লেখা:

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারির আকস্মিক বিমান হামলা ছিল একই সঙ্গে উদ্বেগজনক ঘটনা। বাংলাদেশও পরিমিত ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে—ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কারণে যে এই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা উল্লেখ করেনি।
ইরানকে প্রধান ভুক্তভোগী হিসেবেও তুলে ধরা হয়নি। এতে শুধু অর্থনৈতিকই নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। যুদ্ধ এই দুর্বলতা তৈরি করেনি। এটিকে সামনে এনেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও কূটনৈতিক সংশয়গুলো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, পাশাপাশি কোনো বড় শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার চেষ্টা করছে। কাউকে আঘাত না করে বক্তব্য দিতে গিয়ে বরং সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকারের এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা—বাংলাদেশের কোনো সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি নেই। ঝুঁকি এড়াতে গিয়ে সরকার একটি ‘নির্ভরশীলতার নীতি’ গ্রহণ করেছে। এই অবস্থাকে যথার্থই ‘পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’ বলা যেতে পারে।
দূরের যুদ্ধ, কাছের প্রভাব
ইরানের যুদ্ধ ভৌগোলিকভাবে দূরে হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক। বাংলাদেশ সরাসরি এই সংঘাতে অংশগ্রহণ করছে না, কিন্তু এর প্রভাব গভীরভাবে অনুভব করছে। এটাই বিশ্বায়নের বাস্তবতা, বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর ‘ভূমিকম্পের মতো’ আঘাত হানতে পারে। ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি দুর্বল হওয়া, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
নিরপেক্ষতার ভ্রম
এমন পরিস্থিতিতে একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারি বিবৃতিতে সংযম, সংলাপ ও শান্তির কথা বলা হয়েছে, যা প্রথমে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু নিরপেক্ষতা মানে শুধু পক্ষ না নেওয়া নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভারসাম্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতি স্পষ্ট।
সমালোচকরা বলেছেন, বাংলাদেশ কিছু পদক্ষেপের নিন্দা করলেও—বিশেষত পাল্টা হামলা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক আগ্রাসনের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। এতে ভাষাগতভাবে একটি পক্ষপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা প্রকৃত নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। এটি নিরপেক্ষতা নয়, বরং বেছে বেছে সতর্কতা।
নীতির বদলে নির্ভরশীলতা
এই বাস্তবতা বুঝতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির কাঠামোগত নির্ভরশীলতার দিকে তাকাতে হবে। তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল: জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি বাজার (বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো) এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর, ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়লে বাংলাদেশ কোনো পক্ষকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে পারে না।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা কূটনৈতিক অবস্থানকে সীমাবদ্ধ করে।
এছাড়া, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং একই সঙ্গে চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তোলে।
কিন্তু এই ‘ভারসাম্য’ অনেক সময় স্থবিরতায় রূপ নেয়। পররাষ্ট্রনীতি শুধু ঝুঁকি এড়ানোর বিষয় নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠার বিষয়ও। স্পষ্ট অবস্থানের অভাবে বাংলাদেশ কখনো অপ্রাসঙ্গিক, কখনো সুযোগসন্ধানী হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে, যা কোনোটিই কাম্য নয়।
কৌশলগত অস্পষ্টতা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রায়ই কৌশলগত অস্পষ্টতায় চিহ্নিত। তবে কৌশলগত অস্পষ্টতা আর অগোছালো অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আইনের ভিত্তিতে সুসংহত অবস্থান প্রকাশে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়। ছোট রাষ্ট্রগুলো সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির বদলে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে। সেসব নীতিকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন না করলে নিজেদের অবস্থানই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশীয় প্রভাব
এই দুর্বলতা শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। বর্তমান জ্বালানি সংকট তার একটি উদাহরণ। আমদানিনির্ভরতা ও বৈচিত্র্যের অভাব বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলেছে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের হাতে বিকল্প কম থাকে।
কয়লার দিকে ঝুঁকে পড়া একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই নির্দেশ করে। পররাষ্ট্রনীতি শুধু বিবৃতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়—জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এর অংশ।
ধারাবাহিক চিত্র
ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়াকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ প্রায়ই সতর্ক ও অনির্দিষ্ট অবস্থান নেয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসংগতির ধারণা তৈরি করে।
যেকোনো দেশের জন্য একটি কূটনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ—শান্তির পক্ষে অবস্থান, মানবাধিকার, বা নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকার মাধ্যমে সম্ভাবনা দেখালেও বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতে তা প্রতিফলিত হয়নি।
ছোট রাষ্ট্রের বাস্তবতা
অনেকে যুক্তি দেন, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিকল্প সীমিত। বড় শক্তির বিশ্বে সতর্কতা প্রয়োজন। এটি আংশিক সত্য। কিন্তু সতর্কতা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়।
অন্যান্য ছোট রাষ্ট্র দেখিয়েছে, নীতিনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেও স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সম্ভব। প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা—জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ, নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈচিত্র্য, এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ এই দিকগুলোতে পিছিয়ে আছে।
ইরান যুদ্ধ হয়তো একসময় শেষ হবে, কিন্তু এই সমস্যাগুলো থেকে যাবে। বিশ্ব রাজনীতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, এবং এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এ ধরনের ধাক্কা আরও ঘন ঘন আসবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।
নতুন ভাবনার প্রয়োজন
এই যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হলো—পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বাস্তববাদ মানে শুধু ঝুঁকি এড়ানো নয় বরং সুস্পষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।
এর জন্য প্রয়োজন জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার, আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান এবং বৈশ্বিক মঞ্চে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এসব সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। না হলে বাংলাদেশ একই জায়গায় ঘুরপাক খাবে—প্রতিক্রিয়াশীল, সীমাবদ্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। বর্তমান বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির এই ধারা টেকসই নয়। এটি শুধু বর্তমান সামলানোর বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। বাংলাদেশ এখন এই দুই ক্ষেত্রেই সংগ্রাম করছে। এ কারণেই পরিস্থিতি এক ধরনের দেউলিয়াত্বের মতো মনে হয়।
প্রশ্ন হলো—এই সংকট কি বাংলাদেশের পরিবর্তনের সূচনা হবে, নাকি হবে আরেকটি হারানো সুযোগ?
(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত অনুবাদ: মাহজাবিন নাফিসা)

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারির আকস্মিক বিমান হামলা ছিল একই সঙ্গে উদ্বেগজনক ঘটনা। বাংলাদেশও পরিমিত ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে—ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কারণে যে এই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা উল্লেখ করেনি।
ইরানকে প্রধান ভুক্তভোগী হিসেবেও তুলে ধরা হয়নি। এতে শুধু অর্থনৈতিকই নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। যুদ্ধ এই দুর্বলতা তৈরি করেনি। এটিকে সামনে এনেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও কূটনৈতিক সংশয়গুলো সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, পাশাপাশি কোনো বড় শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার চেষ্টা করছে। কাউকে আঘাত না করে বক্তব্য দিতে গিয়ে বরং সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকারের এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা—বাংলাদেশের কোনো সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি নেই। ঝুঁকি এড়াতে গিয়ে সরকার একটি ‘নির্ভরশীলতার নীতি’ গ্রহণ করেছে। এই অবস্থাকে যথার্থই ‘পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’ বলা যেতে পারে।
দূরের যুদ্ধ, কাছের প্রভাব
ইরানের যুদ্ধ ভৌগোলিকভাবে দূরে হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক। বাংলাদেশ সরাসরি এই সংঘাতে অংশগ্রহণ করছে না, কিন্তু এর প্রভাব গভীরভাবে অনুভব করছে। এটাই বিশ্বায়নের বাস্তবতা, বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর ‘ভূমিকম্পের মতো’ আঘাত হানতে পারে। ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি দুর্বল হওয়া, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
নিরপেক্ষতার ভ্রম
এমন পরিস্থিতিতে একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সরকারি বিবৃতিতে সংযম, সংলাপ ও শান্তির কথা বলা হয়েছে, যা প্রথমে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু নিরপেক্ষতা মানে শুধু পক্ষ না নেওয়া নয়; এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভারসাম্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতি স্পষ্ট।
সমালোচকরা বলেছেন, বাংলাদেশ কিছু পদক্ষেপের নিন্দা করলেও—বিশেষত পাল্টা হামলা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক আগ্রাসনের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। এতে ভাষাগতভাবে একটি পক্ষপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা প্রকৃত নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। এটি নিরপেক্ষতা নয়, বরং বেছে বেছে সতর্কতা।
নীতির বদলে নির্ভরশীলতা
এই বাস্তবতা বুঝতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির কাঠামোগত নির্ভরশীলতার দিকে তাকাতে হবে। তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল: জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি বাজার (বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো) এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর, ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়লে বাংলাদেশ কোনো পক্ষকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে পারে না।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা কূটনৈতিক অবস্থানকে সীমাবদ্ধ করে।
এছাড়া, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং একই সঙ্গে চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তোলে।
কিন্তু এই ‘ভারসাম্য’ অনেক সময় স্থবিরতায় রূপ নেয়। পররাষ্ট্রনীতি শুধু ঝুঁকি এড়ানোর বিষয় নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠার বিষয়ও। স্পষ্ট অবস্থানের অভাবে বাংলাদেশ কখনো অপ্রাসঙ্গিক, কখনো সুযোগসন্ধানী হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে, যা কোনোটিই কাম্য নয়।
কৌশলগত অস্পষ্টতা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রায়ই কৌশলগত অস্পষ্টতায় চিহ্নিত। তবে কৌশলগত অস্পষ্টতা আর অগোছালো অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আইনের ভিত্তিতে সুসংহত অবস্থান প্রকাশে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়। ছোট রাষ্ট্রগুলো সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির বদলে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে। সেসব নীতিকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন না করলে নিজেদের অবস্থানই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশীয় প্রভাব
এই দুর্বলতা শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। বর্তমান জ্বালানি সংকট তার একটি উদাহরণ। আমদানিনির্ভরতা ও বৈচিত্র্যের অভাব বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলেছে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের হাতে বিকল্প কম থাকে।
কয়লার দিকে ঝুঁকে পড়া একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই নির্দেশ করে। পররাষ্ট্রনীতি শুধু বিবৃতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়—জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এর অংশ।
ধারাবাহিক চিত্র
ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়াকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ প্রায়ই সতর্ক ও অনির্দিষ্ট অবস্থান নেয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসংগতির ধারণা তৈরি করে।
যেকোনো দেশের জন্য একটি কূটনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ—শান্তির পক্ষে অবস্থান, মানবাধিকার, বা নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকার মাধ্যমে সম্ভাবনা দেখালেও বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতে তা প্রতিফলিত হয়নি।
ছোট রাষ্ট্রের বাস্তবতা
অনেকে যুক্তি দেন, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিকল্প সীমিত। বড় শক্তির বিশ্বে সতর্কতা প্রয়োজন। এটি আংশিক সত্য। কিন্তু সতর্কতা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়।
অন্যান্য ছোট রাষ্ট্র দেখিয়েছে, নীতিনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেও স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সম্ভব। প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা—জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ, নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈচিত্র্য, এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ এই দিকগুলোতে পিছিয়ে আছে।
ইরান যুদ্ধ হয়তো একসময় শেষ হবে, কিন্তু এই সমস্যাগুলো থেকে যাবে। বিশ্ব রাজনীতি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, এবং এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এ ধরনের ধাক্কা আরও ঘন ঘন আসবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।
নতুন ভাবনার প্রয়োজন
এই যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হলো—পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বাস্তববাদ মানে শুধু ঝুঁকি এড়ানো নয় বরং সুস্পষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।
এর জন্য প্রয়োজন জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার, আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান এবং বৈশ্বিক মঞ্চে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এসব সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। না হলে বাংলাদেশ একই জায়গায় ঘুরপাক খাবে—প্রতিক্রিয়াশীল, সীমাবদ্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। বর্তমান বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির এই ধারা টেকসই নয়। এটি শুধু বর্তমান সামলানোর বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। বাংলাদেশ এখন এই দুই ক্ষেত্রেই সংগ্রাম করছে। এ কারণেই পরিস্থিতি এক ধরনের দেউলিয়াত্বের মতো মনে হয়।
প্রশ্ন হলো—এই সংকট কি বাংলাদেশের পরিবর্তনের সূচনা হবে, নাকি হবে আরেকটি হারানো সুযোগ?
(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত অনুবাদ: মাহজাবিন নাফিসা)

চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ শেষে গত ১১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে যেদিন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন আমেরিকার নভোচারীরা, সেদিনই কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বাংলাদেশের কিছু লোক।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলা নববর্ষের দিন ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এক চালবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে নিহত হন সাতজন শ্রমিক। বর্ষবরণ উৎসবের ব্যস্ততায় এই দুর্ঘটনা থেকে গেছে দৃষ্টির আড়ালে।
১ দিন আগে
স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি বিস্তৃত রোড ম্যাপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যার নাম ‘সবার আগে স্বাস্থ্য’। এতে রোগ প্রতিরোধ, বর্ধিত স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেস এবং ফোকাসড প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে জননিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১ দিন আগে
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি কেবল জ্বালানি তেল বা ধর্মীয় আবেগের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক শক্তির মহড়া ও আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এক জটিল দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে।
২ দিন আগে