ক্ষমতার অস্বস্তি তৈরিতে ইন্টারনেট মিম

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ১৭: ৫৯
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে মিম কালচার এখন এক প্রজন্মের ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা এক্স (টুইটার)—সব জায়গায়ই তরুণরা নিজেদের ভাবনা, হতাশা, রাজনৈতিক মত কিংবা সামাজিক ব্যঙ্গ প্রকাশ করছে মিমের ভাষায়। আগে যেখানে রাস্তায় পোস্টার লাগানো বা দেয়াল লিখন ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, এখন তার জায়গা নিয়েছে স্ক্রিনে তৈরি হাসির ছবি। ইয়ার্কি, সোবার, শিট পোস্টিং, গণমজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিমস পেইজ শুধু মজার কনটেন্ট দেয় না, বরং সমাজের নিত্য বাস্তবতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনকেও মজার ছলে তুলে ধরে। কখনো সরকারবিরোধী ক্ষোভ, কখনো সামাজিক বৈষম্যের ব্যঙ্গ—সবকিছুই মিমে রূপ পায়।

গণতান্ত্রিক সমাজে স্যাটায়ার অপরিহার্য। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। স্যাটায়ার তিনটি মৌলিক কাজ করে—এক, ক্ষমতার ভেতর দায়বদ্ধতার বোধ জাগায়; দুই, জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে; তিন, ভয়হীন নাগরিক সংস্কৃতি তৈরি করে। যে রাষ্ট্র ব্যঙ্গকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র আসলে জনগণের কণ্ঠস্বরকেই ভয় পায়। আর যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ ক্রমশ কর্তৃত্ববাদে ঢলে পড়ে। মিম কালচার তাই শুধু বিনোদন নয়; এটি একধরনের সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া মানুষ আগে যেভাবে আড্ডায় প্রকাশ করত, এখন তাৎক্ষণিকভাবে মিমে প্রকাশ করে। কঠোর সেন্সরশিপের ভেতরেও মিম হয়ে ওঠে সাংকেতিক প্রতিবাদ—এক ধরনের কোডেড ডিসেন্ট।

বাংলাদেশে মিম কীভাবে কাজ করে—এটা বোঝার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে, আমরা জাতি হিসেবে হাসতে ভালোবাসি। রাজনীতি হোক, ক্রিকেট হোক, কিংবা পাশের বাসার “ভাইয়া, একটু আসেন”—সব জায়গায় আমরা মজা খুঁজে পাই। আর ফেসবুক, টিকটকের যুগে এই হাসিটাই ধরা পড়েছে ছবির ওপর দুই লাইনের লেখায়। এটাই মিম। খুব বেশি কিছু লাগে না—একটা ছবি, একটু চিপচিপে ব্যঙ্গ, আর দু’টো চোখ বিস্ফোরিত ইমোজি—ব্যস! ছড়াতে শুরু করলো ফাস্টপেসে।

বাংলাদেশে মিম কাজ করে খুব সহজভাবে—‘কিছু না বলেও সব বলে ফেলা’র কৌশলে। এখানে মিম হলো সেই বন্ধুর মতো, যে সবার সামনে গুরুগম্ভীর কথা বলতে লজ্জা পায়, কিন্তু বাসায় ফিরেই ফেসবুকে দুই লাইনের ক্যাপশনে রাষ্ট্রদর্শন লিখে ফেলে। একটা ছবি, তার ওপর একটু ব্যঙ্গ, আর নিচে তিনটা ইমোজি—ব্যস! সাধারণ মানুষ যেটা বলতে ভয় পায়, মিম সেটা হাহা-রিঅ্যাক্টের আড়ালে সুন্দরভাবে বলে দেয়।

সম্প্রতি ঢাকায় একজন ছাত্রনেতা যখন বিভিন্ন ফেসবুক আইডি এবং ১৪টি পেজের বিরুদ্ধে মামলা করলেন, তখন আইনি বিতর্কের চেয়ে বেশি আলোচনায় এল আরেকটি শব্দ—মিম। মামলার খবর বেরোতেই দেশের মিমাররা যেন অনলাইন আকাশে আবারও জ্বলে উঠল। পিক্সেলকে তীর, পাঞ্চলাইনকে ঢাল বানিয়ে তারা মাঠে নামল। যেন মিম নিজেই বলছে— “যার কেউ নাই, তার মিম আছে।” বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি—মিমাররা কেবল স্ক্রিনে নয়, মানুষের সাহসের ভেতরও আলো জ্বালিয়েছে। সাইবার স্পেসের বট-বাহিনীকে কৌতুকের ভাষায় ছায়া থেকে চ্যালেঞ্জ করেছে তারা—এ এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিরোধ।

যোগাযোগতত্ত্ববিদ ম্যাকলুহানের ভাষায়, ‘মিডিয়াই বার্তা’ মানে মাধ্যমই মানুষের উপলব্ধিকে গড়ে তোলে; আর আজ সেই ভূমিকা পালন করছে মিম—যেখানে একটি ছবি, ইমোজি বা একলাইন টেক্সটই হয়ে ওঠে সমগ্র প্রজন্মের আবেগের ভাষা। অর্থাৎ, মিম শুধু ‘মেসেজের বাহক’ নয়, সেটিই আজ ‘সংবাদ, মাধ্যম ও ভাষা’—সব একসাথে। বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে হাসিও এক ধরনের বার্তা, আর ব্যঙ্গও এক প্রকার প্রতিবাদ। আমরা এখন এক নেটওয়ার্কড সমাজে বাস করি—যেখানে মানুষ শুধু তথ্যের গ্রাহক নয়, তথ্যের স্রষ্টাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ভাষা, যা অনেক সময় শব্দ ছাড়াই কথা বলে। এই ভাষার নাম—মিম।

আগে যেখানে রাস্তায় পোস্টার লাগানো বা দেয়াল লিখন ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, এখন তার জায়গা নিয়েছে স্ক্রিনে তৈরি হাসির ছবি। ইয়ার্কি, সোবার, শিট পোস্টিং, গণমজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিমস পেইজ শুধু মজার কনটেন্ট দেয় না, বরং সমাজের নিত্য বাস্তবতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনকেও মজার ছলে তুলে ধরে।

মিমস নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রায় বিরানব্বই শতাংশ নিয়মিত মিম দেখে বা শেয়ার করে। তাদের মধ্যে অনেকেই জানে না যে এই রসিকতা বা কৌতুক আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার এক রূপ। গবেষণায় বলা হয়েছে—মিম এখন এক ধরনের সামাজিক এক্সপ্রেশন, যা অনেক সময় কথায় বা লেখায় বলা সম্ভব হয় না।

মিমের ধারণাটি নতুন নয়। জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে দ্য সেল্ফিশ জিন বইয়ে লিখেছিলেন, সমাজে কোনো আচরণ, রুচি বা চিন্তা যেমন একে অপরের মধ্যে ছড়ায়, সেটিই এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক জিন’—অর্থাৎ মিম। আজকের ইন্টারনেট যুগ সেই ধারণাকে দৃশ্যমান করেছে। একটি মিম তৈরি হয়, শেয়ার হয়, আবার অন্য কেউ সেটিকে নতুনভাবে বানায়—এই ধারাবাহিকতাই মিমের ডিজিটাল বংশানুক্রম।

বাংলাদেশে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক শুধু বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়—এগুলো এখন এক নতুন জনপরিসর, যেখানে হাস্যরসের মধ্য দিয়েও মানুষ কথা বলে, সমালোচনা করে, প্রতিবাদ জানায়। একসময় পত্রিকার ব্যঙ্গচিত্র বা রাজনৈতিক কার্টুন সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরত, আজ মিম সেই ভূমিকায় হাজির। বিশেষ করে যখন গণমাধ্যমে সমালোচনার পরিসর সংকুচিত হয়, তখন মিম হয়ে ওঠে নাগরিকদের বিকল্প কণ্ঠস্বর।

বাংলা সমাজে ব্যঙ্গের শিকড় গভীরে। আবুল মনসুর আহমদ, কালপেঁচা, শিব্রাম, পরশুরাম, মুজতবা আলী—তাঁরা সবাই ক্ষমতাকে আয়নার সামনে দাঁড় করাতেন কৌতুকের ছোঁয়ায়। আজ সেই ধারাটিই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আপগ্রেড হয়ে এসেছে পলিটিক্যাল মিম হয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া গবেষক লিমোর শিফম্যান মিমকে বলেছেন ‘পার্টিসিপেটরি কালচার’—যেখানে প্রতিটি ব্যবহারকারীই একই সঙ্গে প্রযোজক ও ভোক্তা। তাই মিম কেবল হাস্যরস নয়; এটি দ্রুত, ক্ষিপ্র, জনমতের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের আধুনিক ভাষা।

বাংলাদেশে মিম প্রথমে ছিলো নিছক মজা। প্রেম-ভালোবাসা, বেকারত্বের হাসাহাসি, রাস্তাঘাটে মানুষের অদ্ভুত আচরণ—এসব নিয়েই চলত মিমের জগৎ। কিন্তু ২০২১/২২ সালের দিকে এসে ঘটনাটা মোড় নিল। দেশজুড়ে নানা রাজনৈতিক চাপ, তরুণদের হতাশা, আর মত প্রকাশের ঝুঁকি—এসব মিলিয়ে মিম হয়ে উঠলো এক ধরনের ‘নিরাপদ রাজনৈতিক মাইক্রোফোন’। যেটা আগে শুধুই হাসাতো, সে এখন প্রশ্ন করতে শুরু করল।

সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশে মিম সাধারণত রাজনৈতিক হয়ে ওঠে না, কারণ সেখানে মানুষ খোলাখুলিই রাজনৈতিক মতামত দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সরাসরি কিছু বললে ঝামেলা আছে—সেটা সবাই জানে। তাই মানুষ বলল, “আমরা সরাসরি বলবো না, মিমে বলে দিব।” মিম তাই হয়ে গেলো ‘হাসির ছলে প্রতিবাদ’। মজার মধ্যে ছুরি, ব্যঙ্গের মধ্যে বার্তা—এমন এক নতুন ভাষা, যেটা তরুণরা খুব দ্রুত গ্রহণ করল।

বাংলাদেশে কোনো ঘটনা ঘটল মাত্র—একটা ভাষণ, দাম বাড়া, কোনো অদ্ভুত রাজনৈতিক মন্তব্য—এর আগেই সংবাদমাধ্যম খবর লিখে শেষ করতে না পারলে মিমাররা মিম বানিয়ে শেষ করে ফেলে। মানে এখানে রাজনীতির সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এখন আর টকশো নয়—মিম। মিম হলো সেই উবার-বাইক, যেটা সবসময় আগে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশে প্রথমবার ঢাকায় যখন মিম ফেস্টিভ্যাল হলো, তখন বোঝা গেল—মিম এখন শুধু অনলাইন খেলার বস্তু নয়। সেখানে ক্যাটাগরিওয়াইজ প্রদর্শনী ছিল, যেমন প্রেমের মিম, ছাত্রজীবন, পপ কালচার, আর অবশ্যই রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। আরও মজার ব্যাপার—ওয়ার্কশপে মিমারদের শেখানো হলো, কীভাবে মিমকে ফুল-লতাপাতা না করে রাজনীতির ভাষা বানানো যায়। ‘মিম দিয়ে কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়?’—এটা যেন একেবারে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসই হয়ে গেল।

তরুণরা এখন আর রাজনৈতিক মিছিল করে না, কিন্তু ফেসবুকে মিম শেয়ার করে। আগের দিনে প্রতিবাদ মানে ছিল রাস্তায় নামা, এখন প্রতিবাদ মানে রিঅ্যাক্ট দেওয়া, ইনবক্সে পাঠানো, বা গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া। মিম তাই নতুন এক গণভাষা—যেখানে দুই লাইনের ক্যাপশনেই হয়ে যায় “জনমত নির্মাণ”। রাজনীতিবিদরা যতই সিরিয়াস মুখ করে কথা বলুন, মিমাররা এক ক্লিকে সেই সিরিয়াসনেস ভেঙে দেন।

যে রাষ্ট্র ব্যঙ্গকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র আসলে জনগণের কণ্ঠস্বরকেই ভয় পায়। আর যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ ক্রমশ কর্তৃত্ববাদে ঢলে পড়ে। মিম কালচার তাই শুধু বিনোদন নয়; এটি একধরনের সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।

রাজনীতিতে ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ার আসলে বহুদিনের পুরোনো অস্ত্র। এই ব্যঙ্গের শক্তি কী? কানাডার সাহিত্যতাত্ত্বিক লিন্ডা হাটচন বলে গেছেন—‘স্যাটায়ার এক্সপোজেস পাওয়ার বাই লাফিং অ্যাট ইট’। মানে দাঁড়ায়—ব্যঙ্গ ক্ষমতাকে হাসির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, আর সেই হাসিটাই ক্ষমতার গায়ে লাগে সবচেয়ে বেশি। ইতিহাস দেখলে দেখি—যে সরকার যত বেশি শক্ত হাতে দেশ চালাতে চায়, তারা ততই কম হাসতে পারে। আমরা জানি, সোভিয়েত ইউনিয়নে একসময় ব্যঙ্গ করা মানেই ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ। তুরস্কে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে একটু রসিকতা করলে সরাসরি মামলা! রাশিয়ায় বিরোধী নেতা নাভালনির টিম যেসব ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও বানাত—সেগুলোকে বলা হতো ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা’। আর মিসরের কমেডিয়ান বাসেম ইউসুফ? তিনি তো দেশই ছাড়তে বাধ্য হলেন—তার অপরাধ? ক্ষমতাকে হাসানো! তাই বলা হয়ে থাকে—যে ক্ষমতা ব্যঙ্গ সহ্য করতে পারে না, সে ক্ষমতায় টোটালিটারিয়ান (সর্বগ্রাসী/স্বৈরতান্ত্রিক) মানসিকতার বীজ থাকে।

এখনকার দিনে যোগাযোগবিদ্যা বা মিডিয়া-গবেষণার লোকেরা বলছেন—মিম আর শুধুই হালকা বিনোদন নয়। এটা একধরনের নতুন রাজনৈতিক ভাষা। আর এই ভাষা কেমন করে ক্ষমতার গায়ে খোঁচা দেয়—তা বোঝাতে গবেষকেরা কয়েকটা তত্ত্ব এনেছেন। এগুলোকে সহজ বাংলায় বলি—

পিয়ের বুর্দিয়ুর চিহ্নগত ক্ষমতার তত্ত্ব মতে, ক্ষমতার চারপাশে একটা অদৃশ্য মর্যাদার বলয় থাকে। ব্যঙ্গ সেই বলয়টাকে ফুটো করে দেয়। মানে, মিম দিয়ে ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের চোখে “স্বাভাবিক” করে ফেলা—ক্ষমতার কাছে ভয়ংকর ব্যাপার। এরভিং গোফম্যানের ফ্রেমিং তত্ত্ব মতে- কার কী ঘটনা কীভাবে দেখা হবে, সেটার ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো ফ্রেম। আর মিম এই ফ্রেম পাল্টে দেয়! শাসকরা যেভাবে ঘটনাকে দেখাতে চান, মিম সেটাকে অন্যভাবে তুলে ধরে—এটাই তাদের অস্বস্তি। এভারেট রজার্সের উদ্ভাবন ছড়িয়ে পড়ার তত্ত্ব মতে—যে জিনিস সহজ, মজার এবং প্রাসঙ্গিক হয়, সেটাই সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। মিম তাই চোখের পলকে ভাইরাল হয় এবং নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যোগাযোগবিদ্যার অন্যতম পণ্ডিত হাবারমাসের পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর তত্ত্ব এর ভাষায়—রাজনীতি শুধু সংসদে হয় না, মানুষের আলোচনার জায়গাতেও হয়। ডিজিটাল যুগে সেই জায়গা হলো ফেসবুক, টিকটক, রেডিট—যেখানে মিম রাজনৈতিক আলোচনা বাড়ায়, অংশগ্রহণ বাড়ায়।

সব তত্ত্ব মিলিয়ে সহজ করে বললে: মিম দেখতে যত হালকা, ভেতরে তত গভীর। এটা কৌতুক নয়—এটা ক্ষমতার সমালোচনার আধুনিক হাতিয়ার। এই সব বিশ্লেষণ সাজিয়ে রাখলে দেখা যায়—ডিজিটাল ব্যঙ্গ বা মিম কেন অনেক শাসকের সহ্য হয় না। আবার এটাও বোঝা যায়—গণতান্ত্রিক সমাজে মিম কালচারের উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই মানুষ নিজেদের কথা বলে, প্রতিবাদ করে, আর হাসির আড়ালে সত্যিটা প্রকাশ করে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মিম আজ বাংলাদেশের তরুণদের রাজনৈতিক ভাষা। সামান্য ছবি, কয়েকটি শব্দ—কিন্তু এর আঘাত তীক্ষ্ণ। শাসকগোষ্ঠী যখন ফেসবুক বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে স্যাটায়ারের মুখোমুখি হয়, তখন এটি তাদের কাছে কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়—বরং ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক অনিয়ন্ত্রিত শক্তি হিসেবে সামনে আসে। যোগাযোগশাস্ত্রের সিম্বলিক পাওয়ার থিওরি অনুসারে যে ক্ষমতাবলয় মর্যাদা, দূরত্ব ও বিশেষত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, মিম সেই মর্যাদাকে মুহূর্তে ভেঙে মানুষ্যিক তুচ্ছতার জায়গায় নামিয়ে আনে। ক্ষমতাবানরা তাই ব্যঙ্গকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, পুরো কাঠামোগত কর্তৃত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেন।

ক্ষমতা সবসময় জনগণের সামনে একটি নির্দিষ্ট বয়ান হাজির করতে চায়—ঘটনা ব্যাখ্যার নিজস্ব ফ্রেম। কিন্তু মিম সেই ফ্রেমিং পাল্টে দেয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে মিম এখন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সহজ, দ্রুত, এবং স্বাভাবিক পথ। তবে ব্যঙ্গেরও নৈতিকতা আছে। মিমাররা নাগরিক হিসেবে দায়িত্বহীন হতে পারে না। বিদ্বেষ, মিথ্যাচার বা ইচ্ছাকৃত অপমান ব্যঙ্গকে বিকৃত করে। স্যাটায়ার যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা আর হাসির শিল্প থাকে না—সহিংস ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই সীমা ঠিক করার দায়িত্ব আদালতের নয়; বরং নাগরিক শিক্ষার, সামাজিক আলোচনার, এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির।

মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, “মিডিয়াই বার্তা।” যদি তিনি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো বলতেন—“মিমই এখন বার্তা।” কারণ মিমের ভেতরে আছে তথ্য, ব্যঙ্গ, শিল্প ও রাজনীতি—সবকিছুর মিশেল। একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে মিম যেন এক নতুন গণভাষা, যেখানে নাগরিকেরা কীবোর্ডে নয়, ইমোজি ও ব্যঙ্গের রেখায় নিজেদের কথা বলে। যে সমাজে হাসি সেন্সর করা যায় না, সেই সমাজে মিমই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ। ডিজিটাল যুগে মিম কেবল রসিকতা নয়; এটি নতুন গণমাধ্যমের পুনর্জন্ম—যেখানে সংবাদ, ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদ মিশে এক অনন্য যোগাযোগের রূপ নিয়েছে। আর হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাস একদিন লিখবে—“যেখানে মানুষ চুপ ছিল, সেখানে মিম কথা বলেছিল।”

  • লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত