শান্তি প্রচেষ্টার পর এই প্রথম দুই প্রতিবেশী দেশ কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। তবে বৈরুত ও তেল আবিবের মাঠপর্যায়ের সামরিক বাস্তবতা বলছে—এটি একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের এক মহাপরিকল্পনা এবং লেবাননের জন্য এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের বারুদ।
হোয়াইট হাউসের কৌশলগত দলিল অনুযায়ী, ১৪ দফা বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল সুর হলো—‘ইসরায়েলের সামরিক প্রত্যাহার বনাম হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’। তবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে এটি হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক দমনের অজুহাতে দেশটিতে নতুন ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পথ তৈরি করছে।
১৪ দফা চুক্তির মূল দর্শন হলো ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বনাম হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৈরি এই রূপরেখা চুক্তিটি লেবাননের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেওয়ার এক বিতর্কিত ও সুদূরপ্রসারী আইনি দলিল।
চুক্তিটির প্রথম ধাপের পদক্ষেপ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননে দুটি পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলট জোন’ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলো থেকে ধাপে ধাপে প্রথমে সরে যাবে। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ব্রিফিং অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের পর সেই স্থানগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেবে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা যাচাই করা, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর সীমান্ত সুরক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করবে।
চুক্তিটির আরেকটি শর্ত হলো হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক অস্তিত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে দেওয়া। চুক্তির মূল ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শুধু দক্ষিণ লেবানন বা লিটানি নদীর অববাহিকাই নয়, বরং সমগ্র লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহসহ সমস্ত অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক শাখা চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত করতে হবে। পেন্টাগনের সামরিক পর্যবেক্ষণ সেল অনুসারে, তাদের সমস্ত ভারী ও হালকা অস্ত্র রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সমর্পণ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই শর্তটি মূলত লেবাননে হিজবুল্লাহর প্যারা-মিলিটারি বা সমান্তরাল সামরিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানোর জন্য আমেরিকার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই অংশ।
লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে স্বীকার করেছে যে, রাষ্ট্রে একক বলপ্রয়োগ বা অস্ত্র ব্যবহারের বৈধ অধিকার কেবল সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর থাকবে। লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র (যেমন ইরান) বা অ-রাষ্ট্রীয় কোনো সশস্ত্র পক্ষ লেবাননের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া তার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারবে না। এই ধারার মূল লক্ষ্য হলো লেবাননের সার্বভৌমত্বকে পুনরুদ্ধার করা এবং একে আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধের আখড়া হওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করা।
ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত চুক্তিপত্রের খসড়ায় ‘শান্তি’ শব্দটি সরাসরি ১০ বার ব্যবহার করা হয়েছে এবং স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশ অবিলম্বে যৌথ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করবে। তবে ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দুই দেশ আন্তর্জাতিক কোনো রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘প্রতিকূল পদক্ষেপ’ বা যুদ্ধাপরাধের কোনো মামলা দায়ের করা থেকে বিরত থাকবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহল এই দায়মুক্তির ধারার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এটি বিগত সংঘাতগুলোর জবাবদিহিতা এড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল।
চুক্তিটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বিশেষ সামরিক সমন্বয়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি মেকানিজম তৈরি করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রেস নোট অনুযায়ী, যদি লেবানন সফলভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার শর্ত পূরণ করতে পারে, তবে ধসে পড়া লেবাননের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিপুল বৈশ্বিক তহবিল দেওয়া হবে। একই সঙ্গে লেবানন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বড় ধরনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার সরাসরি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই অর্থনৈতিক প্যাকেজটি মূলত লেবানন সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করার একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
ওয়াশিংটন চুক্তি স্বাক্ষরের পর লেবাননের ভূ-রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অনমনীয় অবস্থান। কাগজে-কলমে লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তিতে সই করলেও, দেশটির প্রকৃত সামরিক ও রাজনৈতিক চালিকাশক্তি অর্থাৎ হিজবুল্লাহ এবং শিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব একে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বৈরুতভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি লেবাননের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক নাজুক অবস্থায় ফেলেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে।
হিজবুল্লাহর আল-মানার টেলিভিশনে প্রচারিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংগঠনের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকে ‘অবৈধ, বাতিল ও শূন্য’ বলে ঘোষণা করেছে। তাদের মূল দাবি হলো, লেবাননের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো ধরনের জাতীয় ঐকমত্য এবং সংসদের অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ এককভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের স্বার্থে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেবাননের রাজনৈতিক কাঠামোর নিয়ম লঙ্ঘন করে নেওয়া এই চুক্তিকে তারা তাই আইনি ও নৈতিক কোনো দিক থেকেই বৈধ বলে মনে করে না।
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আমাল মুভমেন্টের প্রধান নাবিহ বেরি—যিনি হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রধান শিয়া রাজনৈতিক মিত্র—এই চুক্তিকে সরাসরি ‘লেবাননে নতুন করে গৃহযুদ্ধ বাধানোর উসকানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, হিজবুল্লাহর মতো একটি জনপ্রিয় শক্তিকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করার যেকোনো চেষ্টা লেবানন রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলবে। হিজবুল্লাহর সামরিক উইং স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা চুপ থাকবে না, যা দেশকে আবার ১৯৭৫ সালের মতো এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। এই হুঁশিয়ারিটি লেবাননের বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
প্রতিরোধের যুক্তি
হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক শাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, লেবাননের ভূখণ্ডে (যেমন বিতর্কিত শেবা ফার্মস ও কাফর শুবা পাহাড়) যতক্ষণ ইসরায়েলি দখলদারিত্ব বা হুমকি থাকবে, ততক্ষণ ‘প্রতিরোধের অস্ত্র’ ত্যাগ করা হবে আত্মঘাতী। তেল আবিব থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তির পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে। নেতানিয়াহুর এই সামরিক হুঙ্কার হিজবুল্লাহর আশঙ্কাকে মাঠপর্যায়ে আরও সত্য প্রমাণিত করেছে এবং তাদের অস্ত্র ধরে রাখার যুক্তিকে শিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। হিজবুল্লাহ তাই মনে করে, এই চুক্তি কোনো শান্তির দলিল নয়, বরং ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া একটি ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ।
পেন্টাগনের গোয়েন্দা সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সামনে রেখে আমেরিকা আসলে ইরানের আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের মূল ভিত্তিকে উপড়ে ফেলতে চাইছে। ফলে এই চুক্তি একদিকে যেমন কূটনৈতিক দরকষাকষির নতুন টেবিল তৈরি করেছে, ঠিক অন্যদিকে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে ইরানের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও নৌ-বাণিজ্য অবরোধের চেষ্টা রুখতে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি তৈরি করেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় আন্তর্জাতিক আইন ও নৌ-নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে তাদের তিনটি সর্বাধুনিক বিমানবাহী রণতরী বহর— ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার মোতায়েন করে রেখেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং অনুসারে, এই বিশাল নৌবহরের পাশাপাশি ইসরায়েল, জর্ডান এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে বিপুল সংখ্যক পঞ্চম প্রজন্মের এফ-২২ র্যাপ্টর এবং এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার এই নজিরবিহীন শক্তি প্রদর্শন মূলত ইরানকে যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ বা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত রাখার একটি চূড়ান্ত প্রতিরোধমূলক কৌশল।
গত ২৭-২৮ জুন হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ড্রোনের আঘাতে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এবং এর জবাবে মার্কিন বিমানবাহিনী কর্তৃক ইরানের মূল ভূখণ্ডের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলার ঘটনার পর সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক ও যুদ্ধমুখী হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর সামরিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমেরিকার মূল কৌশল হলো—একদিকে নৌ ও বিমান শক্তি প্রদর্শন করে ইরানকে সরাসরি বড় কোনো সংঘাত থেকে দূরে রাখা, অন্যদিকে লেবানন সরকারের আইনি মোড়ক ব্যবহার করে হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা।
কাতার ও দোহার কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ৩০ জুন দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি টেকনিক্যাল বৈঠক চলার মধ্যেই এই সামরিক চাপ বজায় রাখা হয়েছে, যাতে তেহরান তাদের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। মূলত লেবাননের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে শক্তিশালী করার আড়ালে ইরানের তৈরি করা ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়াই এখন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
ওয়াশিংটন ডিসির এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা চুক্তি কাগজে-কলমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অত্যন্ত ধূসর ও বিপজ্জনক। লেবাননের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ (বিশেষ করে ড্রুজ, মারোনাইট খ্রিস্টান ও সুন্নিরা) দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চাইলেও, দেশটির প্রায় ৯২ শতাংশ শিয়া জনগোষ্ঠী এই একপাক্ষিক চুক্তির চরম বিরোধিতা করছে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, লেবানন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত যোদ্ধা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের অস্ত্রভাণ্ডার বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। এর ওপর লেবাননে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিরক্ষী বাহিনীর বর্তমান মিশন ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের তীব্র কূটনৈতিক চাপে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই মিশনটি ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার চূড়ান্ত রূপরেখা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক শূন্যতার মাঝে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করতে গেলে লেবানন রাষ্ট্র নিজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে এবং আরেকটি রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের বারুদে আগুন জ্বলবে।
এই আসন্ন নিরাপত্তা মহাবিপর্যয় এবং নতুন করে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা লেবাননের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই জটিলতা নিরসনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘ মিশন পরবর্তী সময়ে ইতালি ও ফ্রান্সের যৌথ সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি ইউরোপীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। তবে এই সামরিক মোড়ক তখনই সফল হবে, যখন কাতারের দোহার টেবিলে চলমান মার্কিন-ইরান টেকনিক্যাল বৈঠক একটি টেকসই ও সর্বসম্মত রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
স্থায়ী সমাধানের জন্য লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবশ্যই সব পক্ষকে নিয়ে একটি জরুরি জাতীয় সংলাপ আয়োজন করতে হবে, যেখানে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক শাখাকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে বৈরুতকে ইরানের প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগকেও বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে একটি ধাপে ধাপে রূপান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিস্ফোরণটি ঘটল ওয়াশিংটন ডিসিতে। গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক ‘ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা চুক্তি’। চুক্তিতে লেবাননের পক্ষে দেশটির রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াদ এবং ইসরায়েলের পক্ষে রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার স্বাক্ষর করেন।
১৯৮৩ সালের ব্যর্থ শান্তি প্রচেষ্টার পর এই প্রথম দুই প্রতিবেশী দেশ কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। তবে বৈরুত ও তেল আবিবের মাঠপর্যায়ের সামরিক বাস্তবতা বলছে—এটি একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের এক মহাপরিকল্পনা এবং লেবাননের জন্য এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের বারুদ।
হোয়াইট হাউসের কৌশলগত দলিল অনুযায়ী, ১৪ দফা বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল সুর হলো—‘ইসরায়েলের সামরিক প্রত্যাহার বনাম হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’। তবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে এটি হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক দমনের অজুহাতে দেশটিতে নতুন ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পথ তৈরি করছে।
১৪ দফা চুক্তির মূল দর্শন হলো ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বনাম হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৈরি এই রূপরেখা চুক্তিটি লেবাননের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেওয়ার এক বিতর্কিত ও সুদূরপ্রসারী আইনি দলিল।
চুক্তিটির প্রথম ধাপের পদক্ষেপ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননে দুটি পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলট জোন’ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলো থেকে ধাপে ধাপে প্রথমে সরে যাবে। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ব্রিফিং অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের পর সেই স্থানগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেবে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা যাচাই করা, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর সীমান্ত সুরক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করবে।
চুক্তিটির আরেকটি শর্ত হলো হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক অস্তিত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে দেওয়া। চুক্তির মূল ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শুধু দক্ষিণ লেবানন বা লিটানি নদীর অববাহিকাই নয়, বরং সমগ্র লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহসহ সমস্ত অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক শাখা চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত করতে হবে। পেন্টাগনের সামরিক পর্যবেক্ষণ সেল অনুসারে, তাদের সমস্ত ভারী ও হালকা অস্ত্র রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সমর্পণ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই শর্তটি মূলত লেবাননে হিজবুল্লাহর প্যারা-মিলিটারি বা সমান্তরাল সামরিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানোর জন্য আমেরিকার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই অংশ।
লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে স্বীকার করেছে যে, রাষ্ট্রে একক বলপ্রয়োগ বা অস্ত্র ব্যবহারের বৈধ অধিকার কেবল সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর থাকবে। লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র (যেমন ইরান) বা অ-রাষ্ট্রীয় কোনো সশস্ত্র পক্ষ লেবাননের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া তার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারবে না। এই ধারার মূল লক্ষ্য হলো লেবাননের সার্বভৌমত্বকে পুনরুদ্ধার করা এবং একে আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধের আখড়া হওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করা।
ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত চুক্তিপত্রের খসড়ায় ‘শান্তি’ শব্দটি সরাসরি ১০ বার ব্যবহার করা হয়েছে এবং স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশ অবিলম্বে যৌথ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করবে। তবে ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দুই দেশ আন্তর্জাতিক কোনো রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘প্রতিকূল পদক্ষেপ’ বা যুদ্ধাপরাধের কোনো মামলা দায়ের করা থেকে বিরত থাকবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহল এই দায়মুক্তির ধারার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এটি বিগত সংঘাতগুলোর জবাবদিহিতা এড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল।
চুক্তিটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বিশেষ সামরিক সমন্বয়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি মেকানিজম তৈরি করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রেস নোট অনুযায়ী, যদি লেবানন সফলভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার শর্ত পূরণ করতে পারে, তবে ধসে পড়া লেবাননের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিপুল বৈশ্বিক তহবিল দেওয়া হবে। একই সঙ্গে লেবানন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বড় ধরনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার সরাসরি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই অর্থনৈতিক প্যাকেজটি মূলত লেবানন সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করার একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
ওয়াশিংটন চুক্তি স্বাক্ষরের পর লেবাননের ভূ-রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অনমনীয় অবস্থান। কাগজে-কলমে লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তিতে সই করলেও, দেশটির প্রকৃত সামরিক ও রাজনৈতিক চালিকাশক্তি অর্থাৎ হিজবুল্লাহ এবং শিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব একে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বৈরুতভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি লেবাননের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক নাজুক অবস্থায় ফেলেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে।
হিজবুল্লাহর আল-মানার টেলিভিশনে প্রচারিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংগঠনের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকে ‘অবৈধ, বাতিল ও শূন্য’ বলে ঘোষণা করেছে। তাদের মূল দাবি হলো, লেবাননের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো ধরনের জাতীয় ঐকমত্য এবং সংসদের অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ এককভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের স্বার্থে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেবাননের রাজনৈতিক কাঠামোর নিয়ম লঙ্ঘন করে নেওয়া এই চুক্তিকে তারা তাই আইনি ও নৈতিক কোনো দিক থেকেই বৈধ বলে মনে করে না।
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আমাল মুভমেন্টের প্রধান নাবিহ বেরি—যিনি হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রধান শিয়া রাজনৈতিক মিত্র—এই চুক্তিকে সরাসরি ‘লেবাননে নতুন করে গৃহযুদ্ধ বাধানোর উসকানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, হিজবুল্লাহর মতো একটি জনপ্রিয় শক্তিকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করার যেকোনো চেষ্টা লেবানন রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলবে। হিজবুল্লাহর সামরিক উইং স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা চুপ থাকবে না, যা দেশকে আবার ১৯৭৫ সালের মতো এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। এই হুঁশিয়ারিটি লেবাননের বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
প্রতিরোধের যুক্তি
হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক শাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, লেবাননের ভূখণ্ডে (যেমন বিতর্কিত শেবা ফার্মস ও কাফর শুবা পাহাড়) যতক্ষণ ইসরায়েলি দখলদারিত্ব বা হুমকি থাকবে, ততক্ষণ ‘প্রতিরোধের অস্ত্র’ ত্যাগ করা হবে আত্মঘাতী। তেল আবিব থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তির পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে। নেতানিয়াহুর এই সামরিক হুঙ্কার হিজবুল্লাহর আশঙ্কাকে মাঠপর্যায়ে আরও সত্য প্রমাণিত করেছে এবং তাদের অস্ত্র ধরে রাখার যুক্তিকে শিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। হিজবুল্লাহ তাই মনে করে, এই চুক্তি কোনো শান্তির দলিল নয়, বরং ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া একটি ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ।
পেন্টাগনের গোয়েন্দা সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সামনে রেখে আমেরিকা আসলে ইরানের আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের মূল ভিত্তিকে উপড়ে ফেলতে চাইছে। ফলে এই চুক্তি একদিকে যেমন কূটনৈতিক দরকষাকষির নতুন টেবিল তৈরি করেছে, ঠিক অন্যদিকে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে ইরানের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ও নৌ-বাণিজ্য অবরোধের চেষ্টা রুখতে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি তৈরি করেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় আন্তর্জাতিক আইন ও নৌ-নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে তাদের তিনটি সর্বাধুনিক বিমানবাহী রণতরী বহর— ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার মোতায়েন করে রেখেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং অনুসারে, এই বিশাল নৌবহরের পাশাপাশি ইসরায়েল, জর্ডান এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে বিপুল সংখ্যক পঞ্চম প্রজন্মের এফ-২২ র্যাপ্টর এবং এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার এই নজিরবিহীন শক্তি প্রদর্শন মূলত ইরানকে যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ বা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত রাখার একটি চূড়ান্ত প্রতিরোধমূলক কৌশল।
গত ২৭-২৮ জুন হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ড্রোনের আঘাতে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এবং এর জবাবে মার্কিন বিমানবাহিনী কর্তৃক ইরানের মূল ভূখণ্ডের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলার ঘটনার পর সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক ও যুদ্ধমুখী হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর সামরিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমেরিকার মূল কৌশল হলো—একদিকে নৌ ও বিমান শক্তি প্রদর্শন করে ইরানকে সরাসরি বড় কোনো সংঘাত থেকে দূরে রাখা, অন্যদিকে লেবানন সরকারের আইনি মোড়ক ব্যবহার করে হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা।
কাতার ও দোহার কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ৩০ জুন দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি টেকনিক্যাল বৈঠক চলার মধ্যেই এই সামরিক চাপ বজায় রাখা হয়েছে, যাতে তেহরান তাদের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। মূলত লেবাননের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে শক্তিশালী করার আড়ালে ইরানের তৈরি করা ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়াই এখন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
ওয়াশিংটন ডিসির এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা চুক্তি কাগজে-কলমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অত্যন্ত ধূসর ও বিপজ্জনক। লেবাননের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ (বিশেষ করে ড্রুজ, মারোনাইট খ্রিস্টান ও সুন্নিরা) দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চাইলেও, দেশটির প্রায় ৯২ শতাংশ শিয়া জনগোষ্ঠী এই একপাক্ষিক চুক্তির চরম বিরোধিতা করছে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, লেবানন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত যোদ্ধা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের অস্ত্রভাণ্ডার বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। এর ওপর লেবাননে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিরক্ষী বাহিনীর বর্তমান মিশন ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের তীব্র কূটনৈতিক চাপে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই মিশনটি ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার চূড়ান্ত রূপরেখা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক শূন্যতার মাঝে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করতে গেলে লেবানন রাষ্ট্র নিজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে এবং আরেকটি রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের বারুদে আগুন জ্বলবে।
এই আসন্ন নিরাপত্তা মহাবিপর্যয় এবং নতুন করে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা লেবাননের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই জটিলতা নিরসনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘ মিশন পরবর্তী সময়ে ইতালি ও ফ্রান্সের যৌথ সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি ইউরোপীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। তবে এই সামরিক মোড়ক তখনই সফল হবে, যখন কাতারের দোহার টেবিলে চলমান মার্কিন-ইরান টেকনিক্যাল বৈঠক একটি টেকসই ও সর্বসম্মত রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
স্থায়ী সমাধানের জন্য লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবশ্যই সব পক্ষকে নিয়ে একটি জরুরি জাতীয় সংলাপ আয়োজন করতে হবে, যেখানে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক শাখাকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে বৈরুতকে ইরানের প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগকেও বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের পরিবর্তে একটি ধাপে ধাপে রূপান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়।
.png)

গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচদিনের চীন-সফর শুধু দুই দেশের জন্যই নয়, ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
১ ঘণ্টা আগে
আজ পহেলা জুলাই, নতুন অর্থবছরের সূচনা। শুরু হচ্ছে নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। তবে নতুন অর্থবছর কেবল বাজেটের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাজেটের বাইরেও বাজার ব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আসা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা—এসব কিছু
৫ ঘণ্টা আগে
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস এক নতুন মোড় নিয়েছিল। যে গণঅভ্যুত্থানকে অনেকে আজ ‘বর্ষা-বিপ্লব’ নামে অভিহিত করেন, তা কেবল একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের পুনর্নির্ধারণ।
৫ ঘণ্টা আগে
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দুঃখজনক বৈপরীত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন– লোডশেডিং নেই বললেই চলে; অন্যদিকে গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। হালে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লোডশেডিংয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে।
১৭ ঘণ্টা আগে